06/05/2026
কেন ব্যস্ত মানুষ দরিদ্র থাকে আর ফোকাসড মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ে: সময়ের ROI
অনেকেই সারাদিন কাজ করেন, তবুও জীবন এগোয় না। কারণ তারা সময় খরচ করেন, কিন্তু সময়কে ইনভেস্ট করতে শেখেন না। টাকা হারালে আবার অর্জন করা যায়, কিন্তু ভুল জায়গায় ব্যয় করা সময় আর ফেরত আসে না।
আমরা সাধারণত প্রোডাক্টিভিটি বলতে বুঝি বেশি কাজ করা, বেশি মিটিং করা, বেশি ফোন ধরা বা সারক্ষণ ব্যস্ত থাকা। কিন্তু এই চিন্তাটাই আসলে সবচেয়ে বড় ফাঁদ। কারণ ব্যস্ততা আর ফলাফল এক জিনিস নয়। একজন মানুষ সারাদিন দৌড়াতে পারেন, কিন্তু তিনি যদি একই জায়গায় বৃত্তাকারে দৌড়ান, তাহলে তিনি শুধু ক্লান্তই হবেন, কোন রেজাল্ট আসবে না। ঠিক তেমনই, আপনি সারাদিন কাজ করলেন কিন্তু দিনশেষে যদি নতুন কোনো অ্যাসেট তৈরি না হয়, কোনো সিস্টেম বিল্ড না হয়, কোনো কনটেন্ট, প্রোডাক্ট, সেলস মেশিন, স্কিল বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তৈরি না হয় তবে আপনি শুধু সময় খরচ করেছেন, সময়কে বিনিয়োগ করেননি।
১। সময়কে সম্পদ হিসেবে দেখা
এই ভাবনার সবচেয়ে ডিপ অংশ হলো সময়কে অর্থ হিসেবে দেখা। আমরা অর্থ বিনিয়োগ করার আগে ভাবি এর রিটার্ন কী? কিন্তু সময় দেওয়ার আগে আমরা তা ভাবি না। কেউ বলল, “ভাই পাঁচ মিনিট লাগবে” আমরা তা দিয়ে দিই। কিন্তু একজন মেকারের জন্য এই পাঁচ মিনিট আসলে পাঁচ মিনিট নয়; এটি পুরো সকাল নষ্ট করার মতো হতে পারে। কারণ ডিপ কাজের একটি মোশন থাকে, একটি মেন্টাল স্টেট থাকে। যেমন ভাত রান্না হতে হতে বারবার চুলা বন্ধ করে দিলে ভাত ঠিকমতো সেদ্ধ হয় না, তেমনি বড় চিন্তা বা সৃজনশীল কাজও বারবার বাধা পেলে, মোশন নষ্ট করে দিলে ভাল আউটপুট আসে না।
২। মেকার ও ম্যানেজার কনসেপ্ট
এখানে মেকার আর ম্যানেজার ধারণাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ম্যানেজারের কাজ হলো মানুষ, সিদ্ধান্ত, তথ্য সমন্বয় করা। তাই তার ক্যালেন্ডারে অনেক মিটিং থাকা স্বাভাবিক। তার জন্য ১৫ মিনিট, ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার ছোট ছোট স্লটই প্রোডাক্টিভিটির অংশ। কিন্তু মেকারের কাজ আলাদা। একজন লেখক, এডিটর, কোডার, ডিজাইনার, কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা উদ্যোক্তা যাদের স্ট্র্যাটেজি বানাতে হয়, তাদের বড় সময়ের ব্লক প্রয়োজন। কারণ তারা এমন কিছু তৈরি করছেন যা আগে ছিল না। ম্যানেজার সময়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত তৈরি করেন, আর মেকার সময়ের মাধ্যমে সম্পদ তৈরি করেন।
৩। ক্যালেন্ডার ও প্রোডাক্টিভিটির ভুল ধারণা
বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে সমস্যা হয় কারণ ম্যানেজার মেকারকে নিজের মাপকাঠিতে মাপেন। ম্যানেজার দেখেন ক্যালেন্ডার ফাঁকা, তাই ভাবেন মানুষটি ফ্রি আছেন। কিন্তু মেকারের ক্যালেন্ডার ফাঁকা থাকা মানেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য প্রস্তুত। এটি অনেকটা জমির মতো; বাইরে থেকে দেখলে খালি মাঠ মনে হয়, কিন্তু কৃষকের চোখে সেটিই ফসল ফলানোর জায়গা। আপনি যদি সেই মাঠে বারবার মেলা বসান, তাহলে ফসল হবে না। ঠিক তেমনই, একজন মেকারের ক্যালেন্ডারে বারবার মিটিং বসালে তার আউটপুট কমে যায়, যদিও বাইরে থেকে মনে হয় তিনি অনেক ব্যস্ত।
৪। মেকার টাইম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
ব্যবসায়িক পরিভাষায় বললে, মেকার টাইম হলো সেই সময় যেখানে কোম্পানির ভবিষ্যৎ তৈরি হয়। নতুন অফার, নতুন মার্কেটিং অ্যাঙ্গেল, মানসম্মত কনটেন্ট, সেলস স্ক্রিপ্ট, অপারেশন সিস্টেম বা প্রোডাক্টের উন্নয়ন এসব কোনো ১৫ মিনিটের ফাঁকে তৈরি হয় না। এগুলো তৈরি হয় গভীর মনোযোগের মাধ্যমে। তাই যে উদ্যোক্তা নিজের ক্যালেন্ডারকে শুধু মিটিং দিয়ে পূর্ণ রাখেন, তিনি আসলে নিজের ভবিষ্যৎ আয়ের পথ বাঁধা গ্রস্থ করেন।
৫। জরুরি বনাম গুরুত্বপূর্ণ কাজ
আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, সব জরুরি কাজই গুরুত্বপূর্ণ নয়। অনেক কাজ জরুরি মনে হয় কারণ কেউ এখনই উত্তর চায় বা এখনই মিটিং করতে চায়। কিন্তু জীবনের বড় কাজগুলো সাধারণত চিৎকার করে আপনাকে জ্বালাতন করে না। বই লেখা, ব্যবসার সিস্টেম বানানো, নতুন দক্ষতা অর্জন, শরীর ঠিক রাখা কিংবা গভীর চিন্তা করা এসব কাজ আজ না করলেও কেউ আপনাকে গালমন্দ করবে না। কিন্তু বছরের শেষে এই কাজগুলোই নির্ধারণ করবে আপনি এগিয়েছেন, নাকি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন।
একজন শিক্ষার্থীর জন্যও এই ধারণা সমান দরকারি। সে যদি সারাদিন নোট সাজায়, গ্রুপ চ্যাটে থাকে বা ছোট ছোট কাজ করে, তবে সে ব্যস্ত থাকবে ঠিকই কিন্তু প্রকৃত মেকার টাইম হলো সেটিই, যখন সে গভীরভাবে পড়াশোনা করে, সমস্যার সমাধান করে এবং নিজের ভাষায় বুঝে অনুশীলন করে। একজন চাকরিজীবীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সারাদিন ইমেইল, মিটিং আর রিপোর্ট তাকে ব্যস্ত রাখবে, কিন্তু ক্যারিয়ারকে উন্নত করবে সেই সময়টুকু, যখন সে নতুন দক্ষতা শেখে কিংবা নিজের কাজের ধরন উন্নত করে।
৬। ব্যক্তিগত জীবনে সময়ের প্রয়োগ
ব্যক্তিগত জীবনেও সময়ের এই ROI কাজ করে। আমরা অনেক সময় অন্যদের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনকে পিছিয়ে দিই। সবাইকে সময় দিতে গিয়ে নিজের শরীর, পরিবার, শিক্ষা ও চিন্তা সবকিছু বাদ পড়ে যায়। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায়, যাদের খুশি রাখতে এত সময় দিলেন তারা এগিয়ে গেছে, অথচ আপনি নিজের মূল কাজটাই করেননি। তাই ‘না’ বলা শুধু অহংকার নয়, অনেক সময় এটি নিজের ভবিষ্যৎকে বাঁচানোর উপায়।
এই ধারণার সবচেয়ে বাস্তব প্রয়োগ হলো ক্যালেন্ডার ডিজাইন করা। আপনি যদি মেকার হন, তবে দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টা ডিপ ওয়ার্কের জন্য রাখুন। অনেকের জন্য সকালবেলা সবচেয়ে ভালো, কারণ তখন মস্তিষ্ক সজীব থাকে। মিটিং, কল বা মেসেজ দেওয়ার কাজগুলো দিনের শেষভাগে রাখলে আপনার মূল্যবান মানসিক শক্তি সংরক্ষিত থাকে। আর আপনি যদি ম্যানেজার হন, তবে বুঝতে হবে আপনার একটি ছোট মিটিং অন্য কারও পুরো দিনের আউটপুট নষ্ট করতে পারে। তাই মিটিং করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এটি কি সত্যিই প্রয়োজন?
৭। মেকার টাইমের দায়িত্ব ও একাগ্রতা
তবে মেকার টাইমের নামে অলসতা করা চলবে না। যদি আপনি বলেন যে আপনি ডিপ ওয়ার্ক করছেন, তবে সেই সময়ে সত্যিই কাজ করতে হবে। কারণ ফাঁকা ক্যালেন্ডার যেমন একটি সুবিধা, তেমনি এটি একটি বড় দায়িত্বও। আপনি যদি সেই সময় নষ্ট করেন, তবে আপনি নিজের ওপর থেকেই বিশ্বাস হারাবেন। তাই মেকার টাইম মানে ফোন দূরে রাখা, নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, স্পষ্ট লক্ষ্য সামনে রাখা এবং একটানা কাজ করা। এই সময়টাকে পবিত্র সময়ের মতো গুরুত্ব দিতে হবে।
৮। উদ্যোক্তার ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণ
বাস্তবতা হলো, একজন উদ্যোক্তাকে দুই ধরনের ভূমিকাই পালন করতে হয়। কখনো তাকে মেকার হতে হয়, কখনো ম্যানেজার। সমস্যা হয় তখন, যখন তিনি নিজেও জানেন না এখন কোন মোডে আছেন। সকালবেলা যদি তিনি স্ট্র্যাটেজি বানাতে বসেন এবং প্রতি ১০ মিনিটে মেসেজ দেখেন, তবে তিনি মেকারও নন, ম্যানেজারও নন তিনি কেবল একজন রিঅ্যাকটিভ মানুষ। আর রিঅ্যাকটিভ মানুষ কখনো বড় কিছু তৈরি করতে পারে না। বড় কিছু সৃষ্টি করতে হলে নিজের সময়ের ওপর কর্তৃত্ব থাকতে হয়।
পরিশেষে বলতে হয়, সময় ব্যবস্থাপনা আসলে জীবন ব্যবস্থাপনা। আপনি আপনার সময় যেভাবে সাজাবেন, আপনার ভবিষ্যৎও সেভাবেই গড়ে উঠবে। ছোট ছোট অনুরোধ, অপ্রয়োজনীয় মিটিং আর অহেতুক ব্যস্ততা এসব দেখতে নিরীহ মনে হলেও এগুলো ধীরে ধীরে আপনার বড় স্বপ্নকে ধ্বংস করে দেয়। তাই নিজের ক্যালেন্ডারকে শুধু কাজের তালিকা ভাববেন না; এটিকে আপনার ভবিষ্যতের নকশা হিসেবে গণ্য করুন।
সময় শুধু ব্যয় করার বিষয় নয়, এটি বিনিয়োগ যোগ্য সম্পদ।
বাস্তবে এই আইডিয়া কাজে লাগাতে প্রথমে নিজের দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী সময়টি খুঁজে বের করুন এবং সেই সময়টুকু ডিপ ওয়ার্কের জন্য জন্য বরাদ্দ করুন। মিটিং, কল বা ছোট কাজগুলো দিনের নির্দিষ্ট অংশে রাখুন যেন কাজের ধারা নষ্ট না হয়। টিমের সদস্যদের আগে থেকেই জানান কখন আপনার শিডিউল ফাঁকা আছে এবং কখন থাকবে না। মনে রাখবেন, ফাঁকা সময় মানেই তা নষ্ট করার জন্য নয় ওটিই আপনার ভবিষ্যৎ গড়ার শ্রেষ্ঠ সময়।
যে মানুষ নিজের সময়কে রক্ষা করতে পারে না, সে নিজের স্বপ্নকেও রক্ষা করতে পারে না।
নুর মোহাম্মদ
28/08/2025
23/08/2025
22/08/2025
23/07/2025
17/07/2025
04/07/2025