22/07/2026
আজকে যে দুটো আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়ে কথা বলব, তাদের নাম আপনারা প্রায়ই খবরে শোনেন— IMF (International Monetary Fund) এবং বিশ্ব ব্যাংক (World Bank Group)। সচরাচর আমাদের শেখানো হয় যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর অর্থনীতিকে সাহায্য করতে আর দারিদ্র্য দূর করতেই এদের জন্ম। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞার আড়ালে লুকিয়ে আছে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডব, মুদ্রার রক্তক্ষয়ী লড়াই আর পুরো পৃথিবীর ওপর আমেরিকার একচ্ছত্র রাজত্ব বসানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প।
কাহিনির সূচনা ১৯১৪ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (First World War) দিয়ে। তখন পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর অর্থব্যবস্থা চাবুক নিয়ে শাসন করত যুক্তরাজ্য, আর রাজত্ব করত তাদের মুদ্রা ‘পাউন্ড স্টার্লিং’ (Pound Sterling)। কিন্তু চার বছরের যুদ্ধ ইউরোপের দেশগুলোকে ধূলিসাৎ করে দেয়। যুদ্ধ চালাতে গিয়ে যুক্তরাজ্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ নেয় আমেরিকার কাছ থেকে। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল, ইউরোপ ঋণে জর্জরিত আর আমেরিকা রাতারাতি পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী পাওনাদার দেশ হয়ে গেছে। ইতিহাসের গতিপথ সেখান থেকেই প্রথমবার বদলে যায়।
এরপর এলো ১৯২৯ সাল। আমেরিকার শেয়ারবাজারে নামল ধস, যা জন্ম দিল ইতিহাসখ্যাত ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’ (Great Depression) বা মহামন্দার। নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে দেশগুলো মারাত্মক সব ভুল সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করল। ১৯৩০ সালে আমেরিকা পাস করল ‘স্মুট-হাউলি শুল্ক আইন’ (Smoot-Hawley Tariff Act), যার মাধ্যমে বিদেশি পণ্যের ওপর তারা আকাশচুম্বী ট্যাক্স বা শুল্ক বসিয়ে দেয়। জবাবে অন্য দেশগুলোও একই কাজ করে। এতেও মন ভরেনি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্য সুবিধা পেতে বিভিন্ন দেশ টেক্কা দিয়ে নিজের মুদ্রার মান কৃত্রিমভাবে কমাতে শুরু করে। একে বলা হয় ‘কারেন্সি ওয়ার’ (Currency War) বা মুদ্রার যুদ্ধ (Beggar-thy-neighbor policy)। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো—বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ল, কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেল, আর চারিদিকে তীব্র দারিদ্র্য ছড়িয়ে পড়ল।
এই চরম অর্থনৈতিক সংকট ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েই ইউরোপে জন্ম নিল উগ্র জাতীয়তাবাদ ও হিটলারের নাৎসিবাদ (Na**sm), যা বিশ্বকে ঠেলে দিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (Second World War) দাবানলে।
যুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপের দেশগুলোকে বাঁচতে হলে আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র আর রসদ কিনতে হতো। আর তার বিনিময় মূল্য তারা শোধ করেছিল নিজেদের সঞ্চিত সোনা বা গোল্ড রিজার্ভ (Gold Reserve) দিয়ে। ১৯৪৪ সাল নাগাদ অবস্থা দাঁড়ায় এমন যে, পুরো পৃথিবীর সরকারি সোনার প্রায় ৭৫ শতাংশই জমা হয়ে যায় আমেরিকার ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্কের ভল্টে! ইউরোপ তখন নিঃস্ব, তাদের কারখানা ধ্বংস, অর্থব্যবস্থা মৃত। আমেরিকা বুঝল—পৃথিবীর নতুন ‘বস’ বা একক মোড়ল (Global Hegemon) হওয়ার জন্য এর চেয়ে সেরা সুযোগ আর আসবে না।
১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই, আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের পাহাড়ঘেরা ‘ব্রেটন উডস’ (Bretton Woods) নামের এক বিলাসবহুল হোটেলে গোপনে বসে ৪৪টি দেশের প্রতিনিধি দল। সেখানে মূল লড়াইটা হয়েছিল তৎকালীন দুই বিখ্যাত অর্থনীতির মস্তিষ্কের মধ্যে—যুক্তরাজ্যের জন মেইনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes) এবং আমেরিকার হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট (Harry Dexter White)।
কেল্লাফতে অবস্থা বুঝে কেইনস প্রস্তাব করেছিলেন ‘ব্যাঙ্কোর’ (Bancor) নামে একটি নিরপেক্ষ বৈশ্বিক মুদ্রা চালু করতে, যা কোনো নির্দিষ্ট দেশের অধীনে থাকবে না। কিন্তু নিজেদের হাতের সোনার পাহাড় দেখে আমেরিকা কেইনসের প্রস্তাব এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দেয়। মার্কিন প্রতিনিধি সাফ জানিয়ে দেন, ডলারই হবে বিশ্বের প্রধান মুদ্রা। প্রতি আউন্স সোনা ৩৫ ডলারে বাঁধা থাকবে, আর পৃথিবীর বাকি সব দেশ তাদের মুদ্রার মূল্য স্থির করবে মার্কিন ডলারের ওপর ভিত্তি করে। ইউরোপ তখন আমেরিকার কাছে এত বেশি দেনাদার ছিল যে, বিষ গিলে হলেও এই শর্ত তাদের মেনে নিতে হয়। এভাবেই জন্ম নেয় ‘ডলার সাম্রাজ্য’ (Dollar Hegemony)।
ডলারের এই রাজত্ব এবং নিজেদের পছন্দের মুক্তবাজার অর্থনীতিকে (Free-market Capitalism) বিশ্বজুড়ে পাহারা দেওয়ার জন্যই ওই একই সম্মেলনে জন্ম দেওয়া হয় IMF ও বিশ্ব ব্যাংক নামের দুটি সংস্থার। IMF-এর কাজ হলো কোনো দেশ যেন আবার ১৯৩০-এর মতো হুট করে মুদ্রার মান কমিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে তা দেখা। আর বিশ্ব ব্যাংকের কাজ ছিল ঋণ দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ ও সদ্য স্বাধীন হওয়া তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে নিজেদের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রাখা।
প্রতিষ্ঠান দুটি তৈরির সময় ভোটিং নিয়মগুলো এমন চতুরতার সাথে সাজানো হয়েছিল, যাতে আমেরিকার মতামত ছাড়া কোনো বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, তাদের হাতে একচেটিয়া ‘ভেটো’ পাওয়ার (Veto Power) নিশ্চিত করা হয়। মানবিক সাহায্যের আড়ালে তৈরি করা হয়েছিল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এমন এক সূক্ষ্ম জাল, যা আজও পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) চরম শোষণ থেকে যেমন শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ILO-র জন্ম হয়েছিল, ঠিক তেমনি ১ম বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মহামন্দা, ২য় বিশ্বযুদ্ধের ছাই আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের ধ্বংসস্তূপ থেকেই জন্ম নিয়েছিল IMF, বিশ্ব ব্যাংক এবং মার্কিন ডলারের এই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য।
🇧🇩 বাংলাদেশ ও ব্রেটন উডস টুইনস (IMF ও বিশ্ব ব্যাংক):
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭২ সালে এই দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে।
* IMF-এর সদস্যপদ: ১৯৭২ সালের ১৭ই আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ৮৫তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।
* বিশ্ব ব্যাংকের সদস্যপদ: একই বছর, অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১৭ই আগস্ট বাংলাদেশ বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের (IBRD) ১৩৬তম সদস্য হিসেবে যোগ দেয়।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠন করতে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট ও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে এই দুই সংস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে চীন, রাশিয়া কিংবা ব্রিকস (BRICS)-এর মতো জোটগুলো যখন ডলার বাদ দিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্যের কথা বলছে (De-dollarization)—আপনার কী মনে হয়? ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডসের সেই হোটেলে বসে আমেরিকানরা যে অর্থনৈতিক দুর্গ গড়ে তুলেছিল, তা ভাঙা কি আদৌ সম্ভব? কমেন্টে জানান।
#অর্থনীতি #ইতিহাস #আন্তর্জাতিক_রাজনীতি #বাংলাদেশের_অর্থনীতি