02/06/2026
সাতচল্লিশে হিন্দুদের বিরোধিতায় বাংলাকে
অখণ্ড রাখার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়
সাহাদত হোসেন খান
যুক্তবাংলা গঠনের আন্দোলন ছিল বঙ্গদেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার শেষ প্রচেষ্টা। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অকাল মৃত্যুতে বেঙ্গল প্যাক্টের আওতায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের পতন ঘটে। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মে মাসে ভারত বিভাজন অপরিহার্য বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। বঙ্গদেশের মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অখণ্ড বঙ্গদেশকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনা করেন।
একইসময়ে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সদস্য ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই শরৎ চন্দ্র বসু একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক বঙ্গদেশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসেন। বঙ্গদেশের সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। তবে উভয়ের লক্ষ্য ছিল বঙ্গদেশের বিভক্তি রোধ করা। সোহরাওয়ার্দী ভারত ইউনিয়নের বাইরে বঙ্গদেশকে একটি পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে দেখতে চাইছিলেন। অন্যদিকে, শরৎ বসু ভারত ইউনিয়নের আওতায় একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন।
১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীন বাংলার দাবি করেন। তিনি বলেন, আমি বরাবরই বাংলার ভবিষ্যৎ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে কল্পনা করে এসেছি। কোনোরূপ ভারতীয় রাষ্ট্র সংঘের অংশ হিসাবে নয়। তিনি আরো বলেন, বাংলা যদি মহান হতে চায় তবে সে শুধু নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই তা হতে পারবে। বাংলা বিভাগকে তিনি বাঙ্গালিদের আত্মহত্যা হিসাবে মনে করতেন। ১৫ মে তিনি বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও জিন্নাহর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। ভাইসরয় তাকে জানান যে, স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কংগ্রেসের সঙ্গে তিনি ঐকমত্যে পৌঁছতে পারলে তা তাকে অবিলম্বে জানাতে হবে এবং জানালে তার সরকার সেভাবে ভারতকে স্বাধীনতা প্রদানের তারিখ ঘোষণা করবে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎ বসু ও কিরণ শঙ্কর রায় স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠায় ঐকমত্যে পৌঁছান। তারা ২০ মে স্বাধীন বাংলার রূপরেখা প্রণয়ন করেন। বাংলা হবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু কংগ্রেসের অসহযোগিতায় স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৫ ডিসেম্বর, ২০০৯ সাল, সিরাজউদ্দিন আহমেদের গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)
শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু উভয়ে প্রচণ্ডভাবে বঙ্গদেশ বিভাজনের বিরোধিতা করেছেন। প্রদেশের কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার অধিকাংশ নেতা বঙ্গদেশকে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেন। বঙ্গদেশের কয়েকজন হিন্দু ও মুসলিম নেতা সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর উদ্যোগে সমর্থন দেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে কংগ্রেস পার্লামেন্টারী পার্টির নেতা কিরণ শঙ্কর রায়, শরৎ বসুর সচিব সত্য রঞ্জন বকশি, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম, প্রদেশের রাজস্বমন্ত্রী ফজলুর রহমান, সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী চৌধুরী প্রমুখ। প্রথমে এ প্রস্তাব নিয়ে গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনা হয় এবং পরে বঙ্গদেশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
লাহোর প্রস্তাবে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা গঠনের ধারণার বীজ নিহিত ছিল। ১৯৪০ সালের মার্চে গৃহীত লাহোর প্রস্তাব ছিল ভারতের দু’টি মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রস্তাব ছিল অনির্দিষ্ট। বঙ্গদেশের মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে পাকিস্তানের ধারণা ছিল মূলত ভারতের দু’টি মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে দু’টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি প্রস্তাব।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের মতানুসারীরা ছিলেন অবিভক্ত বঙ্গদেশ ও আসাম এবং পার্শ¦বর্তী বিহারের পূর্ণিয়া জেলার সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর বাংলা গঠনের পক্ষে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির প্রভাবশালী সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন এবং বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খাঁ ছিলেন এ ধারণার বিরোধী। তারা হিন্দুপ্রধান বর্ধমান বিভাগ বাদে অবশিষ্ট বঙ্গদেশ ও আসাম এবং মুসলিমপ্রধান পূর্ণিয়া জেলার অংশবিশেষের সমন্বয়ে ভৌগোলিকভাবে সন্নিহিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৭-৯ এপ্রিল দিল্লিতে মুসলিম লীগের আইন পরিষদের সদস্যদের সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ প্রশ্নে তার আনুষ্ঠানিক মতামত প্রকাশ করেন। পাকিস্তান গঠনে তার যুক্তিতে প্রভাবিত হয়ে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। তারা পূর্বাঞ্চলে গোটা বঙ্গদেশ ও আসাম এবং পশ্চিমাঞ্চলে পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান এবং উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে একটি অখণ্ড পাকিস্তান গঠনে জিন্নাহর প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেন। তবে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-হাশিম গ্র“প একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলা গঠনে পূর্ব পাকিস্তানের ধারণাকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাবের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছিল। এ ধারণার আলোকে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম উভয়ে শরৎ বুস ও কিরণ শঙ্কর রায়ের মতো প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনাক্রমে একটি অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠনের উদ্যোগ নেন।
হিন্দুরা বঙ্গদেশ বিভক্তির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হওয়ার বহু আগে সোহরাওয়ার্দী অবিভক্ত বাংলা গঠনের চিন্তা করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি উপমহাদেশ বিভক্তির ঘোষণা দেয়ায় এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বঙ্গদেশ ও পাঞ্জাব বিভক্তির দাবি উত্থাপন করায় সোহরাওয়ার্দীসহ বঙ্গদেশের মুষ্টিমেয় রাজনীতিক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে এ প্রদেশের অখণ্ডতা বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তারা নিজস্ব সংবিধানের ভিত্তিতে বাংলাকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রদেশে একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রতি জোর দেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, বঙ্গদেশ হলো বাঙ্গালিদের এবং এটি অবিভাজ্য। এ প্রদেশের একাংশ অন্য অংশের উপর নির্ভরশীল এবং সবাই এ প্রদেশের প্রশাসনে অংশগ্রহণের অধিকারী। তিনি আশা করছিলেন, প্রদেশের সকল স্তরের জনগণ বঙ্গদেশকে একটি গৌরবময় স্বাধীন দেশে পরিণত করতে একযোগে কাজ করবে। সোহরাওয়ার্দী উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, স্বাধীনতা বঙ্গদেশে শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি নয়া যুগের সূচনা ঘটাবে। আবুল হাশিম ব্রিটিশ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের সমস্যা সমাধানে যৌথ প্রচেষ্টা চালানোর জন্য কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান। কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মধ্যে শরৎ বসু ছাড়া অন্য কেউ অবিভক্ত বাংলা গঠনে মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর ধারণার সঙ্গে একমত পোষণ করেননি।
১৯৪৭ সালের এপ্রিল-মে মাসে হিন্দু পত্রপত্রিকা ও রাজনীতিকরা বঙ্গদেশকে বিভক্ত করার জন্য তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশদের ঘোষণায় ভারত বিভক্তি অনিবার্য হয়ে উঠে। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন যে, ভারত বিভক্তি অপ্রতিরোধ্য। একথা উপলব্ধি করতে পেরে তারা বঙ্গদেশের হিন্দুপ্রধান এবং পাঞ্জাবের হিন্দু ও শিখপ্রধান অঞ্চলগুলো ভারতের সঙ্গে একীভূত করার জোর প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের ফলাফল দেখে হিন্দুরা ভীত হয়ে পড়ে। নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ ১১৪টি আসন পায়। প্রাপ্ত আসনগুলোর মধ্যে ছিল শহরাঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত ৬টি আসনের সব ক’টি, গ্রামাঞ্চলে বরাদ্দকৃত ১১১টির মধ্যে ১০৪টি এবং সংরক্ষিত আরো চারটি বিশেষ আসন। পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে মুসলমানদের এ নিরংকুশ সমর্থন দেখে হিন্দুরা বুঝতে পারে যে, সাম্প্রদায়িক পরিচিতির ভিত্তিতে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ না করলে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। এ হিসাব থেকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গদেশ বিভক্তি এবং কলকাতাসহ একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ (পশ্চিমবঙ্গ) গঠনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রায় একইসময়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভাও অনুরূপ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবে বলা হয় যে, বঙ্গদেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলোকে ভারত ইউনিয়নের আওতায় রাখতে হবে এবং বঙ্গদেশের হিন্দুপ্রধান অঞ্চলগুলোকে কোনো অবস্থায়ই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না। বাঙ্গালি হিন্দুদের কাছে অখণ্ড বাংলার অর্থ ছিল স্থায়ীভাবে মুসলমানদের কাছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়া এবং তাদের অধীনতা মেনে নেয়া। হিন্দু মহা সভার নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর একটি উক্তিতে তাদের এ অন্তর্জ¡ালা প্রতিফলিত হয়। শ্যামা প্রসাদ প্রথমদিকে অখণ্ড বাংলার পক্ষে থাকলেও ১৯৪৬ সালে তিনি তার মনোভাব পরিবর্তন করেন। নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভাপতির কাছে প্রেরিত স্বহস্তে লিখিত এক পত্রে তিনি মন্তব্য করেন, ÔIf Bengal is converted into Pakistan, Bengali Hindus will be placed under a permanent tutelage of Muslims. Judging from the manner in which attacks on Hindu religion and society have been made, (this) means an end of Bengali Hindu culture. In order to placate a set of converts from low caste Hindus to Islam, very ancient Hindu culture will be sacrificed ‘অর্থাৎ ‘বঙ্গদেশ পাকিস্তানে রূপান্তরিত হলে বাঙ্গালি হিন্দুরা স্থায়ীভাবে মুসলমানদের অধীনস্ত হবে। মুসলমানরা যেভাবে হিন্দু ধর্ম ও সমাজের উপর আঘাত হেনেছে সে দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে তার মানে দাঁড়ায় বাঙ্গালি হিন্দু সংস্কৃতির অপমৃত্যু। নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত একটি শ্রেণিকে তুষ্ট করা হলে প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতি বলি দেয়া হবে।’
হিন্দু সমাজের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী দমে যাননি। ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অবিভক্ত স্বাধীন বাংলা গঠনে তার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ২৯ এপ্রিল কলকাতায় এক বিবৃতিতে আবুল হাশিম তার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানান। তার কয়েকদিন পর শরৎ বসু একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক বঙ্গীয় প্রজাতন্ত্র গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। সার্বিকভাবে ভারত বিশেষ করে বঙ্গদেশের দু’টি প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি হওয়ার এক বিষাদময় পরিবেশে এসব প্রস্তাব পেশ করা হয়। জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন বঙ্গদেশের মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবির প্রতি মুসলিম জনমত সৃষ্টিতে কাজ করতে থাকে। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ গোটা বঙ্গদেশকে পাকিস্তানিকরণের সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। অনিবার্যভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকায় প্রদেশে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে একটি সমঝোতা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পাকিস্তান দাবি আদায়ে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস বা ডাইরেক্ট একশন দিবসের ডাক দেয়ায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। অন্যান্য প্রদেশে ডাইরেক্ট একশন দিবস শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হলেও কলকাতায় এ কর্মসূচি পালনে সহিংসতা দেখা দেয়। কলকাতা কেন্দ্রিক বঙ্গদেশে মুসলিম লীগ ছিল ক্ষমতায়। মুসলিম লীগ শাসিত বঙ্গদেশে সহিংসতা সংঘটিত হওয়ায় প্রদেশ বিভক্তির দাবির পক্ষে হিন্দু জনমত সৃষ্টি হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভা এবং কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃবৃন্দ সার্বভৌম বাংলা গঠনের পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাঙ্গালি হিন্দুদের বিরাট অংশকে ঐক্যবদ্ধ করেন। হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বাংলাকে অখণ্ড রাখার পরিকল্পনা হচ্ছে গোটা বঙ্গদেশে পাকিস্তান কায়েমের একটি কৌশল। হিন্দুনিয়ন্ত্রিত পত্রপত্রিকাগুলো অখণ্ড বাংলার ফর্মুলার বিরুদ্ধে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টার ক্রটি করেনি। হিন্দু মহাসভা স্বাধীন বঙ্গদেশ আন্দোলনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বাঙ্গালি কংগ্রেসীদের প্রভাবিত করে। গান্ধী ভর্ৎসনা করে শরৎ বসুর কাছে একটি বার্তা পাঠান। এ বার্তার জবাবে তিনি গান্ধীকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, It grieves me to find the Congress which was a great National Organisation is fast becoming an organisation of Hindus only.’ ’ অর্থাৎ ‘একটি মহান জাতীয় দল হিসাবে কংগ্রেসকে কেবলমাত্র একটি হিন্দু সংগঠনে পরিণত হতে দেখতে পেয়ে আমি ব্যথিত।’
বঙ্গীয় কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা স্বাধীন বাংলা গঠনে সোহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনার বিরোধিতা করতে থাকায় মুসলিম লীগ বঙ্গদেশ বিভক্তির অনুকূলে মত প্রকাশ করে। খাজা নাজিমুদ্দিন ও মাওলানা আকরাম খাঁর নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বঙ্গদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে নয়, বরং একটি একক পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখতে চাইছিল। পাকিস্তান প্রশ্নে জিন্নাহর মতো খাজা নাজিমুদ্দিন, মাওলানা আকরাম খাঁ ও তাদের অনুসারীরা ছিলেন অনঢ়।
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম তাদের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপদানে প্রদেশের হিন্দু নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। সোহরাওয়ার্দী বাংলার ইংরেজ গভর্নর ফ্রেডারিক বারুস, জিন্নাহ ও ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ করেন এবং তাদের সঙ্গে তার আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছিল। শরৎ বসু সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির মার্চে গৃহীত প্রস্তাবের প্রতিবাদ করছিলেন। কিরণ শঙ্কর রায় আশা করছিলেন যে, মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ হিন্দুদের কিছুটা ছাড় দেয়ার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে এলে তখনো প্রদেশকে অখণ্ড রাখা সম্ভব। ১৯৪৭ সালে মে মাসের শুরুতে বঙ্গদেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখায় বিশ্বাসী ব্যক্তিগণ একে অন্যের কাছাকাছি আসেন। কলকাতায় গান্ধীর সফরকালে তারা তাদের প্রস্তাব নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তার সমর্থন কামনা করেন। এসব নেতা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ডকে তাদের অভিমত গ্রহণে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। অবশেষে ১৯৪৭ সালের ২০ মে বাংলার গভর্নর ফ্রেডারিক বারুসের সমর্থনে কলকাতায় এক বৈঠকে বাঙ্গালি নেতারা নিজেদের মধ্যে একটি খসড়া চুক্তিতে পৌঁছান।
চুক্তির শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ:
(১) বঙ্গদেশ হবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন বঙ্গদেশ বাদবাকি ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
(২) স্বাধীন বঙ্গদেশের সংবিধান অনুযায়ী যৌথ নির্বাচন পদ্ধতি ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে বঙ্গীয় আইন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাতে জনসংখ্যানুপাতে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা হবে। হিন্দু ও তফসিলী সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত আসন তাদের নিজ নিজ জনসংখ্যার অনুপাতে বণ্টন করা হবে। নির্বাচনে আসন সংখ্যা হবে বহু এবং ভোট হবে বিভাজিত। যে প্রার্থী নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ২৫ শতাংশ ভোট পাবেন তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে। কোনো প্রার্থী এ শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে যে প্রার্থী নিজ সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ ভোট পাবেন তাকে বিজয়ী হিসাবে ঘোষণা করা হবে।
(৩) ব্রিটিশ সরকার স্বাধীন বঙ্গদেশের প্রস্তাব গ্রহণ করায় এবং বঙ্গদেশকে বিভক্ত না করার ঘোষণা দেয়ায় বঙ্গদেশের বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেয়া হবে। তফসিলী সম্প্রদায়সহ সমান সংখ্যক হিন্দু ও মুসলমান সদস্য নিয়ে একটি নয়া অর্ন্তবর্তী মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। নয়া মন্ত্রিসভায় মুখ্যমন্ত্রী হবেন মুসলমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন হিন্দু।
(৪) নয়া সংবিধানের আওতায় একটি স্থায়ী আইন পরিষদ ও মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়া নাগাদ সামরিক ও পুলিশ বাহিনীসহ সরকারি চাকরিতে তফসিলী সম্প্রদায়সহ হিন্দু ও মুসলমানদের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে। সরকারি চাকরিতে কেবলমাত্র বাঙ্গালিদের নিয়োগ করা হবে।
(৫) আইন পরিষদের হিন্দু ও মুসলিম প্রতিনিধিরা ৩০-সদস্যবিশিষ্ট একটি গণপরিষদ নির্বাচিত করবেন। গণপরিষদের ১৬ জন সদস্য হবেন মুসলমান এবং ১৪ জন হবেন হিন্দু। গণপরিষদে কোনো ইউরোপীয়ের ঠাঁই হবে না।
নিজেদের মধ্যে এ চুক্তি করে সোহরাওয়ার্দী, কিরণ শঙ্কর রায় ও শরৎ চন্দ্র বসু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ডের অনুমোদন লাভে আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস এবং পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি চুক্তি প্রণেতাদের বিচলিত করে তোলে। কংগ্রেস ও লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতৃবৃন্দ তৎক্ষণাৎ চুক্তির নিন্দা করেন। কলকাতার হিন্দু দৈনিক এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের খাজা গ্র“পের মালিকানাধীন পত্রপত্রিকাগুলো চুক্তির শর্তাবলীর বিরোধিতা করতে শুরু করে। খাজা গ্র“প বিশ্বাস করতে থাকে যে, এ চুক্তি হচ্ছে হিন্দুদের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ। অন্যদিকে, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতৃবৃন্দ ধারণা করছিলেন যে, পাকিস্তানের সীমান্ত সম্প্রসারণের অশুভ উদ্দেশ্যে এ চুক্তি করা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের ২৮ মে মাওলানা আকরাম খাঁর সভাপতিত্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে খসড়া চুক্তির শর্তাবলীর নিন্দা, মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত এবং জিন্নাহর নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করা হয়। ১৯৪৭ সালের পহেলা জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক কালিপদ মুখার্জী চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে একটি বিবৃতি দেয়ার পর বাংলাকে অখণ্ড রাখার পরিকল্পনার প্রতি আরেকটি আঘাত আসে।
সর্ব ভারতীয় রাজনীতিতে সার্বভৌম স্বাধীন বঙ্গদেশ গঠনের প্রস্তাবের প্রতি মূল বিরোধিতা এসেছিল কংগ্রেসের তরফ থেকে। কংগ্রেস হাইকমান্ড একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলায় হিন্দুদের উপর মুসলমানদের স্থায়ী আধিপত্যের আশংকায় ভীত হয়ে পড়ে। কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও সরদার বল্লবভাই প্যাটেল ছিলেন একটি সার্বভৌম বাংলা গঠনের পুরোপুরি বিরোধী। নেহরু ধারণা করছিলেন, এ পরিকল্পনার মাধ্যমে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ গোটা বঙ্গদেশকে পাকিস্তানে যোগদানে বাধ্য করবে। তিনি এমন অভিমত পোষণ করতেন যে, বঙ্গদেশকে অখণ্ড রাখতে হলে তাকে ভারত ইউনিয়নের একটি অংশে পরিণত হতে হবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, কংগ্রেস পৃথক বঙ্গদেশ রাষ্ট্রকে পাকিস্তানের একটি সম্প্রসারণ হিসাবে গণ্য করবে। সরদার প্যাটেলও বঙ্গদেশকে অখণ্ড রাখার উদ্যোগের বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের এপ্রিল-জুনে বঙ্গদেশের প্রভাবশালী হিন্দু নেতৃবৃন্দের কাছে প্রেরিত প্যাটেলের চিঠিপত্র প্রদেশ বিভক্তি এবং একটি সার্বভৌম বঙ্গদেশের ধারণার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণে হিন্দু সম্প্রদায় এবং তার কট্টর অনুসারীদের দিকনির্দেশনা দানের সাক্ষ্য বহন করছে। প্রদেশকে অখণ্ড রাখতে মুসলিম লীগের সঙ্গে আলোচনায় বঙ্গদেশের যেসব হিন্দু নেতা সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি তাদের নিন্দা করেন।
খসড়া চুক্তির শর্তাবলীর প্রতি মুসলিম লীগ হাইকমান্ডের দৃষ্টিভঙ্গিও অনুকূল ছিল না। একথা সত্য যে, জিন্নাহ পুরোপুরি এ ধারণার বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি একটি স্বাধীন বঙ্গদেশ প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ যুগিয়েছেন। মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন যে, ভারত বিভক্ত করতে হলে পাঞ্জাব ও বঙ্গদেশকেও বিভক্ত করতে হবে। ব্রিটিশ ভাইসরয়ের এ উক্তি বিবেচনায় রেখে জিন্নাহ বঙ্গদেশ ঐক্যবদ্ধ রাখার ধারণার প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন। জিন্নাহর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বঙ্গদেশের বিভক্তি এড়িয়ে যাওয়া। ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন বঙ্গদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য জোট গঠনের সম্ভাবনা ছিল তার কাছে একটি বিকল্প চিন্তা। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি অখণ্ড বঙ্গদেশের প্রতি তার সমর্থন অব্যাহত রাখতে পারেননি। দৃশ্যত জিন্নাহ বঙ্গদেশ অখণ্ড রাখার পক্ষে মত দিলেও কয়েকটি যুক্তিতে তিনি তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন। তিনি এক পর্যায়ে বুঝতে পারেন যে, স্বাধীন বঙ্গদেশ গঠন করার ধারণা হলো পাকিস্তান সৃষ্টির ধারণা থেকে একটি বিচ্যুতি। তিনি খসড়া চুক্তিতে সন্নিবেশিত যৌথ নির্বাচন পদ্ধতির মতো কয়েকটি ছাড় দেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না।
যুক্তবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, প্রদেশে একটি কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে বাংলার হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং বঙ্গদেশের বিভক্তি রোধ করার পথে একটি বিরাট অগ্রগতি। তবে জিন্নাহ এসব বিষয়কে কখনো বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। বাংলার কোয়ালিশন সরকারের বিরুদ্ধে তার ভেটো সোহরাওয়ার্দী-বসুর ফর্মুলার প্রতি মারাত্মক আঘাত হিসাবে প্রমাণিত হয়। হিন্দুদের কাছে মুসলিম লীগ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়াই সোহরাওয়ার্দীর একমাত্র দোষ ছিল তা নয়, আরো দু’টি কারণে তারা তাকে সহ্য করতে পারতো না। একটি ছিল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং আরেকটি ছিল মন্ত্রিসভায় বর্ণহিন্দুদের প্রতিনিধিত্ব হ্রাস। ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে সোহরাওয়ার্দী মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য ১৩ থেকে ১১-তে নামিয়ে আনেন এবং তিনজন হিন্দুকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনজন হিন্দু মন্ত্রীর মধ্যে দু’জন ছিলেন তফসিলী সম্প্রদায়ের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতের প্রতি অনুসৃত ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যন্দুরা এ সত্য এড়িয়ে যেতো। দুর্ভিক্ষের সময় সোহরাওয়ার্দী সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় তার বিরুদ্ধে বাদী নীতি ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী হলেও হিদুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। কাল্পনিক অভিযোগ থেকে হিন্দুরা যুক্তবাংলা গঠনে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ব্রিটিশরা কখনো একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলা গঠনের ধারণার প্রতি পুরোপুরি বৈরি ছিল না। বাংলার গভর্নর ফ্রেডারিক বারুস মোটেও প্রদেশ বিভক্তির পক্ষে ছিলেন না। বস্তুতপক্ষে তিনি সোহরাওয়ার্দী-বসু ফর্মুলাকে সমর্থন করতেন এবং এ ফর্মুলা বাস্তবায়নে শেষ পর্যন্ত তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ব্রিটিশ ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি অখণ্ড বাংলাকে ডোমিনিয়ন মর্যাদাদানে অনিচ্ছুক ছিলেন না। তিনি সোহরাওয়ার্দীকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বঙ্গদেশ প্রশ্নে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ড অনুমোদিত যেকোনো নিষ্পত্তি ব্রিটিশ সরকার মেনে নেবে। তবে ব্র্রিটিশদেরকে সর্ব ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বঙ্গদেশকে বিচার করতে হয়েছিল। তারা একটি প্রদেশের স্বার্থে গোটা ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে আপোস করতে প্রস্তুত ছিল না। অবশেষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধিতায় বঙ্গদেশকে অখণ্ড রাখার পরিকল্পনার ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে উঠে। ভারত বিভক্তি এবং পাকিস্তান ও ভারত ডোমিনিয়নের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ১৯৪৭ সালের ৩ জুনের পরিকল্পনা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ড মেনে নিলে অখণ্ড বঙ্গদেশ কায়েমের স্বপ্ন ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়।
(লেখাটি ‘পলাশী থেকে একাত্তর’ থেকে নেয়া।)