24/04/2025
মুফতি Yousuf Sultan সাহেবের টাইমলাইন থেকে
এ সপ্তাহে বাহারাইনে আওফির ২৩ তম বার্ষিক শরীয়াহ বোর্ড কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হলো। দুই দিনব্যাপী কনফারেন্সে নানা গুরুত্বপূর্ণ টপিক আলোচিত হয়েছে। ইনশা'আল্লাহ আরেকটি লেখায় আমি কনফারেন্সের সারাংশ তুলে ধরার চেষ্টা করব। এ লেখাটি মূলত শরীয়াহ বোর্ডের দায়িত্ব নিয়ে।
কনফারেন্সের উদ্বোধনী বক্তব্যে শায়খুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ দুটো পয়েন্টে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন।
১. তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ৫০ বছরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামিক ব্যাংকিং যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে। এবং ইসলামিক ব্যাংকিং এর এ অগ্রযাত্রায় শরীয়াহ বোর্ডের ভূমিকা অপরিসীম। একদিকে শরীয়াহ সম্মত হওয়া নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বাস্তবসম্মত ফতোয়া প্রদান করা - এর দুইয়ের সম্মিলন গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদেরকে তাই সর্বদা আল্লাহর কাছে রুজু করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে জবাবদিহিতা করবেন।
তিনি প্রখ্যাত আলেম ইমাম শাফেয়ীর রহ. কথা তুলে ধরেন, যিনি নানা প্রশ্নের উত্তরের আগে সময় নিতেন। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে নিজেকে জান্নাত ও জাহান্নামের সামনে উপস্থিত করি, এরপর উত্তর দেই। কাজেই শরীয়াহ বোর্ডের সকল সদস্যের এ বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার এবং তদনুযায়ী শরীয়াহ সিদ্ধান্ত দেয়া উচিত।
২. দ্বিতীয় পয়েন্টে তিনি ইসলামী অর্থনীতির মূল উদ্দেশ্য তথা সম্পদ কুক্ষিগত না হওয়া সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন। এবং এ ক্ষেত্রে সকলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
এ বছর তৃতীয়বারের মতো আওফির শরীয়াহ বোর্ড কনফারেন্স সরাসরি উপস্থিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। এবং প্রতিবারই উদ্বোধনী বক্তব্যে শায়খ মুফতী তাকী উসমানী শরীয়াহ বোর্ডের সদস্যদেরকে তাদের এই গুরু দায়িত্ব সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শায়খের এই নসিহত যতবারই শুনি অন্তর ভয়ে কেঁপে ওঠে।
বাংলাদেশের নানা ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরীয়াহ বোর্ডে নিজের ও সহকর্মীদের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বলতে কোন সংকোচ নেই যে আমাদের শরীয়াহ বোর্ডগুলোর অধিকাংশ সদস্য ইসলামিক ব্যাংকিং তো দূরের কথা, ফিকহ মুয়ামালাত নিয়ে সামান্যতম ধারণা রাখেন না। কোন দূরবর্তী বিবেচনায় - যেমন ব্যক্তি প্রসিদ্ধি বা পরিচালকদের পূর্ব পরিচয় ইত্যাদির ভিত্তিতে হয়ত তারা সদস্য নির্বাচিত হন। এবং দিনের পর দিন শরীয়াহ বোর্ডে কোন উল্লেখযোগ্য শরীয়াহ ভূমিকা রাখা ছাড়াই তারা যে কোন ফতোয়া সাইন করে যান।
একই সঙ্গে তারা এতটাই ব্যস্ত যে মিটিং এর এজেন্ডা পড়ার সময়টুকু পান না, এবং অনেক সময় ঘন্টা পার হতেই মিটিং শেষ করার জন্য তড়ান্বিত করতে থাকেন। ফলে দিনের পর দিন যথাযোগ্য ডেলিবারেশন/আলোচনা/বিতর্ক ছাড়াই মিটিং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, যা শরীয়াহর দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়। আবার অনেক সময় শরীয়াহর আলোকে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেও অন্যান্য সদস্যদের বিষয়টি না জানা থাকার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সেটা বাতিল হয়ে যায়।
এক্ষেত্রে খুব কম বোর্ডেই দেখা যায় যে এক বা একাধিক সদস্য রয়েছেন যারা কিছুটা অগ্রসর এবং যাদের সঙ্গে মিলে একটি শরীয়াহ আলোচনা বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব। কিন্তু অন্যদের কারণে সেটাও অনেক সময় হয়ে ওঠে না।
ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুরো পৃথিবীতেই অত্যন্ত রেগুলেটেড ইন্ডাস্ট্রি। মানে এক্ষেত্রে প্রত্যেকটা কাজ অত্যন্ত প্রফেশনাল এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে কার্যকর করতে হয়। আপনি কল্পনা করুন, যে এমন একজনকে ব্যাংকিং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব - যেমন, কমপ্লায়েন্স বা অডিট - দেয়া হয়েছে কিংবা সেই কাজটির ব্যবস্থাপনা বা বোর্ডের সদস্য বানানো হয়েছে যিনি এই বিষয়ে নূন্যতম ধারণা রাখেন না। এটা একেবারেই অকল্পনীয়। কিন্তু ইসলামিক ব্যাংকগুলোর শরীয়াহ পরিপালনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে অর্গান - শরীয়াহ বোর্ড, সেখানে বাংলাদেশে এটা হরহামেশাই হচ্ছে।
আমার আজকের এই পোস্ট অনেকের মনে কষ্টের কারণ হতে পারে, তবে আমানাহর দিক থেকে আমি না লিখে পারলাম না।
শরীয়াহ বোর্ডের যেসব সদস্য ফিকহুল মুয়ামালাতের সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখেন না, কিংবা এ বিষয়ে পড়াশোনার সময় বের করতে পারেন না, কিংবা তিনি তার অন্যান্য দায়িত্বে এতটাই ব্যস্ত যে মিটিং এর এজেন্ডাটুকু পড়ে আসার সময় পান না - এসব ক্ষেত্রে তার উচিত সসম্মানে পদত্যাগ করা। শরীয়াহ বোর্ডের দায়িত্ব মিডিয়াতে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার মত নয়, অথবা মাহফিলে বয়ান করার মত নয়। এখানে পূর্ণ প্রস্তুতির সঙ্গে, নিজেকে আল্লাহর সামনেও উপস্থিত রেখে শরীয়াহ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। কাজটি ঠিকভাবে সম্ভব হলে করব, অন্যথায় ছেড়ে দিব, মাঝামাঝি কোন কিছুর সুযোগ নেই। এটা শুধু আমানাহর খেয়ানত নয়, বরং অত্যন্ত গুরু এই দায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রতারণার শামিল। কারণ সাধারণ মানুষ জানছে যে শরীয়াহ বোর্ড যোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শরীয়াহ নিশ্চিত করছেন, যা সত্য নয়। এই জবাবদিহিতা কত মারাত্মক হতে পারে তা ভাবলেই আমার গা শিউরে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মাফ করুন।
আমি অত্যন্ত সবিনয়ে অনুরোধ করব, শরীয়াহ বোর্ডে যারা বর্তমানে আছেন কিন্তু বিষয়ের সাথে সম্পর্ক না থাকায় কিংবা পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছেন না, তারা আল্লাহকে ভয় করে পদ ছেড়ে দিন। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দেশে এখন নবীনদের মাঝে এক ঝাঁক তুখর মেধাবী আলেম প্রস্তুত আছেন যারা এই দায়িত্ব যোগ্যতা এবং পর্যাপ্ত সময় দিয়ে পালন করতে পারবেন বলে আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি।
ডিসক্লেইমার: কেউ আশা করি ভাববেন না যে, আমার নিজের পদের জন্য লিখেছি। ইতোমধ্যে আমি বাংলাদেশে নতুন কোনো শরীয়াহ বোর্ডে ঢুকছি না বলে অনেককে না করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি। এর চেয়ে বেশি বোর্ডে সদস্য হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বরং বর্তমানে সদস্যপদ থাকা কিছু বোর্ডও শীঘ্রই ছেড়ে দিব ইনশা'আল্লাহ।