19/04/2026
আমার বাংলাদেশ ব্যাংক এর সহকারী পরিচালক হবার জার্নি ⏭️⏭️
২০২২ সালের জুলাই আগস্টের দিকে প্রাইভেট ব্যাংকের চাকুরি ছেড়ে ঢাকায় উঠি। একটা বাসা ভাড়া নিয়ে কয়েকজন ফ্রেন্ড থাকতাম, যখন শুরুতে উঠলাম দেখলাম সবাই পড়াশোনায় অনেক এগিয়ে। নিজের মধ্যে ভয় চলে আসলো, সবাই ত অনেক দিন ধরে পড়াশোনা করছে, আমি ত অলরেডি পিছিয়ে। তাহলে আমি চাকরি পাব কবে।
এভাবে ভাবতে ভাবতে প্রায় ১/২ মাস চলে গেলো। একবার ভাবতে শুরু করলাম হয়ত ভুল করে ফেললাম, এর চেয়ে প্রাইভেট ব্যাংকেই ভাল ছিলো।
এরপর কিছুদিন পর কুলকিনারা না পেয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিলাম। সাবজেক্টিভ বই কিনলাম, প্রশ্নব্যাংক কিনলাম, মডেল টেস্ট কিনলাম। অনলাইনে বিভিন্ন বই সাজেশন হিসেবে দেখতাম, সেগুলো কিনলাম। কিন্তু তাতে দেখলাম শুধু বই ই কেনা হচ্ছে, পড়া সেভাবে আগাচ্ছেনা। এরপর ঠিক করলাম যে শুধু একসেট বই পড়ব, ভালভাবে পড়ব।
এভাবে শুরু করলাম, সার্কুলার যা পেতাম সেটাতেই আবেদন করতাম। চাকরির প্রিপারেশন নেওয়ার পরপরই এডি-২৩ এর প্রিলির ডেট পরল ২০২২ এর নভেম্বর এ। ভাবলাম মাত্র ১/২ মাস পড়লাম, এতে কি আর হবে। প্রিলির কিছুদিন আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অবস্থা খারাপ, তারপরও এক্সামে এটেন্ড করলাম। সেবার কাটমার্ক ছিল ৬৫+, প্রথম জবের পরীক্ষা দিয়ে মনে হলো আমার অনেক পড়া বাকি, রেইস এ টিকে থাকতে হলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে, বাকিরা অনেক পড়ে ফেলেছে।
এরপর বাসায় গেছে একদম জোরালো পড়াশোনা শুরু করলাম। যে আমি ছোটবেলা থেকে কখনো টানা ৫/৬ ঘন্টাও পড়তাম না, সেমিস্টার ফাইনালে এক্সামের আগে আগে পড়ে এক্সাম দিতাম সেই আমি দৈনিক ৮-১০ ঘন্টা পড়ার চ্যালেঞ্জ নিলাম। খাতায় লিখে লিখে প্রতিদিনের পড়ার ঘন্টা হিসাব করা শুরু করলাম।
কারেন্ট এফেয়ার্স, মডেল টেস্ট, বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট সহ সব গুছানোর চেষ্টা করলাম। এর মধ্যে সিনিয়র অফিসার -২০ এর প্রিলির ডেট পড়ল ২০২৩ এর জানুয়ারি মাসে।
এবার ভাবলাম পরীক্ষার প্রিপারেশন ত মোটামুটি, দিয়ে দেখি। প্রিলি দিয়ে স্যাটিসফাইড ছিলাম না। তাই কোনো এক্সপেকটেশন ও ছিলনা। কিন্তু প্রিলির রেজাল্টের দিন অবাক হয়ে দেখলাম আমার রোল আছে, হয়ত সর্বশেষ কাট মার্ক নিয়ে পড়েছি। একদিকে খুশি, আরেকদিকে চিন্তা করতেছি যে রিটেনের আর মাত্র ১০ দিন আছে, টিকে কি হবে।
তারপরও ভাবলাম সুযোগ যেহেতু আসছে কাজে লাগায়ে ফেলি। বই টই কিনে পুরোদমে পড়া শুরু করলাম, অনলাইনে ফোকাস সাজেশন, মডেল টেস্ট দেওয়া, জিকে পড়া, নিজের প্ল্যান করা সহ অন্যান্য ব্যাপারে আইডিয়া নিয়ে নিলাম। আমার টার্গেট ছিল ২ ঘন্টায় সব কিছু সুন্দর ভাবে শেষ করা। করলামও তাই, ভাবলাম এভাবে আগাতে পারলে ইনশাআল্লাহ আগামী এডি সার্কুলার টা ভাল করতে পারব।
কিভাবে কিভাবে যেন SO-20 রিটেন টিকে গেলাম।
ভাইভা দিতে গিয়ে বিবির লোগোসহ একটা ছবি তুলতে খুব ইচ্ছা করছিলো, প্রথম প্রিলি টিকলাম, প্রথম রিটেন আর প্রথম ভাইভা। তাই খুব ইচ্ছে করতেছিল। কিন্তু হটাত করেই মনে হলো যে নাহ, ছবি তুলব না। যদি কোনদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি পাই তবেই আমি এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলব। একটা প্রচন্ড জিদ কাজ করা শুরু করল।
সেই ভাইভা দিয়ে পেয়ে গেলাম পছন্দের ২ নম্বরে থাকা সোনালী ব্যাংক।
এর মাঝে অন্যান্য অফিসার, অফিসার ক্যাশ, এগুলোর রিটেনও দিয়েছিলাম, পরে আর ভাইভায় এটেন্ড করিনি।
এরমাঝে বিবি এডির প্রিলির ডেট পড়ে। তো আমার এটা নিয়ে প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল যে আল্লাহ্ অন্তত একবার একটা রিটেন যেন দিতে পারি তাহলে আর মনে আফসোস থাকবেনা। কিন্তু এডির প্রিলিটা মন মত হলো না, খুবই বিদ্ধস্ত হয়ে গেলাম। এর আগে ৪/৫ টা ব্যাংকের প্রিলি টিকে খুব কনফিডেন্স ছিলাম যে ইনশাআল্লাহ প্রিলি টিকব। কিন্তু বড় ধাক্কা খেলাম। পরীক্ষার হলে উপস্থিত বুদ্ধিও কাজে লাগতেছিল না, তাই রিস্ক নিয়ে ৯৯ টা দাগায়ে ফেলি। বাসায় এসে সমাধানও দেখতে ইচ্ছা করছিল না। ২/৩ দিন পুরো মন খারাপ করে ছিলাম। কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো এখানেও, প্রিলিটা কোনোমতে পার হয়ে গেলাম।
এবার আমার আসল যুদ্ধ শুরু হলো, এতদিন ত আশা করে ছিলাম একটা বিবি এডি রিটেন দিব, সেই সুযোগ হাতে কিন্তু পর্যাপ্ত প্রিপারেশন নেই। আবার তখন বাজারে সব বাঘা বাঘা প্লেয়ার, অনেক ক্যাডার, নন ক্যাডার, অন্যান্য ভাল পোস্টে কর্মরতদের টার্গেট থাকে বিবি এডির প্রতি। এত কিছু ভেবে খুব হতাশ লাগতেছিল। পরে ভাবলাম যে একটা সুযোগ চেয়েছিলাম, পেয়েছি, দেখি কি হয়, নিজের সর্বোচ্চ টা দিয়ে চেষ্টা করি।
হাতে যে কয়দিন সময় পেলাম প্রচুর পড়াশোনা করলাম। পরিচিত যত ধরণের ফোকাস ছিল সব ক্যাটাগরির সবগুলো সম্পর্কে আইডিয়া নিয়ে ফেললাম, কোনো কিছু যদি কমন না পড়ে কিভাবে লিখব, কি লিখব তা নোট করে ফেললাম।
ম্যাথ, জিকে, অনুবাদ এগুলোয় যেন টপ মার্ক উঠাতে পারি সেটা প্ল্যান করে ফেললাম। টানা কয়েকদিন ১১-১২ ঘন্টা পড়লাম, প্রত্যেকটা সেকশনে যেন আমি খুব ভাল করি সেটার একটা জেদ কাজ করত তখন।
এত এত টানা পড়া আমি কখনোই করিনাই, ব্রেইনকে সর্বোচ্চ পুশ করে যতটুকু আদায় করা যায় ততটুকু আদায় করার পর দেখলাম পড়তে খারাপ লাগছে, কিছুই মাথায় ঢুকছেনা। বুঝলাম অতিরিক্ত প্রেশার লাগছে। এরপর পরীক্ষার আগে ১ দিন ব্রেক দিলাম, ব্রেইন রিল্যাক্স রাখলাম।
এরপর ত পরীক্ষা দিলাম, প্রতিটা সেকশনে যেন স্বল্প সময়ে সর্বোচ্চ লিখতে পারি চেষ্টা করলাম, খুব দ্রুত লেখার ট্রাই করতাম। ফোকাস একটা কমন না পড়ার পরেও ব্যাকাপ প্ল্যান থাকায় লিখে ফেললাম।
এরপর ত রিটেনে টিকে গেলাম, ভাইভা দিলাম। ফাইনাল রেজাল্ট যেদিন পেলাম সেদিন প্রথমে রোলটা খুজে পাচ্ছিলাম না, খুব হতাশ লাগছিলো। কান্না করে দিছিলাম, আমি কখনো প্রচন্ড পড়ুয়া ছিলাম না, সবসময় ফাকিবাজ আর ২/৩ ঘন্টা পড়ুয়া মানুষ। সেই আমি এত কষ্ট করলাম অথচ শুন্য হাতে ফেরত আসলাম। ব্যাপারটা মানতে পারছিলাম না।
পরবর্তীতে আরেকজনের রোল খুজতে গিয়ে নিজের রোল দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। সেই মুহুর্তের অনুভুতি আসলে বলে বোঝানো যাবেনা। আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে খুশি করে দিয়েছিলেন।
অনেকে বলতে পারেন আমার এত বড় গল্প এই সময়ে বলার কারণ কি? আর আমার গল্পকে অতিরঞ্জিত বা বানানো বলতে পারেন।
ভার্সিটি লাইফে আমার রুমমেট আমাকে বলত, "খালেদ, তুই যতই পরিশ্রম করিস, যতই স্ট্রাগল করিস যদি তুই সফল না হতে পারিস তাহলে তোর গল্পের কোনো ভ্যালু নাই। যেদিন নিজে সফল হবি দেখবি সবাই তোর গল্পকে ভ্যালু দিবে। "
আপনারা যারা চাকরির প্রিপারেশন নিচ্ছেন প্রায় সবারই স্ট্রাগলের গল্প আছে, সেসব গল্প সেদিনই মুল্যায়ণ পাবে যেদিন আপনি সফল হবেন। তাই নিজের সফলতার গল্প বলতে হলেও জীবনে সফল হোন।
আপনাদের উদ্দ্যেশ্যে আমার কিছু উপদেশ থাকবে ---
✅ক্যান্ডিডেট অনেক আছে, তবে আপনাকে সফল হতেই হবে, যেকোন ভাবেই হোকনা কেনো।
✅যত হাই ভোল্টেজ ক্যান্ডিডেটই থাকুক না কেনো, আপনি ঠিকমতন প্রিপারেশন নিলে আপনার চাকরি হবেই।
✅ছোট ছোট সুযোগ কে অবহেলা করবেন না, কাজে লাগাবেন।
✅নিজের পড়াশোনায় কোথায় গ্যাপ আছে সেটা খুজে বের করবেন, সেটা মেকাপ করবেন।
✅নিজের সর্বোচ্চ আউটপুটটা দেবার চেষ্টা করবেন।
✅নিজস্ব স্ট্র্যাটেজি বিল্ড করবেন
✅নিজেকে মোটিভেটেড রাখার জন্য উপায় বের করবেন
মোঃ খালেদ মাসুদ
সহকারী পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংক
সাবেক সিনিয়র অফিসার
সোনালী ব্যাংক পিএলসি