05/10/2026
সাহাবীদের চোখে রাসূল ﷺ
পর্ব ৮ | "একটা কাঁটাও যেন তাঁকে না ফোটে"
চতুর্থ হিজরি সনের সফর মাস। আদল আর কারা গোত্রের কিছু লোক রাসূল ﷺ-এর কাছে এসে অনুরোধ করেছিল, তাদের এলাকায় কয়েকজন মানুষ পাঠানো হোক, যারা তাদের ইসলাম শেখাবে। রাসূল ﷺ বিশ্বাস করে কয়েকজন সাহাবিকে পাঠালেন, আসিম ইবনে সাবিত (রাঃ)র নেতৃত্বে। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। পথিমধ্যে রাজী নামক স্থানে হুযাইল গোত্রের শাখা বনু লিহয়ান তাদের ফাঁদে ফেলল। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল সাহাবীদের ধরিয়ে মক্কার কুরাইশদের কাছে বিক্রি করা।
সেখানে তাদের সাথে সাহাবীদের এক অসম লড়াই হয়। লড়াইয়ে বেশিরভাগ সাহাবি শহীদ হলেন। বেঁচে রইলেন মাত্র দুজন। খুবাইব ইবনে আদি (রাঃ) আর যায়েদ ইবনে দাসিন্নাহ (রাঃ)। তাঁদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হলো মক্কায়, আর বিক্রি করে দেওয়া হলো বদরের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। খুবাইব (রাঃ)-কে কিনল উকবা ইবনে হারিসের পরিবার, কারণ বদরের যুদ্ধে খুবাইব (রাঃ) নিজে উকবার বাবাকে হত্যা করেছিলেন।
কিছুদিন বন্দি রাখার পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো তানঈম নামের একটা জায়গায়, হত্যা করার জন্য।
সেখানে পৌঁছে খুবাইব (রাঃ) একটাই অনুরোধ করলেন। তাকে যেনো দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ দেয়া হয়। তারা রাজি হলো। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, “যদি আমার এই আশঙ্কা না থাকত যে তোমরা ভাববে আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আরও অনেকক্ষণ নামাজ পড়তাম।”
এই একটা কথা, এই একটা মুহূর্ত পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য একটা রীতি হয়ে গেল। এরপর থেকে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন যেকোনো মুসলিম মৃত্যুর আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার চেষ্টা করতেন, খুবাইব (রাঃ)-এর এই সুন্নাহ অনুসরণ করে।
তারপর তিনি হাত তুললেন আকাশের দিকে, দোয়া করলেন: “হে আল্লাহ, এদের সংখ্যা গুনে রাখো, একে একে সবাইকে শেষ করে দাও, কাউকে ছাড় দিয়ো না।”
কাঠের ক্রুশে বেঁধে ফেলা হলো তাঁকে। চারপাশে জড়ো হয়েছে মক্কার মানুষ, বর্শা হাতে প্রস্তুত। তখন তিনি এমন কিছু পঙক্তি আবৃত্তি করলেন, যা পরবর্তীতে সহিহ বুখারীতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। তার সারমর্ম ছিল, “আমি মুসলিম হিসেবে শহীদ হচ্ছি, তাই এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আল্লাহর পথে যেদিকেই আমার দেহ লুটিয়ে পড়ুক, তাতে কিছু যায় আসে না। এই মৃত্যু তো একান্তই তাঁর জন্য, তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য। আর তিনি যদি চান, আমার এই ছিন্নভিন্ন দেহের প্রতিটি অংশেও তিনি বরকত দিতে পারেন।”
উকবা ইবনে হারিস এগিয়ে এলো। যার বাবাকে খুবাইব (রাঃ) হত্যা করেছিলেন। আঘাত করার আগে জিজ্ঞেস করলো: “তুমি কি চাও, মুহাম্মদ এখন তোমার জায়গায় থাকুক, আর তুমি নিজের পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরে যাও?”
খুবাইব (রাঃ)-এর উত্তরটা এমন ছিল, যা শুনে সেদিন মক্কার মানুষও থমকে গিয়েছিল:
“আল্লাহর কসম, আমি চাই না আমি নিজের পরিবার-পরিজনের মাঝে নিরাপদে বসে থাকি, আর মুহাম্মদ ﷺ-এর গায়ে একটা কাঁটাও ফুটুক।”
সেদিন সেখানে আবু সুফিয়ানও উপস্থিত ছিলেন, যিনি তখনও মুসলিম হননি। এই দৃশ্য দেখে তিনি নিজেও বলে উঠেছিলেন, মুহাম্মদ ﷺ-এর সাহাবিরা তাঁকে যেভাবে ভালোবাসে, এমন ভালোবাসা তিনি কখনো কারও প্রতি কাউকে করতে দেখেননি।