05/08/2026
কোনো জাতির ইতিহাস কেবল তার অর্জনের তালিকা নয়, বরং সেই অর্জনগুলোকে কত দূর স্থায়ী রূপ দেওয়া গেছে, তারও বিবরণ। ১৯৪৭ এর উপনিবেশ পরবর্তী স্বাধীনতা, একাত্তরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ চব্বিশের জুলাই আমাদের জাতীয় জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। প্রতিটি পর্বেই মানুষ অন্যায়, আধিপত্য ও অবদমনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলেছে। কিন্তু বিজয়ের মুহূর্ত যতই মহিমান্বিত হোক, তাকে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক আদর্শ, ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে না পারলে তার শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। তখন পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যায় এবং পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো নতুন রূপে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তাই কেবল একটি সরকারের পতনের ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘদিনের দুঃশাসন, রাজনৈতিক আধিপত্য, বৈষম্য, অপমান এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের সঞ্চিত প্রতিরোধের বিস্ফোরণ। এই অভ্যুত্থান একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে এনেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই অভ্যুত্থানের প্রাণশক্তিকে কীভাবে স্থায়ী রূপ দেওয়া যায়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আমাদের রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর দিকে তাকাতে হয়। বাংলাদেশ এখনো অনেকাংশে ব্রিটিশ উপনিবেশিক আইন, প্রশাসন, শিক্ষা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বহন করছে। স্বাধীনতার পর শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে, রাষ্ট্রের পতাকা ও মানচিত্র বদলেছে, কিন্তু জ্ঞান, প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক মানসিকতার মৌলিক রূপান্তর ঘটেনি। ফলে গণঅভ্যুত্থানের বিজয়ও যদি এই পুরোনো কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার হাতবদলেই পর্যবসিত হবে।
এই কারণেই চব্বিশের অভ্যুত্থানকে স্থায়ী করতে হলে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় স্বপ্ন নির্মাণ অপরিহার্য। কোনো জাতি শুধু অতীতের বিজয়ের স্মৃতি নিয়ে সামনে এগোতে পারে না। তাকে জানতে হয়, সে কেমন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়, কোন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়াতে চায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের সমাজ রেখে যেতে চায়। অথচ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট হলো, আমাদের সামনে এখনো কোনো ঐকমত্যভিত্তিক, অনুসরণযোগ্য ও যৌক্তিক জাতীয় স্বপ্ন সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত নেই।
এই জাতীয় স্বপ্ন বাইরের কোনো আদর্শের অনুকরণে নির্মিত হতে পারে না। একে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূগোল, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জনগণের বাস্তব আকাঙ্ক্ষার ভেতর থেকে উঠে আসতে হবে। এর ভিত্তি হবে হাকিকত, আদালত, ইনসাফ, মানবিক মর্যাদা, দায়িত্বশীলতা ও সামষ্টিক মাসলাহাত। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যদি কেবল ক্ষমতা সংরক্ষণ ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে গণঅভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে যাবে। রাষ্ট্রকে মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও মাসলাহাত রক্ষার দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।
এই নতুন রাষ্ট্রচিন্তা নির্মাণে ইসলামী সভ্যতার রাজনৈতিক ও নৈতিক ঐতিহ্য আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। আল মাওয়ার্দীর রাষ্ট্রদর্শনে ন্যায়ভিত্তিক শাসন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব, সামাজিক শৃঙ্খলা, জ্ঞান ও মাসলাহাতকে রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসও প্রমাণ করে, কোনো রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ওপর টিকে থাকে না। তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে ন্যায়, জ্ঞান, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং নৈতিক বৈধতার ওপর।
কিন্তু এই ঐতিহ্য থেকে কার্যকরভাবে উপকৃত হতে হলে প্রথমে আমাদের চিন্তা ও জ্ঞানের উপনিবেশমুক্তি ঘটাতে হবে। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে অন্যের ভাষায় পড়ে, নিজের সমাজকে অন্যের ধারণায় ব্যাখ্যা করে এবং নিজের ভবিষ্যৎও অন্যের তত্ত্বে কল্পনা করে, সে স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারে না। বাংলা ভাষাকে তাই শুধু যোগাযোগের ভাষা নয়, জ্ঞান, রাষ্ট্রচিন্তা ও সভ্যতা নির্মাণের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি ইসলামী সভ্যতার জ্ঞানভাণ্ডার এবং সমকালীন বিশ্বের প্রয়োজনীয় জ্ঞানকে স্বাধীন, হাকিকতমুখী ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে গ্রহণ করতে হবে।
চিন্তার এই পুনর্গঠন অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ছাড়া পূর্ণতা পাবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বৈষম্য, দুর্নীতি, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ এবং বিদেশ নির্ভরতা বাড়িয়েছে। কৃষি, খাদ্য, পানি, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও শিল্পনীতিকে জাতীয় স্বার্থের আলোকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। শ্রমিক, কৃষক, তরুণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক স্বাধীনতাও বাস্তব অর্থ হারাবে। ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষ্য হবে কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, বরং সম্পদের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার এবং সামষ্টিক মাসলাহাত নিশ্চিত করা।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সিভিল সোসাইটি গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষক, গবেষক, আলেম, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী ও তরুণদের এমন সামাজিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে, যা ক্ষমতার বাইরে দাঁড়িয়ে ন্যায়, জবাবদিহি ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা রাখবে। গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে শুধু প্রতিবাদী আবেগে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। সেই শক্তিকে নতুন নেতৃত্ব, নীতিমালা, জ্ঞানচর্চা ও বিকল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণের সক্ষমতায় রূপ দিতে হবে।
কারণ বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি একটি জাতির শক্তির পরস্পর সংযুক্ত তিনটি ক্ষেত্র। একটিকে দুর্বল রেখে অন্য দুটিতে স্থায়ী সাফল্য অর্জন করা যায় না। রাজনৈতিক বিজয়কে স্থায়ী করতে হলে ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্তরে পরিবর্তন আনতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নকে তাই শুধু নির্বাচন, সরকার কিংবা দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যাবে না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে ইতিহাসের একটি নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এখন দায়িত্ব হলো এই অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগ, আত্মমর্যাদা ও প্রাণশক্তিকে একটি সুসংহত জাতীয় স্বপ্নে রূপ দেওয়া। এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করতে হবে, যা নিজের ইতিহাস ও সভ্যতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে হাকিকত, আদালত, জ্ঞান, মর্যাদা ও মাসলাহাতকে রাষ্ট্রের মূলনীতিতে পরিণত করবে। তাহলেই চব্বিশ কেবল একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি হয়ে থাকবে না, বরং নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হয়ে উঠবে।