21/10/2025
মুসলিম ইতিহাসে অনেক নারী মসজিদে হাদীসের ক্লাস নিতেন!
উম্মুদ দারদা রাহিমাহাল্লাহ দামেস্ক ও জেরুজালেমের মসজিদে হাদীস শেখাতেন। তাঁর হাদীসের ক্লাসে অংশগ্রহণ করতেন তখনকার সময়ের বিখ্যাত অনেক আলেম। খলিফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান ছিলেন উম্মুদ দারদা রাহিমাহাল্লাহর ক্লাসের একজন ছাত্র।
শায়েখা উম্মুল খায়র ফাতিমা বিনতে ইব্রাহীম রাহিমাহাল্লাহ মসজিদে নববীতে হাদীস শেখাতেন। ইমাম আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহর ছেলেরা ছিলেন তাঁর ছাত্র। উম্মুল খায়র ফাতিমার বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন মুসলিম ইতিহাসের স্বনামধন্য আলেম আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ।
দামেস্কের বিভিন্ন মসজিদে নারীরা হাদীস শেখাতেন। যেমন: আল-জামিয়া আল-মুজাফফারী, জামে বনু উমাইয়্যা। আয়িশা বিনতে আব্দিল হাদী রাহিমাহাল্লাহকে বনু উমাইয়্যার গ্র্যান্ড মসজিদের হাদীসের শিক্ষিকা হিশেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
সাহাবীদের পর মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে সেলিব্রেটেড নারী স্কলার ছিলেন কারিমা বিনতে আহমদ।
কারিমাহ বিনতে আহমদের বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন শাফেয়ী মাজহাবের আলেম খতীব বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ। এছাড়াও তাঁর শিক্ষার্থী ছিলেন- আবু তালেব আল হুসাইন, মুহাম্মদ ইবনে বারাকাত, আলি ইবনু হুসাইন আল-ফাররা, আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ, আবুল কাসেম আলি ইবনে ইব্রাহিম, আবুল মুজাফফার মানসুর ইবনে সামআনি প্রমুখ। [শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, ইলমের ভালোবাসায় চিরকুমার উলামায়ে কেরাম, পৃষ্ঠা ৩৪৩]
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর সময়ে বাগদাদে একজন বিখ্যত আলেমা ছিলেন ফাতিমা বিনতে আব্বাস আল-বাগদাদিয়াহ রাহিমাহাল্লাহ। তাঁর ডাকনাম ছিলো ‘উম্মে যাইনাব’।
মুসলিম ইতিহাসের অন্যতম পলিম্যাথ ইমাম আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন ফাতিমা বিনতে আব্বাসের ছাত্র।
ইমাম যাহাবী তাঁর শিক্ষিকা সম্পর্কে বলেন:
“আমি ফাতিমা বিনতে আব্বাসের কাছে গেলাম। তাঁর চরিত্র, বিনয় ও তাকওয়া দেখে অবাক হলাম। তিনি ফিক্বহে খুব পারদর্শী ছিলেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়াও ফাতিমার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রশংসা করেন। তিনি সমাজের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।” [ইমাম আয-যাহাবী, সিয়ারু আ’লাম আন-নুবালা, আয-যুয আল-মাকফুদ, ৪১৬]
আমরা যেমন সিভিতে লিখি কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করেছি, তেমনি আলেমগণ তাদের জীবনীতে উল্লেখ করতেন তারা কোন কোন আলেমের কাছ থেকে পড়াশোনা করেছেন।
যাদের মধ্যে অনেকের শিক্ষিকা ছিলেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, আবু ইব্রাহীম আল তর্জুমানী, আলী ইবনে মুসলিম আল-তূসী, কাযী আবু ইয়ালা নারীদের কাছে জ্ঞানার্জন করেন।
ইমাম নাজমুদ্দিন ইবনে ফাহাদ ১৩০ জন নারীর কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন।
সহীহ বুখারীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী তাঁর কিতাবে হিজরি অষ্টম শতাব্দীর ১৭০ জন নারী শায়েখের উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে ৫৪ জন থেকে তিনি নিজে হাদীস বর্ণনা করেন।
ইমাম ইবনে হাজারের ছাত্র আল্লামা সাখাবী ৮৫ জন নারী থেকে ইলম অর্জন করেছেন।
তাঁর সমসাময়িক আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতি ৪৪ জন নারী আলেমের কাছ থেকে ইলম অর্জন করেছেন।
বিখ্যাত আলেম ও ইতিহাসবিদ হাফিজ ইবনে আসাকির ৮০ জনের বেশি নারী আলেমের কাছে জ্ঞানার্জন করেন। যেসব নারী আলেমের কাছে তিনি জ্ঞানার্জন করেন তাদেরকে নিয়ে তিনি একটি জীবনীগ্রন্থ লিখেন।
তাঁর সমসাময়িক আবু সা'দ আল সাম'আনী ৬৯ জন নারীর কাছে হাদীস শিখেন। হাফিজ আবু তাহির আল সিলাফী ১০ জন নারী আলেমের কাছ থেকে হাদীস শিখেন।
মুসলিম ইতিহাসের বিখ্যাত পলিম্যাথ, শায়খুল ইসলাম আল্লামা ইবনুল জাওযী ৩ জন নারী আলেমের কাছে জ্ঞানার্জন করেন। তাঁর সমসাময়িক আব্দুল গণী আল-মাকদিসী বেশ কয়েকজন নারী আলেমের কাছে জ্ঞানার্জন করেন।
বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইমাম ইবনুল আসির, ইবনুল সালাহ, হাফিজ আল-মুনজিরী, মুহিব আল-তাবরী বেশ কয়েকজন নারীর কাছে জ্ঞানার্জন করেন।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া, ইবনে জামাহ, ইবনে সায়্যিদ আন-নাস, আবুল হাজ্জাজ আল-মিজ্জী, ইমাম আয-যাহাবী, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, তাজ উদ্দিন সুবকী, হাফিজ আল্লামা ইবনে কাসির, আল্লামা যারকাশী, আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী, আল-বুলকিনী, হাফিজ আবুল ফযল আল-ইরাকী, আল্লামা ইবনুল জাজারী, হাফিক শামসুদ্দীন আশ-শাখাওয়ী সহ অনেক বিখ্যাত ইমামগণের নারী শিক্ষিকা ছিলেন। (মুহাম্মদ আকরাম নদভী, আল-মুহাদ্দিসাত, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪২। এছাড়াও যেসব ইমামগণের নামোল্লেখ করলাম, তাদের স্বতন্ত্র জীবনী পড়লে তাদের শিক্ষক-শিক্ষিকার নামের তালিকা পাবেন।)
সেসব শিক্ষিকাদের কারো কারো ঘরের দরজায় পর্দা টানানো থাকতো, পর্দার আড়ালে থেকে তারা দারস দিতেন৷ কেউ কেউ মসজিদে দারস দিতেন।
সেইসব বিখ্যাত নারী আলেমা ও তাঁদের বিখ্যাত ছাত্রদের কাছে পর্দা জ্ঞানার্জনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং পর্দা মেনেও কিভাবে জ্ঞানচর্চা করা যায়, সেটা মুসলিম ইতিহাসের পূর্ববর্তী আলেমগণের জীবনী পড়লে জানা যায়।