01/08/2026
মৃত্যুর পর বাড়িতে রান্না বন্ধ রাখা: শরিয়তের বিধান, নাকি সমাজের প্রচলিত প্রথা?
কুরআন, সহিহ হাদিস ও ফিকহের আলোকে শরিয়তের বিধান, সমাজের প্রচলিত প্রথা ও ফতোয়া
ভূমিকা
মৃত্যু মানুষের জীবনের এমন এক চিরন্তন সত্য, যা থেকে কোনো মানুষ মুক্ত নয়। জন্ম যেমন নিশ্চিত, তেমনি মৃত্যুও অবধারিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ
"প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।"(সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
আরও ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
"নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং অবশ্যই তাঁর কাছেই ফিরে যাব।"(সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৫৬)
মৃত্যুর মুহূর্তে ইসলাম ধৈর্য ধারণ, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা, জানাযা, দাফন-কাফন, মৃতের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফারের শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মুসলিম সমাজে এমন অনেক প্রথা প্রচলিত হয়েছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি কুরআন, সহিহ সুন্নাহ বা সাহাবায়ে কেরামের আমলে নেই। বরং এগুলোর অনেকগুলোই স্থানীয় সংস্কার, লোকাচার বা কুসংস্কারের প্রভাবে ধর্মের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এসব প্রচলিত ধারণার মধ্যে অন্যতম হলো—পরিবারে কেউ মারা গেলে তিন দিন, চার দিন বা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুলা জ্বালানো যাবে না, রান্না করা যাবে না কিংবা রান্না করলে গুনাহ হবে। কোথাও কোথাও এমনও বিশ্বাস করা হয় যে, রান্না করলে মৃতের রূহ কষ্ট পায় বা অমঙ্গল নেমে আসে। অথচ ইসলামের মৌলিক উৎস—কুরআন, সহিহ সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবসমূহে এমন কোনো বিধান নেই।
বরং সুন্নাহ আমাদের শিক্ষা দেয়—শোকাহত পরিবারকে কষ্ট না দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ধর্মের নামে ভিত্তিহীন প্রথা চালু করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মৃতের বাড়িতে রান্না করা কি বৈধ?
হ্যাঁ। শরিয়তের দৃষ্টিতে মৃতের বাড়িতে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা সম্পূর্ণ জায়েজ। কুরআন, সহিহ সুন্নাহ কিংবা নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থে কোথাও বলা হয়নি যে, মৃত্যু ঘটলে সেই বাড়িতে রান্না করা নিষিদ্ধ হবে বা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুলা জ্বালানো যাবে না। পরিবারের সদস্যদের স্বাভাবিক প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা বৈধ এবং এতে কোনো গুনাহ নেই।
সুন্নাহ কী শিক্ষা দেয়?
হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) মুতার যুদ্ধে শহীদ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
اصْنَعُوا لِآلِ جَعْفَرٍ طَعَامًا، فَقَدْ أَتَاهُمْ مَا يَشْغَلُهُمْ
"তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করো; কারণ তাদের এমন বিপদ এসেছে যা তাদের ব্যস্ত করে রেখেছে।"(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৩২; জামে তিরমিযী, হাদিস: ৯৯৮)
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, শোকাহত পরিবারের জন্য প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের খাবার পাঠানো সুন্নাত ও মুস্তাহাব। কারণ শোকের কারণে তারা রান্না করার মতো মানসিক অবস্থায় নাও থাকতে পারেন। এটি সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সহযোগিতার এক অনন্য ইসলামী শিক্ষা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাদের নিজেদের জন্য রান্না করা হারাম বা নিষিদ্ধ। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী তারা রান্না করলে তা সম্পূর্ণ জায়েজ।
শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার পাঠানোর বিধান
ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, শোকের প্রাথমিক সময়ে—প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী—প্রতিবেশী ও নিকট আত্মীয়দের পক্ষ থেকে একদিন-একরাত বা প্রয়োজনে তিন দিন পর্যন্ত মৃতের পরিবারের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা মুস্তাহাব। কারণ এ সময় তারা দাফন-কাফন, আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনা এবং মানসিক কষ্টে ব্যস্ত থাকেন।
হানাফি ফিকহে উল্লেখ আছে—
"মৃতের পরিবারের জন্য প্রতিবেশীদের খাবার পাঠানো মুস্তাহাব; কারণ এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ।"(আদ্-দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জানায়িয)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন—
"মৃতের পরিবারের জন্য প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের খাবার প্রস্তুত করা মুস্তাহাব। এ বিষয়ে আলিমদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।"(আল-মাজমূ', খণ্ড ৫)
অতএব, তিন দিন পর্যন্ত খাবার পাঠানো কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্নাহসম্মত সামাজিক সহযোগিতা।
মৃতের বাড়িতে রান্না নিষিদ্ধ—এ ধারণার কোনো দলিল আছে কি?
না।
কুরআন, সহিহ হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল কিংবা চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থে কোথাও বলা হয়নি যে—
তিন দিন চুলা জ্বালানো যাবে না।
চার দিন রান্না করা যাবে না।
চল্লিশ দিন রান্না নিষিদ্ধ।
রান্না করলে মৃতের রূহ কষ্ট পায়।
রান্না করলে অমঙ্গল নেমে আসে।
এসব বিশ্বাসের কোনো সহিহ শরয়ি ভিত্তি নেই। এগুলো সমাজের প্রচলিত লোকাচার ও কুসংস্কার; ইসলামের বিধান নয়।
ইসলাম অতিরঞ্জিত শোক সমর্থন করে না
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا
"আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য স্বামীর মৃত্যু ব্যতীত অন্য কারও জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়। আর স্বামীর জন্য চার মাস দশ দিন।"(সহিহ বুখারি, হাদিস: ১২৮০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৮৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম শোককে ভারসাম্যপূর্ণ রেখেছে; কিন্তু শোকের নামে নতুন নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেনি।
মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে লোকদের খাওয়ানোর বিধান
সাহাবি জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন—
كُنَّا نَعُدُّ الِاجْتِمَاعَ إِلَى أَهْلِ الْمَيِّتِ وَصَنِيعَةَ الطَّعَامِ بَعْدَ دَفْنِهِ مِنَ النِّيَاحَةِ
"আমরা দাফনের পর মৃতের বাড়িতে সমবেত হওয়া এবং মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করাকে নিয়াহা (অবৈধ শোকাচরণ)-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম।"
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬১২)
অতএব, শোকাহত পরিবারকে অতিথিদের জন্য রান্না করতে বাধ্য করা সুন্নাহর পরিপন্থী। বরং তাদের জন্য অন্যদের খাবার নিয়ে যাওয়াই সুন্নাহ।
চার মাযহাবের ফিকহি বক্তব্য
চার মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফিকহি গ্রন্থসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে—
মৃতের পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো মুস্তাহাব।
শোকাহত পরিবারকে রান্নার কষ্ট না দেওয়া উত্তম।
তারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করলে তা সম্পূর্ণ জায়েজ।
তাদের ওপর লোকদের আপ্যায়নের চাপ সৃষ্টি করা অনুচিত।
এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে—
রদ্দুল মুহতার (হানাফি)
আল-মাজমূ' (শাফেয়ি)
আল-মুগনী (হাম্বলি)
আল-মুদাওয়ানাহ (মালিকি)
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
যদি কোনো পরিবার গভীর শোক, মানসিক অস্থিরতা বা দাফন-কাফনের ব্যস্ততার কারণে এক-দুই দিন নিজেরা রান্না না করে এবং প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজন তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন, তাহলে এতে কোনো অসুবিধা নেই। বরং এটি সুন্নাহসম্মত সামাজিক সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। সমস্যা তখনই, যখন এটিকে শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধান বা ধর্মীয় নিয়ম মনে করা হয়।
প্রচলিত ভুল ধারণাসমূহ
তিন দিন চুলা জ্বালানো যাবে না।
চার দিন বা চল্লিশ দিন রান্না করা যাবে না।
রান্না করলে গুনাহ হবে।
রান্না করলে মৃতের রূহ কষ্ট পায়।
রান্না করলে অমঙ্গল নেমে আসে।
চুলা জ্বালালে শোক নষ্ট হয়ে যায়।
এসব বিশ্বাসের কোনো সহিহ শরয়ি দলিল নেই।
এগুলোকে ইসলামের বিধান হিসেবে প্রচার করা বৈধ নয়।
ফতোয়া
১. পরিবারে কেউ মারা গেলে সেই বাড়িতে রান্না করা ও চুলা জ্বালানো সম্পূর্ণ জায়েজ।
২. চুলা জ্বালানো বন্ধ রাখা শরিয়তের কোনো বিধান নয়।
৩. তিন দিন, চার দিন বা চল্লিশ দিন রান্না নিষিদ্ধ—এমন বিশ্বাসের কোনো সহিহ শরয়ি ভিত্তি নেই।
৪. প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারের জন্য খাবার পাঠানো সুন্নাত ও মুস্তাহাব।
৫. প্রয়োজন অনুযায়ী শোকের প্রাথমিক কয়েক দিন খাবার পৌঁছে দেওয়া উত্তম, মানবিক এবং সুন্নাহসম্মত আমল।
৬. মৃতের পরিবারের ওপর লোকদের খাওয়ানোর সামাজিক চাপ সৃষ্টি করা কিংবা এটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা মনে করা সুন্নাহবিরোধী।
উপসংহার
ইসলাম দলিলভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও সহজ জীবনব্যবস্থা। মৃত্যু উপলক্ষে শোক পালন বৈধ; কিন্তু শরিয়তে নেই—এমন প্রথাকে ধর্মের অংশ বানানো বৈধ নয়। মৃতের বাড়িতে রান্না করা বা চুলা জ্বালানো নিষিদ্ধ নয়; বরং পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী তা করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
সুন্নাহ হলো শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা, তাদের কষ্ট লাঘব করা এবং তাদের ওপর অযথা সামাজিক চাপ সৃষ্টি না করা।
অতএব, মুসলিম সমাজের উচিত কুসংস্কার, বিদআত ও ভিত্তিহীন লোকাচার পরিহার করে কুরআন, সহিহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি নির্দেশনার আলোকে আমল করা। মুমিনের কর্তব্য হলো প্রতিটি ইবাদত, আমল ও সামাজিক রীতিকে দলিলের আলোকে যাচাই করা; কারণ কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণই ইসলামের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন এবং বিদআত, কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন সামাজিক প্রথা থেকে হিফাজত করুন।
আমীন।
লেখক, সাঈদ আল মামুন