22/07/2026
আল্লাহর ইনসাফ
একজন মহিলা একবার একজন নেককার ব্যক্তির সামনে এসে সালাম বিনিময় করার পর কোনো ভূমিকা ছাড়াই সরাসরি প্রশ্ন করে বসল যে, হে শায়েখ! বলুন তো, আপনার প্রভু ন্যায়পরায়ণ না জালেম?
মহিলার কথাটি শুনে শায়েখের গায়ের লোমকূপ খাড়া হয়ে গেল। তিনি হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে হতভাগী মহিলা! তুমি এসব কী বলছ! ভেবেচিন্তে বলছ কি? আমার প্রভু মহান দয়ালু ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফকারী। তিনি কখনোই তার প্রতি জুলুম করেন না।
কিন্তু বলো, তোমার এই প্রশ্ন করার কারণ কী? মহিলা তখন বলল, আমি একজন বিধবা নারী, আমার জিহাদে স্বামী যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, ঘরে আমার তিনজন কন্যাসন্তান। তাদের খাবারের মতো কোনো ব্যবস্থা নাই। আমি সারাদিন সূতা কেটে এক কিছু সুতা সংগ্রহ করেছিলাম। এরপর সেগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একটি লাল পোটলায় ভর্তি করে মাথায় নিয়ে বাজারের দিকে রওনা হলাম বিক্রি করে আমার বাচ্চাদের খাবার কিনে আনার জন্য। আমি যখন রাস্তায় চলছিলাম। কিন্তু হঠাৎ একটি ঈগল এসে আমার মাথা থেকে ছোঁ মেরে সেই পটলাটা নিয়ে উড়ে গেল। আমি তখন একদম মনমরা ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে রাস্তায় বসে পড়লাম। কেননা আমার তিনজন কন্যা সন্তানের মুখে খাবার দেওয়ার মতো আর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অসহায় ক্ষুধার্ত বাচ্চাগুলোর চেহারা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমি তখন অশ্রুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম। চোখের আশ্রুতে আমার বুক ভেসে যেতে লাগল।
মহিলা যখন এই ঘটনাগুলো শায়েখের কাছে বর্ণনা করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে দশজন ব্যক্তি তার সামনে হাজির হলেন। তাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে স্বর্ণ মুদ্রার থলে। তারা এই শায়েখের কাছে এসে বললেন, আমরা আপনাকে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা করি এবং আপনার প্রতি পূর্ণ আস্থাপোষণ করি। আমরা এই এলাকার শীর্ষ ১০ জন ধনী ব্যক্তি। আমরা মূলতঃ সমুদ্রপথে ব্য-বাণিজ্য করি। আমরা চাই আমাদের এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো আপনি আপনার ইচ্ছামতো কোনো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে দান করে দিবেন।
শায়খ ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক হয়ে পড়লেন। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কী, তোমরা একসঙ্গে দশজন মানুষ প্রত্যেকেই ১০০টি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আসছো কেন?
তারা বললেন, আমরা একটি ব্যবসায়ী জাহাজে ছিলাম। হঠাৎ ঝড় শুরু হয়ে গেল এবং ঝড়ের কারণে জাহাজের একটি কাঠ ভেঙে যাওয়ার কারণে তুমুল গতিতে জাহাজে পানি প্রবেশ করতে শুরু করলো। আমরা তখন নিজেদের জীবনের ব্যাপারে আশঙ্কা করা শুরু করলাম। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর অশেষ রহমতে অকল্পনীয়ভাবে দেখতে পেলাম যে, একটি ঈগল আমাদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে এসে একটি লাল পোটলা জাহাজের উপরে ছেড়ে দিল। ব্যাগের মধ্যে শক্ত ও মজবুত সূতা ছিল। আমরা দ্রুত সেই পুটলির সুতা দিয়ে জাহাজের ভাঙা অংশকে বন্ধ করে দিলাম আর এতে আমাদের জীবনের রক্ষা হলো।
এই অলৌকিকভাবে আমাদের জীবন রক্ষা হওয়ার কারণে প্রত্যেকেই মান্নত করলাম যে, আমরা এর শোকরিয়া হিসেবে প্রত্যেকেই ১০০টি করে স্বর্ণমুদ্রা আল্লাহর রাস্তায় দান করব। সুতরাং আপনি এই স্বর্ণমুদ্রাগুলোকে যাকে প্রয়োজন মনে করেন তাকে দিয়ে দিন।
আরো আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, যেই মহিলার সূতা দ্বারা তাদের জীবন রক্ষা হয়েছিল, সেই মহিলা তখন তাদের সামনেই উপস্থিত ছিল।
নেককার বুজুর্গ ব্যক্তিটি লোকগুলোকে বিদায় করে দিয়ে ওই অভাবগ্রস্ত মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন—
ربك يتاجر لك في البر والبحر وتظنينه ظالما!؟
‘তোমার রব তোমার পণ্য নিয়ে স্থলে এবং জলে ব্যবসা করছেন, অথচ তুমি তাঁকে জালেম মনে করছ!?’
এরপর তিনি তার হাতে সেই একহাজার স্বর্ণ মুদ্রা তুলে দিয়ে বললেন, এগুলো তুমিও তোমার সন্তানের জন্য ব্যয় করো। আর তুমি যে মহান আল্লাহকে জালেম বলে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেছ, এটা মূলতঃ তুমি তোমার ক্ষুদ্র মাপপাত্র দ্বারা করেছ। বাস্তবে মহান আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সাথে আচরণ করেন তার সৃষ্টিতত্ত্বের গভীর কৌশল অনুযায়ী এবং ইনসাফের দৃষ্টিকোণে, তাঁর সত্তায় জুলুমের বিন্দুমাত্র লেশ নাই।
আল্লাহ তা’আলা যখন বান্দাকে কোনো বিষয়ে পরীক্ষা করেন, তার পশ্চাতে নিশ্চয়ই ভালো কল্যাণকর কোনো বিষয় লুকিয়ে থাকে। যদিও বাহ্যদৃষ্টিতে সেগুলোকে এর বিপরীত মনে হয় অর্থাৎ অকল্যাণকর বলে মনে হয়। সুতরাং সর্বদা এই দৃঢ়বিশ্বাস অন্তরে লালন করুন যে, আল্লাহ আপনাকে কখনোই বঞ্চিত করবেন।
আর বাহ্যদৃষ্টিতে হয়ত দেখছেন যে, আল্লাহ আপনাকে বঞ্চিত করছেন, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বরং সেটাই প্রকৃতপক্ষে অনেক বড় অনুগ্রহ, যার সুফল আপনার দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে আছে।
আরেকটি কথা মনে রাখবেন, তিনি যে পরীক্ষা করে থাকেন নিঃসন্দেহে সেটা এর চেয়ে বড় কোনো ক্ষতি ও বিপদ দূর করার জন্যই মূলতঃ করে থাকেন। সুতরাং যত বড় বিপদই আপনার সম্মুখে আসুক না কেন এবং বিপদের কারণে আপনার জীবন যতই অতিষ্ঠ হয়ে উঠুক না কেন, মনে রাখবেন প্রশস্ততা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাফল্য আপনার অতি নিকটবর্তী। আর একথা ও খুব ভালো করে মনে রাখবেন যে, আল্লাহ হলেন সবচেয়ে বড় শ্রবণকারী এবং বান্দার আহ্বানে সাড়া দেয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত মহান সত্তা।
[সূত্র: কাসাসুল আজমান]
©
Inside Bangla