23/08/2026
খুব বেশি মেধাবী আমি কখনোই ছিলাম না। কিন্তু ছিলাম নিজের মেধার ব্যাপারে ওভারকনফিডেন্ট। পড়াশোনা করতে তেমন একটা ভালো লাগতো না। ফলসরূপ রেজাল্টও খুব বেশি একটা ভালো কখনোই হয়নি আমার। হাই স্কুল লাইফে ১ থেকে ১০ এর মধ্যে ঢুকতে পেরেছি শুধুমাত্র দুইবার তাও ঢাকার নামীদামী স্কুলে না। ফরিদপুরে। কিন্তু এডমিশন টেস্টে এসে আমি বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা ইউনিভার্সিটি সব জায়গায়ই চান্স পাই। আমার মনে হয় আমার এডমিশন টেস্টের সফলতার কারণ আমার মেধা কখনোই ছিলো না। বরং আমি এমন কিছু মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি যারা আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে কাজ করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমার পরিশ্রম।
তখন আমি ক্লাস সিক্সে। ভর্তি হলাম ফরিদপুরের শাহীন স্কুল এন্ড কলেজের ক্যাডেট কোচিং প্রোগ্রামে। সেখানে আমাদের ম্যাথ পড়াতেন সাব্বির হোসেন স্যার। আমি স্যারের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ কারণ আমি বিশ্বাস করি আমি আজকে ম্যাথে যতটুকু পারদর্শী হয়েছি তার পিছনে সবথেকে বেশি অবদান ক্লাস সিক্সে সাব্বির স্যারের। স্যার আমাকে বিশ্বাস করান যে আমি অন্য ৫টা স্টুডেন্টের থেকে আলাদা। আমার ভিতর কনফিডেন্স তৈরি হয়। কিন্তু সেটা একদম ভেঙে যায় যখন আমি ক্যাডেট কলেজের রিটেনেই বাদ পড়ে যাই। আমার ভর্তি পরীক্ষার রোল ছিলো ২১০৮৮০। ২০১৭ সালের ৬ জানুয়ারি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে আমি পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আজও আমার পরিষ্কার মনে আছে সব।
ক্যাডেট কলেজে চান্স না পাওয়ার পর আমার কনফিডেন্স একদম ডাউন হয়ে যায়। স্কুলেও আমি ক্রমাগত নিচের দিকে যেতে থাকি। পড়াশোনায় তেমন একটা ইফোর্ট যে দিতাম তাও না। এরপর ক্লাস নাইনে উঠি। শত চেষ্টা করেও ফিজিক্স কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। নাইনের ফার্স্ট টার্মে আমি ফিজিক্স, হায়ার ম্যাথে খুবই বাজে রেজাল্ট করি। স্যারদের কাছে পড়তাম কিন্তু কিছু বুঝতে পারতাম না। তখন আমাকে পথ দেখান বুয়েটের একজন স্টুডেন্ট। যিনি আমাকে শিখান ফিজিক্স কিভাবে পড়তে হবে। তার নাম সুদীপ্ত সিকদার। তিনি এখন আমার জামাইবাবু(দুলাভাই)। উনিই আমাকে ট্র্যাকে ফেরত আনেন।
আস্তে আস্তে আমি ফিজিক্স হায়ার ম্যাথ বুঝতে শুরু করি। জিনিসগুলো ভালো লাগতে শুরু করে। তখন আমি ভাবলাম আমি অলিম্পিয়াডগুলোতে পার্টিসিপেট করা শুরু করি। প্রথমবার ম্যাথ অলিম্পিয়াডে পার্টিসিপেট করে রিজিওনাল রাউন্ডে সেকেন্ড রানার আপ হলাম। ঢাকায় গিয়ে ন্যাশনালে পার্টিসিপেট করলাম। পুরষ্কার জিততে পারলাম না কিন্তু কিছু একটা অর্জন করলাম যা আমাকে এই পর্যন্ত নিয়াসলো।
আমি ভাবলাম আমার অলিম্পিয়াডে জাতীয় পর্যায়ে একটা পুরষ্কার জিততে হবে। কি করা যায় চিন্তা করতে করতে আমি রকমারি থেকে অলিম্পিয়াডের অনেকগুলো বই কিনলাম। আমার বাসায় ৪০টা মতন বই আছে সম্ভবত অলিম্পিয়াডের। কিন্তু সমস্যা হলো আমি সেগুলো পড়ে কিছুই বুঝতে পারতাম না। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে আমি জানলাম দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনেক ম্যাথ ক্লাব আছে যেখানে অলিম্পিয়াডের জন্য বিভিন্ন ক্লাস হয়। আমি খোজ নিয়ে জানলাম ফরিদপুরে কোনো ম্যাথ ক্লাব নেই। আছে পাশের জেলা রাজবাড়িতে। ওইখানে প্রতি শুক্রবার সকাল ৯টায় অলিম্পিয়াডের জন্য ম্যাথ, ফিজিক্স ক্লাস হয়। আমি শুক্রবার ভোর ৬টায় উঠে ৮টার মধ্যে বাসে উঠে আমার বাবার সাথে ফরিদপুর থেকে রাজবাড়ি গিয়ে ক্লাস করা শুরু করলাম। এটাই আমার জীবনের সবথেকে বড় টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে কাজ করলো।
সেখানে গিয়ে আমার পরিচয় হলো নিলয় কুমার মন্ডল দাদার সাথে। দাদা তখন নটরডেম কলেজে পড়তেন। এখন বুয়েট সিএসই ২১ ব্যাচের স্টুডেন্ট। দাদার থেকে নটরডেম কলেজের ব্যাপারে জানলাম, অলিম্পিয়াডের ব্যাপারে জানলাম। স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। সেইদিন থেকে বুয়েটে চান্স পাওয়া পর্যন্ত আমি নিলয়দার পরামর্শ সবসময় নিতাম। আরও ক্লাস নিতেন সেখানে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের মৃদুল ভাই, কেমিস্ট্রির অমি ভাই, বুয়েটের প্রজ্ঞা দীপ্ত সাহা দাদারা। ফরিদপুরে আমি কখনও এত মেধাবী মানুষের সান্নিধ্য একবারে পাইনি যা রাজবাড়ির আর্যভট্ট গণিত সঙ্ঘ আমাকে দিয়েছে। অলিম্পিয়াডেও হালকা কিছু সফলতা পাই বাংলাদেশ জুনিয়র সাইন্স অলিম্পিয়াডে ন্যাশনাল মেডেল সহ মাত্র ২ বছরের ছোট অলিম্পিয়াড জার্নিতে আমি টোটাল ১০টা মেডেল অর্জন করি।
এরপর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এসএসসিতে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, হায়ার ম্যাথ সব সাব্জেক্টে ১০০ পেয়ে ট্যালেন্টপুল স্কলারশিপ নিয়ে পাশ করলাম। নটরডেম কলেজে ভর্তি হলাম। সেখান থেকে এইচএসসিতে ফিজিক্স কেমিস্ট্রি ম্যাথে ৯৬.৩৩% নাম্বার নিয়ে পাশ করলাম। এডমিশন টেস্টে বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা ইউনিভার্সিটি সব জায়গায় চান্স পেলাম।
আমার সফলতার পিছনে সবথেকে বেশি ভূমিকা আমার মা, বাবা, দিদির। কিন্তু যে মানুষগুলোর কথা আমি উল্লেখ করলাম ক্লাস সিক্সের সেই সাব্বির স্যার, আমার দুলাভাই সুদীপ্ত সিকদার আর রাজবাড়ির সেই নিলয় কুমার মন্ডল দাদা এদের ছাড়া হয়তো আমি আজকে জীবনে যতটুকু করেছি তা করতে পারতাম না। এখন আমি বুঝি শুধু পরিশ্রম কিংবা মেধাই যথেষ্ট না। দরকার সঠিক মানুষের গাইডলাইন।
আমার এই দীর্ঘ পথচলা আমাকে একটা বড় শিক্ষা দিয়েছে—প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যেই অসীম সম্ভাবনা থাকে, কেবল প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক মেন্টরশিপের আলো পাওয়া। সেই দায়বদ্ধতা আর স্বপ্ন থেকেই আমাদের উদ্যোগ ইরতিকা একাডেমি (Irtiqa Academy)। আমরা চাই, কোনো শিক্ষার্থী যেন সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে মাঝপথে থমকে না যায়। বুয়েট, মেডিকেল ও শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ মেন্টরদের হাত ধরে আমরা গড়ে তুলছি এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যা তোমাদের একাডেমিক ভীতি কাটিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে এবং পৌঁছে দেবে স্বপ্নের ঠিকানায়।
সকল শিক্ষার্থীর জন্য রইল অনেক অনেক শুভকামনা ও ভালোবাসা। তোমাদের পরিশ্রম আর আমাদের সঠিক দিকনির্দেশনা মিলে তৈরি হোক নতুন সাফল্যের গল্প।
ছবিতে আমার সাথে দেখা যাচ্ছে আমার সবথেকে প্রিয় শিক্ষক নটরডেম কলেজের নয়ন পোদ্দার স্যারকে।তার গল্প বলবো আরেকদিন।
গোপাল চন্দ্র দাস
ম্যাটেরিয়ালস এন্ড মেটালার্জিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং,বুয়েট
Gopal Chandra Das