G A U Islamic Society

G A U Islamic Society Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from G A U Islamic Society, Education, Gazipur Agricultural University, Dhaka.

আউস ইবনে আবূ আউস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের সকল দিনের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দিন হল জুমু'আর দিন। সে দিন আ...
09/07/2026

আউস ইবনে আবূ আউস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের সকল দিনের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দিন হল জুমু'আর দিন। সে দিন আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, সে দিনই তাঁর মৃত্যু হয়, সেদিনই শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, এবং সে দিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতএব এই দিনে তোমরা আমার উপর বেশী বেশী দরূদ পড়বে। কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়। তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কিভাবে আমাদের দরূদ আপনার কাছে পেশ করা হবে? আপনি তো মাটিতে মিশে যাবেন, অর্থাৎ তাঁরা বললেন, আপনার দেহ মাটির সাথে মিশে যাবে। তিনি বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা যমীনের জন্য নবীদের দেহ গ্রাস করা হারাম করে দিয়েছেন।
(আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, বায়হাকী সুনানে কুবরা, সহীহ ইবনে হিব্বান মুসতাদরাকে হাকিম। হাকিম হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।)

অতএব, আসুন নিজে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি এবং বন্ধু বান্ধবদের মেনশন করে তাদেরকেও দরুদ পাঠে উৎসাহিত করি।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পরিচয়-মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফি.(খতিব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ) আহলে সুন্নাত ওয়...
14/06/2026

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পরিচয়
-মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক হাফি.
(খতিব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ)

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে চারটি মূলনীতির আলোকে চেনা যায়।

প্রথম বৈশিষ্ট্য: নবী-রাসূলগণের প্রতি সম্মান
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কোনো নবী বা রাসূলের সমালোচনা করেন না। হযরত মূসা (আ.), হযরত ইউসুফ (আ.), হযরত সুলায়মান (আ.) কিংবা হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)—যেকোনো নবীর সমালোচনায় যে ব্যক্তি লিপ্ত হয়, সে আহলে সুন্নাতের মানহাজে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং সে স্পষ্ট গোমরাহিতে নিপতিত। নাউযুবিল্লাহ।

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: সাহাবায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কোনো সাহাবীর সমালোচনা করেন না। শিয়া সম্প্রদায় সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনায় লিপ্ত হওয়ার কারণে তারা এই মানহাজ থেকে বিচ্যুত। কট্টর শিয়াদের আকিদা তো এতটাই বিকৃত যে তাদের মধ্যে ঈমানের অস্তিত্বই প্রশ্নসাপেক্ষ। সাধারণ শিয়ারাও সাহাবা-বিদ্বেষমুক্ত নয়।
শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও সমাজে এমন কিছু ব্যক্তি রয়েছেন যারা হযরত মুয়াবিয়া (রা.) বা হযরত উসমান (রা.)-এর মতো মহান সাহাবীদের সমালোচনায় কুণ্ঠিত হন না। এমনকি কেউ কেউ দাবি করেন যে উহুদের যুদ্ধে তিনশত সাহাবী মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সঙ্গে চলে গিয়েছিলেন—নাউযুবিল্লাহ। যারা মুনাফিকের অনুসরণ করেছিল, তারা সাহাবী নয়; আর প্রকৃত সাহাবী তারাই, যাঁরা ঈমানের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহচর্যে ছিলেন। যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করে, সে আহলে সুন্নাতের তরিকায় নেই।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য: আইম্মায়ে কেরামের প্রতি সম্মান
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত কোনো ইমামের সমালোচনা করেন না—না ফিকহের ইমামদের, না হাদিসের ইমামদের, না আকিদার ইমামদের, না ইলমুস সুলুক ওয়াল ইহসানের ইমামদের। যে ব্যক্তি ইমাম আবুল হাসান আশআরী (রহ.), ইমাম আবু মনসুর মাতুরিদী (রহ.), ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম বা আবু দাউদ (রহ.), কিংবা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর সমালোচনায় লিপ্ত হয়—বুঝতে হবে যে সে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের তরিকায় নেই।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য: আলেম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত সামগ্রিকভাবে আলেম সমাজকে অবজ্ঞা করেন না। যে ব্যক্তি সমগ্র আলেম সমাজকে হেয় করে, তাদের জ্ঞান ও অবদানকে তুচ্ছ মনে করে—সে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আদর্শ থেকে বিচ্যুত। উদাহরণস্বরূপ, "আলেমরা তাবলীগ কী বোঝেন?"—এ জাতীয় উক্তির মাধ্যমে পুরো আলেম শ্রেণিকে অবজ্ঞা করা হয়, যা এই মানহাজের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

সারসংক্ষেপ
সংক্ষেপে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের চারটি মূল পরিচয় হলো:
১. কোনো নবী-রাসূলের সমালোচনা না করা।
২. কোনো সাহাবীর সমালোচনা না করা।
৩. কোনো ইমামের সমালোচনা না করা।
৪. সামগ্রিকভাবে আলেম সমাজকে অবজ্ঞা না করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের তরিকায় অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আবু কাতাদাহ রা. হইতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :"আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আশা করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা এর দ্বারা প...
23/05/2026

আবু কাতাদাহ রা. হইতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :
"আরাফার দিনের রোযার ব্যাপারে আমি আশা করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা এর দ্বারা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।"
- সহিহ মুসলিম:২৬১৮

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। এই মহাবিশ্বের সবকিছুই তিনি সৃষ্টি করেছেন। আমরা তাঁর সৃষ্টি পর্যবেক...
22/05/2026

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। এই মহাবিশ্বের সবকিছুই তিনি সৃষ্টি করেছেন। আমরা তাঁর সৃষ্টি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন ধরনের জিনিস বা প্রযুক্তি তৈরি করি। তাঁর সৃষ্টির ভারসাম্যই আমাদের জন্য তাঁর পরিচয় লাভের ক্ষেত্রে যথেষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরপরও তিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন কেন?

আসলে মহাবিশ্বের বাকি সবকিছু দেখে আমরা নিজেদের জন্য বিভিন্ন ধরনের উপকরণ তৈরি করি। আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিতাব নাজিল করেছেন। জিনিসটা কিছুটা এমন—প্রায় সবকিছুই তোমরা আমার সৃষ্টি দেখে করো, কিন্তু বই লেখা কিংবা সাহিত্য রচনা মানুষের নিজেদের কাজ। যেহেতু তোমরা বই লেখো, তাহলে এও নাও—আমিও কিছু কিতাব অবতীর্ণ করলাম। এখন তোমরা তোমাদের নিজেদের কিতাবের সাথে আমার কিতাবের তুলনা করো।

দিনশেষে, আসলে তাঁর পরিচয় লাভ করতে পারাই আমাদের পুরো জীবনের একমাত্র কাজ।

যদি আমরা আল-জামিল-এর পরিচয় লাভ করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন জামিলে ভরপুর হয়ে যাবে।
যদি আমরা আল-হাকিম-এর পরিচয় লাভ করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন হিকমতে পূর্ণ হয়ে যাবে।
আর যদি আমরা আর-রহমান-কে চিনতে পারি, তাহলে দুনিয়াটাও রহমতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।

কুরআন হচ্ছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে আসা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও শক্তিশালী তত্ত্ব—কেন? ঐ দিন রবের সামনে দাঁড়ানোর জন্য।

কুরআন থেকে আমরা আমাদের জীবন সংশোধন করছি, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলছি—কীসের জন্য? হ্যাঁ, ঐ দিনের জন্য।

এখন বলো, তাহলে কুরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে তার প্র্যাকটিক্যাল অনুশীলন কোনটা?

হ্যাঁ, নামাজ হলো রবের সাথে সাক্ষাতের জন্য বাস্তব ব্যবহারিক অনুশীলন। আর হয়তো এজন্যই নামাজে আমরা শুধু কুরআন তিলাওয়াত করি বা পাঠ করি।

মানবজাতির জন্য সবচেয়ে significant day হচ্ছে তার রবের সাথে সাক্ষাতের দিন। আমরা দুনিয়াতে কত ধরনের ভাইভা ফেস করি, আর তার জন্য কত ধরনের প্রস্তুতি, পড়াশোনা, সাজগোজ—কত কিছুই না করি। কিন্তু আমাদের রবের সামনে দাঁড়ানোর সময় আমাদেরকেও সেদিনের ভাইভা ফেস করতে হবে রবের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে (নামাজেও আমরা হয়তো এজন্যই দাঁড়িয়ে থাকি)।

পোশাকহীন, অনাবৃত অবস্থায় আমাদেরকে তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে। (নামাজে আমাদের সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরে তাঁর সামনে দাঁড়ানো উচিত। কারণ সেদিন তুমি তাঁর সামনে দাঁড়ানোর জন্য কোনো পোশাক পাবে না পরিধান করার জন্য।)

সেদিন রবের সামনে আমাদের একাকী দাঁড়াতে হবে। দুনিয়াতে এজন্যই জামায়াতে বা দলবদ্ধ হয়ে একসাথে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। কারণ সেদিন রবের সামনে দাঁড়ানোর সময় তুমি তোমার আশেপাশে কাউকে খুঁজে পাবে না তোমাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য।

যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, সেদিন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক, আস্তিক, সেকুলার, পপুলার, আনপপুলার—সবাই দৌড়ে দৌড়ে ছুটে যাবে তাদের রবের সামনে উপস্থিত হবে।

আর আজ আজান হয়, অথচ সকল মুসলমানরাই সে ডাকে মসজিদে আসে না। না দৌড়ে আসে, না ধীরে আসে—তারা আজান শুনেও কোনো সাড়া দেয় না। কিন্তু সেদিন সবাই সাড়া দেবে।

মুসলিম মেয়েরা মূলত হিন্দুদের কালচার নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে সেখানে নাচ-গান করা যায়, স্বাধীনভাবে সাজা যায় কোন লোক-লজ্জার ভ...
10/05/2026

মুসলিম মেয়েরা মূলত হিন্দুদের কালচার নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে সেখানে নাচ-গান করা যায়, স্বাধীনভাবে সাজা যায় কোন লোক-লজ্জার ভয় নেই। ইউনিভার্সিটিতে এগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বন্ধুত্বের নাম দিয়ে ফ্রি-মিক্সিং অহরহ। সেখান থেকেই ভাগওয়া ট্র্যাপে জড়িয়ে পড়ে।

©lkhlas-ইখলাস

*উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা: এক মহান মর্যাদা, বিশাল ফযীলত, সুদৃঢ় জ্ঞান ও চিরস্থায়ী প্রভাব**কলমে: ড. আলী ...
05/05/2026

*উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা: এক মহান মর্যাদা, বিশাল ফযীলত, সুদৃঢ় জ্ঞান ও চিরস্থায়ী প্রভাব*

*কলমে: ড. আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবী*

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয়তমা ও স্ত্রী, তাঁর খলীফা আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কন্যা, উম্মুল মুমিনীন, উম্মতের নারীদের মধ্যে সর্বাধিক ফকীহ, বিদুষী, সুস্পষ্টভাষী, দাওয়াতের অধিপতি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দৈনন্দিন জীবনের সজাগ পর্যবেক্ষক, নববী ইলমের সচেতন শ্রোতা, নবুওয়তের মাদরাসার প্রথম মেধাবী ছাত্রী। দ্রুত মুখস্থ করা, সুন্দরভাবে বোঝা এবং নিজেকে চমৎকারভাবে প্রকাশ করার সহজাত যোগ্যতা তাকে সাহায্য করেছে। এগুলোই তাকে যোগ্যতার সাথে এক বৈজ্ঞানিক কর্মচাঞ্চল্যে ভরপুর জীবন যাপনের উপযুক্ত করেছে, দ্বীন ও উম্মাহর খেদমতে কাজ করার জন্য। ফলে তিনি তাঁর সন্তান মুসলিমদের জন্য রেখে গেছেন শরীয়তের উৎসগুলো নিয়ে চিন্তার পদ্ধতি, ফতোয়া প্রণয়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণভাবে নসের সাথে আচরণের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার।

*তাঁর নাম, বংশ ও উপনাম:*
তাঁর যে নামে পরিচিত ছিলেন তা হলো আয়েশা, উপাধি সিদ্দীকা। তাঁকে উম্মুল মুমিনীন বলে সম্বোধন করা হতো এবং উম্মে আব্দুল্লাহ উপনামে ডাকা হতো। কখনো তাঁকে হুমাইরা, মুবাররাআ, তাইয়িবা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয়তমা উপাধি দেওয়া হতো। তিনি আবু বকর সিদ্দীক, উসমান ইবনে আবু কুহাফা ইবনে আমির ইবনে আমর ইবনে কা'ব ইবনে সা'দ ইবনে তাইম ইবনে মুররা ইবনে কা'ব ইবনে লুআই ইবনে ফিহর ইবনে মালিক-এর কন্যা। তাঁর বংশ সপ্তম পূর্বপুরুষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বংশের সাথে মিলিত হয় এবং মায়ের দিক থেকে একাদশ বা দ্বাদশ পূর্বপুরুষে।

*তাঁর গুণাবলী ও ফযীলত*
*চারিত্রিক গুণাবলী:* আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর মধ্যে সর্বোত্তম সুন্দর গুণাবলী একত্রিত হয়েছিল। তাঁর যে গুণগুলো সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছিল তার মধ্যে সত্যবাদিতা ও বুদ্ধিমত্তা অন্যতম। তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে এই দুটি দুর্লভ গুণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। তিনি হাদীস সমালোচনায় স্বাধীন ছিলেন এবং যেভাবে এসেছে সেভাবেই তা বর্ণনা করতে যত্নবান ছিলেন, কোনো পরিবর্তন বা কমতি ছাড়াই। এরপরও তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, উপস্থিত-বুদ্ধিসম্পন্ন, মিষ্টভাষী, প্রজ্ঞা ও রসবোধে অনন্য। পাশাপাশি তাঁকে ফিকহী বোধ ও শরয়ী ইস্তিনবাতের বিশাল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও যুহদ ও তাকওয়া—তিনি অল্পে তুষ্ট জীবন যাপন করেছেন, জীবনের সংকীর্ণতা আস্বাদন করেছেন কিন্তু সন্তুষ্টি ও সুখ তাঁকে ছুঁয়ে থাকত। তিনি এমনভাবে দান করতেন যেন দারিদ্র্যের ভয় করেন না, মালিক ও মর্যাদাবান ব্যক্তির মতো উদারতা দেখাতেন। তিনি গরীব-মিসকীনদের জন্য খরচ করতেন, বিধবা ও এতিমদের দেখাশোনা করতেন। এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, স্বার্থত্যাগী, দানশীল, অতিথিপরায়ণ। তিনি ছিলেন উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী, দীপ্ত ললাট, তারুণ্যদীপ্ত, তাকওয়াবান, ইবাদতগুজার, বিনয়ী, সাহাবীদের সম্মান করতেন ও তাঁদের মর্যাদা রক্ষা করতেন। তিনি সৎ কাজের আদেশ দিতেন ও অসৎ কাজে নিষেধ করতেন।

*তাঁর হৃদয়ের কোমলতা:*
তিনি (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন কোমল হৃদয়ের, বিনয়ী, অনুগত। তিনি নিজের জন্য কোনো ফযীলত দেখতেন না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নৈকট্যের উপর ভরসা করতেন না। তাঁর পিতার মতো তাঁর মধ্যেও এই বিনয়ী স্বভাব দেখা গেছে। এই অনুগত বিনয়ের প্রমাণস্বরূপ বহু বর্ণনা রয়েছে, অবস্থা ও কথায়। তাঁর থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন: "হায়, আমি যদি এই গাছের একটি পাতা হতাম!"

*তাঁর লজ্জাশীলতা:*
তিনি (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন অত্যন্ত লজ্জাশীল। এর প্রমাণে তিনি নিজের সম্পর্কে যা বলেছেন: তিনি বলেন, "আমি আমার সেই ঘরে প্রবেশ করতাম যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আমার পিতাকে দাফন করা হয়েছে, আর বলতাম তিনি তো আমার স্বামী এবং ইনি আমার পিতা। কিন্তু যখন উমরকে তাঁদের সাথে দাফন করা হলো, আল্লাহর কসম, উমরের লজ্জায় আমি কাপড় ভালো করে জড়িয়ে না নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করিনি।"

*তাঁর জিহাদ ও সাহসিকতা:*
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন বিরল সাহসের অধিকারী। তিনি রাতে বাকীতে যেতেন, কোনো ভয় বা দ্বিধা তাঁকে আটকাত না। তিনি যুদ্ধের ময়দানে অবতরণ করতেন, মুসলিমদের সাথে মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নিতেন এবং তাঁদের সেবা করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তিনি বলেন: "খন্দকের দিন আমি বের হয়ে মানুষের পদচিহ্ন অনুসরণ করছিলাম, তখন আমার পেছনে মাটির শব্দ শুনতে পেলাম।"

*তাঁর ইলমী মর্যাদা:*
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এক উচ্চ ইলমী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, যা তাঁকে তাঁর যুগের একজন আলেমা এবং মৌলিক ইলমী নির্ভরস্থলে পরিণত করেছিল। কুরআন, হাদীস ও ফিকহের কোনো বিষয় তাঁদের কাছে অস্পষ্ট হলে বা জটিল মনে হলে তাঁর কাছে ফিরে আসতেন, এবং তাঁদের সকল প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক উত্তর পেতেন।
আবু মূসা আশআরী রা তাঁর ইলম সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেন: "আমাদের কাছে কোনো হাদীস অস্পষ্ট হতো না, আমরা আয়েশাকে জিজ্ঞেস করলে তাঁর কাছে সে সম্পর্কে ইলম পেতাম।" ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন: "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে, বরং নারীদের মধ্যে مطلقًا, আমি তাঁর চেয়ে বেশি জ্ঞানী কোনো নারীকে জানি না।"

কিছু কারণ সাইয়্যিদাকে এই উচ্চ ইলমী মর্যাদায় পৌঁছাতে সক্ষম করেছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো: তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা, শক্তিশালী স্মৃতি ও মুখস্থশক্তি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে অল্প বয়সে বিবাহ, তাঁর তত্ত্বাবধান ও লালন-পালনে জীবনযাপন, তাঁর দিকনির্দেশনা ও শিক্ষা। এছাড়াও তাঁর কক্ষে প্রচুর ওহী নাযিল হয়েছে, এমনকি একে ওহী নাযিলের স্থান বলা হতো। তাঁর প্রশ্নপ্রবণ জিহ্বাও একটি কারণ—তিনি কোনো কিছু শুনে অস্পষ্ট মনে হলে বা কোনো বিষয় না জানলে জিজ্ঞেস না করে থাকতেন না। নবীকে তাঁর প্রশ্ন, পর্যালোচনা ও কিছু শরয়ী বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাওয়া থেকে উম্মত অনেক উপকৃত হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য সাইয়্যিদাকে বহু উত্তম হাদীস বর্ণনায় অনন্য করে তুলেছে, যা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম-এর কাছ থেকে তিনি ছাড়া আর কেউ শোনেনি। তিনি রাদিয়াল্লাহু আনহা একটি সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, যার রূপ হলো: কিতাব ও সুন্নাহতে যা এসেছে তা দিয়ে বিষয়গুলো প্রামাণ্য করা। তিনি ইলম ছাড়া কথা বলা থেকে বিরত থাকতেন, দলীলগুলো একত্র করা, শরীয়তের উদ্দেশ্য ও আরবি ভাষার জ্ঞানের উপর নির্ভর করতেন। ফলে তাঁর মধ্যে বর্ণনা মুখস্থ করার সাথে সাথে তাতে সুন্দর ফিকহ ও ইজতিহাদ একত্রিত হয়েছিল। তিনি মতবিরোধের শিষ্টাচার জানতেন—কীভাবে জানবেন না, যখন তিনি এই উম্মতের নবী ও শিক্ষক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে শিক্ষা পেয়েছেন। শিক্ষাদানে তাঁর একটি মজবুত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিল, তিনি কথা ধীরে বলতেন যাতে সহজে আয়ত্ত করা যায়, দ্রুত কথা বলা ব্যক্তির উপর আপত্তি করতেন। তিনি শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না, বরং কখনো ব্যবহারিক শিক্ষার আশ্রয় নিতেন, যেমন ওযু ও গোসলের পদ্ধতি দেখিয়ে দেওয়া। তাঁর লজ্জা মানুষকে দ্বীনের বিষয় শেখানো থেকে বিরত রাখত না, এমনকি তাদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়েও। তিনি বিশুদ্ধ উৎস থেকে আকীদা গ্রহণের সর্বাধিক সুযোগ পেয়েছিলেন, তদুপরি তিনি একটি মুসলিম ঘরে লালিত-পালিত হয়েছেন, তাঁর আকীদায় শিরক বা জাহেলিয়াতের কোনো বিভ্রান্তি মিশেনি।

*কুরআন ও তার ইলমে তাঁর জ্ঞান:*
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর যুগের বড় মুফাসসিরদের একজন। এতে তাঁকে সাহায্য করেছে শৈশব থেকেই কুরআন কারীম শোনা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে বিবাহ ও তাঁর সান্নিধ্যে জীবনযাপন। ফলে তিনি প্রচুর কুরআন নাযিলের সময় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য লাভ করেছেন, তিনি ওহী নাযিলের স্থানে নয় বছর কাটিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর উপর তাঁর স্ত্রীদের কারো লিহাফে থাকা অবস্থায় ওহী নাযিল হতো না, একমাত্র তিনি ছাড়া। তিনি রাদিয়াল্লাহু আনহা শুধু মুখস্থ করেই ক্ষান্ত হতেন না, বরং কোনো কিছু অস্পষ্ট মনে হলে রাসূলের কাছে তা পেশ করতে দ্বিধা করতেন না, যাতে কুরআনের আয়াতের অর্থ ও আল্লাহর উদ্দেশ্য জানতে পারেন। এটাই তাঁকে কুরআন কারীম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান দিয়েছে—এর নাযিলের কারণ, বিষয়বস্তু ও মাসআলাসমূহ। কিছু আয়াত তাঁর কারণেই নাযিল হয়েছে, তিনি তাফসীর করতেন ও ইজতিহাদ করতেন।

*সুন্নাতে নববীতে তাঁর জ্ঞান:*
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সুন্নাতে নববী বর্ণনা ও প্রামাণ্যকরণে বড় ভূমিকা পালন করেছেন এবং এই ক্ষেত্রে তিনি অগ্রদূত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নৈকট্যের কারণে—তিনি ছিলেন এমন স্ত্রী যিনি তাঁর সাথে গভীরভাবে লেগে থাকতেন, অন্যদের যা শোনার সুযোগ হতো না তা তাঁর কাছ থেকে শুনতেন, তাঁর যে অবস্থা অন্যরা দেখত না তা দেখতেন, তাঁর কাছ থেকে বুঝতেন এবং যা অস্পষ্ট মনে হতো তা জিজ্ঞেস করতেন। এ কারণে সুন্নাতে নববীর পবিত্র বর্ণনায় তাঁর বর্ণনা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়েছে, কারণ তা ছিল রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে সরাসরি শোনা ও নৈকট্যের ভিত্তিতে, এবং নবুওয়তের ঘরে লালিত-পালিত হওয়া ও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকনির্দেশনার অধীনে বেড়ে ওঠার কারণে।
রাসূলুল্লাহ থেকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ২২১০টি, এর মধ্যে ১৭৪টি বুখারী ও মুসলিম উভয়ে একমত। বুখারী এককভাবে ৫৪টি, মুসলিম ৬৯টি বর্ণনা করেছেন, বাকিগুলো সহীহ, সুনান, মু'জাম ও মুসনাদ গ্রন্থসমূহে রয়েছে। ইবনে হাযম তাঁকে অধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে চতুর্থ স্থানে গণ্য করেছেন। ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন: "আবু হুরায়রা ছাড়া কোনো নারী বা পুরুষ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাঁর রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর পরিমাণ হাদীস বর্ণনা করেননি।"

*ফিকহ ও ফতোয়ায় তাঁর জ্ঞান:*
তিনি রাদিয়াল্লাহু আনহা সত্যিই উম্মতের নারীদের মধ্যে সর্বাধিক ফকীহ ও জ্ঞানী, বরং সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক ফকীহ ও জ্ঞানীদের অন্যতম। আতা রহিমাহুল্লাহ বলেন: "আয়েশা ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ফকীহ, সর্বাধিক জ্ঞানী এবং জনসাধারণের বিষয়ে সর্বোত্তম মতের অধিকারী।" ফতোয়া ও ফিকহের ক্ষেত্রে তাঁর জ্ঞানের প্রমাণ হলো, বড় বড় সাহাবীগণ দ্বীনের কোনো বিষয় জটিল মনে হলে তাঁর কাছে ফতোয়া চাইতেন, এবং তাঁর কাছে তার ইলম পেতেন। মাসরুক রহিমাহুল্লাহ বলেন: "আমি রাসূলুল্লাহর বড় বড় সাহাবীগণকে দেখেছি তাঁকে ফারায়েয সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন।" তিনি রাদিয়াল্লাহু আনহা শুধু নস বর্ণনা, তার ফিকহ ও তা দিয়ে ফতোয়া দেওয়াতেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন ফিকহী প্রতিভার অধিকারী, যার মাধ্যমে তিনি কিতাব ও সুন্নাহ থেকে শরয়ী হুকুম ইস্তিনবাত করতে পারতেন। তাঁর কাছে শরীয়তের রহস্য, হিকমত ও কল্যাণ সম্পর্কে জ্ঞান ছিল। তিনি নসের বাহ্যিক অর্থে থেমে থাকতেন না।

*বিভিন্ন ইলমে তাঁর ব্যাপক জ্ঞান:*
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইতিহাস, আরবদের দিনগুলি ও রাসূলের সীরাত সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তিনি চার খলীফার যুগ পেয়েছেন। তাঁর থেকে এমন বর্ণনা এসেছে যেখানে তিনি জাহেলী যুগের লোকদের অবস্থা, তাদের রীতিনীতি, সামাজিক খবর, আচার-অনুষ্ঠান, ইবাদত ও যুদ্ধ সম্পর্কে পরিচয় দেন। তদুপরি তিনি ছিলেন উচ্চ স্তরের বাগ্মিতা ও অলঙ্কারশাস্ত্রে পারদর্শী, কবিতা জানতেন। মূসা ইবনে তালহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমি আয়েশার চেয়ে বেশি স্পষ্টভাষী কাউকে দেখিনি।" তাঁর বাগ্মিতা ও অলঙ্কারের মধ্যে এটাও ছিল যে, যখন তাঁকে উত্তেজিত করা হতো তখন তাঁর কথা উচ্চ ও গাম্ভীর্যপূর্ণ হয়ে উঠত, যেন তা তাঁর মৌলিক সংস্কৃতি ও প্রচুর জ্ঞান থেকে উৎসারিত হতো। তিনি কবিতা মুখস্থ রাখতেন, ভালো কবিতা গ্রহণ করতেন ও বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাছ থেকে তা শুনে খুশি হতেন এবং আরও শুনতে চাইতেন। কবিতার প্রতিভা তাঁর মধ্যে বংশগত ছিল, তাঁর পিতা কবিতা মুখস্থ রাখতেন ও তার ছন্দ সংশোধন করতেন। তিনি মানুষকে তাদের সন্তানদের কবিতা শেখানোর ওসিয়ত করতেন, যাতে তাদের জিহ্বা সুমিষ্ট হয়। তাঁর উপর কোনো বিষয় আসলেই তিনি সে বিষয়ে কবিতা আবৃত্তি করতেন।

*তাঁর ওফাত:*
তাঁর ওফাত হয় মঙ্গলবার রাতে, ১৭ রমজান ৫৭ হিজরী, কারো মতে ৫৮ হিজরী, কারো মতে ৫৯ হিজরী। আবু হুরায়রা বিতরের সালাতের পর তাঁর জানাযা পড়ান। তাঁর কবরে অবতরণ করেন আব্দুল্লাহ ও উরওয়া ইবনে যুবাইর ইবনে আওয়াম—তাঁর বোন আসমা বিনতে আবু বকরের পুত্রদ্বয়—এবং কাসিম ও আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর, এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর। তাঁকে বাকীতে দাফন করা হয়।

#সাহাবীদের_জীবনী
#আয়েশা_রা.
#উম্মুল_মুমিনীন

হযরত আবু বকর রা. শেষ পর্ব হিজরতের পর সকল যুদ্ধ অভিযানেই আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। কোনো একটি অভিযা...
01/05/2026

হযরত আবু বকর রা.
শেষ পর্ব

হিজরতের পর সকল যুদ্ধ অভিযানেই আবু বকর (রা.) রাসূল (সা.)-এর সাথে অংশগ্রহণ করেন। কোনো একটি অভিযানেও অংশগ্রহণ থেকে তিনি বিরত থাকেননি। তাবুক অভিযানে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাধারী। এই অভিযানের সময় রাসূল (সা.)-এর আবেদনে সাড়া দিয়ে বাড়িতে যা কিছু অর্থ-সম্পদ ছিল সবই তিনি আল্লাহর রাসূলের হাতে তুলে দেন। রাসূল (সা.) তখন জিজ্ঞেস করেন, "বাচ্চাকাচ্চাদের জন্য বাড়িতে কী রেখে এসেছো আবু বকর?" জবাবে আবু বকর (রা.) বলেন, "তাদের জন্য আল্লাহ আর আল্লাহর রাসূলই যথেষ্ট।" যদিও হযরত আবু বকর (রা.)-এর আনিত সম্পদের তুলনায় অন্য আরো অনেক সাহাবীর প্রদত্ত সম্পদের পরিমাণ বেশি ছিল, তথাপি রাসূল (সা.) আবু বকরের দেয়া এই সম্পদ সবার উপরে রাখেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য এই সর্বস্ব উজাড় করে দেয়া মানুষটিকে সম্মানিত করেন।
মদিনায় হিজরতের ১৩ বছর পর ইহলোক ত্যাগ করেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর ওফাতের সংবাদ শুনে সাহাবীরা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে পড়েন। তারা চিন্তাই করতে পারছিলেন না রাসূল (সা.) এভাবে তাদেরকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন। এমনকি লৌহমানব ওমর (রা.) কোষমুক্ত তলোয়ার হাতে নিয়ে ঘোষণা করেন, "যে বলবে রাসূল মারা গিয়েছে, আমি ওমর তাকে হত্যা করে ফেলবো।" এমনি এক হৃদয় বিদারক পরিবেশে একমাত্র আবু বকর (রা.) ছিলেন দৃঢ় ও অবিচল। সমবেত জনতাকে লক্ষ্য করে আবু বকর ঘোষণা করেন, "যারা মুহাম্মদের ইবাদত করতে তারা জেনে রাখো মুহাম্মদ মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ইবাদত করো তারা জেনে রাখো আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই।" অতঃপর তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৪৪ নম্বর আয়াতটি পাঠ করেন, যেখানে বলা হয়েছে: "মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর আগে বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছে। তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তাহলে কি তোমরা পেছনে ফিরে যাবে? যারা পেছনে ফিরে যাবে তারা আল্লাহর কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শীঘ্রই আল্লাহ তাদেরকে প্রতিদান দেবেন।" আবু বকর (রা.)-এর মুখে এই আয়াতটি শোনার সাথে সাথে লোকেরা যেন তাদের সম্বিত ফিরে পায়। হযরত ওমরও মেনে নিলেন আল্লাহর নবী মারা গিয়েছেন, তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। অতঃপর এই অসহ্য ব্যথা-বেদনাকে মেনে নিয়ে তারা রাসূল (সা.)-এর কাফন দাফনে মনোনিবেশ করলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের সাথে সাথে প্রথম যে মারাত্মক সমস্যাটি দেখা দেয়, আবু বকরের দৃঢ় হস্তক্ষেপে তার পরিসমাপ্তি ঘটে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাফন দাফন তখনো সম্পন্ন হয়নি। এরই মধ্যে ঘটে আরেক বিপত্তি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন—এই বিষয়টি তখন জটিল আকার ধারণ করে। মদিনার জনগণ বিশেষত আনসার সাহাবীরা সাকিফাহ বনী সায়েদাহ নামক একটি স্থানে সমবেত হন। আনসাররা দাবি করেন, যেহেতু আমরা রাসূল (সা.)-কে আশ্রয় দিয়েছি, নিজেদের জান-মালের বিনিময়ে দুর্বল ইসলামকে সবল ও শক্তিশালী করেছি, আমাদের মধ্য থেকেই কাউকে রাসূলুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। মক্কা থেকে আগত মুহাজির সাহাবীরা এই দাবি মেনে নিলেন না। তারা বললেন, "ইসলামের বীজ আমরাই বপন করেছি এবং আমরাই তাতে পানি সিঞ্চন করেছি। সুতরাং আমরাই খেলাফতের অধিকতর হকদার।" এ অবস্থায় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিল। আবু বকর (রা.) তখন রাসূল (সা.)-এর পবিত্র মরদেহের পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। এই অবস্থা থেকে তাঁকে ডেকে বৈঠকে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে ধীরস্থিরভাবে কথা বললেন। তিনি যুক্তি তুলে ধরলেন কেন মুহাজির সাহাবী বিশেষ করে কুরাইশদের মধ্য থেকে কাউকে খলিফা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। আবু বকর (রা.) এতটাই যুক্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি তুলে ধরলেন যে আনসার সাহাবীরা আর এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত পোষণ করতে পারলেন না। এভাবে রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর দ্বিতীয় যে সমস্যাটি দেখা দেয় তারও সুন্দর সমাধান দেন হযরত আবু বকর (রা.)।
অতঃপর আবু বকর (রা.) এক হাতে ওমর (রা.)-এর হাত এবং অন্য হাতে আবু ওবায়দার হাত ধরে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, "এই দুজনের মধ্যে যে কাউকে তোমরা খলিফা হিসেবে নির্বাচন করতে পারো। তারা রাসূলুল্লাহর যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেন।" কিন্তু হযরত ওমর (রা.) নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাল্টা প্রস্তাব করলেন, "আবু বকরই হতে পারেন রাসূলুল্লাহর(সা.) একমাত্র স্থলাভিষিক্ত। রাসূলুল্লাহর(সা) অনুপস্থিতিতে তিনি আমাদের নামাজে ইমামতি করতেন।" অতঃপর বৈঠকে উপস্থিত আনসার মুহাজির নির্বিশেষে সকল সাহাবীরাই আবু বকর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে মেনে নিলেন এবং তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণ করলেন। মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরিতে প্রথম ইসলামী হজ আদায় উপলক্ষে রাসূল (সা.) আবু বকর (রা.)-কে আমিরুল হজ নিয়োগ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ রাসূল (সা.)-এর অনুপস্থিতিতে আবু বকর (রা.) ছিলেন সেই হজের আমির। রাসূল (সা.) যখন অন্তিম শয্যায় তখন সাহাবীদের মধ্যে এ ব্যাপারে ইতস্তত ভাব দেখা যায় যে রাসূল (সা.)-এর অনুপস্থিতিতে এখন মসজিদে নববীতে নামাজের ইমামতি কে করবে। তখন রাসূল (সা.) বার্তা পাঠান, "আবু বকর ইমামতি করবে।" এই ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়ে যায় রাসূলের অনুপস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেবেন আবু বকর (রা.)। ওমর (রা.) এই বিষয়গুলো তুলে ধরলে উপস্থিত সাহাবীদের সকলেই নিঃসংকোচে আবু বকর (রা.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আবু বকর (রা.)-কে 'খলিফাতু রাসূলিল্লাহ' অর্থাৎ 'রাসূলুল্লাহর খলিফা' উপাধি দেয়া হয়। একমাত্র তাঁকেই এই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তী খলিফাদের উপাধি ছিল 'আমিরুল মুমিনীন'।
খলিফার দায়িত্ব নেয়ার পর সাকিফ বনী সায়েদায় সমবেত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে আবু বকর (রা.) একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন: "আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই আমাকে খলিফা বানানো হয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি চাচ্ছিলাম আপনাদের মধ্য থেকে অন্য কেউ এই দায়িত্ব গ্রহণ করুক। আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনারা যদি চান আমার আচার-আচরণ রাসূলুল্লাহর আচরণের মতো হবে তাহলে আমাকে সেই পর্যায়ে পৌঁছার ব্যাপারে অক্ষম মনে করবেন। তিনি ছিলেন নবী, ভুল-ত্রুটি থেকে তিনি পবিত্র ছিলেন। তাঁর মতো আমার কোনো বিশেষ মর্যাদা নেই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আপনাদের কোনো একজন সাধারণ ব্যক্তি থেকেও উত্তম হওয়ার দাবি আমি করতে পারি না। আপনারা যদি দেখেন আমি সঠিক কাজ করছি আমাকে সহায়তা করবেন। যদি দেখেন আমি বিপদগামী হচ্ছি আমাকে অবশ্যই সতর্ক করবেন।" হযরত আবু বকরের সেই সংক্ষিপ্ত ভাষণটি চিরকাল বিশ্বের সকল রাষ্ট্রনায়কদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। যেখানে একজন শাসক বলছেন, "আমি তোমাদের চেয়ে উত্তম নই। আমি যদি কোনো ভুল করি তাহলে চুপ থাকবে না, আমার ভুল ধরিয়ে দেবে।" কী অবিশ্বাস্য!
হযরত আবু বকর (রা.)-কে আমরা একজন দয়ালু, কোমল প্রকৃতির এবং নরম স্বভাবের মানুষ হিসেবেই জানি। কিন্তু এটা ছিল আবু বকর (রা.)-এর চরিত্রের একটি দিক মাত্র। এই কোমলতার বিপরীতে প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি দৃঢ়তা প্রদর্শনে এমনকি কখনো কখনো কঠোরতা প্রদর্শনেও পিছপা হতেন না। এমনও হয়েছে যে লৌহমানব ওমর (রা.) মাঝেমধ্যে আবু বকরের দৃঢ়তার সামনে নিজেকে নিতান্ত বাচ্চা মনে করতেন। বাস্তবে আবু বকর (রা.) কতটা দৃঢ়চেতা ছিলেন, কতটা আত্মবিশ্বাসী আর অন্যায়কারীদের প্রতি তিনি কতটা কঠোর ছিলেন তা পরিষ্কার হতে শুরু করে যখন তিনি মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পর থেকে।
তাঁর সর্বপ্রথম দৃঢ়তা ও অনমনীয়তার ঘটনাটি প্রকাশ পায় ওসামার বাহিনীকে কেন্দ্র করে। বিষয়টি উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে কিছুকাল পেছনে ফিরে যেতে হবে যখন রাসূল (সা.) জীবিত ছিলেন। আল্লাহর নবী ওফাত গ্রহণের কিছুদিন আগে সিরিয়ার মুতায় একটি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ইতিপূর্বে মুতার যুদ্ধে জায়েদ বিন হারিসা, জাফর ইবনে আবু তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.)-এর মতো প্রখ্যাত সাহাবীরা শহীদ হয়েছিলেন। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা সুসংহত হওয়ার পর আল্লাহর নবী তাঁর প্রিয় এই সাহাবীদের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। তিনি এই বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করেন মুতার যুদ্ধের প্রথম কমান্ডার জায়েদ বিন হারিসার পুত্র ওসামা ইবনে জায়েদকে। ওসামাকে ডেকে তিনি বলেন, "ছুটে যাও সেই রণাঙ্গনে যেখানে তোমার বাবা শহীদ হয়েছিলেন।" অতঃপর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশে ওসামা তাঁর বাহিনীসহ সিরিয়ার দিকে রওনা হলেন। তারা মদিনা থেকে বের হতে না হতেই রাসূল (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারা মদিনার উপকণ্ঠে শিবির স্থাপন করে রাসূল (সা.)-এর রোগমুক্তির জন্য প্রতীক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু এই রোগেই রাসূল (সা.) ইন্তেকাল করেন এবং তারা তখন মদিনায় ফিরে আসেন।
অতঃপর আবু বকর (রা.) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এদিকে রাসূল (সা.)-এর ওফাতের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আরব উপদ্বীপে বিভিন্ন দিকে নানা অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। কেউ ইসলাম ত্যাগ করে, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার কেউ নিজেকে নবী হিসেবে দাবি করে বসে। এমনি এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অনেকে পরামর্শ দিলেন ওসামার বাহিনীকে সিরিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি যেন স্থগিত করা হয়। কিন্তু আবু বকর (রা.) এই পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করলেন। রাসূল (সা.)-এর জীবনের শেষ যুদ্ধ অভিযানের নির্দেশ তিনি সহজে গুটিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন আনসারদের একটি দল দাবি করলেন, তাহলে অন্তত ওসামাকে যেন কমান্ডারের পদ থেকে সরিয়ে অন্য কোনো অভিজ্ঞ ও বিশিষ্ট সাহাবীকে কমান্ডার নিয়োগ করা হয়। উল্লেখ্য যে তখন ওসামার বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। আনসার সাহাবীরা বিষয়টি খলিফার সামনে উপস্থাপন করতে সংকোচ বোধ করছিলেন। তাদের অনুরোধে হযরত ওমর (রা.) বিষয়টি খলিফার সামনে উত্থাপন করেন। তাদের এই প্রস্তাব শুনে আবু বকর (রা.) রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, "রাসূলুল্লাহ যাকে নিয়োগ করেছেন আবু বকর তাকে অপসারণ করবে?" কোনো কোনো বর্ণনাতে বলা হয়েছে এ সময় আবু বকর (রা.) হযরত ওমরের দাড়ি চেপে ধরেছিলেন। এই ঘটনার পর আর কেউ এ ব্যাপারে প্রশ্ন তোলার সাহস করেনি।

এই ঘটনার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। প্রথমত, আবু বকর (রা.) অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও রাসূল (সা.)-এর শেষ যুদ্ধ যাত্রার নির্দেশ বাস্তবায়ন থেকে সরে আসেননি। সামরিক বা রাজনৈতিক বিবেচনায় এই যুদ্ধটি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তথাপি রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর ইচ্ছার প্রতি সমর্পণের একটি চরম নিদর্শন ছিল এই যুদ্ধ যাত্রা। কেননা আরবের অভ্যন্তরীণ অবস্থাই ছিল তখন অত্যন্ত টলমলে। চারদিকে বিদ্রোহের দাবানল। তথাপি আবু বকর (রা.) যুদ্ধ যাত্রার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেননি মূলত রাসূল (সা.)-এর শেষ ইচ্ছার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন প্রকাশ করার জন্য।
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ওই যুদ্ধের কমান্ডার ওসামা (রা.)-কে নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তাও একদিক থেকে দেখতে গেলে যৌক্তিক ছিল। কেননা ওসামার বয়স অনেক কম ছিল আর তিনি বিশিষ্ট কেউ ছিলেন না। আবু বকর (রা.) জানতেন এটা আরবদের চিরাচরিত অভ্যাস যে তারা বিশিষ্ট ব্যক্তির নেতৃত্ব মানে আর বিশিষ্ট জন ছাড়া কারো নেতৃত্ব সহজে মানতে চায় না। ইসলাম এসে আরবদের এই রীতি ভেঙে দিয়েছে। জায়েদের মতো ব্যক্তি যিনি এক সময় রাসূল (সা.)-এর ক্রীতদাস ছিলেন, সেই জায়েদকে রাসূল (সা.) মুতার যুদ্ধের প্রথম কমান্ডার বানিয়েছিলেন। আর মৃত্যুর কিছুকাল আগে সেই জায়েদের পুত্র ওসামাকে বানিয়েছেন দ্বিতীয় মুতার যুদ্ধের কমান্ডার। এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মূলত রাসূল (সা.) আরবদের মধ্যে যে শ্রেণী বৈষম্য ছিল তার মূলে কুঠারাঘাত হেনেছিলেন। যে সাহাবীরা ওসামার নেতৃত্ব মেনে নিতে ঘাইঘুই করছিল আবু বকর (রা.) যেন তাদের মধ্যে সেই জাহেলি যুগের অভ্যাস ফিরে আসার আভাষ পেলেন। তারা বিশিষ্ট কাউকে নেতা হিসেবে মানতে চাচ্ছিল ওসামাকে নয়। তাদের প্রস্তাবে যেন এমন একটা মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ছিল যে কারণে আবু বকর (রা.) রাগে ফেটে পড়েন এবং ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদেরকে প্রচণ্ড ভর্ৎসনা করেন। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত খলিফার দৃঢ়তার সামনে সবাই ওসামাকে নিজেদের কমান্ডার হিসেবে মেনে নেন।
হযরত ওমর (রা.) ছিলেন ওসামার বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত একজন সৈনিক। খলিফা আবু বকর (রা.) চাচ্ছিলেন বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে অন্তত ওমর যেন মদিনায় থেকে যান এবং খেলাফতের কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন। খলিফা ইচ্ছে করলে নিজেই ওমর (রা.)-কে বা ওসামাকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতে পারতেন যেহেতু তিনি এখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান। কিন্তু তিনি ওসামার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ না করে বরং তাঁকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলেন ওমর (রা.)-কে যেন মদিনায় রেখে যাওয়া হয়। ওসামা (রা.) খলিফার অনুরোধ গ্রহণ করলেন এবং অধিকতর বিনয়ের সাথে বললেন, "আপনি যে কাউকে ইচ্ছা আপনার প্রয়োজনে মদিনায় রেখে দিতে পারেন।"
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর কিছু গোত্র জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিষয়টি নিয়ে খলিফার দরবারে পরামর্শ হয়। সাহাবীদের অনেকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, "তারা যেহেতু নামাজ পড়বে শুধু জাকাত দেবে না, সেহেতু আপাতত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের দরকার নেই। কারণ বর্তমানে চারদিকে বিদ্রোহীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমরা বরং এখন অন্যান্য বিদ্রোহীদের দমন করি এবং পরবর্তীতে এই জাকাত দিতে অস্বীকারকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেই।" কিন্তু আবু বকর (রা.) ছিলেন সোজাসাপ্টা মানুষ। তিনি এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পক্ষে ছিলেন না। তিনি তাৎক্ষণিক ঘোষণা দেন, "আল্লাহর কসম, কেউ যদি এক ছটাক পরিমাণ জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, আমি আবু বকর তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো।" হযরত আবু বকরের এই বক্তব্য থেকেই অনুধাবন করা যায় তিনি কতটা দৃঢ়চেতা মানুষ ছিলেন।
হযরত আবু বকর (রা.) খলিফা হওয়ার পর সবচেয়ে বড় যে সংকটটি দেখা দেয় তা হলো চার দিক থেকে বিদ্রোহের খবর আসতে থাকে। মক্কা-মদিনা সহ যে বিশাল বিস্তৃত আরব উপদ্বীপ রাসূল (সা.) ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন, তার মধ্যে থেকে শুধুমাত্র মক্কা ও মদিনা ছাড়া বলতে গেলে অবশিষ্ট সম্পূর্ণ আরব ইসলামী খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তারা নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পর অন্য কাউকে আরবের একক নেতা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং মদিনার কর্তৃত্বকেও প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি প্রভাবশালীদের কেউ কেউ নিজেকে নবী হিসেবেও দাবি করে এবং মদিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। হযরত আবু বকর (রা.) ওই সময় অত্যন্ত দৃঢ় ও কঠোর হস্তে এই বিদ্রোহী ও ভণ্ড নবীদেরকে দমন করেন। তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) সহ আরো বেশ কয়েকজন কমান্ডারের অধীনে বিভিন্ন জায়গায় ঈমানদার মুসলিমদেরকে পাঠিয়ে দেন বিদ্রোহী ও ভণ্ড নবীদেরকে দমন করার জন্য। আল্লাহর রহমে মুসলিম বাহিনী প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয় এবং পুনরায় সমস্ত আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। এরপর আর কখনো জাজিরাতুল আরবে এই ধরনের সংকট দেখা দেয়নি। রাসূল (সা.)-এর ওফাতের পর সৃষ্ট এই ফিতনা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এই পরিস্থিতিতে বহু দৃঢ়চেতা সাহাবীরাও মনোবল হারিয়ে ফেলেছিলেন।
তারা কীভাবে এই সংকট থেকে ইসলামকে রক্ষা করবেন তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কোমল আবু বকর এই সময়ে রুদ্র মূর্তি ধারণ করেন। তিনি দৃঢ় হস্তে অত্যন্ত কঠোরতার সাথে এই ফিতনা মোকাবেলা করেন এবং এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে আরব উপদ্বীপে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। আবু বকরের এই দৃঢ়তার ব্যাপারে পরবর্তীতে হযরত ওমর একবার বলেছিলেন, "যদি ওই সময় আবু বকর না থাকতেন তাহলে আমরা হয়তো ধ্বংসই হয়ে যেতাম।" ইতিহাসবিদরাও এ কথা অকপটে স্বীকার করেন যে যদি আবু বকর দৃঢ় হস্তে এই সব সংকট মোকাবেলা না করতেন তাহলে হয়তো মুসলিম জাতির আজকের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত।
হযরত আবু বকরের স্বভাবে মূলত দুটি পরস্পর বিরোধী গুণের ভারসাম্যপূর্ণ সমাবেশ ঘটেছিল। একদিকে সীমাহীন দৃঢ়তা, অন্যদিকে অপার করুণা ও কোমলতা। এ কারণে তাঁর চরিত্রে সর্বদা একটা ভারসাম্য বিরাজমান ছিল। কোনো ব্যক্তির স্বভাবে যদি এই দুটি গুণের কেবল একটি বর্তমান থাকে এবং অন্যটি অনুপস্থিত থাকে তখন তার চরিত্রের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে এই দুটি গুণ আবু বকর (রা.)-এর চরিত্রে সমানভাবে বিদ্যমান ছিল। হযরত আবু বকর (রা.) যদিও মুসলিমদের নেতা ও খলিফা ছিলেন তবুও তাঁর জীবন ছিল খুবই অনাড়ম্বর। খলিফা হওয়া সত্ত্বেও মদিনার অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে তিনি জনগণের অবস্থা জানতেন এবং তাদের ব্যক্তিগত কাজও অনেক সময় নিজ হাতে করে দিতেন। হযরত ওমর (রা.) বলেন, "আমি প্রতিদিন সকালে এক বৃদ্ধার বাড়িতে তার ঘরের কাজ করে দিতাম। প্রতিদিনের মতো আমি একদিন তার বাড়িতে উপস্থিত হলে বৃদ্ধা বললেন, আজ কোনো কাজ নেই। এক নেককার ব্যক্তি তোমার আগেই কাজগুলো করে গেছে।" হযরত ওমর পরে জানতে পারেন সেই নেককার ব্যক্তিটি ছিলেন স্বয়ং খলিফা আবু বকর (রা.)।
হযরত আবু বকরের পেশা ছিল ব্যবসা। ইসলাম পূর্ব যুগেই কুরাইশদের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। ইসলাম গ্রহণের পরেও জীবিকার প্রয়োজনে তিনি এই পেশা অব্যাহত রাখেন। তবে রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যখন তিনি খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন খেলাফতের দায়িত্ব সামাল দিতে গিয়ে ব্যবসার পাঠ চুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। এই অবস্থায় সংসারে নেমে আসে নিদারুণ দারিদ্র্য। একদিন হযরত ওমর (রা.) ও আবু ওবায়দা (রা.) লক্ষ্য করলেন মাথায় কাপড়ের গাঁট নিয়ে একজন অতি বৃদ্ধ মানুষ মদিনার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করলেন, "কে এই বৃদ্ধ ব্যক্তি?" কৌতূহলবশত তারা কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি আর কেউ নন—খলিফাতু রাসূলিল্লাহ আবু বকর। এই দৃশ্য দেখে তারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। অতঃপর বহু পীড়াপীড়ি করে তারা বৃদ্ধ আবু বকরকে রাজি করালেন যে তিনি এখন থেকে বাইতুল মাল থেকে যৎসামান্য ভাতা গ্রহণ করে নিজের পরিবারের খরচ বহন করবেন। অতঃপর মজলিশে শুরার সিদ্ধান্ত মোতাবেক খলিফার জন্য ন্যূনতম একটি ভাতার ব্যবস্থা করা হয় যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক আড়াই হাজার দিরহাম। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যে মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে নির্দেশ দিয়ে যান তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় করে বাইতুল মাল থেকে গৃহীত সমুদয় অর্থ যেন ফিরিয়ে দেয়া হয়। ইসলামের খেদমতে মাহমুদী আবু বকর (রা.) কেবল দিয়েই গিয়েছেন, কখনো বিন্দুমাত্র সুবিধা গ্রহণ করতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না।
হযরত আবু বকর (রা.) মাত্র আড়াই বছরের মতো খেলাফত পরিচালনা করেন। খুব সংক্ষিপ্ত হলেও তাঁর এই শাসনামল ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য অবদান হলো মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা, আরবের বিদ্রোহীদেরকে দমন করা এবং ভণ্ড নবীদেরকে নির্মূল করা। রাষ্ট্র ও সরকারকে তিনি এত মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে মুসলিমরা ইরান ও রোমের মতো দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে সাহসী হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে তাদের বহু অঞ্চল দখল করে নেয়। তিনি সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্য সাম্রাজ্য তথা ইরানি শাহেনশাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। অতঃপর পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালেই তিনি তৎকালীন আরেক পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বিশ্বের দুই দুটি পরাশক্তি যাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা দূরে থাক তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেই এর আগে আরবরা ভয় পেত, সেই দুই পরাশক্তির বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা ছিল আবু বকর (রা.)-এর জীবনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত। আর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই তাঁর এই সিদ্ধান্ত মানবজাতির ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি বদলে দিয়েছিল। আমরা বলতেই পারি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মতোই তাঁর শ্রেষ্ঠ অনুসারী আবু বকর (রা.)-ও ছিলেন ইতিহাস বদলে দেয়া এক মহানায়ক।
হযরত আবু বকরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো পবিত্র কুরআনের সংকলন ও সংরক্ষণ। তাঁর খিলাফতকালে প্রথম বছরে আরবের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সেসব বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে শত শত হাফেজে কুরআন শাহাদাত বরণ করেন। শুধুমাত্র মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইয়ামামার যুদ্ধেই শহীদ হন ৭০০ হাফেজ। অতঃপর হযরত ওমরের পরামর্শে আবু বকর (রা.) সম্পূর্ণ কুরআন এক স্থানে গ্রন্থ আকারে সংকলন করেন এবং কপিটি নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন। ইতিহাসে কুরআনের এই আদি কপিটি 'মাসহাফে সিদ্দিকি' নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে হযরত ওসমান (রা.)-এর যুগে কুরআনের যে কপিগুলো করা হয়েছিল তা মূলত মাসহাফে সিদ্দিকির অনুলিপি মাত্র।
১৩ হিজরির ৭ জমাদিউল উখরা আবু বকর (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হন। ১৫ দিন জ্বরে ভোগার পর হিজরি ১৩ সনের ২১ জমাদিউল উখরা মোতাবেক ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। তিনি দুই বছর তিন মাস ১০ দিন ইসলামী খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে হযরত আবু বকর (রা.)-এর অবদান চির ভাস্বর হয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

#সাহাবীদের_জীবনী
#আবু_বকর_রা.
#শেষ_পর্ব
#খলিফাতুর_রাসূল_আবু_বকর_রা

Address

Gazipur Agricultural University
Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when G A U Islamic Society posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category