27/08/2025
আচ্ছা, ভাবুন তো আইশা (রা.)-র নামে যখন মুনাফিকরা ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করেছিলো এবং কিছু দুর্বল ঈমানদারও একথা ছড়িয়েছিলো তখন কি রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কথা বিশ্বাস করেছিলেন মনে মনে?
তিনি কি আইশা রা.-কে ঘুণাক্ষরেও এই অপরাধে অপরাধী ভেবেছিলেন?
না। আমি মনে করি, কষ্মিণকালেও না। এবং প্রমিনেন্ট সাহাবিদের কেউও একথা বিশ্বাস করেননি।
কিন্তু তবুও, যখন আইশা (রা.)-র বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে এই অভিযোগ আনা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা.) তার পক্ষাবলম্বন করে কোনো বক্তব্য দেননি।
কারণ যখন কারো নামে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের হয়ে যায় তখন বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঢুকে যায়। সেখানে আর আবেগ বা ব্যক্তিগত বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোনো বিষয় ফাংশান করে না। তখন ফাংশান করে যুক্তি-দলীল ও সাক্ষ্য-প্রমাণ। অভিযোগকারী প্রমাণ উপস্থাপন করবে আর অভিযুক্ত তা খণ্ডন করবে। যাচাই-বাছাই শেষে ফাইনালি যেটা প্রতিষ্ঠিত হবে সেই অনুযায়ী বিচার হবে।
যেহেতু তখনও ব্যভিচার সাব্যস্ত হওয়া কিংবা ব্যভিচারের অপবাদ সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি ডিল করার পদ্ধতি শরিয়াতে নাজিল হয়নি, তাই আল্লাহর রাসূল (সা.) দ্বিধান্বিত ছিলেন কিভাবে কী করবেন এবং আসমান থেকে ফায়সালা আসার অপেক্ষা করছিলেন।
কেবল পরিচিতি, আভিজাত্য বা ক্রেডিবিলিটির কারণে কাউকে যদি ফ্রি-পাস দেওয়ার কোনো নিয়ম ইসলামে থাকত, তাহলে বলুন আল্লাহর রাসূলের স্ত্রী, আবু বকর আস সিদ্দিকের কন্যার চেয়ে বেশি ক্রেডিবিলিটি কার আছে?
কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই যেমন সে অপরাধী হয়ে যায় না, বরং অপরাধ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনের আবশ্যকীয়তা ও শর্ত রয়েছে, তেমনি অভিযোগ উঠলে তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপনের দাবি না জানিয়ে পূর্বপরিচিতির ভিত্তিতে নিষ্পাপ হিসেবে পাবলিকলি ফ্রি-পাসও দেওয়া যাবে না।
কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের, বিশেষত ফৌজদারি অপরাধ বা বান্দার হক্ব মেরে দেওয়ার অভিযোগ এলে তার পূর্বপরিচিতর কারণে, অভিযোগ আমলে না নিয়ে, তদন্ত না করে তার পক্ষে সাফাই গাওয়া হলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষত এমন সমাজে, যেখানে ফরমাল কোনো শরিয়া আদালত নেই এবং দুষ্ট লোকদের হাতেই ক্ষমতার লাগাম বাধা।...
মানুষের প্রবৃত্তি হলো—বন্ধুকে সহযোগিতা করা, এটা ভালো। কিন্তু ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, সবকিছুর উপরে ন্যায় ও ইনসাফ। তাই বন্ধুত্বের সম্পর্ক কখনো যেন ন্যায় ও সত্যকে আড়াল করার অজুহাত হতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
আমাদের কোনো ভাইবন্ধু যদি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তখন সঠিক পথ হলো—তাকে ন্যায়বিচারের আওতায় আনা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
انصر أخاك ظالما أو مظلوما
“তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক কিংবা মজলুম।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মজলুম হলে সাহায্য করা তো বুঝলাম; জালিম হলে কীভাবে সাহায্য করব?’ তিনি উত্তর দিলেন: “তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখাই হলো তাকে সাহায্য করা।” (বুখারি, মুসলিম)
একইসাথে এটাও আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হলেও, শাস্তি পেলেও, মুসলিম হিসেবে তার অন্যান্য হক্ব যথানিয়মেই সংরক্ষণ করতে হবে। যালিমের উপরও যুলুম করার কোনো সুযোগ নেই। ....
আমাদের আল্টিমেট আনুগত্য যে কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এটার প্রমাণ হিসেন আমরা আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে যখন কোনো বিষয়ে আমাদের ব্যক্তিগত আবেগ বা মূল্যায়ন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ফায়সালার সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থায় দাঁড়ায় তখন আমরা কী সিদ্ধান্ত সেটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন,
يَا أَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُونُوا۟ قَوَّامِينَ بِٱلْقِسْطِ شُهَدَآءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُمْ أَوِ ٱلْوَٰلِدَيْنِ وَٱلْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًۭا فَٱللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا۟ ٱلْهَوَىٰٓ أَن تَعْدِلُوا۟ ۚ وَإِن تَلْوُۥٓا۟ أَوْ تُعْرِضُوا۟ فَإِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًۭا
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য হয়্র, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায় কিংবা পিতা-মাতার বা আত্মীয়দের বিরুদ্ধে যায়। সে ধনী হোক কিংবা দরিদ্র—আল্লাহই তাদের দু’জনের প্রতি অধিক হকদার। তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না, যাতে ন্যায়বিচার করতে ব্যর্থ হও। আর যদি তোমরা কথাকে বিকৃত করো অথবা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের কাজের খবর রাখেন।” (সূরা আন নিসা-১৩৫)
©ওস্তায আহমেদ রফিক