একদিন খেলতে গিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া হলে বন্ধুরা তাকে বললো- “তুমি যাকে বাবা ডাকো, তিনি তোমার আসল বাবা নন!”
বন্ধুদের মুখে কথাটি শুনে যায়িদ যেন আকাশ থেকে পড়লেন! তিনি ছুটে গেলেন তার মায়ের কাছে। জিজ্ঞেস করলেন, “মা, রাবিয়াহ ইবনে হারাম কি আমার বাবা নন?”
ফাতিমা বিনতে সা’দ বুঝতে পারলেন, যে কথা তিনি এতোদিন ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন এখন সময় এসেছে আসল কথা বলার। তিনি যায়িদকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন- “শুনো বাবা…।”
মাত্র কৈশোরে পা দেয়া যায়িদ শুনতে লাগলেন তার জন্মের ইতিহাস।
তার বাবার নাম কিলাব ইবনে মুররাহ। এই ঘরে জন্ম নেন যুহরা ইবনে কিলাব এবং যায়িদ ইবনে কিলাব। কিলাবের মৃত্যুর পর তার মায়ের বিয়ে হয় রাবিয়াহ ইবনে হারামের সাথে। স্ত্রীকে নিয়ে রাবিয়াহ মক্কা ছেড়ে চলে যান সিরিয়ায়। সেখানে বেড়ে ওঠেন যায়িদ।
এতোদিন তিনি জেনে আসছিলেন রাবিয়াহ তার বাবা। কিন্তু, মায়ের মুখে তার আসল বাবার পরিচয় লাভের পর জানতে পারেন- তিনি এমন এক বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন যেই বংশ কাবা নির্মাণ করেছে। অর্থাৎ, তিনি ইব্রাহিম আ. এবং ইসমাইল আ. এর বংশধর।
সৎ বাবাকে এতোদিন বাবা ডাকার ফলে প্রথমে যে হীনমন্যতা তৈরি হয়েছিলো, এবার পরিচয় পাবার পর যায়িদ গর্ববোধ করতে লাগলেন। কিশোর যায়িদ সিরিয়া ছেড়ে চলে আসেন মক্কায়। এখানকার কেউ তাকে চিনে না। কারণ মক্কা শাসন করছে বনু খুজাআ নামক গোত্র, যারা জুরহুম গোত্রকে বিতাড়িত করে মক্কার শাসক হয়।
মক্কার শাসক তখন হুলাইল ইবনে হুবশিয়া। যায়িদ মক্কায় আসলে হুলাইলের অধীনে কাজ করেন। তার দক্ষতা, আমানতদারিতা দেখে মক্কার লোকজন তাকে পছন্দ করা শুরু করে। এমনকি মক্কার শাসক নিজেও যায়িদকে পছন্দ করতেন।
তার একমাত্র মেয়ে হুব্বাকে বিয়ে দিতে পাত্র খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু, হুলাইলের মনে হলো মক্কার ভেতরের কেউ যোগ্য না। এজন্য তিনি সেই ‘কিশোর আগন্তুক’ যায়িদের সাথেই মেয়েকে বিয়ে দিলেন।
চিন্তা করুন, একটা শহরের গভর্নর, মেয়র তার মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন তার একজন এমপ্লয়ির সাথে।
আর এই বিয়ে ইতিহাসের মোড় বদলে দেয়!
হুলাইল মেয়েকে বেশিই ভালোবাসতেন। তার কাছে ছেলেরা ছিলো অযোগ্য। এজন্য মৃত্যুর আগে তিনি কাবার চাবি দিয়ে যান মেয়ে হুব্বাকে।
হুব্বা কাবার চাবি পেলেও বাবার মৃত্যুর পর তিনি এক সমস্যায় পড়েন। তিনি মেয়ে মানুষ, কাবা ঘর খুলতে তো পারবেন না। এজন্য চাবিটা দিয়ে দেন তার চাচাতো ভাই আবু গুবশানকে।
আবু গুবশানের একটা বদ অভ্যাস ছিলো। আর এই এক বদ অভ্যাসই কাবার ইতিহাস বদলে দেয়।
একদিন আবু গুবশাণের প্রচন্ড নেশা ধরে। সে কোথাও মদ খুঁজে পাচ্ছিলো না। তখন একজন তাকে বললো, আমি তোমাকে মদ দিতে পারি।
আবু গুবশান মদের জন্য সবকিছু দিতে রাজি। তাকে বলা হলো, তুমি কাবা ঘরের চাবি আমাকে দিয়ে দাও, আমি এই মদের পুরো পেয়ালা তোমাকে দিয়ে দেবো। মদের নেশায় আসক্ত আবু গুবশান রাজি হয়ে যায়!
সেই বুদ্ধিমান লোক কে ছিলো যে কাবা ঘরের চাবির মালিক হন?
তিনি ছিলেন সেই যায়িদ, যিনি সুদূর সিরিয়া থেকে মক্কায় আসেন তার পিতৃপুরুষদের বানানো কাবা ঘর পুনরুদ্ধার করতে।
যায়িদ মক্কায় আসার পর থেকেই কাবা পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করেন। তার একার পক্ষে তো সম্ভব না, এজন্য তিনি তার চাচা, চাচাতো ভাই সবাইকে মক্কায় আসতে বলেন। তার ভাই যুহরা, চাচা তাইম ইবনে মুররাহ, চাচাতো ভাই মাখজুম, যুমাহ, সাহম সবাইকে একত্রিত করেন।
রাতের বেলা যায়িদ কাবার চাবি পান। সকাল হলেই আবু গাবশানের সম্বিৎ ফিরে। সবাই তাকে বললো, তুমি এ কী করলে? যাও চাবি নিয়ে আসো…।
কিন্তু, যায়িদ সেই চাবি ফিরিয়ে দিতে রাজি হলেন না। এই নিয়ে দেখা দিলো বনু খুজাআর সাথে দ্বন্দ্ব। যায়িদও প্রস্তুত। তিনি তো আগে থেকেই তার বংশের লোকজনকে মক্কায় নিয়ে এসেছেন।
তার বংশের লোকজনই হলো কুরাইশ। কুরাইশ এবং কিনানা গোত্র মিলে বনু খুজাআর সাথে যুদ্ধ হয়। অর্থাৎ যায়িদের নিজের বংশের সাথে শ্বশুরবাড়ির বংশের যুদ্ধ।
দীর্ঘ ৩০০ বছর তারা মক্কা শাসন করলেও এই ‘কিশোর আগন্তুক’ –এর মাস্টারপ্ল্যানের কাছে পরাজিত হয় বনু খুজাআ।
বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে যিনি শুনেছিলেন ‘তুমি যাকে বাবা ডাকো, তিনি তোমার আসল বাবা নন’, সেই ছেলেটি কয়েক বছরের মধ্যে হয় মক্কার শাসক।
যায়িদ ছিলো তার ডাকনাম। মক্কার লোকজণের কাছে তিনি ছিলেন আগন্তুক, কিশোর। এজন্য তারা তাকে ডাকে ‘কুসাই’ নামে।
অর্থাৎ সেই যায়িদই হলেন কুসাই ইবনে কিলাব; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পঞ্চম পূর্বপুরুষ। কুসাইয়ের ছেলে আব্দে মানাফ, আব্দে মানাফের ছেলে হাশিম, হাশিমের ছেলে আব্দুল মুত্তালিব, আব্দুল মুত্তালিবের ছেলে আব্দুল্লাহ, আব্দুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
কুসাই ইবনে কিলাবের ভাইয়ের নাম ছিলো যুহরা। এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন আমিনা। আর কুসাইয়ের বংশে আব্দুল্লাহ। তারমানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মা-বাবার বংশ গিয়ে মিলিত হয় কিলাব ইবনে মুররাহর সাথে। আর কুসাইয়ের চাচা তাইম ইবনে মুররাহ, এই বংশে জন্মগ্রহণ করেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
বন্ধুদের কথা যেমন মোটিভেট করে, তেমনি ডিমোটিভেটও করে। চিন্তা করুন, একজন মানুষ বন্ধুদের কাছে অপমানিত হবার শুনার পর কীভাবে ইতিহাস বদলে দেন!
©আরিফুল ইসলাম
হারানো ইতিহাস - Lost History
সুন্দর ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আনয়নে ইসলাম ?
একজন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ব্যবসা করতেন এবং মানুষকে ঋণ দিতেন। একদিন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। যখন হিসাব-নিকাশের জন্য দাঁড় করানো হলো, তখন ফেরেশতারা তাঁর আমলনামা খুঁজে দেখলেন; কিন্তু এমন কোনো বড় নেক আমল বা বিশেষ ইবাদত পেলেন না, যা তাঁর জন্য সুপারিশ করতে পারে। 📜⚖️
রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি সহীহ হাদীসে, যা ইমাম মুসলিম (রহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, আমাদের এ ঘটনা শুনিয়েছেন। ফেরেশতারা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি জীবনে কোনো ভালো কাজ করেছিলে?
তখন লোকটি একটি মাত্র কাজের কথা স্মরণ করল, যা সে তার ব্যবসায়িক জীবনে নিয়মিত করত। সে বলল:
**«كُنْتُ أُدَايِنُ النَّاسَ، فَآمُرُ فِتْيَانِي أَنْ يُنْظِرُوا الْمُعْسِرَ، وَيَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُوسِرِ»**
অর্থাৎ: “আমি মানুষকে ঋণ দিতাম। তারপর আমার কর্মচারীদের নির্দেশ দিতাম যেন তারা অভাবগ্রস্ত ও ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তিকে সময় দেয় এবং সচ্ছল ব্যক্তির ক্ষেত্রেও কিছুটা ছাড় ও সহনশীলতা প্রদর্শন করে।”
লোকটি বলল: “আমার তেমন উল্লেখযোগ্য ইবাদত ছিল না। কিন্তু আমি একজন ব্যবসায়ী ছিলাম। মানুষকে ঋণ দিতাম। আর আমার কর্মচারীদের বলতাম—যদি কোনো দরিদ্র ও অসহায় ঋণগ্রহীতাকে পাও, যে ঋণ পরিশোধ করতে অক্ষম, তবে তাকে মাফ করে দাও, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার কাছ থেকে কিছু দাবি করো না। আর যদি কোনো সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে পাও, যে সামান্য বিলম্ব করছে, তবে তার প্রতিও ধৈর্য ধরো এবং তাকে সময় দাও।” 💰🤝
একবার কল্পনা করুন! এমন একজন মানুষ, যার উল্লেখযোগ্য কোনো নেক আমল ছিল না; কিন্তু সে ঋণগ্রস্ত মানুষের মন ভাঙেনি, তাদের প্রতি দয়া করেছে এবং ঋণের অপমান ও কষ্ট থেকে তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। তাহলে সেই মহান আল্লাহ, যার রহমত সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, তিনি তার সঙ্গে কী আচরণ করবেন?
যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তার এই কথা শুনলেন, তখন তিনি ফেরেশতাদের উদ্দেশে এক মহামূল্যবান ঘোষণা দিলেন:
**«نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ، تَجَاوَزُوا عَنْهُ»**
অর্থাৎ: “সে যখন আমার বান্দাদের প্রতি ক্ষমাশীলতা দেখিয়েছে, তখন আমিই তো তার চেয়ে অধিক ক্ষমার যোগ্য। তোমরা আমার এই বান্দাকে ক্ষমা করে দাও।”
আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বললেন: “এই ব্যক্তি আমার বান্দাদের ক্ষমা করত, তাদের প্রতি উদারতা দেখাত; অথচ সে ছিল একজন সাধারণ মানুষ। আমি তো তার চেয়েও অধিক দয়ালু ও অধিক ক্ষমাশীল। সুতরাং তোমরা তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দাও।” ✨🕊️
এই ঘটনার মহান শিক্ষা হলো—**“الْجَزَاءُ مِنْ جِنْسِ الْعَمَلِ”** অর্থাৎ “কর্মের প্রতিদান কর্মের অনুরূপ হয়।”
যে পৃথিবীতে মানুষের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ আকাশ থেকে তার প্রতি দয়া করেন। যে ঋণগ্রস্ত ও অভাবী মানুষের জন্য সহজতা সৃষ্টি করে, যে নিজের কিছু অধিকার ছেড়ে দিয়ে কারও দুঃখ-কষ্ট দূর করার চেষ্টা করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের বোঝা হালকা করে—হয়তো সেই গোপন আমলই কিয়ামতের দিন তার মুক্তির কারণ হবে; আল্লাহ তার মাধ্যমে গুনাহ মাফ করবেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। ❤️
**اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ ﷺ**
11/06/2026
একজন ক্রীতদাস রাখালের সেই উত্তর যা আমিরুল মুমিনিনকে কাঁদিয়েছিল:
আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর (রা.) একবার মদীনার বাইরে পথ চলছিলেন। পথে তিনি এক রাখাল বালককে দেখলেন, যে এক পাল ছাগল চরাচ্ছিল। হযরত ওমর (রা.) তাকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
তিনি রাখালকে বললেন, "এখান থেকে আমাকে একটি ছাগল বিক্রি করো।" রাখাল উত্তর দিল, "আমি এই ছাগলগুলোর মালিক নই, আমি একজন গোলাম মাত্র। এগুলো আমার মালিকের"।
হযরত ওমর (রা.) তাকে প্রলুব্ধ করার জন্য বললেন, "তোমার মালিককে বলবে যে, নেকড়ে একটি ছাগল খেয়ে ফেলেছে। তিনি তো আর দেখতে আসছেন না, আর তুমি এর দাম নিজের পকেটে রাখতে পারবে।"
রাখাল বালকটি হযরত ওমর (রা.)-এর এই কথা শুনে চমকে উঠল। সে আকাশের দিকে আঙুল তুলে এক অদ্ভূত কিন্তু শক্তিশালী প্রশ্ন করল,
"ফা-আইনাল্লাহ? (তাহলে আল্লাহ কোথায়?)"
অর্থাৎ, "মালিক না দেখলেও আল্লাহ তো দেখছেন! তাঁকে আমি কী জবাব দেব?"
এই সামান্য রাখালের মুখে আল্লাহর ওপর এমন অগাধ বিশ্বাস এবং আমানতদারিতা দেখে হযরত ওমর (রা.) কেঁদে ফেললেন।
তিনি তৎক্ষণাৎ সেই রাখালের মালিকের কাছে গেলেন, গোলামকে চড়া দামে কিনে নিলেন এবং মুক্ত করে দিলেন।
তিনি বললেন, "তোমার এই একটি কথাই তোমাকে দুনিয়াতে মুক্ত করেছে এবং আশা করি আখেরাতেও তোমাকে মুক্তি দেবে।"
আমানতদারিতা মানে কেবল মানুষের কাছে বিশ্বস্ত থাকা নয়, বরং আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করা।
নির্জনে বা গোপনে গুনাহ না করাই হলো প্রকৃত তাকওয়া।
সততা মানুষকে কেবল সম্মানই দেয় না, বরং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকেও মুক্তি দেয়।
আজকের এই যুগে যখন মানুষ সুযোগ পেলেই অন্যের হক আত্মসাৎ করে, সেখানে এই রাখালের "ফা-আইনাল্লাহ" প্রশ্নটি আমাদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
© Salman Farsi
তথ্যসূত্র:
امانت و دیانت کی اہمیت و فضیلت
11/06/2026
একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার একটি পথ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। পথে একটি সাধারণ, ছোট্ট ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এক বৃদ্ধা মহিলার কণ্ঠে গভীর একাগ্রতা ও খুশূর সঙ্গে কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি তিলাওয়াত করছিলেন—
﴿هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ﴾
“তোমার কাছে কি আচ্ছন্নকারী (কিয়ামতের) সংবাদ পৌঁছেছে?”
নবী ﷺ ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। যেন এই আয়াতটি সরাসরি তাঁর হৃদয়কে সম্বোধন করছিল। কিছুক্ষণ তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর অত্যন্ত বিনয় ও খুশূভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন—
«نَعَمْ أَتَانِي، نَعَمْ أَتَانِي، نَعَمْ أَتَانِي»
“হ্যাঁ, আমার কাছে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, আমার কাছে পৌঁছেছে। হ্যাঁ, আমার কাছে পৌঁছেছে।”
এটি ছিল না কেবল কুরআনের শব্দ শোনা; বরং আল্লাহর কালামের সঙ্গে তাঁর পবিত্র হৃদয়ের জীবন্ত মিথস্ক্রিয়া।
দিন গড়িয়ে গেল...
আরেকদিন নবী ﷺ মসজিদে বনী যাফার-এ প্রবেশ করলেন। সেখানে একটি পাথরের ওপর বসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মহান সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)।
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দিকে ফিরে বললেন—
«اقْرَأْ عَلَيَّ الْقُرْآنَ»
“আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বিস্মিত হয়ে বললেন—
«يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ؟»
“হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনাকে কুরআন পড়ে শোনাব, অথচ আপনার ওপরই তো তা অবতীর্ণ হয়েছে?”
তিনি জানতেন, নবী ﷺ স্বয়ং জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-এর মাধ্যমে ওহি গ্রহণ করেন।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন—
«إِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي»
“আমি অন্যের মুখ থেকে কুরআন শুনতে ভালোবাসি।”
তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সূরা আন-নিসা তিলাওয়াত শুরু করলেন। নবী ﷺ গভীর মনোযোগ ও প্রশান্তির সঙ্গে শুনতে লাগলেন।
অবশেষে তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন—
﴿فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَىٰ هَؤُلَاءِ شَهِيدًا﴾
“তখন কী হবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং আপনাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব?”
হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর দৃষ্টি নবী ﷺ-এর দিকে তুললেন...
এবং দেখলেন, তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে।
এ ছিল আল্লাহর কালামের প্রভাবে সিক্ত হৃদয়ের অশ্রু।
এ ছিল খুশূ, ভয়, দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসায় ভরা অশ্রু।
এভাবেই কুরআনের সঙ্গে নবী ﷺ-এর সম্পর্ক ছিল। তিনি কেবল কুরআন তিলাওয়াত করতেন না; বরং এর প্রতিটি আয়াতকে হৃদয়ে ধারণ করতেন, এর অর্থ নিয়ে বাঁচতেন এবং এর প্রভাবে অশ্রুসিক্ত হতেন।
তাই যখন উম্মুল মুমিনীন আয়িশা সিদ্দীকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে নবী ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি এমন একটি বাক্য বলেছিলেন, যা তাঁর সমগ্র জীবনকে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে—
«كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ»
“তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন।”
অর্থাৎ কুরআনের আদেশ, নিষেধ, দয়া, ন্যায়, ধৈর্য, ক্ষমা, বিনয় ও উত্তম আচরণ—সবকিছুর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। কুরআন ছিল তাঁর জীবন, তাঁর চরিত্র এবং তাঁর চলার পথ। ﷺ.
10/06/2026
হিজরতের চার বছর পর। রাসূলুল্লাহ ﷺ খবর পেলেন, নজদের গাতাফান গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তিনি চারশতেরও বেশি সাহাবী নিয়ে তাদের মোকাবেলায় বেরিয়ে পড়লেন। মদীনার দায়িত্ব দিলেন উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ওপর।
দলে ছিলেন তরুণ আনসারী সাহাবী আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
অভিযানে পৌঁছে দেখলেন, শত্রুপক্ষের পুরুষরা পাহাড়ে পালিয়ে গেছে। আসরের ওয়াক্ত এলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ আশঙ্কা করলেন, নামাজের সময় শত্রু হামলা করতে পারে। তিনি সাহাবীদের দুই দলে ভাগ করে সালাতুল খাওফ আদায় করলেন—একদল নামাজ পড়ছে, অন্যদল পাহারা দিচ্ছে।
শত্রুরা মুসলমানদের সুশৃঙ্খল কাতার দেখে আর আক্রমণ করার সাহস পেল না।
সেই রাত — উপত্যকার মুখে
ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি উপত্যকায় রাতের জন্য তাঁবু ফেললেন।
সবাই বিশ্রামে গেলে রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন—
“আজ রাতে কে আমাদের পাহারা দেবে?”
সঙ্গে সঙ্গে দুই কণ্ঠ একসাথে বলে উঠল—“আমরা, ইয়া রাসূলাল্লাহ!”
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু—যাদেরকে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনায় আগমনের পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন।
উভয়ে উপত্যকার মুখে গিয়ে পাহারায় দাঁড়ালেন। আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, আম্মার ক্লান্ত। জিজ্ঞেস করলেন—“রাতের কোন অংশে ঘুমাতে চাও—আগেরটা না পরেরটা?”
আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন—“আমি আগের অংশে ঘুমাব।” বলেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
নামাজ শুরু হলো
রাত স্থির ও শান্ত। তারা, গাছ ও পাথর যেন নিঃশব্দে তাদের রবের তাসবীহ করছে। আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রশান্তি অনুভব করলেন। কোনো নড়াচড়া নেই, কোনো হুমকির চিহ্ন নেই। তিনি ভাবলেন—এই সময়টা ইবাদত ও কুরআন তিলাওয়াতে কাটাই।
তিনি নামাজে দাঁড়ালেন। কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন।
তিনটি তীর
তখন শত্রুপক্ষের একজন লোক অন্ধকারে এগিয়ে এলো। আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নামাজে দেখে সে একটি তীর ছুড়ল।
তীরটি আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর শরীরে বিদ্ধ হলো।
তিনি শান্তভাবে তীরটি টেনে বের করলেন—এবং তিলাওয়াত চালিয়ে গেলেন।
শত্রু দ্বিতীয় তীর ছুড়ল।
সেটিও লক্ষ্যভেদ করল। আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সেটিও টেনে বের করলেন। তারপর তৃতীয় তীর এলো।
তিনবার তীর বিদ্ধ হলো—তিনবারই টেনে বের করলেন।
তৃতীয় তীরের ব্যথায় তিনি রুকুতে গেলেন, তারপর সিজদায়। সিজদারত অবস্থায় তিনি তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নাড়া দিলেন। আম্মার জেগে উঠলেন।
আব্বাদ নামাজ শেষ করলেন। তারপর বললেন—“উঠুন, আমার জায়গায় পাহারা দিন। আমি আহত হয়েছি।”
আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু লাফিয়ে উঠে চিৎকার করলেন। তাদের দুজনকে দেখে শত্রু অন্ধকারে পালিয়ে গেল।
আম্মারের প্রশ্ন — আব্বাদের উত্তর
আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাদের দিকে ফিরলেন—মাটিতে শুয়ে আছেন, তিন জায়গা থেকে রক্ত ঝরছে।
আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন—“ইয়া সুবহানাল্লাহ! প্রথম তীর লাগার সময়ই কেন আমাকে জাগালেন না?”
আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দিলেন—
“আমি এমন একটি সূরা তিলাওয়াত করছিলাম, যা আমার আত্মাকে ভয় ও ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিল। আমি সেই তিলাওয়াত মাঝপথে কাটতে চাইনি।
আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ পালনে ব্যর্থ হওয়ার ভয় না থাকলে, আমি তোমাকে জাগাতাম না। এমনকি মারা গেলেও সেই তিলাওয়াত শেষ না করে নামাজ ভাঙতাম না।”
— আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু আনহু
(আবু দাউদ, হাদিস: ১৯৮ | শুআবুল ঈমান — ইমাম বায়হাকী রহ.)
আব্বাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কে ছিলেন?
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন কুরআনের বন্ধু—“সাহিবুল কুরআন”। তিনি রাতের পর রাত কুরআন তিলাওয়াতে কাটাতেন।
আলী ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত আছে—নামাজের সময় হলে তাঁর চেহারার রং বদলে যেত, শরীর কাঁপত। জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন—
“আল্লাহর আমানত পালনের সময় এসেছে—যে আমানত আসমান, জমিন ও পাহাড় বহন করতে অস্বীকার করেছিল।”
এটিই ছিল সাহাবায়ে কেরামের নামাজ।
শিক্ষা
ইমাম আল-বায়হাকী রহ. এই ঘটনাটি শুআবুল ঈমান-এ ‘সালাত ও খুশু ঈমানের শাখা’ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, নামাজের খুশু কেবল শরীরের নম্রতা নয়; এটি হৃদয়ের এমন একটি অবস্থা, যেখানে পৌঁছালে শরীরের ব্যথাও আল্লাহর সঙ্গে সেই সংযোগ ভাঙতে পারে না।
আব্বাদ ইবনে বিশর রাদিয়াল্লাহু আনহু তীরের ব্যথায় কাতর হননি—কারণ তিনি তখন অন্য এক জগতে ছিলেন; আল্লাহর কালামের জগতে।
সেই জগতে তিনবার তীর বিদ্ধ হওয়াও তাঁকে ফেরাতে পারেনি।
সূত্র: শুআবুল ঈমান — ইমাম বায়হাকী রহ. | আবু দাউদ (হাদিস: ১৯৮) | ইবনে হিব্বান | ইয়াহইয়া ইবনে শারাফ আন-নববী: সহীহ | ইবনে কাসীর: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
(ইমাম বায়হাকী রহ.: ৩৮৪–৪৫৮ হিজরি)
09/06/2026
আল্লামা ইকবালের কাছে এসে কাশ্মীরের একজন পীরজাদা কাঁদতে লাগলেন!
ইকবাল বুঝতে পারছেন না তাঁকে দেখে তিনি কাঁদছেন কেনো?
কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে পীরজাদা একটি স্বপ্নের কথা বললেন।
একবার তিনি স্বপ্নে দেখেন সবাই নামাজে দাঁড়িয়েছেন। কাতার সোজা করা হচ্ছে। নামাজ পড়াচ্ছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!
পেছন ফিরে মুসল্লিদের দেখে রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন, “ইকবাল কি এখনো আসেনি?”
জানানো হলো, না এখনো আসেননি। তখন একজন লোক পাঠানো হলো।
কিছুক্ষণের মধ্যে ইকবাল এসে পৌঁছালেন। কাতারের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গেলেন।
সেই পীরজাদা বলেন, এই স্বপ্নের আগে আমি কখনো আপনার চেহারা দেখিনি। আজ বাস্তবে দেখে মনে পড়ছে, সেদিন স্বপ্নে হুবহু আপনাকে দেখেছিলাম। আর আমার কানে ভাসছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন- “ইকবাল এখনো আসেনি?”
©Ariful Islam
(তথ্যসূত্র: স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ (সা.), মাওলানা মুহিউদ্দিন খান, পৃষ্ঠা ১৫০-১৫১)
09/06/2026
উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর মজলিসে সিরিয়ার এক লোক নিয়মিত আসতো। হঠাৎ বেশ কিছুদিন লোকটিকে দেখা যাচ্ছিল না। উমর রা. খেয়াল করলেন তার অনুপস্থিতি। তিনি সাথিদের জিজ্ঞেস করলেন,
"আচ্ছা, অমুক লোকটার কী খবর? তাকে তো কদিন ধরে দেখছি না!"
সাহাবিরা বিষণ্ণ মুখে উত্তর দিলেন,
"হে আমীরুল মুমিনীন, লোকটা তো মদে আসক্ত হয়ে পড়েছে। নেশার ঘোরেই তার দিন কাটছে আজ কদিন ধরে।"
খবরটা শুনে উমর রা. তাকে ত্যাজ্য করলেন না, কিংবা সমাজ থেকে ছুড়ে ফেলার নির্দেশ দিলেন না। বরং তিনি তার লেখকের হাতে কলম ধরিয়ে দিলেন। বললেন, "লেখো—"
"উমরের পক্ষ থেকে অমুকের প্রতি, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমি তোমার কাছে সেই আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। অতঃপর তিনি কুরআনের আয়াতাংশ উল্লেখ করেন :
{ غَافِرِ الذَّنبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيدِ الْعِقَابِ ذِي الطَّوْلِ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ إِلَيْهِ الْمَصِيرُ } [غافر : 3]
'তিনি গুনাহ ক্ষমা করেন, তওবা কবুল করেন, আবার শাস্তিদানেও যিনি কঠোর এবং বড়ই দয়ালু। তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তাঁর কাছেই সবাইকে ফিরে যেতে হবে।"- সূরা গাফির:৩
চিঠিটা লিখে তিনি সাথিদের দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত আবেদন করলেন। বললেন,
"চলো, আমরা সবাই মিলে আমাদের এই ভাইটার জন্য মন থেকে দোয়া করি। আল্লাহর কাছে চাই—তিনি যেন তার অন্তরটাকে ঘুরিয়ে দেন এবং তার তওবা কবুল করেন।"
ওদিকে লোকটার হাতে যখন আমীরুল মুমিনীনের চিঠিটা পৌঁছালো, সে অবাক হয়ে বারবার সেটি পড়তে লাগল। 'গুনাহ মাফ করেন, তওবা কবুল করেন, আবার শাস্তিতেও কঠোর'—এই শব্দগুলো তার হৃদয়ে হাতুড়ির মতো ঘা দিচ্ছিল। সে ভাবল, "আল্লাহ একদিকে আমাকে তাঁর আজাব সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, আবার অন্যদিকে আমাকে মাফ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন!"
একা একা সে ডুকরে কেঁদে উঠল। সেই চোখের পানিতে তার অতীতের সব কলঙ্ক ধুয়ে গেল। সে ফিরে এল আলোর পথে।
যখন উমর রা. এই সুসংবাদ পেলেন, উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে এক কালজয়ী কথা বলেন। বললেন—
"তোমাদের কোনো ভাই যখন ভুল পথে পা বাড়ায়, তখন তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে এভাবেই পাশে দাঁড়াও। তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো। তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে শয়তানকে সাহায্য করো না।"
সূত্র : তাফসিরু ইবনে কাসির (সূরা গাফিরের ৩নং আয়াত)
সংগৃহীত
09/06/2026
চলন্ত ট্রেনে কুরআন দরস, গোপনে আযানঃ তুরষ্কে ইসলাম পুনরুত্থানের উপাখ্যান
১৯২৩ সালে মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে যখন আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্রের জন্ম হয়। তখন নব্য শাসকগোষ্ঠী উসমানীয় (অটোমান) আমলের অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে দেশকে পশ্চিমা ধাঁচে আধুনিকায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের এই দর্শনকে বলা হতো "কামালিজম" (Kamalism), যার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতা (Laiklik)।
এই নীতির অধীনে ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য একের পর এক কঠোর আইন পাস করা হয়।
১৯২৪ সালের ৩ মার্চ তুরস্কের গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি (TBMM) বা সংসদে একই দিনে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক আইন পাস করা হয়, যা তুরস্কের হাজার বছরের ইসলামি কাঠামোর মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
আইন নম্বর ৪৩১ খিলাফতের অবসান। এই আইনের মাধ্যমে উসমানীয় খিলাফতকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন শেষ খলিফা ২য় আব্দুল মেজিদ এবং উসমানীয় রাজপরিবারের সকল সদস্যকে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) পরের দিন ভোরের মধ্যে তুরস্কের ভূখণ্ড ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়!
আইন নম্বর ৪৩০ শিক্ষা ব্যবস্থার একীকরণ - Tevhid-i Tedrisat Kanunu। এই আইনের মাধ্যমে তুরস্কের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে (Maarif Vekaleti) দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একমাত্র নিয়ন্ত্রক ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সুন্নি ইসলামি বিশ্বের প্রধান স্তম্ভ, সব ধরনের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা, ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র এবং সুফি খানকাহ ও দরগাহগুলো চিরতরে নিষিদ্ধ ও সিলগালা করে দেওয়া হয়।
আইন নম্বর ৪২৯ শরিয়াহ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয় বিলুপ্তি। উসমানীয় আমলের ‘শরিয়াহ ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়’ (Şeriyye ve Evkaf Vekaleti) বিলুপ্ত করে তার জায়গায় 'ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর' (Diyanet İşleri Başkanlığı) গঠন করা হয়। তবে এই নতুন সংস্থাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে এনে এর সমস্ত রাজনৈতিক ও আইনি ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং এটি কেবল নামাজের সময়সূচি ও সীমিত ধর্মীয় আচার দেখভালের সংস্থায় পরিণত হয়।
২৫ নভেম্বর, ১৯২৫। তুর্কিদের বাহ্যিক অবয়ব থেকে ইসলামি ও প্রাচ্য সংস্কৃতির ছাপ মুছে ফেলে তাদের ইউরোপীয়দের মতো দেখাতে এই আইন করা হয়।
টুপি আইন-আইন নম্বর ৬৭১৷ এই আইনের মাধ্যমে উসমানীয়দের ঐতিহ্যবাহী প্রতীক 'ফেজ টুপি' (Fez) এবং পাগড়ি পরা সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়। আইন করা হয়, সকল সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিকদের জনসমক্ষে ইউরোপীয় ধাঁচের হ্যাট বা হ্যামবার্গ হ্যাট পরতে হবে।
এই আইনের বিরুদ্ধে আনাতোলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন: রিজে, মারাশ, এরজুরুম) তীব্র গণবিক্ষোভ শুরু হয়। সরকার 'আদালতে ইস্তিকলাল' (স্বাধীনতা আদালত) গঠন করে সামরিক আদালতের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করে। টুপি পরতে অস্বীকৃতি জানানো এবং এই আইনের সমালোচনা করার অপরাধে “ইসকিলিপলি আতিফ হোজা (İskilipli Atıf Hoca)” নামক একজন প্রখ্যাত আলেমকে ১৯২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফাঁ.সি দেওয়া হয়।
ধর্মীয় পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইন পাশ হয় ৩ ডিসেম্বর, ১৯৩৪। আইন নম্বর ২৫৯৬। এর মাধ্যমে মুসলিম ওলামা এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতদের জন্য উপাসনালয়ের (মসজিদ/গির্জা) বাইরে ধর্মীয় পোশাক বা আলখাল্লা পরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। কেবল মাত্র রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত প্রধান মুফতি (Diyanet İşleri Başkanı) এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে ছিলেন।
হিজাবের ওপর অলিখিত সামাজিক নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। যদিও নারীদের হিজাব বা বোরকা সরাসরি নিষিদ্ধ করে কোনো লিখিত সংসদীয় আইন পাস করা হয়নি, তবে সরকারি ডিক্রি এবং প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি অফিসে হিজাব পরা নারীদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয় (বাংলাদেশে এই প্রাকটিস শুরু হয়েছিলো, এখনো কিছু কিছু জায়গায় আছে)। সমাজ ও আধুনিক রাষ্ট্র থেকে হিজাব পরিহিত নারীদের সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল।
১ নভেম্বর,১৯২৮। ল্যাটিন হরফ প্রবর্তন ও আরবি ভাষার উচ্ছেদ করা হয়। এই আইনটি ছিল তুর্কি সমাজকে তাদের অতীত ইতিহাস ও ইসলামি ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার। আইন নম্বর ১৩৫৩, তুর্কি বর্ণমালা আইন। এর মাধ্যমে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসা আরবি-ফারসি ভিত্তিক উসমানীয় তুর্কি লিপির ব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ল্যাটিন (ইংরেজি) অক্ষরের ওপর ভিত্তি করে নতুন তুর্কি বর্ণমালা চালু করা হয়। এখানে উল্লেখ্য উসমানী আমলে রাজপরিবারে ফার্সি ভাষাও চালু ছিলো।
১৯২৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশের সব ধরনের সংবাদপত্র, বই, সরকারি দলিলপত্র এবং আদালতে আরবি অক্ষরের ব্যবহার সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। এর ফলে রাতারাতি তুরস্কের ৯৯% মানুষ নিরক্ষর হয়ে পড়ে! তারা তাদের পূর্বপুরুষদের লেখা বই, ইতিহাস, দলিল এমনকি কবরের ফলক পড়ার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলে। একই সাথে সরকারিভাবে আরবি ও ফারসি ভাষার সব ধরনের ক্লাস ও শিক্ষাদান স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কামালিস্ট সরকারের সংস্কার যখন চূড়ান্ত রূপ নেয়, তখন সরাসরি মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় ইবাদত ও আযানের ওপর আঘাত আসে।
সরকারি ডিক্রি জারি- ৩০ জানুয়ারি, ১৯৩২। অফিসিয়ালি কামাল আতাতুর্কের নির্দেশে এবং সরকারি ধর্মীয় সংস্থা ‘দিয়ানেত’-এর আদেশে ১৯৩২ সালের ৩০ জানুয়ারি থেকে তুরস্কের সকল মসজিদে আরবি ভাষায় আযান দেওয়া এবং সালাতের ভেতর আরবিতে ইকামত দেওয়া সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরিবর্তে তুর্কি ভাষায় অনুবাদ করা আযান জোরপূর্বক চালু করা হয় (যেমন: আল্লাহু আকবার-এর জায়গায় বলা হতো তানরি উলুদুর)।
১৯৩২ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত আরবি আযানের নিষেধাজ্ঞা কেবল প্রশাসনিক আদেশে চললেও,১৯৪১ সালের ২ জুন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইসমত ইনোনুর শাসনামলে তুর্কি দণ্ডবিধির (Turkish Penal Code) ধারা ৫২৬ সংশোধন করা হয়। এই নতুন সংশোধনী অনুযায়ী: "যারা আরবি ভাষায় আযান দেবে বা ইকামত দেবে, তাদের ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ১০ থেকে ২০০ লিরা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়।"
এই আইনের অধীনেই ঘরের ভেতর বা বাইরে যেকোনো জায়গায় আরবি হরফে কুরআন শিক্ষা দেওয়া, তিলাওয়াত শেখানো বা হিফজ করানো রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে গণ্য হতে শুরু করে। যেহেতু মাদ্রাসাগুলো আগেই বন্ধ করা হয়েছিল, তাই আরবি কায়দা বা কুরআন নিজের সন্তানদের শেখানোও অপরাধের তালিকায় চলে যায়।
এই দুই দশক (বিশেষ করে ১৯৩২ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত) তুরস্কের গ্রামীণ এবং রক্ষণশীল অঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল এক বিভীষিকাময় সময়। আইনগুলো বাস্তবায়নের জন্য গ্রামীণ সামরিক পুলিশ এবং বেসামরিক গোয়েন্দাদের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
গ্রামীণ অঞ্চলের জেন্ডারমারি পুলিশ বা ঘোড়সওয়ার বাহিনী যেকোনো সময় সন্দেহ হলেই সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, শস্যের গোলা বা খামারবাড়িতে অতর্কিত হানা দিত। যদি ঘরের কোনো গোপন কুঠুরি, সিন্দুক বা বালিশের নিচেও কোনো আরবি কায়দা, উসমানীয় আমলের ধর্মীয় বই বা কুরআনের অনুলিপি পাওয়া যেত, তবে পুরো পরিবারকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হতো। (বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট জমানায় জিহাদি বই, গোপন মিটিংয়ের নামে গন গ্রেফতার দিয়ে অনুধাবন করতে পারেন।)
আরবি কুরআন বা আযানের অপরাধে ধরা পড়লে ওলামা এবং সাধারণ মানুষদের প্রথমে স্থানীয় সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের দাড়ি কেটে ফেলা হতো, প্রহার করা হতো এবং মাসের পর মাস অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হতো (কল্পনা করুন আয়নাঘর)। অনেকে 'আদালতে ইস্তিকলাল'-এর বিচারে দীর্ঘমেয়াদি সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতেন।
এই সময় তুর্কি মুসলমানরা তাদের ঘরের মূল্যবান ও প্রাচীন ইসলামি বই এবং কুরআনের কপিগুলো জেন্ডারমারির হাত থেকে বাঁচাতে কাপড়ে মুড়িয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখতেন বা খড়ের গাদার ভেতর লুকিয়ে রাখতেন। বহু প্রাচীন পান্ডুলিপি পুলিশি তল্লাশির ভয়ে নদী বা কুয়ায় ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ।
গ্রামে যখন কেউ গোপনে আরবিতে আযান দেওয়ার চেষ্টা করত, তখন অন্য যুবকেরা লাঠি বা অস্ত্র নিয়ে গ্রামের প্রবেশমুখে পাহারা দিত, যাতে দূর থেকে জেন্ডারমারি বা সরকারি ঘোড়সওয়ারদের আসতে দেখলে সংকেত দেওয়া যায়। সংকেত পাওয়া মাত্রই আযান বন্ধ করে সবাই সাধারণ চাষী বা শ্রমিকের ছদ্মবেশ ধারণ করত।
কামালের দুই দশকের চরম অন্ধকার সময়ে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ধারাকে বাঁচিয়ে রাখতে যিনি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি হলেন আল্লামা সুলাইমান হিলমি তুনাহান (১৮৮৮–১৯৫৯)। তিনি ছিলেন উসমানীয় আমলের একজন শীর্ষস্থানীয় আলিম, ফিকহ শাস্ত্রবিদ এবং আইনবিদ। যখন সব মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়া হলো, তিনি দমে যাননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কুরআন শিক্ষা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী এক প্রজন্মের মধ্যে তুরস্ক থেকে ইসলামের নাম নিশানা মুছে যাবে। তাই তিনি শুরু করলেন এক গোপন ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরোধ যুদ্ধ। যেহেতু সাধারণ ঘরবাড়ি, মসজিদ বা বাগানে বসলে সহজেই সরকারি গোয়েন্দা (MIT) বা পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয় ছিল, তাই সুলাইমান হিলমি তুনাহান এক অভিনব বুদ্ধি বের করলেন। তিনি তার ছাত্রদের নিয়ে দূরপাল্লার ট্রেনের পুরো একটি বগি বা কয়েকটি বগির টিকিট কাটতেন।
ট্রেন যখন স্টেশন ছেড়ে এক শহর থেকে অন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতো, তখন তিনি সাধারণ যাত্রী সেজে ছাত্রদের নিয়ে বসতেন।
ট্রেন চলতে শুরু করলেই শুরু হতো হিফজ এবং কুরআনের পাঠ। জানালা দিয়ে বাইরে নজর রাখা হতো। ট্রেন যখন কোনো স্টেশনে থামার উপক্রম হতো, সঙ্গে সঙ্গে কুরআনের কপিগুলো লুকিয়ে ফেলা হতো এবং শিক্ষকরা সাধারণ কাপড়ের ব্যবসায়ী বা মুসাফিরের ছদ্মবেশ ধারণ করতেন।
স্টেশন পার হয়ে ট্রেন আবার গতি নিলে পাঠদান শুরু হতো। এভাবে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চলন্ত ট্রেনের গতিকে কাজে লাগিয়ে তারা কুরআন শিক্ষা সচল রেখেছিলেন।
শুধু ট্রেন নয়, সুলাইমান হিলমি তুনাহান এবং তার অনুসারীরা শহরের উপকণ্ঠে প্রত্যন্ত খামারবাড়ি ভাড়া নিতেন। সেখানে ছাত্ররা দিনের বেলা কৃষি শ্রমিক বা রাখাল হিসেবে কাজ করত, যাতে কেউ সন্দেহ না করে। আর রাতের আঁধারে মোমবাতি জ্বালিয়ে চলত কুরআনের দরস। কখনো কখনো তারা শহরের কোলাহল থেকে দূরে জনমানবহীন পাহাড়ের গুহায় গিয়ে আশ্রয় নিতেন সুরা কাহফের যুবকদের মত এবং দিনের পর দিন সেখানে অবস্থান করে দ্বীনি ইলম অর্জন করতেন।
এই কাজের জন্য সুলাইমান হিলমি তুনাহানকে বহুবার গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, কারাবরণ করতে হয়েছে এবং অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি তার মিশন থেকে এক চুলও নড়েননি।
সুলাইমান হিলমি তুনাহান এবং তার মতো অন্যান্য মনীষীদের (যেমন: বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি) এই গোপন ও আত্মত্যাগী সংগ্রামের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। তারা যদি সেদিন এই ঝুঁকি না নিতেন, তবে তুরস্কের সমাজ ব্যবস্থা থেকে ইসলাম সম্পূর্ণ হারিয়ে যেত।
তুরস্কের ইতিহাসের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির অবসান ঘটে ১৯৫০ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে। কট্টর সেক্যুলার দল 'সিএইচপি' (CHP) নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয় এবং জননেতা আদনান মেন্দেরেস (Adnan Menderes)এর ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় আসে।
ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায়, ১৯৫০ সালের ১৬ জুন, আদনান মেন্দেরেসের সরকার তুর্কি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দণ্ডবিধির ৫২৬ ধারা বাতিল করে এবং দীর্ঘ ১৮ বছর পর তুরস্কে পুনরায় সরকারিভাবে আরবি ভাষায় আযান দেওয়ার অনুমতি ফিরিয়ে দেয়। যেদিন এই আইন পাস হয়, সেদিন পুরো তুরস্কের মানুষ রাস্তায় নেমে আনন্দাশ্রু বিসর্জন দিয়েছিল এবং প্রতিটি মসজিদে একের পর এক বহুবার আরবিতে আযান দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও আবেগ প্রকাশ করেছিল। মানুষের ভিতর লুকিয়ে রাখা ধর্মীয় আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে।
১৯৫০ সালে তুরস্কে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা এবং আদনান মেন্দেরেসের নেতৃত্বাধীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ক্ষমতায় আসা ঠিক যেন বাংলাদেশে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন আদনান মেন্দেরেস হয়ে এসেছিলেন। এরপর সুলাইমান হিলমি তুনাহানের এই গোপন আন্দোলন প্রকাশ্যে আসে। আজ তুরস্কে এবং ইউরোপে তাদের হাজার হাজার "কুরআন কোর্স" (Kur'an Kursu) এবং ছাত্রাবাস রয়েছে। তুরস্কের ইসলামি পুনরুত্থানের পেছনে এই সুলাইমানি জামাত অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এই নীরব বিপ্লবের ফলেই তুরস্কের সাধারণ মানুষের অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা অক্ষুণ্ন থাকে। যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নাজমুদ্দিন এরবাকানের "মিল্লি গুরুশ" (National Outlook) আন্দোলনের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ২০০২ সালে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের একে পার্টির (AK Party) ক্ষমতায় আসার মাধ্যমে। এরদোয়ানের গত দুই দশকের শাসনামলে হিজাবের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। 'ইমাম হাতিপ' (ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত রূপ) স্কুলগুলোর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়াকে পুনরায় মসজিদে রূপান্তর করা হয়েছে।
আজকের তুরস্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটি তার অটোমান বা ইসলামি অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত তৎপর। তবে তুরস্কের ইসলামের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দুটি বিপরীতমুখী ধারা আমাদের সামনে আসে। বর্তমান তুরস্কের সরকার ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষা, ফিলিস্তিনসহ বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর পক্ষে দাঁড়ানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নেতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
তুরস্কের ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর বা "দিয়ানেত" (Diyanet) এখন অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এর বাজেট ও প্রভাব তুরস্কের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের চেয়েও বেশি। তারা বিশ্বজুড়ে মসজিদ নির্মাণ এবং ইসলামি সংস্কৃতির প্রচার করছে।
তুর্কি ড্রামা বা সিরিজগুলো (যেমন: দিরিলিস আরতুগ্রুল, কুরুলুস ওসমান, পায়িতাহত আব্দুল হামিদ) বিশ্বজুড়ে মুসলিম যুবসমাজের মধ্যে এক ধরনের ইসলামি আত্মমর্যাদাবোধ ও ইতিহাস সচেতনতা তৈরি করছে।
তুরস্কে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন প্রজন্মের একটি অংশের মধ্যে ধর্মবিমুখতা বা 'ডেইজম' (Deism - ঈশ্বরে বিশ্বাস কিন্তু ধর্মে উদাসীনতা) এবং সেক্যুলার জীবনযাত্রার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে। দীর্ঘদিনের লিবারেল সরকারের অধীনে বড় হওয়া সত্ত্বেও অনেক তরুণ আধুনিক পশ্চিমা জীবনধারা এবং তীব্র জাতীয়তাবাদের (Nationalism) দিকে ঝুঁকছে। তুরস্কের সমাজ এখনো গভীরভাবে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে কট্টর কামালিষ্ট-সেক্যুলার পক্ষ, যারা সুযোগ পেলেই তুরস্ককে ১৯৩০-এর দশকের সেই কট্টর ধর্মনিরপেক্ষতায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহ্যবাদী ও ইসলামপন্থী পক্ষ। ক্ষমতার হাতবদল হলে এই সমীকরণ যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।
যে তুরস্কে একসময় চলন্ত ট্রেনের বগিতে লুকিয়ে কুরআন পড়তে হতো, সেই তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আজ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে স্বকণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করেন। সুলাইমান হিলমি তুনাহানদের মতো মুখলেস মানুষেরাই তুরস্কের মাটিকে ইসলামের জন্য উর্বর করে রেখেছিলেন।
তুরস্কে ইসলামের ভবিষ্যৎ হয়তো শতভাগ মসৃণ নয় এবং সেখানে সেক্যুলারিজমের সাথে ইসলামের দ্বন্দ্ব চলতেই থাকবে; তবে এটা নিশ্চিত যে, তুরস্কের সমাজ থেকে ইসলামকে উপড়ে ফেলার যে চেষ্টা একদা করা হয়েছিল, তা চিরতরে ব্যর্থ হয়েছে। তুরস্ক এখন আর ইসলামকে বর্জন করার মডেলে বিশ্বাসী নয়, বরং আধুনিকতা ও ইসলামের এক অনন্য সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে তারা আগামী পৃথিবীর বুকে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে।
©Saiful Khan সাইফুল খান
লেখক- ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।