07/11/2023
শিশুর ঘুমের সমস্যা: কারণ ও করণীয়
ঘুম প্রতিটি মানুষের জীবনে একটি অত্যাবশ্যকীয় এবং অপরিহার্য বিষয়। শিশুদের জন্য ভালো মানের ও পর্যাপ্ত ঘুম আরও বেশি প্রয়োজনীয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, বিভিন্ন ধরনের আচরণগত ও আবেগীয় সমস্যা তৈরি হতে পারে। শিশুর মনোযোগ ও স্মরণশক্তি কমে যেতে পারে ও কর্মদক্ষতা কমে যেতে পারে। শিশু বেশি বেশি খাওয়া শুরু করতে পারে এবং মুটিয়ে যেতে পারে। ঘটতে পারে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাও।
যদিও শিশুদের ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যাগুলো ক্ষণস্থায়ী হয়। তবুও কিছু শিশুর ক্ষেত্রে তাদের ঘুমের সমস্যা দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড এবং তাদের সার্বিক সুস্থতায় তাৎপর্যপূর্ণ নেতিবাচক প্রভাব রাখে।
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১-৫ বছর বয়সের শিশুদের মাঝে শতকরা ২৫ জন শিশু বিভিন্ন ধরনের ঘুমের সমস্যায় ভোগে। ঘুমের সমস্যাগুলো বিভিন্ন মাত্রায় ও বিভিন্ন রূপে হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুচিকিৎসা ও সুপরামর্শে ভালো হয়। বয়স অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর দৈনিক কত ঘণ্টা স্বাভাবিক এবং গুণগত মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন সেটি আগে জানা প্রয়োজন।
বয়স অনুযায়ী শিশুর প্রয়োজনীয় ঘুমের সময় তালিকা নিম্নরূপ-
» ১-৪ সপ্তাহ : ১৬-১৭ ঘণ্টা
» ১-৪ মাস : ১৬-১৭ ঘণ্টা (রাতের ঘুমে পরিমাণ বাড়তে থাকে)
» ৪ মাস-১ বছর : ১৪-১৫ ঘণ্টা
» ১-৩ বছর : ১২-১৪ ঘণ্টা (রাতেই বেশি ঘুমায়, দিনে অল্প সময়ের জন্য ঘুমায়)
» ৩-৬ বছর : ১১-১২ ঘণ্টা
» ৭-১২ বছর : ১০-১২ ঘণ্টা
» ১৩-১৮ বছর : ৬-৮ ঘণ্টা
শিশুদের ঘুমের সমস্যাকে মূলত: ২ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ডিসসমনিয়া, প্যারাসমনিয়া।
ডিসসমনিয়া: এটি ইনসমনিয়া এবং হাইপারসমনিয়ার মাঝে অন্তর্ভুক্ত। ইনসমনিয়া হলো ঘুমাতে যাওয়ার পর সহজে ঘুম না আসা, মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়া, খুব সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়া অথবা একেবারেই ঘুম না হওয়া ইত্যাদি। যা কয়েকদিন থেকে সপ্তাহ, অথবা কয়েক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চলতে থাকে। এটি শিশুর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে এবং শিশুর মাঝে সতেজ অনুভূতির অভাব তৈরি করে। ফলে শিশুর মাঝে দিনের বেলা ঘুম ঘুম ভাব থাকে। মানসিক চাপ, শারীরিক অসুস্থতা (ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগ, অ্যালার্জি বা চুলকানি রোগ, থাইরয়েডের সমস্যা, হাড় এবং মাংসপেশিতে ব্যথা, গলা-বুক জ্বলা, দাঁত ব্যথা ইত্যাদি), মানসিক রোগ (ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি), ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি ইনসমনিয়ার কারণ হতে পারে।
এছাড়া কিছু স্নায়ুবিকাশজনিত রোগ যেমন- অটিজম, অ্যাসপারজারস সিনড্রোম, লার্নিং ডিজঅ্যাবিলিটি, হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডার ইত্যাদিও শিশুদের ইনসমনিয়ার কারণে হতে পারে। আপনজনদের (বাবা, মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি অথবা গুরুত্বপূর্ণ পরিচর্যাকারী) কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ভয়, স্কুলে পড়ার চাপ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, বুলিং, ভাই-বোন বা বন্ধুর সঙ্গে কলহ, নতুন স্থানে গমন, নতুন রুটিন ইত্যাদি শিশুদের মানসিক চাপের কারণ হতে পারে এবং এগুলো থেকে শিশুদের ঘুমের সমস্যা হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো গান, গল্প না শুনলে শিশুর ঘুম আসে না, নির্দিষ্ট কোনো আপনজনের নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে আদর করা, জড়িয়ে ধরা, কোলে নেওয়া ইত্যাদির অভাববোধ করলেও শিশুরা ঘুমাতে পারে না। এবিষয়গুলো মাঝে মাঝে হলেও তেমন ক্ষতি নেই, কিন্তু এটি যদি বেশিদিন চলতে থাকে তাহলে অবশ্যই তা ঘুমের সমস্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
হাইপারসমনিয়া: হাইপারসমনিয়া হলো রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও দিনের বেলায় ঘন ঘন ঘুমানো অথবা তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকা এবং ক্লান্তবোধ করা। ভোরে বা সকালবেলা ঘুম থেকে জাগতে কষ্ট হওয়া। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া, নারকোলেপ্সি, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ইত্যাদি হাইপারসমনিয়ার কারণ হতে পারে।
প্যারাসমনিয়া: ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ে বা ধাপে, ঘুমের মাঝে অথবা ঘুম এবং সজাগ অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে সংঘটিত কিছু আচরণ বা শারীরবৃত্তীয় কাজের উপস্থিতি থাকলে সেটিকে বলা হয় প্যারাসমনিয়া। যেমন- নাইটমেয়ার, নাইটটেরর, স্লিপ ওয়াকিং, ব্রুক্সিজম, স্লিপ ইন্যিউরেসিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম ইত্যাদি।
নাইটমেয়ার: এটিকে ড্রিম অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা স্বপ্নোদ্বেগ রোগও বলা যায়। এ ক্ষেত্রে শিশু স্বপ্নে এমন কিছু দেখে যা তাকে ভীত, উদ্বিগ্ন এবং অস্থির করে তোলে। ঘুমের র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ধাপে এটি ঘটে। এ ক্ষেত্রে শিশু রেম স্লিপ থেকে সম্পূর্ণ সচেতন অবস্থায় ফিরে আসতে পারে এবং স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ দিতে পারে। দিনের বেলায় ঘটে যাওয়া কোনো ভীতিকর অবস্থা থেকে অথবা উদ্বেগজনিত কারণে (কোনোকিছু থেকে অথবা কারও কাছ থেকে ভয়-ভীতি পেলে) এটি ঘনঘন হতে পারে। ৫-৬ বছর বয়সের শিশুদের মাঝে এটি সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। আঘাত-পরবর্তী মানসিক চাপজনিত রোগ, জ্বর, মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধ এবং মাদকের প্রত্যাহারজনিত কারণেও এমন হতে পারে।
নাইটটেরর: এটি সাধারণত নন-রেম স্লিপে ঘটে। ঘুমাতে যাওয়ার ৯০ মিনিট পর অথবা প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর অন্তর শিশুর ঘুম ভেঙে যায়, সে শোয়া থেকে ওঠে বসে, কখনও দাঁড়িয়ে যায়, কখনও ঘুমন্ত অবস্থায় হাঁটে, প্রচণ্ড অস্থির এবং আতঙ্কগ্রস্ত থাকে। কখনও বা জোরে জোরে কান্নাকাটি করে। শিশুর হৃদস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। শিশু বুঝতে পারে না তার কী করতে হবে। কয়েক মিনিটের মাঝেই শিশুটি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যায় এবং আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে শিশু স্বপ্নে কী দেখেছে তা মনে করতে পারে না বা করলেও খুব কম মনে করতে পারে। এটি নাইটমেয়ারের চেয়ে কম পরিলক্ষিত হয়।
স্লিপওয়াকিং: শিশু ঘুমের মাঝে হাঁটে। এটি নন-রেম স্লিপের গভীর পর্যায়ে (স্টেজ ৩-৪) হয়। সাধারণত রাতের প্রথমার্ধে হয়। ৫-১২ বছরের শিশুদের মাঝে সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়। যাদের এ সমস্যা রয়েছে তাদের মাঝে প্রতি ১০০ জনে প্রায় ১৫ জন শিশু অন্তত একবার ঘুমের মাঝে হাঁটে। মাঝে মাঝে বড় হওয়ার পরও এ সমস্যা থেকে যায়। এটি পারিবারিক বা বংশগতভাবেও হতে পারে। ঘুমের মাঝে অধিকাংশ শিশু সত্যিকার অর্থে কিন্তু হাঁটে না। তারা ঘুমন্ত থাকা অবস্থায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়, নড়াচড়া করে, সাধারণত চোখ খোলা রেখে চারপাশে হাঁটে, কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দেয় না এবং তাদের ঘুম থেকে জাগানো খুব কঠিন হয়ে যায়। সাধারণত তারা আবারও বিছানায় ফিরে যায় এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়। এরা রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় কী কী করেছিল তা পরদিন মনে করতে পারে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরা নিজের এবং অন্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ, নিজের অজান্তে নিজের এবং অন্যের জন্য ক্ষতিকারক কিছু করে ফেলতে পারে। তাই তাদের জন্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রাখতে হবে। যেমন- দরজা-জানালা তালাবন্ধ রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলা ইত্যাদি।
স্লিপ অ্যাপনিয়া: একজন শিশু যদি ঘুমের মাঝে ১০ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় শ্বাস নিতে না পারে তাহলে তা খুবই ভীতিকর। শিশুটি জোরে জোরে নাক ডাকছে, মুখ খোলা রেখে ঘুমাচ্ছে, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকছে। বেশিরভাগ শিশু জানেই না তারা এমন করছে। শিশুদের টনসিল, এডেনয়েড, কানের সংক্রমণের কারণেও রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। ফলে শিশু দিনের বেলায় ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, পড়াশোনা এবং অন্যান্য কাজে মনোযোগ দিতে পারে না, মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে, আচরণগত সমস্যা, হার্টের সমস্যা ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম: যদিও এটি বড়দের রোগ হিসাবে পরিচিত তবুও শিশুদের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে। শিশুরা বলতে পারে ‘পায়ে পোকা হাঁটছে’ বা ‘পা ঝিঁঝি করছে’ এমন অনুভূতির কথা। পায়ের মাঝে অস্বস্তি অনুভূতি থেকে রেহাই পেতে তারা বিছানায় ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করে, আর এতে পর্যাপ্ত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
স্লিপ ইন্যিউরেসিস বা বেড ওয়েটিং: শারীরিক কোনো সমস্যা বা রোগ না থাকা সত্ত্বেও পাঁচ বছর বয়সের পরেও যদি কোনো শিশু প্রায় প্রতিদিনই ঘুমের মাঝে বিছানা ভিজিয়ে ফেলে তাহলে তার স্লিপ ইন্যিউরেসিস আছে বুঝতে হবে। সাধারণত ছেলেদের মাঝে এটি বেশি পরিলক্ষিত হয়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ পরিবর্তনের জন্য কন্টিনজেন্সি (শর্তসাপেক্ষ) ম্যানেজমেন্ট বা স্টার চার্ট মেথড ভালো কাজ করে। বেল অ্যান্ড প্যাড সিস্টেম সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং কার্যকর। ব্লাডার ট্রেইনিং, ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে চা, কফি ইত্যাদি না খাওয়া, সন্ধ্যার পর কম পানি খাওয়া, ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ব্লাডার খালি করা ইত্যাদি। সবগুলো পদ্ধতি একসঙ্গে অনুসরণ করলে শতকরা ৯৯ জন রোগী তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি লাভ করে। এছাড়া ট্রাইসাইক্লিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টসের মাঝে ইমিপ্রামিন ভালো কাজ করে।
ব্রুক্সিজম: অনেক শিশু ঘুমের মাঝে দাঁতে দাঁত পেষা বা দাঁত খিঁচার মতো শব্দ করে। অনেকেই মনে করেন পেটে কৃমি হলে এমনটি হয়। আসলে শিশুর মানসিক চাপ, উদ্বেগ অথবা দাঁতের কোনো সমস্যা থাকলে এমন হয়। এতে ঘুম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এটিকে ঘুমের সমস্যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে দাঁত, জিহ্বা, চোয়াল, গালের ভেতরের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এ সমস্যাটি গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করতে হবে।
ঘুমের সমস্যা দূর করতে পরামর্শ
» শিশুর জন্য ঘুমের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশুকে পরিচিত, পরিচ্ছন্ন এবং আরামদায়ক বিছানা দিতে হবে। শোবার ঘরটা কিছুটা অথবা পুরোপুরি অন্ধকার রাখতে হবে এবং শান্ত, নীরব ও কোলাহলমুক্ত ঘরে ঘুমাতে দিতে হবে।
» স্বাস্থ্যসম্মত ঘুমের জন্য ঘুমের রুটিন তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে জাগতে হবে এবং বিছানা ছাড়তে হবে।
» নিয়মিত ব্যায়াম, খেলাধুলা করতে হবে।
যা যা করা যাবে না
» ঘুমাতে যাওয়ার আগের ৪-৫ ঘণ্টা সময়ে ব্যায়াম করা, ভারি কাজ করা, চা, কফি পান করা যাবে না।
» বিছানায় বসে রেডিও শোনা, টিভি দেখা, মোবাইল চালানো, গল্পের বই পড়া, গেম খেলা যাবে না।
» দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমানো যাবে না।
» রাত ৯টার পর ভারি খাবার খাওয়া যাবে না।
» শিশু ঘুমিয়ে পড়লে বা ক্লান্ত মনে হলে বা চোখে ঘুম ঘুম ভাব থাকলে তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকা যাবে না, তাকে তার বিছানায় শুইয়ে দিতে হবে।
সর্বোপরি, শিশুর শারীরিক বা মানসিক কোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।