29/01/2026
প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলেই নিজের এডমিশন জার্নির কথাগুলো খুব মনে পড়ে।
HSC শেষ করে অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা ছিল স্বপ্নের ঠিক উল্টো। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভালো বাসায় থাকার সুযোগ হয়নি। আব্বু, আম্মু আর আমি ফার্মগেটের তেজকুনিপাড়ায় একরুমের একটা টিনের ঘরে উঠেছিলাম, যেখানে বৃষ্টির সময় ঘরের মধ্যে পানি পড়তো। চারপাশের পরিবেশ, জীবনযাপন—সবকিছু মিলিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা ছিলো।
১৪ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম একটি কোচিংয়ে। ভর্তি করিয়ে দিয়ে মাত্র দুই দিন পর আব্বু বাড়ি ফিরে যান। এরপর টানা সাত দিন মা আর ছেলের একসাথে অসুস্থ হয়ে পড়া—জ্বর, জন্ডিস, ডায়রিয়া—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল একেবারে মুমূর্ষু। শেষমেশ জীবন বাঁচানোর তাগিদে আব্বু ঢাকায় এসে আম্মু আর আমাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
কোচিংয়ে ক্লাস করা হয়েছিল মাত্র দুই দিন। পরে ভর্তি বাতিল করে টাকা ফেরত চাইলে এক টাকাও দেওয়া হয়নি।
সব স্বপ্ন নিয়ে ঐদিনই বাড়ি ফিরেছিলাম—খালি হাতে।
সুস্থ হতে প্রায় এক মাস লেগে যায়। পড়াশুনা বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি। এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় ভর্তিযুদ্ধ। একে একে DU, তারপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা।
ভয় ছিল ভয়ংকর।
কোথাও কোচিং করিনি।
কারো কাছে প্রাইভেট পড়িনি।
মনে হতো— “আমার পক্ষে কি আদৌ সম্ভব?”
কিন্তু আব্বু সবসময় একটা কথাই বলতেন—
“তোর মেধার উপর আমার বিশ্বাস আছে। দেখিস, তুই পরীক্ষা দিলেই টিকে যাবি।”
এই কথাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—প্রতিটা পরীক্ষার হলে প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পর দেখতাম, প্রশ্নগুলো খুব পরিচিত লাগছে। কঠিন মনে হচ্ছিল না। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ রহমত আর বাবা–মায়ের দোয়ায় ভর্তিযুদ্ধে সফল হয়েছিলাম।
পেছনে তাকিয়ে বুঝি—এই সফলতা হঠাৎ করে আসেনি। কলেজে থাকতে আমি ভীষণ পরিশ্রম করেছিলাম। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ—সবগুলোতেই নিয়মিত ভালো করতাম। টেস্ট পরীক্ষায় ম্যাথে ৭৫-এর মধ্যে ৭৩ পেয়েছিলাম—যেখানে আমাদের গাইবান্ধা সরকারি কলেজে টেস্টে পাস করাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এমনকি বায়োলজিতেও আমার মার্ক ছিল ভালো।
কলেজের টেস্ট পরীক্ষার কিছুদিন আগে একদিন ফিজিক্স টিচার নয়ন স্যার বলেছিলেন,
“তুমি আরেকটু পড়াশুনা করলেই বুয়েটে চান্স পাবা।”
সেদিনই জীবনে প্রথম ‘বুয়েট’ শব্দটা শুনেছিলাম।
এরপর স্যারের ওই কথা নিয়ে অনেক সহপাঠী আমাকে দেখলেই “বুয়েট, বুয়েট” বলে পচাতো। খারাপ লাগতো, কিন্তু হেসে উড়িয়ে দিতাম।
কলেজের বন্ধু রিমন প্রায়ই বলতো,
“তুই বুয়েটে টিকবি, দেখিস।”
ছেলেটা আমাকে ভীষণ অনুপ্রেরণা দিত। অথচ, তখনও আমি ঠিক বুঝতামই না—বুয়েট আসলে কী জিনিস।
আমার পড়াশুনা জীবনের একটা ছোট্ট কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল—
আমি কখনো পরীক্ষার হলে কারো কাছে কিছু শুনতাম না।
নিজে যা পড়ে যেতাম, সেটাই খাতায় লিখতাম।
এই গল্পটা তাদের জন্য—
👉 যারা কোচিং পায় না,
👉 যারা সুযোগের অভাবে নিজেকে পিছিয়ে ভাবো,
👉 যারা ভয় পাও— “আমি পারবো তো?”
বিশ্বাস রাখো—
👉 সঠিক পরিশ্রম কখনো নষ্ট হয় না।
👉 মেধা চুপচাপ থাকে, কিন্তু সময় এলে ঠিকই কথা বলে।
👉 নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে, পথ নিজে থেকেই বের হয়।
আজ না হোক, কাল—
তোমার সময়ও আসবেই, ইনশাআল্লাহ।
সংযুক্তি: আজকে হঠাৎ বুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিটলিস্ট টা খুঁজে পেলাম। নিচে স্ক্রিনশট দিয়ে দিলাম।