13/09/2026
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : একাধারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী,সংবিধান লঙ্ঘনকারী, মানবতাবিরোধী অপরাধী, রাস্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনকারী
দেশের ভেতরে যুদ্ধ: বাংলাদেশে সামরিক প্রতিষ্ঠানের দায়, দায়মুক্তি ও রাষ্ট্রের সংকীর্ণতর সাংস্কৃতিক পরিসর
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, মুক্তচিন্তা ও উদার গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, এই কথা বললে আমরা সাধারণত আঙুল তুলি মৌলবাদী রাজনীতি, জামায়াত, হেফাজত কিংবা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তির দিকে। একটি প্রশ্ন আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই: যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে সংগঠিত এবং সবচেয়ে কম জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে, সেই সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কি ?
বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে নিয়ে একটি প্রায় অচ্ছেদ্য জাতীয় মিথ আছে, সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক, রাজনীতির ঊর্ধ্বে, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং শেষ পর্যন্ত জাতির রক্ষক। এই মিথের মধ্যে সত্যের একটি অংশ অবশ্য আছে। ১৯৭১ সালে বহু বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিক পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ইতিহাস দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পরবর্তী সামরিক প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসকে ধুয়ে-মুছে ফেলা যায় না।
বরং প্রশ্নটি আরও কঠিন: একটি বাহিনী যদি জনগণকে রক্ষা করার নামে বারবার জনগণের ওপর শক্তি প্রয়োগ করে, নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে, বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে, সংবিধানের চরিত্র বদলে দেয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করে এবং নিজের জন্য দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তাকে শুধু “দেশপ্রেমিক” বললে কি তার দায় শেষ হয়ে যায়? না কি যে “দেশপ্রেমিক” বলছে, সে নিজের অপরাধের ঢাল তৈরি করছে এই অভিধা থেকে?
আইনগতভাবে “যুদ্ধাপরাধ” এবং “মানবতাবিরোধী অপরাধ” এক জিনিস নয়। যুদ্ধাপরাধের জন্য সাধারণত একটি সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপট প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন সময়ের কর্মকাণ্ডের মধ্যে এমন বহু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, বেসামরিক জনগণের ওপর পরিকল্পিত বা নির্বিচার প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম, রাজনৈতিক দমন এবং দায়মুক্তি, যেগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধের আলোচনায় গুরুতরভাবে বিবেচিত হওয়ার মতো।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়ন সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, সাবেক সরকার ও তার নিরাপত্তা-গোয়েন্দা কাঠামো পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল; তাদের হিসাবে ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে অন্তত তিনটি ঘটনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের গুলি চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা দরকার। ২০২৪-এর হত্যাযজ্ঞের প্রধান দায় শুধু সেনাবাহিনীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথ্যগতভাবে সঠিক হবে না। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভূমিকাও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নটি আরও গভীর, কারণ রাষ্ট্রের শেষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যার পরিচয়, সেই বাহিনী যখন রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অংশ হয়ে ওঠে, তখন প্রতিষ্ঠানটির সাংবিধানিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৯৭৫ থেকে ২০২৪: দায়মুক্তির এক দীর্ঘ ছায়া
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যা করেছিলেন সামরিক বাহিনীর কর্মরত কর্মকর্তারা। এটি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যাকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার ওপর সশস্ত্র আঘাত। তার পরে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, সেটিই বাংলাদেশের দায়মুক্তির সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্তগুলোর একটি।
১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার Indemnity Ordinance জারি করে। এতে ১৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তন ও সামরিক আইন জারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পথ কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে সেটিকে সংসদীয় আইনে পরিণত করা হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে আইনটি বাতিল না করা পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বাধাগ্রস্ত ছিল।
অর্থাৎ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজে একসময় ঘোষণা করেছিল, রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা যেতে পারে, সরকার উৎখাত করা যেতে পারে, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো যেতে পারে, এবং তারপর আইন করে হত্যাকারীদের রক্ষা করা যেতে পারে।
৭ নভেম্বর ১৯৭৫-কে পরে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ বলা হলেও এটি মূলত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যার সঙ্গে জাসদ ও গণবাহিনী যুক্ত হয়েছিল। একদিকে জিয়াকে বীর, অন্যদিকে কর্নেল তাহেরকে বিপ্লবী হিসেবে দেখানো হয়; কিন্তু সৈনিকদের হাতে জিয়ার মুক্তি, তার ক্ষমতায় উত্থান এবং তাহেরের মৃত্যুদণ্ড প্রমাণ করে যে জাসদের কথিত গণভিত্তি বাস্তবে কতটা সীমিত ছিল।
পরবর্তী রাষ্ট্রও জাসদ-গণবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত করেনি, যদিও তাদের সশস্ত্র রাজনীতি অসংখ্য বামপন্থী তরুণকে সহিংসতার ফাঁদে ফেলেছিল।
এখানে ১৯৯৬ সালের দায়মুক্তি বাতিল এবং পরবর্তী সময়ে মুজিব হত্যার বিচার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম। কিন্তু এই বিচার আবার আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে: কেন শুধু ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার হলো, অথচ সামরিক শাসনের বৃহত্তর সাংবিধানিক অপরাধ, অভ্যুত্থান, বেআইনি ক্ষমতা দখল, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সামরিক শাসনের অন্যান্য অপরাধের জন্য একই রকম জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলো না?
হাসিনা সরকার মুজিব হত্যার দায়মুক্তি বাতিল করে বিচার করেছে, এটি সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে জিয়া, এরশাদ, ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক রাজনীতি, ১৯৮০-এর দশকের সামরিক শাসন এবং ২০০৭-০৮ সালের সামরিক-সমর্থিত ১/১১ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বৃহত্তর অসাংবিধানিক ক্ষমতার কাঠামোকে বিচারের আওতায় আনেনি।
১/১১ প্রকল্পে সেনাবাহিনীর হয়ে যে অধ্যাপক ইউনুস, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমানসহ বিভিন্ন মিডিয়া, এনজিও মিলে মাইনাস টু, বিরাজনীতিকরণের প্রচারণা চালিয়েছে, খালেদা এবং হাসিনার সরকার তার বিচার করেনি। ফলে বিচার হলো নির্বাচিত ইতিহাসের; প্রতিষ্ঠিত হলো না সর্বজনীন জবাবদিহিতার নীতি।
এখানে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক শিক্ষা তৈরি হয়: কোনো একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে পারে, কিন্তু সামরিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অপরাধের বিচার হবে না।
১৯৬৯, ১৯৯০, ২০২৪: জনগণের তিন বিদ্রোহ
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও সামরিক প্রশ্নটি বুঝতে সাহায্য করে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান পতন ঘটায় জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের।
২০২৪-এর অভ্যুত্থান ছিল ভিন্ন। তখন সরকারটি কাগজে-কলমে একটি বেসামরিক, নির্বাচিত সরকার। কিন্তু তার ক্ষমতার কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের সমর্থন, রাজনৈতিক প্রশাসন এবং দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল।
শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী আর জনগণের ওপর গুলি চালানোর পক্ষে দাঁড়ায়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সেনাদের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং শেখ হাসিনাকে জানান যে তিনি সামরিক সমর্থন হারিয়েছেন। এর পরই তার পতন ঘটে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গভীর বাস্তবতা প্রকাশ করে: একটি সরকার নির্বাচিত কি না, তা এক জিনিস; কিন্তু সরকার টিকে থাকবে কি না, তার শেষ সিদ্ধান্ত কখনো কখনো নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান নয়, সামরিক প্রতিষ্ঠান নেয়।
১৯৬৯-এ, ১৯৯০-এ জনগণ সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিল। ২০২৪-এ জনগণ বেসামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে, কিন্তু সরকার পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তে সেনাবাহিনীর সমর্থন প্রত্যাহারও প্রয়োজন হয়েছিল। তিনটি অভ্যুত্থান আলাদা হলেও একই প্রশ্নে এসে মেলে: রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা আসলে কার হাতে? জনগণের, নাকি শেষ পর্যন্ত বন্দুকধারী প্রতিষ্ঠানের?
সংবিধান বদলে দিয়ে সমাজ বদলানো
১৯৭২ সালের সংবিধান চারটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় আদর্শের ওপর দাঁড়িয়েছিল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার এবং ধর্মীয় বৈষম্য দূর করার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল। সামরিক শাসন এই চরিত্র বদলে দেয়।
১৯৭৭ সালের সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনায় “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” যুক্ত হয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় “সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকার অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে এই পরিবর্তনের সাংবিধানিক ইতিহাসও বিস্তারিতভাবে নথিবদ্ধ হয়েছে।
এটি কেবল কয়েকটি শব্দ বদলানোর ঘটনা ছিল না। সংবিধান রাষ্ট্রের নৈতিক ভাষা নির্ধারণ করে। রাষ্ট্র যখন বলে ধর্ম রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ, তখন ধীরে ধীরে নাগরিকত্বের ভাষাও বদলায়। ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক থেকে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের নাগরিকত্বে, বহুত্ব থেকে সংখ্যাগুরুবাদে, সাংস্কৃতিক পরিচয় থেকে ধর্মীয় পরিচয়ে, এই রূপান্তর একদিনে হয় না।
এখানে সামরিক শাসন এবং পরবর্তী মৌলবাদী রাজনীতির সম্পর্কটি দেখতে হবে। মৌলবাদীরা সমাজকে সংকুচিত করেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রের সংবিধানিক কাঠামোয় ধর্মীয় পরিচয়ের বিশেষ মর্যাদা ঢোকানোর ঐতিহাসিক দরজা খুলেছিল সামরিক শাসন।
আজ সেই দরজা দিয়ে সমাজ আরও অনেক দূর পিছিয়ে গেছে।
১৯৭১-এর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং “ডিউটি”-র নৈতিকতা
এই জায়গায় বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানি সামরিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা পড়লে একটি ভয়ংকর মনস্তত্ত্ব দেখা যায়। একজন সামরিক কর্মকর্তা প্রায়ই নিজের কাজকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখেন না; তিনি দেখেন “অপারেশন”, “দায়িত্ব”, “রাষ্ট্ররক্ষা”, “বিদ্রোহ দমন”, “প্রতিরোধের পকেট পরিষ্কার” হিসেবে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ.এ.কে. নিয়াজির The Betrayal of East Pakistan কিংবা রাও ফারমান আলীর How Pakistan Got Divided-এর মতো স্মৃতিকথা সেই সামরিক আত্মপক্ষসমর্থনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য এসেছিল ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সাংবাদিকতার মাধ্যমে। পাকিস্তানি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৩ জুন ১৯৭১ Sunday Times-এ “Genocide” প্রকাশ করে বিশ্বকে জানিয়ে দেন যে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান নিছক বিদ্রোহ দমন নয়; এর মধ্যে ছিল গ্রাম ধ্বংস, বেসামরিক হত্যাকাণ্ড এবং পরিকল্পিত জেনোসাইড।
এখানে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা আছে। একজন সৈনিক যখন বলে, “আমি আদেশ পালন করেছি”, তখন রাষ্ট্রীয় অপরাধের দায় শেষ হয়ে যায় না।
নুরেমবার্গের পর পৃথিবী এই নীতিটি শিখেছিল। বলকান যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলো আবার প্রমাণ করেছে, ইউনিফর্ম অপরাধের দায়মুক্তি নয়। কমান্ডারশিপ, আদেশ, পরিকল্পনা, জানার পরও প্রতিরোধ না করা, সবই জবাবদিহির বিষয় হতে পারে।
বাংলাদেশে সমস্যা হলো, সামরিক কর্মকর্তারা অবসর নিয়ে স্মৃতিকথা লেখেন, ইতিহাসের নিজেদের সংস্করণ প্রকাশ করেন, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিচার খুব কমই হয়। ফলে স্মৃতিকথা থাকে, বিচার থাকে না; আত্মপক্ষ সমর্থন থাকে, কিন্তু ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য থাকে না।
সেনাবাহিনীর ভেতরের রক্তাক্ত ইতিহাস
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী শুধু বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়নি; বাহিনীর ভেতরেও রক্তাক্ত ক্ষমতার লড়াই হয়েছে।
১৯৭৫-এর পর ধারাবাহিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানে সামরিক কর্মকর্তারা একে অন্যকে হত্যা করেছেন। ১৯৭৭ সালের বিদ্রোহ দমনের পর সরকারি হিসাবেই ১,১৪৩ জন সামরিক সদস্যকে দুই মাসে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল; স্বাধীন গবেষণা ও অন্যান্য সূত্রে সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার দাবি রয়েছে।
১৯৭৫-এর নভেম্বরে খালেদ মোশাররফ, এ.টি.এম. হায়দার ও নাজমুল হুদার হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী জিয়ার উত্থান, ১৯৮১ সালের জিয়া হত্যাকাণ্ড এবং তার পরবর্তী সামরিক বিচার ও মৃত্যুদণ্ড, সব মিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ আসলে সামরিক
প্রতিষ্ঠানের নিজের ভেতরের গৃহযুদ্ধের ইতিহাস।
এখানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে: যে বাহিনী নিজের কর্মকর্তাদের জীবন ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, সেই বাহিনী কীভাবে একটি দেশের সাংবিধানিক ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত রক্ষক হয়ে উঠল?
কল্পনা ও তনু: ন্যায়বিচারের সামনে ক্যান্টনমেন্টের দেয়াল
কল্পনা চাকমার নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতীকগুলোর একটি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, সামরিক উপস্থিতি, ভূমি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, সবকিছুর কেন্দ্রে থাকা এই ঘটনায় দশকের পর দশক কেটে গেলেও সত্য ও দায় নির্ধারণের প্রশ্ন অমীমাংসিত।
সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে: ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকের বিচার পাওয়ার অধিকার কি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সামনে দুর্বল হয়ে যায়?
তনুর মরদেহ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাওয়া যায় এবং তদন্তে ধর্ষণের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু মামলাটি বছরের পর বছর এগোয়নি।
এখানে উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট সেনা সদস্যকে বিচার ছাড়া অপরাধী ঘোষণা করা নয়। বরং উল্টোটি: যেখানে সন্দেহ আছে, সেখানে স্বাধীন তদন্ত এবং প্রকাশ্য বিচার হওয়া উচিত। সামরিক পরিচয় কারোঅপরাধ প্রমাণ করে না; কিন্তু সামরিক পরিচয় যেন তদন্ত থামিয়ে দিতে না পারে, এটা আইনের শাসনের ন্যূনতম শর্ত।
একই কথা গুমের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে গুম ও গোপন আটক নিয়ে অভিযোগ এসেছে; মানবাধিকার সংস্থাগুলো রাষ্ট্রীয় সংস্থার সীমিত তদন্ত ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন প্রশ্ন তুলেছে।
র্যাবের মতো বাহিনীতে সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এবং DGFI-র মতো সামরিক গোয়েন্দা কাঠামোর সঙ্গে গুমের অভিযোগের সম্পর্কও তাই স্বাধীন তদন্তের বিষয়, কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচার নয়।
২০২৪: রাষ্ট্ররক্ষা না কি রাস্ট্রপতন
২০২৪ সালের আন্দোলনে যে ভাষাটি বারবার ফিরে এসেছিল, সেটি পরিচিত: রাষ্ট্ররক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস দমন, জাতীয় নিরাপত্তা। একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিকদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করে, তখন প্রশ্নটি হওয়া উচিত, রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করছে?
জাতিসংঘের তদন্তে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যার কথা উঠে এসেছে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের গুলি চালানোর অন্তত তিনটি ঘটনা তদন্তে পাওয়া গেছে। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, এবং শিশুদেরও বড় সংখ্যায় হত্যা করা হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি” নয়। একটি সরকারের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় অস্ত্র ব্যবহার করার প্রশ্ন।
২০২৪, ৫ আগস্টের পর একটি নতুন ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতিও দেখা গেল। ২০২৪ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করার নির্দেশ দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা July Mass Uprising Protection and Liability Determination Ordinance আন্দোলনকারীদের রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য আইনি সুরক্ষা ও দায়মুক্তি দেয়; ২০২৬ সালের মার্চে সংসদীয় বিশেষ কমিটিও সেটিকে বিল হিসেবে গ্রহণের সুপারিশ করে।
এখানে ইতিহাসের একটি বিপজ্জনক প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। ১৯৭৫-এ ক্ষমতা দখলকারীদের জন্য দায়মুক্তি। ২০২৪-২৬-এ ক্ষমতাচ্যুত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের জন্য দায়মুক্তি।
দুই ঘটনা নৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে এক নয়। একটি ছিল রাষ্ট্রপ্রধান ও তার পরিবারের হত্যাকারীদের রক্ষা; অন্যটি ছিল একটি গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের রাষ্ট্রীয় প্রতিশোধমূলক মামলা থেকে রক্ষা করার দাবি। দুটির মধ্যে একটি একই বিপজ্জনক ধারণা আছে: রাজনৈতিক ইতিহাসের বিশেষ মুহূর্তে আইনকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখা।
আইনের শাসন তখনই পরীক্ষিত হয়, যখন আমরা আমাদের পক্ষের অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে পারি।
সেনাবাহিনী: রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র
বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক বিস্তারও রাজনৈতিক প্রশ্ন। সেনা কল্যাণ সংস্থা নিজে জানায় যে তারা শিল্প, বাণিজ্য ও রিয়েল এস্টেটের বহু খাতে কাজ করে, সিমেন্ট, টেক্সটাইল, খাদ্য, ইলেকট্রনিকস, ট্রেডিং, শপিং কমপ্লেক্স, ব্যবসা ভবন, কনভেনশন হল, হোটেল ও রিয়েল এস্টেটসহ।
Army Welfare Trust-এর সঙ্গে ব্যাংক, হোটেল, গলফ ক্লাব, ফিলিং স্টেশন, শপিং কমপ্লেক্স এবং আবাসন প্রকল্পের সম্পর্কও নথিবদ্ধ।
প্রশ্নটি সেনা সদস্যদের কল্যাণের বিরুদ্ধে নয়। একজন সৈনিকের অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা থাকা উচিত। কিন্তু যখন একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে অস্ত্রধারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ক্ষমতার নির্ধারক এবং বড় অর্থনৈতিক খেলোয়াড় হয়ে ওঠে, তখন স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।
একজন সেনা কর্মকর্তা অবসরে গিয়ে যদি রাষ্ট্রীয় জমি, বিশেষ ঋণ, আবাসন, ব্যবসায়িক সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক পান, অথচ দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তৈরি করা পোশাকশ্রমিকের জীবন যদি বস্তি, অনিরাপদ বাসস্থান, কম মজুরি ও অনিশ্চয়তায় কাটে, তখন “দেশপ্রেম” শব্দটির অর্থনৈতিক হিসাবও করতে হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই শক্তি, রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক এবং প্রবাসী শ্রমিকের রেমিট্যান্স। যারা বৈদেশিক মুদ্রা এনে দেশকে টিকিয়ে রাখে, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল; অথচ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে অনেক শক্তিশালী। এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি ক্ষমতার নৈতিক অর্থনীতি।
সেনাবাহিনী যদি হোটেল চালায়, ব্যাংক চালায়, গলফ ক্লাব চালায়, আবাসন ব্যবসা করে, রিয়েল এস্টেটে যায়, শপিং কমপ্লেক্স চালায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে: এগুলোর প্রত্যেকটির জন্য কি একই নিয়ম প্রযোজ্য যা একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর জন্য প্রযোজ্য?
রাষ্ট্রের ভেতরে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান থাকা উচিত নয় যার হাতে একই সঙ্গে বন্দুক, জমি, ব্যবসা, গোয়েন্দা ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির শক্তি থাকে।
বঙ্গভবনের সেই পরিচিত দৃশ্য
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি প্রায় প্রতীকী দৃশ্য তৈরি হয়েছে: সরকার উৎখাত হয়, সামরিক নেতৃত্ব সামনে আসে, তারপর নতুন সরকারের শপথের সময় সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে উপস্থিত থাকেন।
এটি শুধু প্রোটোকল নয়; এটি ক্ষমতার একটি ভাষা। ১৯৭৫, ১৯৮২, ২০০৭ এবং ২০২৪, প্রতিটি সময়ের রাজনৈতিক রূপ আলাদা হলেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: নির্বাচিত রাজনীতির ওপর শেষ সিদ্ধান্তের অধিকার কার?
১/১১-এর সময় সেনাবাহিনী সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা না করেও একটি সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক কাঠামো তৈরি করেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে রয়টার্সের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসেও ২০০৭ সালে সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান এবং সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা এসেছে।
এই অভিজ্ঞতার পরও ২০২৪-এর সংস্কার প্রক্রিয়ায় পুলিশ, বিচার, নির্বাচন, প্রশাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠিত হলেও সামরিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ভূমিকা, সামরিক ব্যবসা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহি এবং বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সমপর্যায়ের একটি স্বাধীন সামরিক সংস্কার কমিশন গঠিত হয়নি, এটা বড় শূন্যতা।
যে প্রতিষ্ঠান এতবার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, তার সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার অসম্পূর্ণ।
পৃথিবীর অন্য দেশগুলো আমাদের সতর্ক করে
মিয়ানমারে সেনাবাহিনী বহু দশক ধরে রাষ্ট্রের ওপর রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে। ফল, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, জাতিগত সংঘাত, ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী সামরিকীকরণ।
সুদানে সামরিক ও আধাসামরিক শক্তির ক্ষমতার লড়াই রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনের “জাতীয় নিরাপত্তা” তত্ত্ব হাজার হাজার মানুষকে গুম ও হত্যা করার বৈধতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে সত্য উদঘাটন, বিচার ও সামরিক অপরাধের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়া দেশ স্বাভাবিক হতে পারেনি।
ইরানের অভিজ্ঞতা আরও অন্যরকম। সেখানে ধর্মীয় রাষ্ট্র ও সামরিক-নিরাপত্তা কাঠামো একে অপরকে শক্তিশালী করেছে। সামরিক শক্তি শুধু সীমান্ত রক্ষা করে না; রাষ্ট্রের আদর্শিক চরিত্র রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা যত শক্তিশালী হয়, নিরাপত্তা কাঠামোও তত বেশি তা দমন করতে ব্যবহৃত হয়।
সেনাবাহিনীর ইসলামায়ন
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ যেন সেই পথ না নেয়, তার জন্য একটি বিষয় এখনই বোঝা দরকার: সেনাবাহিনীর ইসলামায়ন বা রাজনৈতিক ইসলামায়ন, দুটিই একই সমস্যা নয়, কিন্তু যখন
সামরিক প্রতিষ্ঠান নিজে ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার কেন্দ্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন বেসামরিক রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
এই কারণে ২০২৬ সালের ঘটনাটি গুরুত্বের দাবি রাখে। ৩ আগস্ট ২০২৬ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ঢাকার জলসিঁড়ি আবাসন এলাকায় Army International Islamic Institute উদ্বোধন করেছেন।
একই সময়ে বরিশাল, সাভার, বগুড়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও যশোরে আরও সাতটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ ঘোষণা করা হয়। সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী এগুলো Cambridge curriculum-ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ যুক্ত করবে।
এখানে আপত্তি ইসলামী শিক্ষা থাকার কারণে নয়। আপত্তির জায়গা হলো সামরিক প্রতিষ্ঠান নিজে সমাজের নৈতিক-আদর্শিক শিক্ষার স্থপতি হয়ে উঠছে কি না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী নাগরিক সমাজের একটি প্রতিষ্ঠান; সমাজের আদর্শ নির্ধারণের প্রতিষ্ঠান নয়।
মুজিবের ব্যর্থতার অন্য পাঠ
শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও একই ধরনের সরলীকরণ আমাদের ইতিহাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
মুজিবের ব্যর্থতা শুধু এই ছিল না যে তিনি কঠোর প্রশাসক হতে পারেননি, অথবা তার “বঙ্গবন্ধু” পরিচয় তাঁকে বাস্তব ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রেখেছিল। তার শাসনামলে রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর একটি সমান্তরাল শক্তি হিসেবে সেটি বড় ভূমিকা নেয়। ফলে রাষ্ট্রের হাতে আরও একটি শক্তিশালী coercive apparatus তৈরি হয়েছিল, যার ওপর পর্যাপ্ত জবাবদিহি ছিল না।
কিন্তু এখানেও ইতিহাসকে ন্যায্যভাবে পড়তে হবে। রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি এবং পরবর্তী সেনা অভ্যুত্থানকে একই জিনিস বলা যায় না। একটি সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি করার সিদ্ধান্ত আর সেনাবাহিনীর রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা এক ধরনের অপরাধ নয়। কিন্তু দুটির মধ্যে একটি সাধারণ বিপদ ছিল, রাষ্ট্রের হাতে জবাবদিহিতাহীন সশস্ত্র ক্ষমতার বিস্তার।
মুজিব সেই বিপদের সমাধান করতে পারেননি। তার হত্যাকারীরা সেই ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্র দখল করেছিল। আর সামরিক শাসকরা পরে সেই রাষ্ট্রকে নিজেদের বৈধতার জন্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠন করেছিল।
দেশপ্রেমের মূল্য কে দেয়?
বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে প্রশ্ন করা প্রায়ই দেশদ্রোহিতার সমার্থক করে দেওয়া হয়। এটি ভয়ংকর ভুল।
সেনাবাহিনীর সমালোচনা মানে সৈনিকের অপমান নয়। সামরিক সদস্যের আত্মত্যাগ অস্বীকার করা নয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বাঙালি সৈনিকদের ইতিহাস মুছে ফেলা নয়। বরং উল্টা, একটি পেশাদার, গণতান্ত্রিক ও জনগণের অধীন সেনাবাহিনী গড়ে তোলাই মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রের প্রতি প্রকৃত সম্মান।
প্রশ্ন হলো, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল কি পান? কি পরিমাণ জমি? কি ধরনের ঋণ? কি ধরনের আবাসন? কোন কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে তার প্রবেশাধিকার থাকে? কোন কোন ব্যবসা তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত?
আর সেই একই রাষ্ট্রের পোশাকশ্রমিক কি পান? নিরাপদ বাসস্থান? জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি? স্বাস্থ্যসেবা? পেনশন? নিরাপত্তা?
যদি একজন সৈনিকের কল্যাণের নামে একটি বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে, আর সেই অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করে, তাহলে প্রশ্নটি সেনাবাহিনীকে ছোট করার নয়। প্রশ্নটি হলো রাষ্ট্রের সম্পদ ও ক্ষমতা বণ্টনের ন্যায়বিচার কোথায়?
আসল সংস্কার: সেনাবাহিনীকে অপমান নয়, রাষ্ট্রকে মুক্ত করা
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি নির্বাচন নয়, শুধু সংবিধান নয়, শুধু পুলিশ সংস্কারও নয়।
প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্রের মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান থাকবে কি, যার ওপর নির্বাচিত সরকারেরও সীমিত নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের প্রায় কোনো প্রত্যক্ষ জবাবদিহি নেই?
সেনাবাহিনীকে গণতান্ত্রিক করতে হলে কয়েকটি বিষয় অপরিহার্য:
সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। বেসামরিক সরকারের কার্যকর কমান্ড। সামরিক ব্যবসা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের পূর্ণ স্বচ্ছতা। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধার স্বাধীন নিরীক্ষা। DGFI, RAB ও অন্যান্য নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর কার্যকর সংসদীয় ও বিচারিক নজরদারি। গুম, হত্যা, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত।
সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলে সামরিক আদালতের বাইরে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বেসামরিক আদালতে বিচার। সামরিক অভ্যুত্থান, অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল ও রাজনৈতিক হত্যার পূর্ণ ঐতিহাসিক তদন্ত।
এবং সর্বোপরি, একটি স্বাধীন সামরিক সংস্কার কমিশন।
বাংলাদেশে ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যত রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছে, তার প্রতিটিতে সামরিক প্রতিষ্ঠানের কোনো না কোনো ছাপ আছে। অথচ আমরা বারবার সরকার বদলেছি, সংবিধান বদলেছি,
নির্বাচন ব্যবস্থা বদলেছি, কমিশন করেছি, কিন্তু বন্দুকধারী প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয় ভূমিকা নিয়ে মৌলিক প্রশ্নটি এড়িয়ে গেছি। ফলে সমস্যাটি ব্যক্তির নয়, প্রতিষ্ঠানের।
জিয়া খারাপ ছিলেন, এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। এরশাদ স্বৈরাচারী ছিলেন, এটিও যথেষ্ট নয়। মঈন উদ্দিন আহমেদ ১/১১-তে ভুল করেছিলেন, এটিও যথেষ্ট নয়। হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনী ব্যবহার করেছেন, এটিও যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হলো: কেন প্রতিটি রাজনৈতিক শাসক শেষ পর্যন্ত একই সামরিক-নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়?
যে কাঠামো মুজিবকে রক্ষা করতে পারেনি, মুজিবের হত্যাকারীদের একসময় দায়মুক্তি দিয়েছে, জিয়া ও এরশাদের উত্থান সম্ভব করেছে, ১৯৭৭-এর সামরিক সদস্যদের গণহারে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে, জিয়াকে হত্যা করেছে, ১/১১-তে নির্বাচিত রাজনীতিকে সরিয়ে দিয়েছে, RAB ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে গুমের, অভিযোগের জন্ম দিয়েছে, সীমান্তরক্ষীদের অব্যবস্থাপনা থেকে পিলখানা মারনযজ্ঞের ক্ষেত্র তৈরি করেছে, এবং ২০২৪-এর দমন-পীড়নের সময় রাষ্ট্রীয় শক্তির অংশ হয়েছে, সেই কাঠামোকে শুধু “দেশপ্রেমিক” বলে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার জন্য মৌলবাদী রাজনীতি দায়ী, নিশ্চয়ই। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো যখন দীর্ঘদিন ধরে সামরিকীকরণ, দায়মুক্তি, ধর্মীয় রাষ্ট্রীয় প্রতীক, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধাকে স্বাভাবিক করে তোলে, তখন মৌলবাদ শুধু বাইরে থেকে সমাজে ঢোকে না; রাষ্ট্রের ভেতর থেকেও তার জন্য জায়গা তৈরি হয়।
একটি দেশের সেনাবাহিনী শক্তিশালী হওয়া সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, সেনাবাহিনী যদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে যায়।
একটি দেশের সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক হওয়া সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, দেশপ্রেম যদি তাকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তুলে দেয়।
একজন সৈনিকের সম্মান থাকা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, জেনারেলের সম্মান রক্ষার জন্য যদি নাগরিকের ন্যায়বিচার বিসর্জন দিতে হয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ তাই শুধু ব্যালট বাক্সে নয়। তার একটি বড় অংশ নির্ভর করছে বন্দুকের ওপর বেসামরিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারার ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সেনাবাহিনী দেশপ্রেমিক কি না, তা নয়।
প্রশ্নটি হলো:
দেশের জন্য সেনাবাহিনী আছে, নাকি সেনাবাহিনীর জন্য দেশ?
জুলেখা সিরাপ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক পর্যালোচনা'ডিপ স্টেট'-এর পরিকল্পিত ও কৃত্রিম জনমত তৈরির ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করার লক্ষ্যে প্রকৃত জনমত।
তৈল মর্দনের কৌশল নম্বর ৬৯,সময়ে #সুবিধাবাদীরা কতোই না বদলায়!!! তারা সবাই ডিপ স্টেটের দালালসন্ত্রাসী,একসময় #আওয়ামীলীগের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল।নেতানেত্রীদের সার্বক্ষণিক পা চাটায় ব্যস্ত থাকতো।এখন প্রতিদিন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ঘেউ ঘেউ করে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ রাজনীতি ও গোয়েন্দা তৎপরতা: নেপথ্য সমীকরণ , অনুগ্রহ করে কমেন্ট বক্সে ভিডিওটি চেক করুন, অনুগ্রহ করে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন যাতে আরো জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায় :
বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি-র ভণ্ডামির সার্কাস ও জনগণের দুর্ভোগ, ভিডিওটি অনুগ্রহ করে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করুন যাতে আরো জনসচেতনতা বৃদ্ধি পায় :
゚ -Prof,Dr.Arif
゚ -Prof,Dr.Arif
゚ -Prof,Dr.Arif
#সন্ধ্যাকালীননির্বাচন২৬ ゚ ゚viralfbreelsfypシ゚viral #জুলাই২৪ ゚