10/03/2014
রিকশাওয়ালার ভালোবাসা
Story
Mar 5, 2014
অষ্টম শ্রেণীতে উঠে ক্লাশ শুরু করতে না করতেই এক রিকশাওয়ালা
আমাকে ভালোবেসে ফেলল। পাঠক, আপনারা ভাবছেন আমি কোন
বাংলা সিনেমার কাহিনী লিখতে বসেছি, যেখানে আমার বাবা
চৌধুরী সাহেব টাইপ বিশাল বড়লোক , আমি তার একমাত্র আদুরে স্বল্প পোশাক
পরিহিত কন্যা, যে কিনা সারাদিন বান্ধবীদের সাথে খুলখুল করে বেড়াই,
রূপচর্চা নিয়ে এত ব্যাস্ত থাকি যে দুনিয়ার কাউকে কেয়ার করার সময় নাই,
কিন্তু, পরীক্ষায় ঠিকই ফার্স্ট হই। আর আমার প্রেমে পড়েছে ভার্সিটির ফার্স্ট
ক্লাস ফার্স্ট হওয়া গরীব মায়ের সৎ ছেলে,
যে কিনা চাকরী না পেয়ে মায়ের অসুখের টাকা যোগাড়
করতে রিক্সা চালয় এবং আমাকে ভালোবেসে ফেলে। ঘটনা আসলে মোটেই
সে রকম না।
কাহিনী হল, আমরা তখন থাকতাম তাজমহল রোডে। পড়তাম মোহাম্মদপুর
প্রিপারেটরি স্কুলে। আমাদের কোন গাড়ী না থাকায় রিক্সাই ছিল
বাসা থেকে স্কুলে যাওয়া আসার একমাত্র বাহন। এ গল্প যখনকার তখন, বি এফ
সি, কে এফ সি ইত্যাদি টাইপের কোন এফ সি এর প্রচলন ছিল
না এবং একটা বার্গার, ড্রিংস আর সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেয়ে ৫০০
টাকা ফ্লাই করা যেত না। আমার বাসা থেকে স্কুলের রিক্সা ভাড়া ছিল
৭-৮ টাকা। ছোটবেলা থেকেই চকচকে টাকা জমানোর প্রতি আগ্রহ ছিল
আমার। তাই রিক্সা ভাড়ায় টাকা আদান প্রদানের সময় যদি দৈব
ক্রমে কোনদিন আমার হাতে নতুন নোট আসত সেদিন টিফিনে আর
ভেলপুরি খাওয়া হত না।
এ রকমই এক দিনে, এক রিক্সায় যাচ্ছিলাম। রিকশাচালক ও গতানুগতিক, তবে একটু
বয়স্ক হবে, মুখে দাঁড়ি, তবে সব পাকা না। স্কুল গেটে নামার পর যথারীতি ১০
টাকার নোট বের করে দিলাম। উনি খুচরা ফেরত দেওয়ার জন্য পকেট
থেকে টাকা বের করে সাদামাটা একটা ২ টাকার নোট বের করেদিলেন।
টাকা নিতে যাবার সময় লক্ষ্য করলাম ওনার কাছে চকচকে একটা ২ টাকার
নোট। লোভ সামলাতে না পেরে বললাম ঐ টাকাটা দিতে।
" ক্যান? এই টাহায় কি হয়ছে? " একটু আঞ্চলিকতার টান।
" কিছু হয় নাই। আমি নতুন টাকা জমাই ত, তাই। দেন না প্লিজ, আপনার ত খরচই
হয়ে যাবে।"
উনি আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে টাকাটা দিল।
ক্লাসে চলে গেলাম।
এর পর স্কুল ছুটি হলে রিক্সা ঠিক করতে যাব, দেখি পেছন থেকে একজন
জোরে জোরে বেল দিচ্ছে। পেছনে তাকিয়ে দেখি একটা খালি রিক্সা।
ঠিক করে উঠে পড়লাম। বাসায় নামার সময় যখন টাকা দিতে যাব তখন মনে পড়ল
সকালে ওনার রিক্সায় স্কুলে গেছি। যাইহোক, উনি টাকা ফেরত দেওয়ার সময়
আরও একটা নতুন নোট দিলেন। আমি ত মহা খুশি। সাধারণত এ রকম ঘটনা খুব কম ঘটে।
পরের দিন ও স্কুলে যাওয়া আসা করলাম ওনার রিক্সায় এবং বলা বাহুল্য আগের
দিনের মত নতুন টকা। ব্যাপারটা আমার কাছে কাকতালীয় মনে হল। তারপরদিন
স্কুল ছুটি ছিল কি একটা কারনে। তারপর দিনও দেখি উনি এবং টাকার
কাহিনী ও এক ই। এবার কৌতূহল সামলায়ে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞেস
করলাম,
" আপনি প্রতিদিন নতুন টাকা পান কোথায়? আমার স্কুলের সময় আপনার অন্য কোন
যাত্রী থাকে না? "
প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হাসল, তার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম
অন্যকিছু। আবার জিজ্ঞেস করায় বলে,
" অন্যদিন কমুনে। "
যাইহোক, এরকম আরও কিছুদিন চলার পর আমি একদিন খুব করে ধরলাম
কাহিনী বলতেই হবে। না বললে উনার রিক্সায় আর যাবনা। এই কথা শুনে উনার
দৃষ্টি দেখি কেমন যেন উদাস হয়ে গেছে। উনি বললেন স্কুল ছুটির পরে বলবেন।
সেদিন সত্যি কথা বলতে ক্লাশ করতে পারি নাই। কয়েকজন টিচার দিল বকা।
কিছু বান্ধবী শরীর খারাপ কিনা জিজ্ঞাসা করে মুচকি মুচকি হাসা শুরু করল।
কোন কিছুই ভাল লাগছিল না।
ছুটির বেল বাজলে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। গেটে এসে দেখি উনি আছেন।
বললাম বলুন। উনি বললেন আগে উঠেন, তারপর। এর পর উনি যা বললেন তার সারমর্ম
এই,
আমার মত উনারও একটা মেয়ে ছিল। যারও কিনা টাকা জমানোর শখ ছিল। সেই
মেয়েকে গত বছর বিয়ে দিয়েছিলেন। শশুর বাড়ির গতানুগতিক
অত্যাচারে মেয়েটা আত্মহত্যা করে। আমাকে এতদিন
যে চকচকে টাকাগুলো দিতেন সে গুলো তার মেয়ের জমানো নোট। এই
বলে উনি আরও অনেকগুলো নোট বের করে দিলেন। আর আমাকে বললেন
রাখতে। আমি বললাম এমনি এমনি নেব না। এই বলে ওনাকে বললাম একটু
দাঁড়াতে। বাসায় এসে আম্মুর কাছ থেকে ৫০০ টাকা চাইলাম। আম্মা হেন তেন
জিজ্ঞাসা করে দিলেন অবশেষে। নিচে এসে দেখি উনি নাই। এরপর আর
কোনদিন উনার সাথে দেখা হয় নাই।
এরপর যখন উনার টাকা গুলো দেখি তখন নিজেকে কেন জানি খুব
অপরাধী লাগে। একজন বাবার, তার মেয়ের প্রতি ভালোবাসা আর আবেগ
আমি ৫০০ টাকায় কিনতে চেয়েছিলাম। জগতে কিছু কিছু মানুষ জন্মায়ই বোধ
হয় ভালোবাসা পাবার জন্য। আমি সেই ভাগ্যবতিদের মধ্যে একজন। এখন আমার
স্বামী সংসার আছে এবং খুব শীঘ্রই মা হব। কিন্তু সেই রিক্সা চালকের
ভালোবাসা, আজও ভুলতে পারিনি। সৃষ্টিকর্তার
কাছে দোয়া করি উনাকে সুখী রাখুক।
কৃতজ্ঞতা
অহনা
ধানমন্ডি, ঢাকা