21/08/2026
কুরআনের মাদরাসার ছাত্রীর সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে প্রিয় নবীর ﷺ-এর আশিকা হবে। **********
🔳 আজকের আলোচনার প্রথম কথা হলো—যিনি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারও তাঁরই। আর তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী, আমাদের প্রাণের নবী, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ। কুরআনের ছাত্রীর হৃদয়ে সবচেয়ে বড় ভালোবাসা থাকবে মুহাম্মাদ ﷺ-এর জন্য।
🔳প্রিয় নবীর ভালোবাসা তিনি আমাদের কাউকে দেখেননি, কিন্তু আমাদের জন্য কেঁদেছেন। হাদীসে এসেছে, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তারপর দুই হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন হে আমার রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত!
এত কান্না করলেন যে আল্লাহ জিবরীল (আ.)-কে পাঠালেন। জিবরীল এসে জিজ্ঞেস করলেন আপনি কেন কাঁদছেন? তিনি বললেন আমি আমার উম্মতের জন্য ভয় করি।
প্রিয় নবীর কান্না ছিল উম্মতের জন্য। সেই কান্না আমাদের জন্যই ছিল। আমাদের নাজাতের জন্য তিনি কেঁদেছেন। আমাদের ক্ষমার জন্য আল্লাহর কাছে তিনি দোয়া করেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা
*************
উম্মতের প্রতি প্রিয় রাসূলুল্লাহর ভালোবাসাটা অন্য সকল ভালোবাসা থেকে ভিন্ন। এই ভালোবাসার তুলনা হয় না।
উম্মতের প্রতি রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসার বুঝতে হলে আমাদের প্রিয় নবীর জীবনের কিছু গল্প আলোচনা করতে হবে। তার মাঝে একটি গল্প ওহাহশীর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের গল্প।
উহুদের যুদ্ধে হযরত হামযা (রা.) শহীদ হন। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা। শুধু চাচাই নন, শৈশবের সঙ্গী, ইসলামের এক মহান বীর এবং রাসূল ﷺ-এর অত্যন্ত প্রিয় মানুষ। আর তাঁকে যে শহীদ করেছিলো, তাঁর নাম ছিল ওয়াহশী। একটি বর্শা নিক্ষেপ করে তিনি হযরত হামযা (রা.)-কে হত্যা করেছিলেন। হত্যার পর কাফেররা হযরত হামজার লাশ বিকৃত করল। এই যুদ্ধে প্রিয় রাসূল আহত হন।
যুদ্ধ শেষে উহুদের ময়দানে রাসূল ﷺ যখন তাঁর প্রিয় চাচার বিকৃত দেহ দেখলেন, তখন তাঁর হৃদয় ভেঙে গিয়েছিল। এ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যগুলোর একটি।
কয়েক বছর পরে মক্কা বিজয়ের পর ১১ জন মক্কার বিখ্যাত কাফেরদের ব্যাপারে খামার অযোগ্য মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ঘোষণা করা হয়। ঠিক সে সময় ওয়াহশীর হৃদয়ে ইসলামের আলো জ্বলে উঠল। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন।ভাবছিলেন আমি তো রাসূল ﷺ-এর সবচেয়ে প্রিয় মানুষের হত্যাকারী। আমার জন্য কি ক্ষমার কোনো দরজা খোলা আছে?
তবুও তিনি এসে রাসূল ﷺ-এর সামনে দাঁড়ালেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন। রাসূল ﷺ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমিই কি ওয়াহশী? তিনি বললেন,জি, আমিই। তিনি পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূল ﷺ শুনলেন।
এ মানুষটির হাতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় চাচা শহীদ হয়েছেন।
তবুও তিনি বললেন না,তোমার ক্ষমা নেই।বললেন না,
আমি তোমাকে গ্রহণ করবো না। বরং তাঁর ইসলাম গ্রহণকে গ্রহণ করলেন। তাঁর জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করলেন না।
হ্যাঁ, মানবিক কষ্টের কারণে রাসূল ﷺ তাঁকে বলেছিলেন, তুমি যতটা সম্ভব আমার সামনে কম এসো, কারণ ওয়াহশীকে দেখলে তাঁর প্রিয় চাচার কথা মনে পড়ত।
কিন্তু লক্ষ্য করো ব্যক্তিগত বেদনা একদিকে, আর উম্মতের নাজাতের আকাঙ্ক্ষা আরেকদিকে। নিজের কষ্টকে তিনি দ্বীনের পথে বাধা হতে দেননি।
🔳এই ঘটনায় আমরা দেখি এমন এক নবীকে, যিনি প্রতিশোধের চেয়ে হিদায়াতকে বড় মনে করতেন। যিনি শাস্তির চেয়ে তাওবাকে বেশি ভালোবাসতেন। যিনি মানুষের অতীতের দিকে নয়, তার ঈমানের দিকে তাকাতেন।যে মানুষ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় চাচার হত্যাকারী ছিল, সেই মানুষটিও যখন ঈমান নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে, তখন তিনি তাকে উম্মতের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এটাই মুহাম্মাদ ﷺ। এটাই উম্মতের প্রতি তাঁর ভালোবাসা।
এটাই সেই রহমত, যার জন্য আল্লাহ বলেছেন—
«وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)
যে নবী তাঁর প্রিয় চাচার হত্যাকারীর জন্যও হিদায়াতের দরজা বন্ধ করেননি, তিনি তাঁর উম্মতকে কতটা ভালোবাসতেন—সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
🔳উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ সীমাহীন ভালোবাসার আলোচনা কুরআনে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰٓ ءَاثَـٰرِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا۟ بِهَـٰذَا ٱلْحَدِيثِ أَسَفًا
তারা ঈমান আনছে না বলে আপনি যেন দুঃখে নিজেকেই ধ্বংস করে ফেলবেন।(সূরা কাহফ: ৬)
মানুষ রাসূল ﷺ-এর কথা শুনছে না। অমান্য করছে। প্রিয় উপহাস করছে। তবুও রাসূল ﷺ কষ্ট করেই যাচ্ছেন। তার জন্য এতটাই আফসোস করছেন কেমন যেন তার জন্য জীবন দিয়ে দিবেন। তবু তাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাবেন।
বিষয়টা অনেকটা এভাবেই এসেছে এই আয়াতে।
একবার চিন্তা করো। আমরা যদি কাউকে নসীহত করি, সে না শুনলে এক সময় ছেড়ে দিই। কিন্তু রাসূল ﷺ ছাড়েননি। লোকেরা তাঁকে পাথর মেরেছে। তবুও তিনি কেঁদেছেন।লোকেরা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে। তবুও তিনি কেঁদেছেন।
🔳আল্লাহ কুরআনে প্রিয় রাসূলের গুণাবলী আলোচনা করেছেন। তার একটি গুণ হলো উম্মতের কষ্ট তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়। আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ
তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে খুবই কষ্টকর।(সূরা তাওবা: ১২৮)
এরপর আল্লাহ বলেন,
حَرِيصٌ عَلَيْكُم
তিনি তোমাদের কল্যাণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী।
কী সুন্দর শব্দ!
حَرِيصٌ عَلَيْكُم
অর্থাৎ তিনি তোমাদের নিয়ে ব্যাকুল।তোমাদের নাজাত নিয়ে ব্যাকুল। তোমাদের জান্নাত নিয়ে ব্যাকুল।
🔳মক্কায় নির্যাতিত হয়ে রাসূল ﷺ তায়েফে গেলেন। তুমি তায়েফ গেলেন মানুষকে জান্নাতের দিকে ডাকতে। কিন্তু তায়েফবাসির আচরণ ছিল বড় দুঃখজনক। তারা পাথর ছুঁড়লো। প্রিয় রাসূলের রক্তে জুতা ভরে গেল। শরীর রক্তাক্ত হলো। এমন সময় জিবরীল (আ.) এসে বললেনআপনি চাইলে এদের দুই পাহাড়ের মাঝে পিষে দেওয়া হবে। এখন যদি রাসূল ﷺ চাইতেন, মুহূর্তেই সব শেষ। কিন্তু তিনি কী বললেন?
তিনি বললেন আমি আশা করি, এদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ আসবে যারা আল্লাহর ইবাদত করবে।
সুবহানাল্লাহ! যারা তাঁকে রক্তাক্ত করলো, তিনি তাদের ধ্বংস চাননি। তাদের হিদায়াত চেয়েছেন। ঠিক এখানে আমরা হলে কী করতাম? সামান্য কষ্ট দিলেও আমরা ক্ষমা করতে পারি না। সামান্য অপমান করলেও সম্পর্ক শেষ করে দিই।
আর রাসূল ﷺ রক্ত ঝরছে। তবুও দোয়া করছেন। যারা তাঁকে আঘাত করেছে তাদের জন্য।
🔳উহুদের যুদ্ধ এবং রক্তাক্ত মুখ। উহুদের যুদ্ধে রাসূল ﷺ-এর দাঁত মুবারক শহীদ হলো। মুখমণ্ডল রক্তাক্ত।
সাহাবারা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ওদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন। তিনি কি বদদোয়া করলেন?
বরং তিনি বললেন,
اللهم اغفر لقومي فإنهم لا يعلمون
হে আল্লাহ! আমার জাতিকে ক্ষমা করুন। তারা জানে না।"
যারা তাঁকে আঘাত করেছে, তাদের জন্যও তিনি মাগফিরাত চাইছেন।
🔳এক মদ্যপ সাহাবীর ঘটনা। এক সাহাবী বারবার মদ পান করতেন। তাকে বারবার শাস্তি দেওয়া হতো। একদিন একজন সাহাবী বিরক্ত হয়ে বললেন, আল্লাহ তাকে লানত করুন।
রাসূল ﷺ সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এ কথা বলো না। আল্লাহর কসম! আমি জানি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকেভালোবাসে।
মানুষ দেখছে গুনাহ। রাসূল ﷺ দেখছেন ঈমান।
মানুষ দেখছে ভুল। রাসূল ﷺ দেখছেন হৃদয়ের ভেতরের ভালোবাসা।
🔳 কিয়ামতের দিনও উম্মতের চিন্তায় প্রিয় নবী সবচাইতে বেশি অস্থির হবেন। হাদীসে এসেছে, কিয়ামতের দিন সব নবী বলবেন, নাফসি, নাফসি। আমার কথা, আমার কথা।
কিন্তু মুহাম্মাদ ﷺ বলবেন,উম্মাতি, উম্মাতি। আমার উম্মত, আমার উম্মত।
আজ আমরা তাঁকে ভুলে যাই। তাঁর সুন্নত ভুলে যাই। তাঁর হুকুম অমান্য করি। কিন্তু কিয়ামতের দিনও তিনি আমাদের ভুলবেন না।
তোমরা কুরআনের ছাত্রী। কুরআনের ছাত্রীদের হৃদয় অন্যরকম হয়। তোমাদের হৃদয়ে সবচেয়ে বড় স্থান হওয়া সেই মানুষটির, যিনি তোমাকে না দেখেই ভালোবেসেছেন।
সেই মানুষটির, যিনি তোমার জন্য কেঁদেছেন।
সেই মানুষটির,যিনি তোমার গুনাহের পরেও তোমাকে ছেড়ে দেননি। সেই মানুষটির,যিনি কিয়ামতের ময়দানেও তোমার জন্য দাঁড়াবেন।
একটি কথা মনে রেখো। তুমি রাসূল ﷺ-কে কতটুকু ভালোবাসো, সেটা বড় কথা নয়।বড় কথা হলো রাসূল ﷺ তোমাকে কতটুকু ভালোবেসেছেন।
তুমি তাঁকে দেখোনি। কিন্তু তিনি তোমার জন্য কেঁদেছেন।
তুমি তাঁর যুগে ছিলে না। কিন্তু তিনি তোমার জন্য দোয়া করেছেন। তুমি তাঁর অনেক সুন্নত ভুলে গেছো। কিন্তু তিনি তোমাকে ভুলে যাননি। তুমি অনেক সময় তাঁর হুকুম অমান্য করো।তবুও তিনি তোমার নাজাত চান।
তাই কুরআনের ছাত্রীরা,আজ যদি হৃদয়ে একটি সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে এই সিদ্ধান্ত নাও যে নবী আমার জন্য এত কেঁদেছেন, আমি তাঁর অবাধ্য হয়ে বাঁচবো না। যে নবী আমার জন্য এত ভালোবেসেছেন, আমি তাঁর সুন্নতকে ভালোবেসে জীবন কাটাবো।"
🔳তিনি উম্মতের জন্য কেঁদেছেন, উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন, উম্মতের জন্য অপবাদ সহ্য করেছেন, উম্মতের জন্য রক্ত ঝরিয়েছেন। এমনকি মৃত্যুশয্যাতেও তিনি বলেননি আমার পরিবার। তিনি বলেছেন উম্মাতি... উম্মাতি.। যে মানুষটি আমাদের জন্য কেঁদেছেন, আমরা কি তাঁকে ভালোবেসেছি।
আজ আমরা নিজেদের কাছে জিজ্ঞেস করবো—
রাসূল ﷺ আমাদের জীবনে কতটুকু আছেন? আমাদের বইয়ে আছেন নাকি হৃদয়ে আছেন? আমাদের পরীক্ষার খাতায় আছেন নাকি চোখের পানিতে আছেন? আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা তাকে ভালোবাসব। তিনি যতটা ভালোবেসেছেন মৃত্যুর শয্যায় ও তিনি আমাদের জন্য কেঁদেছেন। পরিবারের জন্য নয়। আমরা সবকিছুর উর্ধ্বে তার ভালোবাসাকে স্থান দিব দিবো।
🔳 রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসা জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মেয়ে বা ছেলে কে। যার অনেক সম্পদ আছে বা। যার অনেক ডিগ্রি আছে
যার অনেক খ্যাতি আছে। বরং পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মেয়ে বা ছেলে সে যার হৃদয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহব্বত আছে।
কারণ সম্পদ মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে যাবে। সৌন্দর্য যৌবনের সাথে শেষ হয়ে যাবে। ক্ষমতা সময়ের সাথে শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসা কবরেও থাকবে। হাশরেও থাকবে। পুলসিরাতেও থাকবে। জান্নাতেও থাকবে।
একটা মেয়ে যদি সত্যিই রাসূল ﷺ-কে ভালোবেসে ফেলে, তাহলে তার জীবন বদলে যায়। তার চোখ বদলে যায়।
তার ভাষা বদলে যায়। তার পোশাক বদলে যায়। তার স্বপ্ন বদলে যায়। কারণ ভালোবাসা মানুষকে পরিবর্তন করে।
ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়। মানুষ যাকে ভালোবাসে, ধীরে ধীরে তার চিন্তা, চরিত্র, আচরণ ও জীবনেও সেই ভালোবাসার ছাপ ফুটে ওঠে।
🔳যখন কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ-কে ভালোবাসে, তখন তার জীবনে আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার রং লেগে যায়। সে আল্লাহর আদেশ মানতে আনন্দ পায়, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করতে গর্ববোধ করে।
পক্ষান্তরে, যখন কেউ আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার ঊর্ধ্বে দুনিয়া, সম্পদ, পরিবার, পদমর্যাদা বা মানুষের সন্তুষ্টিকে স্থান দেয়, তখন সেই ভালোবাসাই তার অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাই প্রশ্ন হলো—আমার হৃদয়ে সবচেয়ে বেশি জায়গা কার? কারণ মানুষের জীবন শেষ পর্যন্ত তার ভালোবাসার দিকেই রঙিন হয়ে ওঠে।
🔳আমরা প্রিয় রাসুল কে ভালবাসব। আমরা তাকে ভালোবাসবো হযরত ফাতিমার মত করে। ফাতিমা (রা.) ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী কন্যা। কারণ তাঁর বাবা ছিলেন মুহাম্মাদ ﷺ। রাসূল ﷺ-এর শেষ অসুস্থতার সময় তিনি বাবার পাশে বসে ছিলেন। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তিনি দেখছিলেন যে মুখ দেখলে তাঁর সমস্ত দুঃখ দূর হয়ে যেত, সেই মুখে আজ অসুস্থতার ছাপ। হঠাৎ রাসূল ﷺ তাঁর কানে কিছু বললেন। ফাতিমা (রা.) কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
ফাতিমা (রা.)-এর হৃদয়ে যে ভালোবাসা ছিল, তা শুধু রক্তের সম্পর্কের ভালোবাসা ছিল না। তা ছিল নবুওয়াতের ভালোবাসা। তা ছিল ঈমানের ভালোবাসা।
রাসূল ﷺ-এর ওফাতের পর তিনি প্রায়ই বলতেন আজ আকাশের ওহি বন্ধ হয়ে গেছে। এই কথার মধ্যে কত ব্যথা!
কত শূন্যতা!কারণ ভালোবাসা মানুষকে এমন করে যে প্রিয়জন ছাড়া পৃথিবীকে আর আগের মতো লাগে না।
🔳তোমরা কুরআনের ছাত্রী। পৃথিবীর হাজার হাজার মেয়ের মতো তোমাদের পরিচয় শুধু একজন ছাত্রীর পরিচয় নয়। তোমাদের বুকের মধ্যে কুরআন। তোমাদের জিহ্বায় কুরআন। তোমাদের জীবনের লক্ষ্য কুরআন। তোমাদের হৃদয়ের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হবে। যিনি কুরআন নিয়ে এসেছেন। যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছে। যিনি কুরআনকে আমাদের হাতে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি মুহাম্মাদ ﷺ।
🔳 মদিনার মহিলা সাহাবীদের প্রিয় রাসূলের প্রতি ভালোবাসা কেমন ছিল তার একটু দৃষ্টান্ত উহুদের সেই নারী। তার হৃদয়ে রাসূল ﷺ ছিলেন সবার উপরে। হাদিসের মাঝে তারা আলোচনায় এসেছে। আমাদের তার কাছ থেকে ভালোবাসা শিখতে হবে।
উহুদের যুদ্ধ শেষ হয়েছে। মদীনার বাতাস ভারী হয়ে গেছে।
শহীদদের সংবাদ আসছে। সেই আনসারী নারীর কাছে লোকজন এসে বললো তোমার বাবা শহীদ হয়েছেন।
ভাবুন তো একজন মেয়ের কাছে বাবার মৃত্যুর সংবাদ কত বড় আঘাত! কিন্তু তিনি বললেন রাসূলুল্লাহ ﷺ কেমন আছেন? কিছুক্ষণ পর বলা হলো তোমার ভাই শহীদ হয়েছেন। তিনি আবার বললেন রাসূলুল্লাহ ﷺ কেমন আছেন? এরপর বলা হলো তোমার স্বামীও শহীদ হয়েছেন। তিনি আবারও বললেন রাসূলুল্লাহ ﷺ কেমন আছেন?
অবশেষে যখন রাসূল ﷺ-কে সামনে দেখলেন, তখন তাঁর মুখ থেকে বের হলো সেই বিখ্যাত বাক্য আপনি সুস্থ থাকলে আমার সব মুসিবত তুচ্ছ।
এটা কোনো গল্প নয়। এটা ভালোবাসা। এটা ঈমান। এটা মহব্বত। এটা সেই হৃদয়, যেখানে রাসূল ﷺ সবার উপরে স্থান পেয়েছেন।
🔳আজ মেয়েরা অনেক কিছু ভালোবাসে। কেউ সৌন্দর্য ভালোবাসে। কেউ দুনিয়া ভালোবাসে। কেউ প্রশংসা ভালোবাসে।
কিন্তু কুরআনের ছাত্রীর ভালোবাসা আলাদা।
কারণ কুরআনের ছাত্রী জানে পৃথিবীর সব ভালোবাসা একদিন শেষ হবে। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর ভালোবাসা কবরেও থাকবে।
একটা কথা আজ হৃদয়ে লিখে নাও। কুরআনের ছাত্রীর হৃদয়ে দুইটা সিংহাসন হয় না। একটা হৃদয়ে একসাথে দুনিয়ার মোহ আর রাসূল ﷺ-এর মহব্বত সমানভাবে থাকতে পারে না। যে হৃদয়ে রাসূল ﷺ বড় হয়ে যান,
দুনিয়া সেখানে ছোট হয়ে যায়।
🔳আজ আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি আমাদের হৃদয়ে রাসূল ﷺ কোথায় আছেন? আমাদের ব্যস্ততার মধ্যে তাঁর জন্য কতটুকু জায়গা আছে? আমাদের চোখে পানি আসে কত কারণে। কিন্তু রাসূল ﷺ-এর নাম শুনে কি কখনো চোখ ভিজেছে? এখানেই কুরআনের ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে একটি আবেগময় আবেদন। তোমরা কুরআনের ছাত্রী। তোমরা সাধারণ মেয়ে নও। তোমাদের হাতে যে কুরআন, সেই কুরআন নিয়ে এসেছেন মুহাম্মাদ ﷺ। তোমরা যদি তাঁকে না ভালোবাসো, তাহলে আর কে ভালোবাসবে? তোমরা যদি তাঁর সুন্নত আঁকড়ে না ধরো, তাহলে আর কে ধরবে? তোমরা যদি তাঁর জন্য চোখের পানি না ফেলো, তাহলে আর কে ফেলবে?
🔳হযরত নুসাইবা (রা.) — প্রেমের আরেক নাম। আত্মত্যাগ
ভালোবাসার দাবি তো অনেক মানুষ করে। অনেকেই বলে আমি ভালোবাসি। অনেকেই বলে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসা আর ভালোবাসার দাবি এক জিনিস নয়।
ভালোবাসা তখনই প্রমাণিত হয়, যখন ভালোবাসার জন্য কিছু হারানো হয়। যখন ত্যাগ করতে হয়। যখন কষ্ট সহ্য করতে হয়। যখন নিজের আরামকে কুরবান করতে হয়।
আর এই ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের নাম—নুসাইবা বিনতে কা'ব (রা.)। উহুদের যুদ্ধ চলছে।
পরিস্থিতি হঠাৎ বদলে গেল। মুসলমানদের সারি ভেঙে গেল। চারদিকে আতঙ্ক। চারদিকে ধুলোবালি। চারদিকে তরবারির ঝনঝনানি। মৃত্যু যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছে। শত্রুরা একের পর এক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে এগিয়ে আসছে। এমন সময় ইতিহাস একটি বিস্ময়কর দৃশ্য দেখলো।
একজন নারী সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাতে অস্ত্র। চোখে ঈমানের আগুন। হৃদয়ে মুহাম্মাদ ﷺ-এর মহব্বত। তিনি নুসাইবা (রা.)।
তিনি কি জানতেন আঘাত লাগবে।তিনি কি জানতেন যে মৃত্যু আসতে পারে। তিনি কি জানতেন যে কয়েক মুহূর্ত পর তাঁর সন্তানরা এতিম হয়ে যেতে পারে। তারপরও তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজের জীবনকে রাসূল ﷺ-এর সামনে ঢাল বানিয়ে দিয়েছিলেন?
এটা মহব্বত। প্রিয়রাসুলের প্রতি ভালোবাসা। ভালোবাসা যখন সত্য হয়, তখন মানুষ হিসাব করে না। ভালোবাসা যখন সত্য হয়, তখন মানুষ লাভ-ক্ষতির খাতা খুলে বসে না।
ভালোবাসা যখন সত্য হয়, তখন মানুষ নিজের কথা ভুলে যায়। নুসাইবা (রা.) সেদিন নিজের জীবন ভুলে গিয়েছিলেন।
তাঁর চোখে তখন শুধু একজন মানুষ। মুহাম্মাদ ﷺ। তাঁর হৃদয়ে তখন শুধু একটি চিন্তা আমার প্রাণ চলে যাক, কিন্তু রাসূল ﷺ-এর দিকে কোনো আঘাত না যাক।
একবার চিন্তা করো কুরআনের ছাত্রীরা, আমরা আজ সামান্য কষ্টের ভয়ে সুন্নত ছেড়ে দিই। সামান্য মানুষের কথার ভয়ে পিছিয়ে যাই। সামান্য সমালোচনায় ভেঙে পড়ি।
আর নুসাইবা (রা.) তাঁর সামনে ছিল তরবারি। ছিল বর্শা।
ছিল মৃত্যু। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন ভালোবাসার দ্বারা।
ঐদিন তাঁর শরীরে একের পর এক আঘাত পড়েছে। রক্ত ঝরেছে। ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ইতিহাসবিদরা লিখেছেন, তাঁর শরীরে বহু গভীর ক্ষত ছিল, যার একটি ক্ষত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত রয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু মেয়েরা, আজ মানুষ সেই ক্ষতগুলোর সংখ্যা মনে রাখেনি। আজ মানুষ মনে রেখেছে তাঁর মহব্বতকে। কারণ ক্ষত শরীরে লাগে। মহব্বত ইতিহাসে লাগে।
তোমরা কুরআনের ছাত্রী। নুসাইবা (রা.)-এর হাতে তরবারি ছিল। আজ তোমাদের হাতে কুরআন। নুসাইবা (রা.) রাসূল ﷺ-কে রক্ষা করেছেন নিজের জীবন দিয়ে। আজ তোমরা রাসূল ﷺ-এর দ্বীনকে রক্ষা করবে নিজেদের চরিত্র দিয়ে।
নুসাইবা (রা.) যুদ্ধক্ষেত্রে মহব্বতের প্রমাণ দিয়েছেন তোমরা হিজাবে, লজ্জাশীলতায়, নামাজে, সুন্নতের উপর অটল থেকে মহব্বতের প্রমাণ দেবে।
মনে রেখো, রাসূল ﷺ-এর আশেকা হওয়া শুধু চোখের পানি ফেলার নাম নয়। রাসূল ﷺ-এর আশেকা হওয়া শুধু নাত শোনার নাম নয়।
রাসূল ﷺ-এর আশেকা হওয়া হলো তাঁর জন্য নিজের ইচ্ছাকে কুরবান করতে পারা। তাঁর জন্য নিজের নফসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারা। তাঁর জন্য মানুষের সমালোচনা সহ্য করতে পারা। রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিধি-বিধান নিয়ে এসেছেন পৃথিবীর সকল কিছুর মোকাবেলায় তার পক্ষে দাঁড়ানো।
প্রিয় কুরআনের ছাত্রীরা,
নুসাইবা (রা.)-এর শরীরে যে ক্ষত ছিল, তা আজ নেই। কিন্তু তাঁর ভালোবাসা আজও বেঁচে আছে। কারণ পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত মানুষের সৌন্দর্য বেঁচে থাকে না। সম্পদ বেঁচে থাকে না। খ্যাতি বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে শুধু সেই হৃদয়, যে হৃদয়ে মুহাম্মাদ ﷺ-এর মহব্বত ছিল।
আর কুরআনের ছাত্রীর সবচেয়ে বড় পরিচয় তার হৃদয়ে কুরআন থাকে, আর সেই কুরআনের মালিকের রাসূল ﷺ-এর মহব্বত থাকে।
একদিন তোমার জীবনের শেষ বিকেল আসবে। শেষবারের মতো সূর্য ডুবে যাবে। শেষবারের মতো মানুষ তোমার চারপাশে দাঁড়াবে। তারপর তোমাকে কাফনে জড়িয়ে কবরের অন্ধকারে রেখে আসবে।
সেদিন তোমার ডিগ্রি সঙ্গে যাবে না। তোমার ফলাফল সঙ্গে যাবে না। তোমার প্রশংসাকারীরা সঙ্গে যাবে না। শুধু ঈমান যাবে। আর সেই ঈমানের সবচেয়ে সুন্দর ফুল হলো রাসূল ﷺ-এর মহব্বত।
ভাবোযদি কিয়ামতের ময়দানে রাসূল ﷺ তোমাকে দেখে চিনে ফেলেন!যদি তিনি বলেন এ আমার উম্মতের মেয়ে। যদি তিনি তোমাকে হাউযে কাওসারের পানি নিজ হাতেপান করান! যদি তিনি তোমার জন্য সুপারিশ করেন! তাহলে আর কী চাই?
আজ রাতে যখন ঘুমাতে যাবে, একটি কাজ করবে। বালিশে মাথা রেখে শুধু একটি প্রশ্ন করবেহে আল্লাহ! আমি কি সত্যিই আপনার রাসূলকে ভালোবাসি?"
যদি উত্তর না পাও, তাহলে কেঁদে বলবে হে আল্লাহ! আমাকে আপনার হাবীবের সত্যিকারের মহব্বত দান করুন। কারণ যে হৃদয়ে মুহাম্মাদ ﷺ-এর মহব্বত নেই, সে হৃদয় বেঁচে থাকলেও আসলে মৃত।
আর যে হৃদয়ে মুহাম্মাদ ﷺ-এর মহব্বত আছে, সে হৃদয় কখনো একা নয়, কখনো নিঃস্ব নয়, কখনো পরাজিত নয়।
-- সংগ্রহীত।