25/08/2020
বহুদিন ধরেই ভাবছি লিখবো দু’জন কবির কথা। দুজনেই মহিলা। দুজনেই লিখেছেন আঞ্চলিক ভাষায়।এখনো লিখছেন।আজ লিখবো নিউইয়র্ক প্রবাসী মুক্তা মাহমুদার কথা। আঞ্চলিক ভাষায় কাব্যভাষা সৃষ্টির কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে আইরিশ কবি জে, এম সিঙের কথা। তার রচিত (১৯০৭) প্রে বয় অব দি ওয়েস্টার্ন ওয়ার্লড আয়ারল্যান্ডের আঞ্চলিক ভাষাকে দিয়েছে কাব্যভাষার মর্যাদা।মুক্তা মাহমুদা লিখেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, সিলেট (দক্ষিণাংশ) কুমিল্লার অংশ বিশেষের আঞ্চলিক ভাষায়।শব্দগুলোকে তিনি চয়ণ করেছেন তাঁর কাব্যের বিষয়বস্তুকে জীবন্ত করে তোলার জন্য।প্রেম, ভালোবাসা, নিসর্গ, আধ্যাতিকতা, প্রথম যৌবনের দিকে ফিরে তাকানো, এ সবই মূর্ত হয়েছে তিতাস পারের এই কবির ভাষার যাদুতে।বলাবাহুল্য নস্টালজিয়া তাকে তাড়িত করে, প্রবাস জীবনের প্রকৃতিও সেখানে অনুপস্থিত নয়। ফিরে দেখা তার কবিতার একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য।গ্রামের সাধারণ
মানুষের জীবনের সুখদুঃখ, হাসিকান্না, কুসংস্কার, নতুন ধানের চাল দিযে রাঁধা ভাতের সুবাস হয়ে আমাদের নান্দনিক অনুভূতিকে আপ্লুত করে।আর কথা না বাড়িয়ে এবার বইমেলায় প্রকাশিত ‘মাটির সেতার, বই থেকে একটা উদ্ধৃতি দিলেই আমার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে নেওয়া যাবে।
ফকফকা চান্নিতেও ঘরের খিলেে আইন্ধার নামে্।হোন্দা-মেন্দির বুরপারানির / দিনে ময়না পাখি কইলজ্যায় ছটীফট করে। ময়না কান্দে জনমের কান্দন।/ বাউরি বাতাসে নিমফুলের ঘেরান। তয় ক্যান মন কান্দে, ক্যান।
পুবের ভিটায় মাইঝরাতে ভূতের আসর নামে, ছম ছম করে গতর। বেফানা মন।/ লগে আমার কেউ নাই, কুন্তা নাই। এমন তো কথা ছিল না রে ময়না। এমন/ তো কথা ছিল না।
উজাই ক্ষেতে নয়া পানির ঢল। জিয়লের ঝোল আর কলাপাতার ভাত। নিশি/ রাইতে
নোলক খোয়াব। খালি তরে দেহি,,,তরে দেহি। সোনামুখী না্ইয়র, / পিতলের আয়নায় চান্দের আলো, বড়ই সোন্দর!
শাদির রাইতে সোহাগী নাকফুল চেরাগের বাত্তিতে কেমন চিকচিক করছিল, মনে / আছে ময়না। হাটবারে গঞ্জের গামছা, ছিটকাপড়ের ব্লােউজ,আর এক পুটুলি/ মুরালির দিন ক্যামতে যায় ক্যামতে যায়।
আমার লাইগ্যা তর পরান পোড়ে না ময়না। পোড়ে না।
ক্যামতে বদল অয় মন, ক্যামতে...
’তুমি কোনবা দেশে রইলা রে দয়াল চান/
তোমায় না দেখলে বাঁচে না আমার প্রাণ’
’মাটির সেতারে’ মাহমুদার ৫৮টি কবিতার মেজাজ পাঠককে নিয়ে যায় দূর বাংলার অন্তরের গহীনে। আর নতুন কিছু দ্যূতিময় শব্দ তাকে বিমোহিত করে। অবশ্য কোন কোন পাঠককে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান হাতরাতে বাধ্য করবে সেটা জানি। তবু এ কবিতাগুলো সদ্য তুলে আনা নতুন মুক্তা যা পাঠককে মুগ্ধ করবেই। মাহমুদার আরো দুটি বই আছে - তিতাস পেরুলেই বাউলঘর (স্মৃতিকথা), এবং ম্যাপল ছুঁযেছে মৌটুসী ভোর (কাব্যগ্রন্থ)।
মুক্তা মাহমুদা করোনার এপি সেন্টারে বসবাস করছে। আমরা তাঁর কল্যাণ কামনা করি।মাহমুদা আমাদের একজন প্রথম সারির কবি। একথা আমি নিদ্বির্ধায় বলি এবং বিশ্বাস করি।