14/10/2024
পুরনো সিলিং ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দে ঘরের আবহ যেন পুরোটাই ‘ঢাকাইয়া’ হয়ে উঠেছে। তিনটা ল্যাপটপের নীল আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। সেই আলোয় ভেসে উঠছে কফির কাপ থেকে ওঠা হালকা ধোঁয়া। সঙ্গে আছে ইনডাকশন প্লেট। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, আর সেই বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে দূরের রিকশার টুং টুং আওয়াজ।
ঘরের কোণে পড়ে থাকা পুরনো বইগুলো থেকে ভেসে আসছে সেই চিরপরিচিত সোঁদা গন্ধ। এই পরিবেশে ব্রায়ান এখন অভ্যস্ত৷ রাশাদ আর ভিয়া — এসেছে পরে। কয়েকটা রিপোর্ট হাতে নিয়ে। কেমন যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর উদ্বেগের মাঝে ডুবে আছে তারা। চোখ স্ক্রিনে আটকে, কিন্তু মন উড়ে বেড়াচ্ছে এক অজানা ঝামেলার দিকে।
ব্রায়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “গাইজ, আমাদের ‘প্রজেক্ট”’ একটা লেভেলে নয়েজকে ফিল্টার করতে পারছে! ওয়ার্কেবল স্টেটে এসেছে মনে হচ্ছে।”
রাশাদ চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে, নিচু গলায় বলল, “শshshh! আস্তে কথা বল। দেয়ালেরও কান আছে।”
ভিয়া একটু হেসে বলল, “রিল্যাক্স, রাশাদ। এই জায়গাটা আমি নিজে চেক করেছি। কোনো বাগ নেই আপাততঃ।”
রাশাদ একটু লজ্জিত হয়ে বলল, “সরি, হয়ত একটু ওভাররিঅ্যাক্ট করছি। কিন্তু তোমরা তো জানো, এই প্রজেক্টের ইম্পর্টেন্স কতো।”
ব্রায়ান মাথা নেড়ে সায় দিল, “হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। আমরাও নার্ভাস। তবে, আমাদের ফোকাস করতে হবে কিছু জায়গায়। দেখো, আমাদের সিস্টেম সত্যিই কাজ করছে প্রোটোটাইপ হিসেবে।”
ভিয়া এগিয়ে এসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। চোখ পাকিয়ে বললো “ওমাই গড! এটা কি সত্যি? আমাদের এক্সটেন্ডেড-এআই সিস্টেম কি সত্যিই দেশের অনেকগুলো ডাটা পয়েন্ট কানেক্ট করতে পেরেছে?”
সবাই হাসলো। কারণ ভিয়াই ‘এপিআই’ লেভেলে এই কানেকশন এক্সপার্ট!
ব্রায়ান উত্তেজিত হয়ে বলল, “হ্যাঁ! ফান করো না! শুধু তাই নয়, এটা নতুন একটা প্যাটার্ন ডিসকভার করেছে। দেখো, এখানে দেখাচ্ছে কীভাবে এই দেশের কৃষি উৎপাদন, আবহাওয়া, অর্থনীতি, রাজনীতি — সবকিছু একে অপরের সাথে ইন্টারকানেক্টেড। মনে আছে, আমরা কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসি ডেটা, কাস্টমস ডেটা, কৃষি মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট, এমনকি স্যাটেলাইট ইমেজ থেকে পাওয়া ভূমি ব্যবহারের তথ্য — সব একসাথে ফিড করেছিলাম?”
“হ্যাঁ, অনেকগুলো পাবলিক ডাটা।”
রাশাদ এগিয়ে এসে স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। “আমাকে একটু ডিটেইলে বুঝিয়ে বলো তো।”
ব্রায়ান মাথা নেড়ে বলল, “অবশ্যই। দেখো, এই গ্রাফটা। এটা দেখাচ্ছে গত ৩০ বছরের পেঁয়াজের দাম, উৎপাদন, এবং আমদানির তথ্য। কিন্তু এর সাথে আমাদের এআই মডেল যোগ করেছে আরও কিছু ভ্যারিয়েবল।”
ভিয়া যোগ করল, “হ্যাঁ, যেমন দেখো এই লাল লাইনটা। এটা দেখাচ্ছে মৌসুমি বন্যার তীব্রতা। লক্ষ্য করো, যখনই এই লাইন উপরে উঠেছে, তার কিছুদিন পর পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।”
রাশাদ বিস্মিত হয়ে বলল, “এটা তো অদ্ভুত! কিন্তু এর মানে কি বন্যা পেঁয়াজের দাম বাড়ায়?”
ব্রায়ান মাথা নাড়ল, “সরাসরি না। কিন্তু বন্যায় যাতায়াত ব্যবস্থা ‘ডিজরাপ্টেড’ হয়, এতে সরবরাহ কমে যায়। আবার, বন্যার পর কৃষকরা অন্য ফসল চাষে মনোযোগী হয়, এতে পরবর্তী মৌসুমে পেঁয়াজের উৎপাদন কমে যায়।”
ভিয়া আরও যোগ করল, “আর এই নীল লাইনটা দেখো। এটা দেখাচ্ছে ভারত এবং মিয়ানমারের সাথে আমাদের রাজনৈতিক সম্পর্কের একটা সূচক। যখনই এই লাইন নিচে নেমেছে, তার কিছুদিন পর পেঁয়াজের দাম বেড়েছে।”
রাশাদ হাই তুলে বলল, “এখন বুঝতে পারছি! রাজনীতির সাথে পেঁয়াজের দামের সম্পর্ক অনেক দিনের।”
ব্রায়ান ব্যাখ্যা করল, “মনে রাখো, এই দেশ অনেক পেঁয়াজ আমদানি করে এই দুই দেশ থেকে। যখন রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়, তখন সীমান্তে ঝামেলা বাড়ে, আমদানি কমে যায়। ফলে দাম বাড়ে।”
ভিয়া আরও একটা গ্রাফ দেখাল, “আর এই সবুজ লাইনটা দেখো। এটা দেখাচ্ছে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার। দেখো কীভাবে এটা ধীরে ধীরে পেঁয়াজের প্রোডাকশনকে প্রভাবিত করছে।”
(ক্রমশঃ)
খসড়া উপন্যাসের অংশবিশেষ: কল্যাণী ২.০
(ডিসক্লেইমারঃ এই গল্পে ব্যবহৃত সমস্ত স্থান, চরিত্র ও কাহিনী কাল্পনিক, মস্তিষ্ক প্রসূত। কারো চরিত্র কিংবা কোন ঘটনার সাথে মিলে গেলে তা কাকতালীয় ঘটনা মাত্র। এর জন্য লেখক দায়ী নন)
(পুরোটা কমেন্টে)