15/06/2026
মুখস্থকরণের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য আকাশচুম্বি। একজন সফল ছাত্র ও সফল ব্যক্তি হতে হলে যেমন অত্যধিক পড়াশোনা ও অধ্যয়নের বিকল্প নেই, তেমনি তার অধ্যয়নকৃত জিনিস মুখস্থ করারও বিকল্প নেই। নিজেকে সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে একাডেমিক তথ্যের পাশাপাশি এর বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ের তথ্যের প্রাচুর্যের মাধ্যমে নিজের মস্তিষ্ক সাজাতে হবে। এ ব্যাপারে যে যত বেশি সফলতার প্রমাণ রাখতে পারবে, সে তত জ্ঞানী হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
আমরা আমাদের মুসলিম জাতির ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাই, মুখস্থকরণ মুসলিম জাতির ঐতিহ্য। মুখস্থকরণে মুসলিম জাতি যে-ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা কখনও কোনো জাতি করতে সক্ষম হয়নি। এর প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তার কাছে জিবরীল আলাইহিস সালাম ওহী নিয়ে আসলে, তিনি তা মুখস্থ করার জন্য তাড়াহুড়ো করতেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বলে দেন, 'আপনার তাড়াহুড়োর কোনো প্রয়োজন নেই, মুখস্থ করানোর দায়িত্ব আমার।' [১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের বিভিন্ন উপায়ে মুখস্থ করার প্রতি উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাতেন।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরী শতক ছিল মুসলিম ইতিহাসের মুখস্থকরণের সোনালি শতক। এ তিন শতকে ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য,
শিক্ষা-দীক্ষাসহ যাবতীয় জিনিস সংরক্ষণের মূল মাধ্যম ছিল মুখস্থ। এ তিন শতকের মুসলিমদের কাছে কুরআনুল কারীম মুখস্থ করা ছিল সাধারণ ব্যাপার। আমরা মলাটে আবদ্ধ যে-লাখো হাদীস দেখি, বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় যে লাখ লাখ হাদীস বর্ণনাকারীদের আদ্যোপান্ত জীবনী সাজানো হয়েছে, ফিকহের কিতাবে যে লাখ লাখ ফাতাওয়া-মাসায়িল জ্বলজ্বল করছে, এছাড়াও অন্যান্য ইসলামী-শাস্ত্রের যেসব তথ্য-উপাত্ত আমাদের সামনে বিদ্যমান-এর সবই তারা মুখস্থের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতেন।
তৃতীয় হিজরী শতকের পর থেকে মুখস্থ-ঐতিহ্য কমতে থাকে এবং লেখার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে তৃতীয় হিজরী শতক পর্যন্ত ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার যে স্বর্ণযুগ অব্যহত ছিল, তাতে ভাটা পড়তে থাকে। ফলাফল হিসেবে আমরা বলতে পারি, মুখস্থকরণ হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার উন্নতি অবনতির এক বড় মাধ্যম।
তৃতীয় হিজরী শতকের পর থেকে মুখস্থকরণ নামক প্রদীপ আস্তে আস্তে তার আলো হারাতে থাকলেও আজ পর্যন্ত পুরোপুরি নিভে যায়নি। মুসলিম জাতির এই ইতিহাস ঐতিহ্য একেবারে হারিয়ে যায়নি। আজও মুসলিম জাতি এই ইতিহাস ঐতিহ্যে সকল ধর্মের ওপরে। পৃথিবীর বুকে রয়েছে লাখ লাখ হাফিযে কুরআন। কুতুবে সিত্তাহসিহ অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের হাজার হাজার হাফিয বর্তমান পৃথিবীতে বিচরণ করছে। এছাড়া অন্যান্য ইসলামী-শাস্ত্রের মৌলিক গ্রন্থ মুখস্থকারীর সংখ্যাও অনেক। এর বিপরীতে অন্যান্য ধর্মের হয়তো একজন অনুসারীও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি স্বীয় ধর্মের কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ হুবহু মুখস্থ করেছেন।
✍️ শাইখ আব্দুল কাইয়্যুম আস-সুহাইবানী
Ahnaf Academy