22/02/2026
প্রযুক্তির যুগে রমজান: ইবাদত ও স্ক্রিনের মাঝে ভারসাম্যের উপায়
মূলঃ ফারিস আবু হাবিব, (ইমাম ও খতিব, আওকাফ মন্ত্রণালয়, মিশর)
অনুবাদ, তাখরীজ, ও পরিমার্জন: ড. আবু তালিব মোহাম্মদ মোনাওয়ার
রমজান হলো আধ্যাত্মিকতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস; রহমত, মাগফিরাত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার মাস। এটি একটি রব্বানি সুযোগ যা মাত্র কয়েকদিনের জন্য আমাদের কাছে আসে। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন: أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ “গণনার কয়েকটি দিন মাত্র” (সূরা বাকারা: ১৮৪)। তা সত্ত্বেও দেখা যায়, অনেক মানুষ এই মূল্যবান সুযোগটি সিনেমা, সিরিয়াল এবং আজেবাজে প্রোগ্রাম দেখে নষ্ট করে ফেলেন, যা কেবল সময়ের অপচয়ই নয়, বরং অন্তর ও মস্তিষ্ককেও কলুষিত করে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং রমজানের আধ্যাত্মিক চেতনার মধ্যে আমরা কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করব? কীভাবে নিম্নমানের মিডিয়ার ফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচাব যা আমাদের এই পবিত্র মাসটিকে চুরি করে নেয়?
প্রথমত: রমজানে নিম্নমানের সিরিয়াল ও কুরুচিপূর্ণ প্রোগ্রামের ভয়াবহতা
বর্তমান সময়ে রমজান একটি মিডিয়া মৌসুমে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রচুর পরিমাণে নাটক ও প্রোগ্রাম তৈরি করা হয়। এগুলোর অধিকাংশেরই কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই; বরং উল্টো এগুলো অনৈতিকতা ছড়ায় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে বিমুখ করে রাখে। এটি এক বিরাট ক্ষতি। প্রিয় নবী ﷺ বলেছেন:
عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم رغم أنف رجل ذكرت عنده فلم يصل علي ورغم أنف رجل دخل عليه رمضان ثم انسلخ قبل أن يغفر له ورغم أنف رجل أدرك عنده أبواه الكبر فلم يدخلاه الجنة قال عبد الرحمن وأظنه قال أو أحدهما. أخرجه الترمذي.
অর্থাৎঃ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সেই ব্যক্তির নাক ধূলিধূসরিত হোক (অর্থাৎ সে লাঞ্ছিত ও ধ্বংস হোক), যার সামনে আমার নাম নেওয়া হলো অথচ সে আমার ওপর দরুদ পড়ল না। সেই ব্যক্তির নাক ধূলিধূসরিত হোক, যার কাছে রমজান মাস এল এবং তা চলে গেল অথচ তার গুনাহ মাফ হলো না। আর সেই ব্যক্তির নাক ধূলিধূসরিত হোক, যে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে (অথবা তাদের কোনো একজনকে) পেল, অথচ তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাল না (অর্থাৎ তাদের সেবা করে সে জান্নাত নিশ্চিত করতে পারল না)।" — [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৫৪৫;]
কত মানুষ ক্ষমা না নিয়ে রমজান থেকে খালি হাতে ফিরে আসে, যেমনিভাবে তারা রমযানে প্রবেশ করেছে! কারণ তারা ইবাদতের বদলে বিনোদনে মগ্ন ছিল! নোংরামি শেখার একটি সিরিয়ালের কারণে আমরা কত তাহাজ্জুদের রাকাত, কুরআনের পাতা এবং রোনাজারির দোয়া হারিয়ে ফেলছি!
আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمِنَ النَّاسِ مَن يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
“মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য ক্রয় করে।” (সূরা লুকমান: ৬)। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেনঃ والله الذي لا إله إلا هو، إن لهو الحديث هو الغناء
সেই আল্লাহর শফথ যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, এখানে 'অসার বাক্য' বলতে গানকে বোঝানো হয়েছে।
গান যদি এই হয়, তবে সেই সিরিয়ালগুলোর অবস্থা কী হবে যা অশ্লীলতা, হারাম সম্পর্ক এবং পাপাচারকে প্রমোট করে?
দ্বিতীয়ত: প্রযুক্তি.. রমজানে এক দোধারী তলোয়ার
প্রযুক্তি নিজে কোনো মন্দ নয়; এটি যেমন ভালো কাজের মাধ্যম হতে পারে, তেমনি মন্দের দরজাও হতে পারে। নবীজি ﷺ বলেছেন:
عَنِ ابنِ عباسٍ - رضي اللهُ عنهما - قال: قال رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم: نِعمَتانِ مغبونٌ فيهما كثيرٌ من الناسِ: الصَّحَّةُ والفَّراغُ» رواه البخاري.
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "দুটি নিয়ামত এমন রয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত (অর্থাৎ তারা এগুলোর কদর করে না): একটি হলো সুস্থতা এবং অন্যটি অবসর।" — [সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৬৪১২]
এটি অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করার বিরুদ্ধে এক সতর্কতা। আমরা কীভাবে রমজানের অবসর সময় সোশ্যাল মিডিয়া বা টিভির সামনে নষ্ট করতে পারি, যেখানে এই সময়টুকু নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করা সম্ভব ছিল?
প্রযুক্তি ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন সহজ করে দিয়েছে—এক ক্লিকেই আমরা আলেমদের দরস শুনতে পারি, তাফসীর পড়তে পারি বা কুরআন শুনতে পারি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি সময় অপচয়েরও মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও সিরিয়াল দেখায় মগ্ন থাকেন, অথবা কোনো উপকার ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রল করে রাত পার করে দেন।
রমজানে প্রযুক্তি ও ইবাদতের মাঝে ভারসাম্য রক্ষার উপায়:
১. ফোন ও টিভির জন্য রুটিন করা: ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যাতে তা ইবাদতের পথে বাধা না হয়।
২. প্রযুক্তিকে ইবাদতে কাজে লাগানো: ধর্মীয় প্রোগ্রাম দেখুন, কুরআন তিলাওয়াত বা জিকিরের অ্যাপ ব্যবহার করুন।
৩. নিম্নমানের প্রোগ্রাম এড়িয়ে চলা: রমজান বিনোদনের সময় নয়, ইবাদতের সময়। সময় শেষ হওয়ার পর যারা আফসোস করবে, তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।
৪. পারিবারিক আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি: টিভির সামনে না বসে পরিবারের সবাই মিলে কুরআন তিলাওয়াত, কিয়ামুল লাইল বা রমজানের ফজিলত নিয়ে আলোচনা করুন।
৫. তর্কাতর্কি ও ফালতু পোস্ট পরিহার: সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কোনো তর্কে জড়াবেন না যা আপনার দুনিয়া বা আখিরাতের কোনো উপকারে আসবে না।
তৃতীয়ত: রমজান.. কয়েকটা দিন মাত্র, একে হারাবেন না
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রমজানকে “أَيَّامًا مَّعْدُودَاتٍ” বা নির্দিষ্ট কয়েকদিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন, অর্থাৎ এটি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাহলে আমরা কেন পাপাচার ও অশ্লীলতা ছড়ানো সিরিয়াল বা সস্তা হাসাহাসির প্রোগ্রামে এই সময় নষ্ট করব?
নবীজি ﷺ বলেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ رواه البخاري (38)، ومسلم (760).
“আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।" — [সহিহ বুখারী (৩৮) ও সহিহ মুসলিম (৭৬০)]”
আমরা কি আসলেই সঠিকভাবে রোজা রাখছি, নাকি আমাদের পেট অভুক্ত থাকলেও চোখ ও কান হারাম দিয়ে ইফতার করছে?
চতুর্থত: রমজান.. মিতাচারের মাস, বাড়াবাড়ির নয়
ইসলাম ভারসাম্যের ধর্ম। আমাদের প্রযুক্তি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে বলা হয়নি, বরং সচেতনভাবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন: وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا “এভাবেই আমি তোমাদের এক মধ্যপন্থী জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছি।” (সূরা বাকারা: ১৪৩)। রমজান যেমন আমাদের খাবারের ক্ষেত্রে সংযম শেখায়, তেমনি প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযম চর্চার এক সুযোগ।
উপসংহার: রমজান পরিবর্তনের স্টেশন.. আমরা কি তা গ্রহণ করব?
রমজান পরিবর্তনের এক সুবর্ণ সুযোগ, স্ক্রিনকে আপনার এই সুযোগটি চুরি করতে দেবেন না। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
وعن أبي هريرة، أَنَّ رسولَ اللَّهِ ﷺ قالَ: إِذا جَاءَ رَمَضَانُ، فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الجنَّةِ، وغُلِّقَت أَبْوَابُ النَّارِ، وصُفِّدتِ الشياطِينُ متفقٌ عَلَيْهِ.
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন রমজান মাস আসে, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।" — [মুত্তাফাকুন আলাইহি: বুখারী (১৮৯৯) ও মুসলিম (১০৭৯)]
জিনের শয়তানরা বন্দি হওয়ার পর আপনি কি মানুষের তৈরি শয়তানি মিডিয়ার (স্ক্রিন) কাছে বন্দি থাকবেন?
রমজানকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী হওয়ার এবং হৃদয় ও মস্তিষ্ককে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যম বানান। তাদের মতো হবেন না যারা রমজানে যেমন ঢুকেছিল তেমনই বের হয়ে গেল। বরং একে তওবা ও প্রকৃত পরিবর্তনের দ্বার হিসেবে গ্রহণ করুন।
রমজান হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ। তাই স্ক্রিন বা পর্দার মোহে এই মাসের আধ্যাত্মিকতা হারিয়ে যেতে দেওয়া আমাদের উচিত নয়। আমরা প্রযুক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে পারি, তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন আমাদের এই পবিত্র মাসের মূল লক্ষ্য—অর্থাৎ তাকওয়া অর্জন ও নেক আমল থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। আসুন, আমরা রমজানকে ইবাদত ও প্রযুক্তির মাঝে একটি প্রকৃত ভারসাম্য তৈরির সূচনা বিন্দু হিসেবে গ্রহণ করি।