05/05/2026
ওষুধ প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনকালে আটক এবং একটি সুশৃঙ্খল পেশার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু?
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) যা ঘটেছে, তা কেবল কয়েকজনের আটক হওয়া নয়, বরং বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল পেশাজীবী শ্রেণির মর্যাদার ওপর চরম আঘাত। নির্ধারিত ভিজিট ডে-তে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় ফার্মা সেলস প্রফেশনালদের আটক করার পর কিছু মিডিয়ায় ঢালাওভাবে ‘দালাল’ হিসেবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অপমানজনক।
উনারা প্রত্যেকেই দেশের শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল, পরিমার্জিত ও সম্মানিত একটি পেশাজীবী গ্রুপ। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের আজকের এই অভূতপূর্ব সাফল্যে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।
আমরা প্রতিদিন তাঁদের দেখি, কিন্তু যে বিষয়গুলো ঠিকভাবে দেখি না সেগুলো সবার একবার পড়া উচিত:
দেশের ওষুধ শিল্পের অভাবনীয় সফলতার অন্যতম কারিগর এই শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষিত প্রতিনিধির দল। তাদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমেই আজ দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সহজলভ্য হয়েছে। স্বাধীনতার পর যেখানে দেশের ৮০-৯০ শতাংশ ওষুধ বিদেশ নির্ভর ছিলো, সেখানে আজ চাহিদার ৯৮ শতাংশ ওষুধ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
যে দেশে আজ একটি চা-পান বা সিগারেট ১০-২০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না, সে দেশে এখনো ২-৫ টাকায় অসংখ্য বিশ্বমানের ওষুধ কিনতে পাওয়া যায়। দেশের অন্যান্য শিক্ষিত বেসরকারি পেশাজীবীদের মতো শতভাগ সুযোগ-সুবিধা ও বেতন-ভাতাদি যদি ওষুধ প্রতিনিধিদের দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতো তাহলে হয়তো এই কম দামে ইন্ডাস্ট্রি আমাদের ওষুধ দিতে পারতো না!
ওষুধ প্রতিনিধিরা কেবল গতানুগতিক সেলসম্যান নন, বরং তারা আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার এক অপরিহার্য ‘নলেজ পার্টনার’। বিশ্বের সর্বশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রিপোর্ট, ওষুধের সঠিক ডোজ, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ট্রিটমেন্ট গাইডলাইনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আপডেটেড তথ্যগুলো নিয়মিত চিকিৎসকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন এই প্রতিনিধিরাই। প্রকৃতপক্ষে, তারা চিকিৎসা গবেষণার নতুন নতুন ওষুধ, নতুন সব উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ের সেবার মাঝে এক শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন।
সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতায় দেশব্যাপী পালিত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে চিকিৎসকদের পাশে থেকে এই প্রতিনিধিরা নিরলস অবদান রেখে চলেন। শুধু তাই নয়, চিকিৎসকদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও জ্ঞান বিনিময়ের লক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন সায়েন্টিফিক সেমিনার এবং কন্টিনিউয়াস মেডিকেল এডুকেশন (CME) প্রোগ্রামগুলো সফল করতে তারা পর্দার আড়ালে থেকে মূল ভূমিকা পালন করেন। চিকিৎসা সেবার আধুনিকায়ন ও উৎকর্ষ সাধনে তাদের এই নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা অনস্বীকার্য।
মনে পড়ে কি করোনাকালীন সময়ের কথা? যখন অন্য পেশাজীবীরা হোম অফিস করছিলেন, তখন চিকিৎসকদের মতোই এই প্রতিনিধিরা জীবন বাজি রেখে শহর-পাড়া-মহল্লায় হাসপাতাল থেকে ফার্মেসিতে ঘুরেছেন। অসংখ্য প্রতিনিধি তখন কাঁধে করে হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর ওষুধ পৌঁছে দিতেও দ্বিধা করেননি স্বাস্থসেবার ওই কঠিন সংকটকালীন সময়ে।
মিডিয়ায় এবং নাটকে এই পেশাজীবীদের এর আগেও নেতিবাচক ও হাস্যকর চরিত্রে উপস্থাপন করে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনেও তাদের প্রতি এক ধরণের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে, যা এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভয়ংকর। এবার ঢালাওভাবে ‘দালাল’ শব্দটি ব্যবহার করা পুরো বাংলাদেশের অত্যন্ত শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল পেশাজীবী শ্রেণির মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত করা হয়েছে।
আমরা বিশ্বাস করি, যেখানে অন্যায় আছে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দালালচক্রকে গ্রেপ্তার করা হোক। কিন্তু পেশাদার পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও ডিউটিরত একজন শিক্ষিত মানুষকে অসম্মান করা কিংবা তার বৈধ পেশাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ওষুধ প্রতিনিধিরা ‘দালাল’ নন, বরং তারা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনীতির এক অদৃশ্য মেরুদণ্ড। এই মেরুদণ্ডের গুরুত্ব আপনি তখনই ভীষণভাবে অনুভব করতেন, যদি প্রিয়জনের প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত ওষুধটির খোঁজে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে মাইলকে মাইল ঘুরেও ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফিরতেন। ওষুধ আজ এই প্রতিনিধিদের কল্যাণে আপনার ঘরের পাশের ফার্মেসিতে সহজলভ্য বলেই হয়তো সেই চরম ভোগান্তির কথা কারো কল্পনায় আসে না।
বিডিলার্নার্স পরিবারের পক্ষ থেকে, বাংলাদেশের প্রতিটি ওষুধ প্রতিনিধিকে জানাই আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা। আপনারা আমাদের গর্ব।
ধন্যবাদ
©️Abdul Kader Chowdhury
০৬ মে, ২০২৬