24/09/2026
আমার ছেলেকে আমি কখনো বলিনি, ছোটবেলায় আমি কী কী পাইনি।
কারণ অভাবের কথা সন্তানকে বলতে নেই। সন্তানকে শুধু যতটা পারা যায়, তার প্রাপ্যটা দিতে হয়। এই বিশ্বাস নিয়েই আমি বড় হয়েছি।
আমার বয়স এখন বিয়াল্লিশ। ঢাকার মিরপুরে নিজের ফ্ল্যাটে থাকি। চাকরি করি নামিদামি কোম্পানিতে। মাস শেষে যা বেতন আসে, ছেলের স্কুলের বেতন দিতে পারি। মাঝে মাঝে বাইরে খেতে পারি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার ছেলে কিছু চাইলে অন্তত প্রথমে আমাকে পকেটের হিসাব করতে হয় না। এই একটা জায়গায় এসে আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করি।
আমার ছেলের নাম জোহান। বয়স বারো। ছোটবেলায় ওকে একটা সাইকেল কিনে দিয়েছিলাম। সেদিন জোহান এত খুশি হয়েছিল যে, সাইকেলটা বারান্দায় রেখে রাতেও বারবার দেখতে যাচ্ছিল।
আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম,
“ঘুমা।”
ও বলেছিল,
“আব্বু, এটা কি সত্যিই আমার?”
আমি বলেছিলাম,
“হ্যাঁ।”
ও আবার জিজ্ঞেস করেছিল,
“পুরোপুরি?”
আমি হেসে বলেছিলাম,
“পুরোপুরি।”
ও সেদিন রাতে সাইকেলের ঘণ্টাটা একবার বাজিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিল। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ সাইকেলটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কেন জানি না, আমার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা হচ্ছিল। কারণ আমার বয়স তখন বারো। আমিও একটা সাইকেল চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবা কিনে দিতে পারেননি। বাবা একটা ছোট মুদির দোকানে কাজ করতেন। মাসের শেষে যা পেতেন, তাতে সংসার চলত। আমরা তিন ভাইবোন। ভাড়া বাড়ি। চাল ডাল। স্কুলের খাতা। ওষুধ। ঈদের জামা।
আমার স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে প্রায় চল্লিশ মিনিট হাঁটতে হতো। রাস্তার পাশে সাইকেল চালিয়ে ছেলেরা যেত। আমি হাঁটতাম। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
একদিন বাবাকে বলেছিলাম,
“আব্বা, একটা সাইকেল কিনে দিবেন?”
বাবা বলেছিলেন,
“দিমু।”
আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।
তারপর জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“কবে?”
বাবা একটু হেসে বলেছিলেন,
“টাকা হইলে।”
এই ‘টাকা হইলে’ কথাটা আমার শৈশবের সবচেয়ে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি ছিল। টাকা আর হয়নি। আমি বড় হয়ে গেলাম। সাইকেল আর কেনা হলো না।
তারপর আমার আরও অনেক কিছু চাওয়া ছিল। স্কুলের বন্ধুরা শীতের ছুটিতে কক্সবাজার যেত। আমি যেতাম নানাবাড়ি। নানাবাড়িও খারাপ ছিল না। কিন্তু সমুদ্র দেখতে খুব ইচ্ছা করত।
একবার বাবাকে বলেছিলাম,
“আব্বা, সমুদ্দুর কেমন?”
তিনি বলেছিলেন,
“অনেক বড় পানি।”
আমি বলেছিলাম,
“আপনি দেখছেন?”
তিনি মাথা নেড়ে বলেছিলেন,
“না।”
আমার ছেলে জোহান বড় হতে লাগল। ওর চাওয়া বাড়ল। নতুন ফোন। ভালো জুতা। কম্পিউটার। গিটার। ক্যামেরা। আমি সব দিলাম।
একদিন আমার স্ত্রী বলল,
“তুমি ওকে একটু বেশি দিচ্ছ।”
আমি বললাম,
“আমার বাবা আমাকে কিছু দিতে পারেনি।”
সে বলল,
“তাই বলে সবকিছু?”
আমি বললাম,
“আমি চাই না ও কোনোদিন মনে করুক, ওর বাবা ওকে দিতে পারেনি।”
স্ত্রী চুপ করে গেল।
কিছুদিন পর জোহান বললো, সে সমুদ্র দেখতে চায়। আমি তাকে কক্সবাজার নিয়ে গেলাম।
ঢেউয়ে পা চুবিয়ে সে বলল,
“আব্বু, এত বড় পানি আগে দেখছ?”
আমি বললাম,
“না।”
সে অবাক হয়ে বলল,
“তাহলে আজ প্রথম?”
আমি হাসলাম।
“হ্যাঁ।”
ও বলল,
“আমার জন্য?”
আমি বললাম,
“হ্যাঁ।”
কিন্তু সত্যিটা হলো, শুধু ওর জন্য না। আমার ভেতরে বারো বছরের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। সে প্রথমবার সমুদ্র দেখছিল। জোহান ঢেউয়ের দিকে দৌড়াচ্ছিল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। হঠাৎ আমার মনে হলো, এই ছেলেটা জানে না তার সঙ্গে সমুদ্র দেখতে এসে আরেকজন মানুষও তার হারানো শৈশবটা খুঁজছে। জোহান আইসক্রিম চাইল। আমি দুটো কিনলাম। একটা ওর। একটা আমার। জীবনে প্রথমবার সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য আইসক্রিম কিনলাম। খেতে খেতে মনে হলো, কিছু অপূর্ণতা পূরণ হতে এত বছর লাগে কেন?
সেবার কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে একটা ঘটনা ঘটলো। আমরা যখন ঢাকার বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, বাস স্ট্যান্ডে একজন মানুষকে দেখলাম। বয়স বোঝা যাচ্ছিল না। শরীরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। একটা পা কাপড় দিয়ে জড়ানো। কাপড়ের ফাঁক দিয়ে পায়ের নিচের অংশটা দেখা যাচ্ছিল, জায়গাটা অনেকটা পচে গেছে। লোকটা রাস্তার পাশে শুয়ে ছিল। কেউ কেউ পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। কেউ তাকাচ্ছিল, কেউ মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। পকেটে হাত দিলাম। কিছু টাকা ছিল। ভাবলাম, দিয়ে যাই। ঠিক তখন জোহান দৌড়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। লোকটার দিকে একবার তাকিয়েই ঘেন্নায় মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“আব্বু, চলো।”
আমি বললাম,
“একটু দাঁড়া।”
“না, চলো।”
“কোথায়?”
জোহান বলল,
“এখানে গন্ধ বেরোচ্ছে। বেশিক্ষণ থেকো না।”
জোহান আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। লোকটা তখনও সেখানেই শুয়ে। আমার অপরাধবোধ হলো, আমি একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য না করে চলে এসেছি৷ কিন্তু আমার ছেলে তখন স্বাভাবিক। সে সামনে হাঁটছে। সমুদ্রের কথা বলছে। হোটেলে কী কী খেয়েছে, সেটা বলছে। আমি কোনো কথা বললাম না। বাসে উঠে জানালার পাশে বসে রইলাম। জোহান আমার পাশে বসে ফোন দেখছিল। হঠাৎ আমার মাথায় একটা কথা এলো। আমি আমার ছেলেকে জীবনে কী দিয়েছি? সাইকেল দিয়েছি। ভালো জুতা দিয়েছি। ফোন দিয়েছি। কম্পিউটার দিয়েছি। সমুদ্র দেখিয়েছি। কিন্তু অভাব? অভাব থেকে আমি ওকে খুব যত্ন করে দূরে রেখেছি।
আমি ছোটবেলায় জানতাম, একটা টাকার মূল্য কতখানি। জানতাম, বাবার পকেটের টাকা শেষ হলে মায়ের হাঁড়ির ভাত কতটা কম হয়। বোধহয় সে কারণেই রাস্তার ঐ মানুষটাকে আমি পাশকাটিয়ে আসতে পারিনি। কিন্তু আমার ছেলে পেরেছে। সেদিন প্রথমবার আমার মনে হলো, আমি কি হেরে গেলাম?
ঢাকায় ফেরার কয়েকদিন পর জোহান আমার কাছে দুইটা আর্জি নিয়ে এলো। এক, সে ট্যাব কিনতে চায়। দুই, সে স্কুল থেকে শিক্ষা সফরে যেতে চায়।
আমি গলার স্বর গম্ভীর করে বললাম,
“ট্যাব তোর জন্য প্রয়োজনীয় কিছু না।”
তারপর একটু থেমে বললাম,
“কিন্তু শিক্ষা সফর প্রয়োজনীয়।”
ছেলে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর বললো,
“ঠিক আছে, আব্বু।”
জোহান যেদিন শিক্ষা সফরে যাচ্ছিল, ব্যাগ গোছাচ্ছে।
জিজ্ঞেস করলাম,
“কী কী নিবি?”
সে বলল,
“জানি না।”
আমি বললাম,
“চল, দেখি।”
ব্যাগ গোছাতে গোছাতে একটা পুরোনো ছবি বের হলো। আমি ছবিটা হাতে নিলাম। ছবিতে আমি। বয়স বারো। আমার পাশে বাবা। আমার গায়ে নতুন শার্ট। পায়ে নতুন জুতা।
আমার ছেলে ছবিটা দেখে বললো,
“বাবা, এইটা কোথায় তুলেছিলে?”
আমি বললাম,
“তোর দাদুর দোকানের সামনে।”
আমি ছবিটা অনেকক্ষণ দেখলাম। তারপর বুঝলাম, ছবিতে আমার বাবা হাসছেন। কিন্তু তার পায়ের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল। তার পায়ে পুরোনো রাবারের স্যান্ডেল। আমি এতদিন শুধু নিজের অপূর্ণতাগুলো দেখেছি। বাবারটা দেখিনি। কারণ সন্তানরা বাবা মায়ের ত্যাগকে সাধারণত ত্যাগ হিসেবে দেখে না। তারা সেটাকে জীবন বলে মনে করে।
জোহান চলে যাওয়ার পর সেদিন রাতে আমি বাবাকে ফোন করলাম। বাবা তখন গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বয়স সত্তরের কাছাকাছি।
আমি বললাম,
“আব্বা, আপনি কেমন আছেন?”
তিনি বললেন,
“ভালো আছি।”
আমি বললাম,
“আপনি কি কখনো সমুদ্র দেখতে চেয়েছিলেন?”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বললেন,
“ক্যান?”
“এমনিই।”
তিনি হেসে বললেন,
“বুড়া বয়সে আবার সমুদ্দুর দেখমু ক্যান?”
আমি বললাম,
“দেখবেন?”
তিনি বললেন,
“তুই নিয়া যাইবি?”
আমি চুপ করে গেলাম।
পরের মাসে বাবাকে নিয়ে কক্সবাজার গেলাম। বাবা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকক্ষণ কিছু বললেন না।
আমি বললাম,
“কেমন?”
তিনি বললেন,
“অনেক বড় পানি।”
আমি হেসে ফেললাম। একই কথা। চল্লিশ বছর আগের মতো। কিন্তু এবার তার চোখে পানি ছিল কি না, আমি বুঝতে পারিনি। বাবা ধীরে ধীরে জুতা খুলে পানির কাছে গেলেন। একটা ঢেউ এসে তার পায়ের কাছে ভেঙে পড়ল। তিনি পিছিয়ে এলেন। তারপর আবার গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমার বাবা সমুদ্র দেখছেন না। তিনি হয়তো তার ছেলের শৈশবের কাছে ফিরে গেছেন।
হোটেলে ফিরে বাবা বললেন,
“তোর ছেলেরে তুই অনেক কিছু দিস।”
আমি বললাম,
“হ।”
“ভালো করস।”
আমি চুপ।
বাবা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“আমার তোর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে।”
আমি বললাম,
“কী কথা?”
“সাইকেল চাইছিলি।”
আমি হেসে বললাম,
“মনে আছে?”
বাবা কথা বললেন না।
কিছুক্ষণ পর বললেন,
“তোরে দিতে পারি নাই।”
আমি বললাম,
“থাক।”
তিনি বললেন,
“তুই তখন রাগ করছিলি।”
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“করছিলাম।”
বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি খুব চেষ্টা করছিলাম।”
এই কথাটা শুনে আমি তার দিকে তাকালাম।
তিনি আর আমার দিকে তাকালেন না।
শুধু বাইরে তাকিয়ে বললেন,
“একদিন টাকা জমছিল। ভাবছিলাম, কিনমু।”
আমি চুপ করে আছি।
“তারপর তোর মায়ের অসুখ হইল।”
হোটেলের রুমটা হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেল।
বাবা বললেন,
“সাইকেলটা আর কেনা হয় নাই।”
আমি জানতাম না এই গল্প। চল্লিশ বছর ধরে আমি ভেবেছি, আমার বাবা পারেননি। সেদিন প্রথম বুঝলাম, বাবা পারেননি এটা যেমন সত্যি, তারচেয়ে বড় সত্যি বাবা চেষ্টা করেছিলেন।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে বাবা বাসে ঘুমিয়ে পড়লেন। তার একটা হাত আমার পিঠের পেছনে রাখা। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। জানি না কেন, আমি সেদিন প্রথমবার বাবার জন্য কাঁদলাম। সাইকেল না পাওয়ার জন্য নয়। বরং এই ভেবে, আমার বাবা যদি সেদিন একটা সাইকেল কিনে দিতে পারতেন, তাহলে হয়তো আমি খুব খুশি হতাম। কিন্তু তিনি পারেননি বলেই আজ বুঝতে পারছি, একজন বাবা কখনো কখনো সন্তানের হাতে শখের জিনিস তুলে দিতে না পারলেও তার পুরো জীবনটা হাত দিয়ে ধরে রাখে। আর সেই হাতটা, সন্তান বড় হয়ে যাওয়ার পরও, অনেক দূর থেকে, অদৃশ্যভাবে, তার পিঠে রাখা থাকে!
লেখা : সোহেল আর রানা