15/07/2026
'ফার্মের মুরগি' নিয়ে দুটি কথা
দুই সন্তানের পিতা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। এই ট্যাগিংয়ে আমার সন্তানরা খুব কষ্ট পায়। ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা শিশুরা আমাদের সময়ে মফস্বল শহর বা গ্রামে বেড়ে উঠাদের মতো খেলাধুলার সুযোগ পায় না।
সিঙ্গাপুর থেকে ২০১২ সালে দেশে ফিরে আসি। তখন আমার এক সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
দেশে ফিরে বনশ্রীতে আবার সংসার শুরু করি। সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন আমার সন্তানের খেলাধুলার অনেক সুযোগ ছিল; নিয়মিত সাইকেল চালাত। কিন্তু দেশে ফিরে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। বন্ধু নেই, খেলার জায়গা নেই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু কাঁদত। তার চেহারা দেখে মনে হতো, দেশে সম্ভবত আমরা সেটেল হতে পারব না। মাঝে মাঝে মনে হতো ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে আবার বিদেশে চলে যাই।
অবশেষে ২০১৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার পর শিক্ষকতা ছেড়ে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসে যোগ দিই এবং উত্তরায় চলে যাই। এর পেছনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিল, সন্তানরা যেন খেলাধুলা করতে পারে এবং ইসলামিক মূল্যবোধের পরিবেশে পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। তাছাড়া, ব্র্যাকেও তখন গবেষণার অনুকূল পরিবেশ ছিল না। আরও কিছু ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণও ছিল।
যাই হোক, আব্বা হঠাৎ ইন্তেকাল করার পর বসুন্ধরায় চলে আসি, কারণ সেখানে আমার ছোট ভাই থাকত। পরে সে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
বসুন্ধরা এত বড় আবাসিক এলাকা, কিন্তু শিশুদের খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি। বর্তমানে এখানে গলফ কোর্সও আছে, কিন্তু শিশুরা নিরাপদে সাইকেল চালাতে পারে—এমন ফুটপাতও নেই।
বসুন্ধরার পরিকল্পনায় শিশুদের প্রয়োজনের প্রতি নূন্যতম গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সরকারও এখানে কার্যকরভাবে নিজস্ব নিয়মকানুন বাস্তবায়ন করতে পারেনি। প্রতিটি ব্লকে শিশুদের জন্য খেলাধুলার জায়গা বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল। কিন্তু এই এলাকার অনেক বাসিন্দাও কমিউনিটির স্বার্থের ব্যাপারে তেমন ভাবিত নন, আত্নকেন্দ্রিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিশুরা খেলাধুলার অভাবে 'ফার্মের মুরগি' তকমা পেয়েছে। তারা এক অর্থে গ্রামের শিশুদের তুলনায় বঞ্চিত। গ্রামের শিশুরা হয়তো পুষ্টির ঘাটতিতে ভোগে, কিন্তু তারা তুলনামূলকভাবে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ, কারণ তারা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে বড় হওয়ার সুযোগ পায়।
শিশুদের খেলার অধিকার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতার জন্য আমাকে টানা চার মাস পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। সে সময় আমার বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বেতন বা বোনাস দেয়নি। স্কলারশিপের অর্থে অস্ট্রেলিয়ায় আমার চললেও, দেশে পরিবারের খরচ আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়েছে।
নিজের আগ্রহ থেকেই শিশুদের শারীরিক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ৬০টিরও বেশি দেশের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করছি। বিশেষ করে শিশুদের ২৪-ঘণ্টার মুভমেন্ট বিহেভিয়ার—ঘুম, স্ক্রিন টাইম এবং শারীরিক কার্যক্রম—নিয়ে গবেষণা করছি।
ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিশুরা কি ইচ্ছা করে 'ফার্মের মুরগি' হয়েছে? অবশ্যই না। এটি আমাদের নগর পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফল।
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পনাহীনভাবে নগরায়ণ হয়েছে, যেখানে মানুষের হাঁটার জায়গা পর্যন্ত নেই। ঢাকায় প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস করে, যা অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় দেড় গুণ। অথচ আয়তনের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের তুলনায় অন্তত ৫১ গুণ বড়। সেই তুলনায় ঢাকা কয়েক শত গুণ ছোট এলাকায় বিপুল জনগোষ্ঠীর বসবাস। তথ্যগুলো শুধু পরিস্থিতির ব্যাপকতা অনুধাবনের জন্য উল্লেখ করলাম।
'ফার্মের মুরগি' বানানোর কারিগর হচ্ছেন সেই রাজনীতিবিদরা, যারা জনগণের অর্থে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়েন, অথচ নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দেন।
প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন
জনস্বাস্থ্য গবেষক