24/06/2025
২০০১ সালে ছোট ভাই স্পেনের তৎকালীন ফাস্ট সেক্রেটারি মনিরুল ইসলামের সাথে পর্তুগাল ভ্রমণ করেছিলাম। সেই ভ্রমণের উপর লেখা৷
পর্তুগাল, ইউরোপের রাজকন্যা।
দুই দশকেরও আগের কথা, তাও পর্তুগালেরর স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে মনে। ভাস্কো দা গামা আর খ্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো-র দেশ বলে কথা। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে মাদ্রিদ থেকে যাব লিসবন, ছ’ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে ৬২৫-কি.মি. পথ। গাড়ি ভাড়া করলাম চল্লিশ হাজার পেসো দিয়ে (একডলারে ১৫৮ পেসো)। সকাল দশটায় রওনা দিলাম। আমরা তিনজন, মোমেনভাই, কাজিন বুলবুল। গাড়ি চালাচ্ছে মাহমুদ।
রেস্ট নেয়া হল অনেক জায়গায়--ত্রুখিয়ো, মেরিদা, বাদাখোজ কিন্তু কখন যে সীমান্ত পার হয়ে নূতন এক দেশে ঢুকলাম, মাহমুদ না বললে বুঝতামই না যে স্পেন শেষ, পর্তুগাল শুরু। কেউ নেই সীমান্ত চৌকিতে! পাসপোর্ট চেকিং বা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স দূরের কথা, গাড়ি পর্যন্ত থামল না একমিনিট। দেশে ঢোকার পরও প্রচুর সময় চালিয়ে গেল পর্তুগাল ন্যাশনাল রোডে। অলিভ-সহ সবুজাভ গাছে ভরা এদেশের সমতল উর্বরভূমি। পাঁচটার পর পৌঁছলাম লিসবোয়ার সমুদ্রতীরবর্তী শহর কোস্তা দা কাপারিকা। উঠলাম মাহমুদের পরিচিত ‘গাজীপুরের বেয়াই’ তমিজ ও শাহজালালের বাসায়।
খাওয়া শেষে গেলাম ঘরের পেছনেই ৩০-কিমি দীর্ঘ সুদৃশ্য সী-বীচ, সম্মুখে অনন্ত অথৈ আটলান্টিক মহাসাগর। সূর্যের ক্লান্ত আলোতে মাছ ধরছে জেলেরা, পর্যটকেরা সার্ফিং করছে, মেয়েরা রৌদ্রস্নান। সন্ধ্যায় আমি ঘুমাতে গেলাম সপরিবারে, ওরা যাক যার যেখানে ইচ্ছা। ডিনার খেতে গেলাম বিক্রমপুরের শাহআলম ও ইকবালের বাসায়। দু’তলা নূতন বাসা, অধিকাংশ বাঙালি থাকে সিঙ্গেল। বুলবুল তার সঙ্গী পেয়ে গেছে: মতি(উর রহমান), ক্লাসমেট দিয়ে যদি হয় কোনো গতি।
পরদিন সকালে আমরা তিনজন হাঁটতে বের হলাম। মিনি দে প্রেসিয়ো থেকে অনির জন্য খাবার কিনলাম। বেয়াইর বাসায় সামান্য খেয়ে বের হলাম সবাই।
প্রথমেই পাহাড়ী দূর্গের ঐতিহাসিক শহর সিন্ত্রা, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক মানববসতি, রোমান এবং মূর মুসলিম শাসনের শিক্ষণীয় নিদর্শন বিদ্যমান। পাহাড়ের উপরে মনোহর প্রাকৃতিক সেটিং-এ নির্মিত প্যালাসিও দা পেনা, সর্বশেষ রানির রোমান্টিক বাসস্থান (১৯১০) পরিপাটি করে সংরক্ষিত। আরো আছে ন্যাশনাল প্যালেস, মূরিশ ক্যাসেল, নেচার পার্ক--বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন কীর্তি--কত দেখব! তারপর এলাম আটলান্টিকের তীরে কাবো দা রোকা--ইউরোপীয় ভূখণ্ডের সর্বশেষ পয়েন্ট, এখানে পা রেখে ভ্রমণপিপাসু মোমেনভাই এক্সাইটেড, সাগর পাড়ি দিলেই আমেরিকা! কলম্বাস তো তা-ই করেছিল।
আসার পথে সবাই লাঞ্চ খেলাম বীফ প্লাঞ্চা। হোস্টের অনেক টাকা গেল, প্রায় ৮০০০ ইস্কোদো (একডলারে ১৯০)।
বিকালে বেলেম গেলাম সুবিশাল জেরোনিমস মনাস্টেরি (১৪৯৫) দেখতে, যেখানে শায়িত আছে ভাস্কো দা গামা (১৪৬০-১৫২৪ খ্রি.)। সংলগ্ন চার্চে প্রেয়ার হচ্ছে, নীরবে বসে একটু দেখলাম তাদের প্রার্থনার রীতিনীতি। তেজো নদীর উপর তরে দা বেলেম (১৫১৩) দেখলাম, সে এক বিশালাকার মধ্যযুগীয় দূর্গপ্রাসাদ। কাস্টেলো দ্য সাও জর্জি হল মুসলিম শাসকদের নির্মিত প্রাসাদ। পুরনো শহর আলফামা-র অলিগলিতে পুরনো গান বাজে এখনো। লিসবন ক্যাথিড্রাল এদেশের রোমান-গোথিক ও বারোক ঐতিহ্যের স্থাপত্যস্মারক। বিখ্যাত ব্যক্তিদের সমাধিস্থল হল ন্যাশনাল প্যানথিয়ন।
লিসবনে দেখার মতো আরো আছে প্রাসা দো কমার্সিয়ো, একোয়ারিয়াম, ট্রাম২৮, ডিসকভারি মনুমেন্ট, টাইলস এবং কোচ/গাড়ির জাদুঘর। যুবা পর্যটকদের জন্য আছে রাতের শহর বাইরো আলতো, সাইডো, কাইস দো সদ্রে। পকেট ভারী থাকলে খেতে পারেন ফ্রেশ উপকরণ দিয়ে তৈরি সুস্বাদু সুগন্ধি বৈচিত্র্যময় পর্তুগীজ খাবার: আলু মরিচ ডিম মসলা ও অলিভওয়েল দিয়ে লবনাক্ত/ভাজা কডফিস (বাকালাউ), রোস্টেড চিকেন (পর্ক জনপ্রিয়), হাঁস বা মাছ দিয়ে ভাত (আরজ দ্য পাতু/মারিসকো), রুটি-সালাদ দিয়ে ভাজা/গ্রিল্ড সার্ডিন বা অক্টোপাস, মাছ-সবজির কালদো, সসেজ, কালদোভার্দে বা একর্দা স্যূপ, কাস্টার্ড টার্ট (পাস্তেল দ্য নাতা), কাতাপলানা, পেস্ট্রি ও ফিশকেক।
তৃতীয়দিন। আমরা উঠে তৈরি হয়ে নিলাম। বিক্রমপুরের ইকবাল তার দেশি আপা-ভাগ্নের জন্য নাস্তা আনল সকালে। বাবুল সরকারও চাঁদপুরের মিষ্টি খাওয়াল। বেয়াইর বাসায় এসে সবাই বের হলাম একসাথে।
প্রথমেই গুলবেনকিয়ান মিউজিয়াম। ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে বিংশ শতাব্দীর অনেক সেরা শিল্পীর মাস্টারপীস আছে এই সংগ্রহশালায়, কারণ প্রতিষ্ঠাতার মটো ছিল: অনলি দ্য বেস্ট। প্রায় ৬,০০০ আইটেমের মধ্যে পাওয়া যাবে বিভিন্ন যুগ ও সভ্যতার নিদর্শন: পেইন্টিং, স্কাল্পচার, জুয়েলারি, কার্পেট, কতকিছু। সবাই দেখে বিমুগ্ধ, আমি স্তব্ধÑকী করে একটা জাদুঘর এত সমৃদ্ধ হয়!
তারপর এক্সপো ’৯৮ ভেন্যু। একই সাথে ১৯৯৮ সালে ওরা ভাস্কো দা গামার ইন্ডিয়া আবিষ্কারের ৫০০তম বার্ষিকীও পালন করেছে। বিশাল ব্যাপার, তেজো নদীর তীর ঘেঁষে করেছে সব স্থাপনা। সেভিয়া এক্সপো ’৯২ থেকেও জাঁকজমক বেশি মনে হল এখানে। অন্যসব দেশের সাথে এখনো উড়ছে বাংলাদেশের পতাকা। পর্তুগালের সেই বিখ্যাত ১৭.২-কিমি ভাস্কো দা গামা ব্রিজ দেখলাম, যা ইউরোপে দীর্ঘতম। প্রভা-অনি গেল ভাস্কো দা গামা মার্কেট, নূতন দেশে কিছু তো কেনাকাটা দরকার। এদেশের ওয়াইন, অলিভওয়েল, কর্ক এবং টমেটো সস চলে দুনিয়াজোড়া।
বিকালে কেরানিগঞ্জের লেহাজউদ্দিন ও সতেরো-সঙ্গীর সাথে পিকনিকে যোগ দিতে গেলাম ২৮০-কিমি দূরে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পর্তো, বিদেশীরা বলে অপর্তো। খেলাম বেশ মজার বিরানি বাঙালিদের। কে কী দেখাবে, পরে নিজেরাই মেট্রোতে ঘুরতে বের হলাম। বৃষ্টির জ্বালায় শহরকেন্দ্র বাইসা গিয়েও বেশিকিছু দেখতে পারলাম না।
সময়াভাবে একনজরে দেখলাম কাসা দা মিউজিকা, চার্চ-ক্যাথিড্রাল, টাওয়ার, সিটি হল, বলসা প্রাসাদ। রোমানদের দিয়ে শুরু পর্তো শহরের ঐতিহাসিক পুরনো অংশ হল ইউনেস্কোর ওয়াল্ড হেরিটেজ সাইট। স্থানীয়রা বলে পর্তো হল ‘প্রাচীন, অভিজাত, অনুগত এবং অপরাজেয় শহর’। মাহমুদ বাংলাদেশী ইলিশ, সবজি, মরিচ ইত্যাদি কিনতে বের হয়ে গেল আমাকে নিয়ে। গিয়ে দেখি বাঙালির আরেক জগৎ--সিঙ্গাপুরের সেরাঙ্গুন!
স্পেনে ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে। সময় পেলে দেখা যেত ক্যাথলিক তীর্থস্থান ফাতিমা এবং মদের রাজ্য দওরো ভ্যালি। যাক, রাত দশটায় রওনা দিলাম। সারাপথে সবাই কথা বললাম, যখন যা মনে আসে, পাছে চালক ঘুমিয়ে পড়ে! ভোর চারটায় এসে গাড়ি পৌঁছল বাসায়।
পর্তুগাল সফর করলাম, একথা মনে পড়লেই শিহরণ জাগে একারণে যে, সুদূর ইউরোপের এমন একটা সুন্দর সমৃদ্ধ দেশ জয় করেছিল মুসলিম জনগণ। মধ্যযুগে ৭১১-১৪৯২ খ্রিস্টাব্দ সময়ে স্পেন-পর্তুগালসহ পুরো ইবেরিয়ান উপদ্বীপ উমাইয়া শাসকদের অধীনে আরব-মুরিশদের দখলে ছিল, যার নাম ছিল আল-আন্দালুস। যখন খ্রিস্টানরা জেগে উঠল সম্মিলিতভাবে, মুসলিমরা ব্যস্ত গোষ্ঠীস্বার্থের কলহ-বিবাদে, মুরিশ গৌরব অস্তাচলে গেল ধীরলয়ে। শুরু হল পর্তুগীজ নাবিকদের নূতন পৃথিবী আবিষ্কারের তাড়না ও অনুপ্রেরণা। সাগরতীরে একটা ছোট্ট জাতির ছোট জনসংখ্যার দেশ পর্তুগাল, তারাই নাকি জাহাজে করে বেরিয়ে পড়েছে অজানা অচেনা দেশের সন্ধানে। এশিয়া (গোয়া ১৪৯৮, মাকাও, মালয়, ওমান, জাপান, তিমুর), আফ্রিকা ও আমেরিকায় (ব্রাজিল ১৫০০) তারা আবিষ্কার করেছে বহু অজানা অজ্ঞাত স্থলভূমি, সমুদ্রপথ এবং বাণিজ্যবন্দর।
দখল/শাসনকৃত অঞ্চলগুলি স্বাধীন হয়ে গেলেও অদ্যাবধি পর্তুগীজ সংস্কৃতির প্রভাবও রয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশে। এখনো পর্তুগীজ স্থাপত্যের স্থাপনা দেখা যায় এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিনদের বহু দেশে। সাহিত্য সঙ্গীত নৃত্য নাট্য চলচিত্র চিত্রকলা খাদ্য পানীয় ক্রীড়া ও বিশ^ভ্রমণে পর্তুগীজদের রয়েছে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু-কিশোর-যুবা-বৃদ্ধ, সবার কাছেই সুপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইউরোপের পশ্চিমপ্রান্তে থাকা এই সহজলভ্য রাজকন্যা।
পৃথিবীর ১০-টি দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা পর্তুগীজ: অ্যাংগোলা ব্রাজিল কেপভার্দে গিনি-বিসাও মোজাম্বিক পর্তুগাল সাওতুমে-প্রিন্সিপে পূর্বতিমুর ইকোয়েটরিয়াল-গিনি মাকাও।। প্রায় ৩০-কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে, এটি প্রায় দুইকোটি লোকের দ্বিতীয় ভাষা। এসব দেশ ও জাতিকে সম্মিলিতভাবে বলা হয় লুসোফোন (যেমন ফ্রাঙ্কোফোন)। পর্তুগীজকে বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম ভাষা। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থায় চলে পর্তুগীজ ভাষা। পৃথিবীর আরো অনেক দেশে, উরুগুয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ভারত ও স্পেনের কিছু শহরে পর্তুগীজ চলে। পর্তুগীজ অভিবাসী আছে অ্যান্ডোরা বারমুডা কানাডা ফ্রান্স জাপান লুক্সেমবার্গ নামিবিয়া প্যারাগুয়ে সুইজারল্যান্ড ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, যাদের মাতৃভাষা পর্তুগীজ।
১৫৩০ সালের দিকে কয়েকবছরের সংস্পর্শে এমনকি আমাদের বাংলা ভাষায় রয়েছে প্রচুর পর্তুগীজ শব্দ: কেদারা কামরা জানালা বারান্দা চাবি গামলা বালতি বোতল বৈয়াম বাসন বয়া বেহালা আলমারি গুদাম ইস্পাত গির্জা সায়া কামিজ সালোয়ার তোয়ালে আয়া আলপিন বোতাম পাঁউরুটি (বাঁধা)কপি জাম্বুরা আনারস পেয়ারা আতা নিলাম ফালতু মিস্ত্রি ইস্ত্রি কার্তুজ আলকাতরা মাস্তুল পেরেক জুয়া টাংকি কাজু ক্রুশ পাদ্রি যিশু ইংরেজ মর্মর পিপা পিরিচ ফিতা চুরুট সাবান সন্ত। চট্টগ্রাম, সাতগাঁও, বন্দর ও ঢাকায় তারা দস্যুতা, দাসব্যবসা ও বাণিজ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা করেছে স্থানীয় মগ-আরাকান এবং বিদেশী শক্তিগুলোর সাথে। আমাদের মসলিন সুতা সিল্ক রফতানী করেছে এশিয়া-ইউরোপে, এদেশে চালু করেছে গোলমরিচ তামাক টমেটো পেঁপে গোলআলু পনির এবং খ্রিস্টধর্ম।
আধুনিককালে পোশাক, ফ্যাশন, কিচেনওয়ার, আসবাবপত্র ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্ব›দ্বী হল পর্তুগাল। ইউরোপের এই রাজকন্যাকে দেখতে আসে বছরে ২৭-মিলিয়ন পর্যটক, অথচ আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে ছোট (৯২,০০০-বর্গকি.মি.) এই দেশটির জনসংখ্যা মাত্র ১১-মিলিয়ন। আরামদায়ক অনুকূল পরিবেশের কারণে আনুমানিক ষাট-সত্তর হাজার বাঙালির সাথে প্রচুর বিদেশী, বিশেষত ব্রাজিলিয়ান আফ্রিকান ও ইউরোপিয়ান, বসবাস করে এদেশে। যথারীতি সিলেটী ও নোয়াখালী প্রচুর। ক্ষুদ্র ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট ও কৃষিতে জড়িত তারা। লিসবনের ‘মার্তিম মনিজ’-এ বাঙালিদের আড্ডাখানা। চলুক আড্ডা, বাঙালি ও বাঙালিয়ানা ছড়িয়ে পড়–ক সাড়া বিশ্বে।