28/08/2026
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ,
আজ আমি আপনাদের সন্তানকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।
আপনারা হয়তো ভাবছেন, আজকে আমি কোনো Parenting Technique শেখাব। কিন্তু তার আগে আমি চাই, আপনি নিজেকে একজন অভিভাবক হিসেবে একটু যাচাই করুন।
আমি প্রশ্ন করব।
আপনি উত্তরটা আমাকে দেবেন না।
উত্তরটা নিজেকে দেবেন।
১. গত এক মাসে আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে কতবার নিবিড়ভাবে মিশেছেন?
শুধু একই ঘরে থাকা নয়।
আমি বলছি, এমনভাবে সময় দেওয়া, যেখানে আপনার মোবাইল পাশে নেই, আপনার ব্যবসার চিন্তা নেই, অফিসের চাপ নেই।
শুধু আপনি এবং আপনার সন্তান।
আপনি কি হিসাব করে বলতে পারবেন, গত এক মাসে এমন সময় কতবার এসেছে?
২. আপনার কি মনে আছে, সর্বশেষ কবে আপনি সন্তানকে জিজ্ঞেস করেছেন?
“বাবা/মা, তোমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ কী?”
“তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”
“কোন বিষয়টা তোমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়?”
“কোন বিষয়টা তোমাকে কষ্ট দেয়?”
আমরা সন্তানকে প্রায়ই বলি,
“এটা করো।”
“ওটা করো না।”
“এভাবে পড়ো।”
“ওভাবে বসো।”
কিন্তু খুব কম সময় বলি,
“তুমি কী চাও, সেটা আমাকে বলো।”
সন্তানকে শুধু নির্দেশ দিলে হবে না।
সন্তানকে বুঝতে হবে।
৩. গত এক মাসে আপনি সন্তানকে কত ঘণ্টা Quality Time দিয়েছেন?
১০ ঘণ্টা?
৫ ঘণ্টা?
নাকি হিসাব করলে দেখা যাবে, সন্তান আপনার কাছে থেকেও আপনার সময় পায়নি?
মনে রাখবেন,
একই ঘরে থাকা আর সন্তানের জীবনে উপস্থিত থাকা এক জিনিস নয়।
আপনি অফিস থেকে ফিরে বাসায় আছেন।
সন্তানও বাসায় আছে।
কিন্তু আপনি মোবাইলে ব্যস্ত, সন্তান গ্যাজেটে ব্যস্ত।
এটা একসঙ্গে থাকা হতে পারে,
কিন্তু Quality Time নয়।
৪. গত ৭ দিনে আপনি সন্তানের সঙ্গে কত ঘণ্টা খেলেছেন?
এক ঘণ্টা?
দুই ঘণ্টা?
নাকি একবারও নয়?
আপনি হয়তো বলবেন,
“আমি কি আর ছোট বাচ্চা? আমার তো অনেক কাজ!”
কিন্তু আপনার সন্তান যখন আপনার সঙ্গে খেলতে চায়, তখন তার কাছে খেলাটা শুধু খেলা নয়।
সে আসলে বলছে,
“বাবা, তুমি কি আমার সঙ্গে থাকবে?”
“মা, তুমি কি আমাকে সময় দেবে?”
সন্তানের শৈশব কিন্তু অপেক্ষা করে থাকে না।
আজ যে বয়সে সে আপনার হাত ধরে হাঁটতে চায়,
কাল সে সেই বয়সে থাকবে না।
আজ যে সন্তান আপনাকে তার পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ মনে করে,
কাল হয়তো সে নিজের পৃথিবী তৈরি করে নেবে।
তাই সময় থাকতে সময় দিন।
৫. নিজের উন্নতির জন্য আপনি কী করেন?
আপনি নিজের ব্যবসার জন্য Training করেন।
নিজের ক্যারিয়ারের জন্য পরামর্শ নেন।
নিজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য কোর্স করেন।
নিজের স্বাস্থ্য ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,
আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি কতটা শিখেছেন?
আপনি কি Parenting নিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নিয়েছেন?
কোনো Parenting Coach বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন?
আপনার সন্তান কেন এমন আচরণ করছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করেছেন?
কারণ একটি সত্য মনে রাখা দরকার:
সন্তান প্রতিপালন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি, অথচ আমরা অনেক সময় এর জন্য কোনো প্রস্তুতিই নিই না।
৬. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন...
গত এক বছরে সন্তানকে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আপনারা কয়টি Parenting Meeting করেছেন?
হ্যাঁ, আমি বলছি Meeting!
আপনারা ব্যবসার Meeting করেন।
অফিসের Meeting করেন।
আর্থিক পরিকল্পনার Meeting করেন।
বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা করেন।
ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করেন।
কিন্তু সন্তানকে নিয়ে বসে কি কখনো আলোচনা করেছেন?
“আমাদের সন্তান কেমন মানুষ হয়ে উঠছে?”
“তার কোন ভালো গুণ তৈরি হচ্ছে?”
“কোন জায়গায় আমাদের কাজ করা দরকার?”
“আমরা বাবা-মা হিসেবে কোথায় ভুল করছি?”
প্রতি মাসে অন্তত একবার স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসে সন্তানের ঈমান, চরিত্র, শিক্ষা, আচরণ, বন্ধুত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করা দরকার।
তাহলে আসল প্রশ্নটা কী?
আপনি আপনার সন্তানকে কী কী দিচ্ছেন?
খাবার দিচ্ছেন।
ভালো কাপড় দিচ্ছেন।
ভালো স্কুলে পড়াচ্ছেন।
মোবাইল দিচ্ছেন।
কম্পিউটার দিচ্ছেন।
বাইক কিনে দিচ্ছেন।
প্রয়োজনীয় সবকিছু দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু সময় কতটুকু দিচ্ছেন?
একটু কঠিন প্রশ্ন করি...
আপনি কি মনে করেন,
সন্তানকে টাকা দেবেন,
খাবার দেবেন,
কাপড় দেবেন,
গ্যাজেট দেবেন,
বাইক দেবেন,
জীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু দেবেন,
শুধু আপনার সঙ্গটা দেবেন না,
তারপরও সে সফল মানুষ হয়ে যাবে?
না।
কারণ সন্তান শুধু আপনার অর্থের উত্তরাধিকারী নয়।
সে আপনার চিন্তা, মূল্যবোধ, আচরণ ও আদর্শেরও উত্তরাধিকারী।
আমি এমন অনেক সচ্ছল পরিবারের সন্তান দেখেছি, যারা প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও জীবনের সঠিক দিশা খুঁজে পায়নি।
আবার এমন অনেক সীমিত সামর্থ্যের পরিবারের সন্তানও দেখেছি, যারা ভালোবাসা, শাসন, মূল্যবোধ, পরিশ্রম ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়ে সুন্দর মানুষ হয়েছে।
তাই প্রশ্ন শুধু,
“আমার সন্তান কী পেল?”
প্রশ্ন হলো,
“আমার সন্তান কী শিখল?”
মনে রাখবেন...
আপনার সন্তানই আপনার পরবর্তী প্রজন্ম।
আপনি আজ সম্পদ তৈরি করছেন।
ভবিষ্যতের জন্য জমি কিনছেন।
বাড়ি করছেন।
ব্যবসা দাঁড় করাচ্ছেন।
ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়াচ্ছেন।
সবই ভালো।
কিন্তু সম্পদ তৈরি করতে গিয়ে যদি সন্তানকে হারিয়ে ফেলেন, তাহলে একদিন হয়তো দেখবেন,
আপনার সম্পদ আছে,
কিন্তু সেই সম্পদ উপভোগ করার মতো একটি সুন্দর পরিবার নেই।
বরং সঠিক মূল্যবোধ ছাড়া বড় হওয়া সন্তান কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সম্পদের অপব্যবহারও করতে পারে।
তাই আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিন:
সন্তানকে শুধু সম্পদ দেব না, জীবন দেব।
শুধু টাকা দেব না, সময় দেব।
শুধু খাবার দেব না, ভালোবাসা দেব।
শুধু স্কুলে পাঠাব না, নিজেও শেখাব।
শুধু সফল করতে চাইব না, ভালো মানুষও বানাব।
শুধু দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করাব না, আল্লাহর সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেব।
সন্তানকে ইলম দিন
তাকে শেখান,
কে তার রব।
কেন তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
জীবনের উদ্দেশ্য কী।
হালাল-হারামের পার্থক্য কী।
সত্যবাদিতা কী।
আমানতদারি কী।
মানুষকে সম্মান করা কী।
দায়িত্বশীল হওয়া কী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করুন
শিশুকে শুধু “নামাজ পড়ো” বললেই যথেষ্ট নয়।
তার হৃদয়ে দ্বীনকে ভালোবাসার করে তুলতে হবে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে গল্প বলুন।
তাঁর দয়া, ভালোবাসা, সত্যবাদিতা, সাহস ও মানুষের প্রতি আচরণের কথা বলুন।
যাতে সন্তান শুধু জানে না,
ভালোবাসে।
সন্তানকে কর্মঠ করে তুলুন
তার সব কাজ বাবা-মা করে দেবেন না।
তার বয়স অনুযায়ী দায়িত্ব দিন।
নিজের বই নিজে গোছাতে শেখান।
নিজের জিনিসের যত্ন নিতে শেখান।
পরিবারের কাজে অংশ নিতে দিন।
ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে শেখান।
ভুল করলে তাকে শেখার সুযোগ দিন।
কারণ আপনার লক্ষ্য শুধু এমন সন্তান তৈরি করা নয়,
যে আপনার ওপর নির্ভর করবে।
আপনার লক্ষ্য এমন সন্তান তৈরি করা,
যে একদিন নিজে দাঁড়াতে পারবে, দায়িত্ব নিতে পারবে, অন্যের উপকার করতে পারবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন পরিচালনা করতে পারবে।
শেষ প্রশ্নটি আপনাদের জন্য
আজ রাতে বাসায় ফিরে সন্তানকে একটু কাছে ডাকুন।
মোবাইলটা পাশে রাখুন।
তার চোখের দিকে তাকান।
তার মাথায় হাত রাখুন।
তারপর জিজ্ঞেস করুন,
“বাবা/মা, তুমি কি মনে করো আমি তোমাকে যথেষ্ট সময় দিই?”
তার উত্তরটা মন দিয়ে শুনুন।
তাকে থামাবেন না।
নিজেকে defend করবেন না।
শুধু শুনবেন।
হয়তো তার উত্তর আপনাকে কষ্ট দেবে।
কিন্তু সেই কষ্টটাই হয়তো আপনার Parenting Journey-এর নতুন শুরু হতে পারে।
কারণ—
সন্তান আপনার জীবনের একটি অংশ নয়।
সন্তান আপনার জীবনের উত্তরাধিকার।
তাই সম্পদ তৈরি করুন।
বাড়ি তৈরি করুন।
ব্যবসা করুন।
সফল হোন।
কিন্তু তার পাশাপাশি—
একজন মানুষ তৈরি করুন।
একজন সৎ মানুষ।
একজন দায়িত্বশীল মানুষ।
একজন কর্মঠ মানুষ।
একজন আল্লাহভীরু মানুষ।
সন্তানকে শুধু সম্পদ নয়, জীবন দিন।
সময় দিন।
ইলম দিন।
ভালোবাসা দিন।
আদর্শ দিন।
কারণ আপনার আজকের Parenting-ই আপনার আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।