20/07/2026
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর কোন ম্যাচই আনুষ্ঠানিকভাবে আমি দেখিনি আলহামদুলিল্লাহ। তারপরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে নানান সময় ম্যাচের আপডেটগুলো সামনে আসতো।
যখন ব্রাজিল হেরে গেল তখন খুব খুশি হয়েছি এই ভেবে যে সারা দেশ থেকে অর্ধেক উন্মাদনা কমে যাবে। এরপর যখন মিশর vs আর্জেন্টিনার খেলা হলো তখন মন থেকে খুব করে চেয়েছিলাম যেন আর্জেন্টিনা বিদায় নেয়, যাতে করে ফুটবল উন্মাদনা থেকে আমাদের দেশের মানুষ রক্ষা পায়। কিন্তু কে জানত আর্জেন্টিনার জন্য অপেক্ষা করছে আরো ভয়াবহ লাঞ্ছনা!
জুলাই বিপ্লবের পর থেকে এবং শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বাংলাদেশের তরুণ তরুণীদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হারে ইসলামী ভাবধারার সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গুলোতে কাওয়ালী সন্ধ্যা, মিলাদুন্নবী উদযাপন, সম্মিলিত ইফতার ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, রমজান বরণ, ইসলামিক ভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ইসলামিক স্কলারদের দাওয়াত করে নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ের ইসলামিক সেমিনার আয়োজন ইত্যাদি। ইসলামী ভাবধারার এই সাংস্কৃতি চর্চা সারা দেশেও প্রভাব ফেলেছে। এমন কি সংসদ ভবনেও এর প্রভাব আমরা লক্ষ্য করছি যার ফলশ্রুতিতে সংসদে এখন এমপিরা কোরআনের আয়াত নিয়ে কথা বলে, বিরোধী দল আবার সরকারি দলের উপস্থাপিত আয়াতের বক্তব্যের বিপক্ষে তাদের পাল্টা যুক্তি দাড় করায়! কী চমৎকার দৃশ্য!
ইসলামী সংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই যুবকগুলো FIFA world cup 2026 এর চোখ ধাঁধানো আয়োজনে মুগ্ধ হয়ে যখন নিজেদের বিবেক বুদ্ধি হারাতে বসেছে এ দৃশ্য দেখে তখন আমার মন চরমভাবে ব্যথিত হয়েছে। এজন্যই আমি খুব করে চাইতাম যেন আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিদায়ের মাধ্যমে এই উন্মাদনার সমাপ্তি ঘটে।
কিন্তু আমি চাইলেই কি আর হবে, আল্লাহর পরিকল্পনা হয়তো ভিন্ন ছিল। আমি তো চেয়েছি ইসরাইলপন্থী আর্জেন্টিনা যেন মিশরের বিপক্ষে হেরে যায় কিন্তু অবশেষে তারা হারলো কোটি কোটি দর্শকের সামনে বিশ্বকাপ ফাইনাল মঞ্চে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল স্পেনের বিপক্ষে। তবে এই ফাইনাল ম্যাচ আমাদেরকে আরো কিছু বার্তা দিয়ে যায়!
১. অতীত ইতিহাস দেখে কোন দলকে সাপোর্ট করা উচিত নয়, যেমন ব্রাজিল পাচ বার শিরোপা বিজয়ী তাই আমি ব্রাজিলের সাপোর্ট করি।
এই উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে এসে বুঝার ট্রাই করুন যে অতীতের ভালো খেলা বর্তমান বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব রাখে না।
২. একজনের খেলায় মুগ্ধ হয়ে কোন দলকে সাপোর্ট করা উচিত নয়। যেমন অনেক উন্মাদ মেসির জাদুতে পাগল হয়ে আর্জেন্টিনার সাপোর্ট করে।
ফুটবলে কখনো একজন ভার্সেস একজনে খেলা হয় না। এখানে সারাদেশের কোটি কোটি মানুষ থেকে বাছাইকৃত একটি টিম অপর আরেকটি দেশের টিমের বিপক্ষে খেলতে নামে। তাই সামগ্রিকভাবে কোন টিম দল হিসেবে ভালো খেলে সেটা দেখে সাপোর্ট করা উচিত।
বাংলাদেশের যে ইসলামিক সংস্কৃতি ভাবধারার তরুণরা একসময় মেসি আর নেইমারকে ছাড়া কাউকে চোখে দেখতে না পেয়ে আর অন্য কাউকে সাপোর্ট করতো না তারা আজকে বিশ্বকাপ ফাইনাল ম্যাচের বড় পর্দায় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে দেখেছে মুসলিম তারকা লামিন ইয়ামালকে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী যুবক, যে কিনা তাদের মতই ইসলামিক সাংস্কৃতি ভাবধারা সম্পন্ন। বিশ্বমঞ্চে ইতিপূর্বেই শিরোপা জয়ের পর তিনি ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছেন। আজকে ফাইনাল ম্যাচে বিজয়ী হওয়ার পরও মাঠে সিজদা দেয়া, দু-হাত তুলে মোনাজাত করা, স্বভাব সুলভ বিনয় ও নম্রতা বজায় রাখা এসবই ছিল ইসলামিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়ার অনন্য কৌশল। বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল আসরের বিশ্বমঞ্চে যখন বিজয়ীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের একটা সিজদা ও মোনাজাতের মাধ্যমে শুকরিয়া আদায় করা হয় তখন এটা সারা বিশ্বের প্রতিটি ধর্মের মানুষের চোখের সামনে ইসলামের সৌন্দর্যকে তুলে ধরা হয়, ইসলামিক সাংস্কৃতিকে রিপ্রেজেন্ট করা হয়।
আমি বিশ্বাস করি গতকালকের ম্যাচ থেকে আমাদের দেশের অনেক যুবকেরাই মেসি ও নেইমার কেন্দ্রিক তাদের অন্ধ সাপোর্টের উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসার নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে। যেখানে তারা খুঁজে পেয়েছে এমন একটি দলকে যারা মুসলিমদের প্রতি সহানুভূতিশীল, ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের সোচ্চার, যাদের প্রভাবশালী তারকা লামিন ইয়ামাল এমন একজন মুসলিম যুবক যিনি তার হৃদয়ে ইসলামী সাংস্কৃতিকে লালন করেন।
পরিশেষে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত স্মরণ করিয়ে দিতে চাই,
وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ ۗ أُولَـٰئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۖ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ
একজন মুসলিম ক্রীতদাসও একজন মুশরেকের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম, যদিও তোমরা তাদের (মুশরিকদের) দেখে মুগ্ধ হও। ওরা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ তার বিধানের মাধ্যমে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুক! আমিন।
ইউসুফ মোঃ তানভীর
২০/০৭/২৬