17/08/2026
প্রথম দিন এখনো শেষ করতে পারিনি, অথচ কত গল্প জমে গেছে!
সবকিছু হয়তো খুব সুন্দর করে লিখতে পারছি না, কিন্তু মন থেকে লিখে যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, এই পেজে নিয়মিত থাকবে সফরের গল্প, হজ-ওমরার অভিজ্ঞতা, দরকারি তথ্য আর পথে পথে শেখা কিছু কথা।
হয়তো আমার এই ছোট্ট সফরকাহিনি কারও বড় একটি সফরের প্রস্তুতিতে কাজে আসবে। 🤍
সৌদিতে সিম ও ইন্টারনেট
দেশের বাইরে প্রথমবার পা রাখলে কিছু নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে—এটা জানতাম। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলোর কিছু যে এত দ্রুত এবং এত বাস্তবভাবে সামনে এসে দাঁড়াবে, তা হয়তো ভাবিনি। সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর প্রথম যে সমস্যাটির মুখোমুখি হলাম, সেটি ছিল যোগাযোগসংক্রান্ত। আর এই ছোট্ট সমস্যাটিই আমাকে বিদেশ ভ্রমণের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে গেল।
দেশ থেকে বের হওয়ার আগে নিজের দেশের সিমটি রোমিং করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। কিন্তু রোমিং করলে অনেক খরচ হবে—এই চিন্তা থেকে সেটি আর করা হয়নি। ভেবেছিলাম, সৌদি আরবে গিয়ে খুব সহজেই একটি স্থানীয় সিম কিনে নেব। এতে ইন্টারনেটও থাকবে, আবার স্থানীয় বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সহজ হবে। পরিকল্পনাটা শুনতে বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু বাস্তবে সিম কিনতে গিয়েই প্রথম ধাক্কাটা খেলাম।
একটি সিমের দাম ৮০ রিয়াল, সঙ্গে মাত্র ৩০ জিবি ইন্টারনেট। অথচ দেশে যেখানে অনায়াসেই প্রতি মাসে ২০০–৩০০ জিবি পর্যন্ত ইন্টারনেট খরচ হয়ে যায়, সেখানে ৩০ জিবি আমার কাছে নস্যি বলেই মনে হলো। শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি হলো—হোটেলের ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার পরও মাত্র তিন দিনেই সেই ৩০ জিবি শেষ হয়ে গেল। ক্লাসের ভিডিও ডাউনলোড, আপলোড এবং অনলাইন কাজের কারণে আমার ইন্টারনেটের ব্যবহার একটু বেশি হয়, এটা ঠিক। তবে খুব হিসেব করেই ব্যবহার করার পরও তিন দিনে পুরো প্যাকেজ শেষ হয়ে যাওয়াটা আমার জন্য বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল।
আমি তখন ‘মোবাইলি’ নামের একটি কোম্পানির সিম কিনেছিলাম। দোকানে ঢোকার পর সেখানে বসা কর্মচারী প্রথমে মুচকি হেসে আমাকে সিরিয়াল নিতে বললেন। আমি শুরু থেকেই তার সঙ্গে আরবিতে কথা বলছিলাম। সৌদি আরবে আসার পর এটাই ছিল কোনো একজনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময় ধরে আরবিতে কথা বলার সুযোগ। এর আগে জেদ্দা বিমানবন্দরে এক সৌদি নারীর সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য কথা বলতে হয়েছিল। সেখানেও আরবি ভাষার সুফল খুব স্পষ্টভাবে পেয়েছিলাম। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারার কারণে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো খুব সহজেই বুঝিয়ে বলা এবং বুঝে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল।
মোবাইলির সেই কর্মচারীর সঙ্গেও তাই বেশ স্বচ্ছন্দে কথা বলছিলাম। কোন প্যাকেজটি আমার জন্য ভালো হবে, কত জিবি ইন্টারনেট আছে, কী সুবিধা রয়েছে—এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন করছিলাম। এমনকি দাম কিছুটা কমানোর জন্য ডিসকাউন্টের কথাও বললাম। সে বেশ বিনয়ের সঙ্গে জানাল, সে কেবল একজন কর্মচারী; তার পক্ষ থেকে কোনো ডিসকাউন্ট দেওয়ার সুযোগ নেই। তখন অবশ্য জানতাম না, সরাসরি অফিসিয়াল স্টোরের বাইরে থেকেও সিম কেনা যায় এবং অনেক সময় সেখানে তুলনামূলক কম দামে প্যাকেজ পাওয়া যায়, এমনকি কিছুটা ডিসকাউন্টও মেলে। পরে বিষয়টি জানতে পেরেছিলাম এবং দ্বিতীয়বার সিম কেনার সময় সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছিলাম।
তবে সিমটি কেনা আমার জন্য নিছক ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয় ছিল না; ছিল পরিবারের দুশ্চিন্তা এবং দায়িত্বের ব্যাপারও।
সৌদি আরবে পৌঁছে হোটেলে ওঠার পর বাসায় ফোন করে নিজের অবস্থান এবং সার্বিক পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু এরপর হোটেল থেকে বের হয়ে ওমরা আদায় করতে গিয়ে প্রায় পাঁচ-ছয় ঘণ্টার মতো কোনো যোগাযোগ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই দেশে থাকা মানুষগুলো দুশ্চিন্তা করছিল। তাই ওমরা শেষ করার পর আমার প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল একটি সিম সংগ্রহ করা, যাতে দ্রুত বাসায় যোগাযোগ করে জানাতে পারি—আলহামদুলিল্লাহ, আমি ভালো আছি।
এই অভিজ্ঞতার পর মনে হলো, ভবিষ্যতে আল্লাহ তাআলা যদি আবার সৌদি আরব কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ দেন, তাহলে দেশের সিমটি রোমিং করে নিয়ে যাওয়াই সম্ভবত বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে। খরচ কিছুটা বেশি হলেও এতে অন্তত শুরুতেই যোগাযোগের ঝামেলায় পড়তে হবে না। মোবাইল ব্যাংকিংসহ দেশের নম্বরের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও সহজে করা যাবে। বিদেশের মাটিতে নেমে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় একটি নতুন সিমের পেছনে ছুটতে হবে না—এটাও কম স্বস্তির বিষয় নয়।
তবে এই পুরো অভিজ্ঞতার আরেকটি দিকও আছে। কেউ যদি সত্যিই দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ১৫ দিন কিংবা ৪০ দিনের জন্য এমন কোনো সফরে যেতে পারেন, যেখানে যোগাযোগের প্রয়োজন নেই, তাহলে সেটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের নিয়ামত। বিশেষ করে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সফরে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা মানুষের জন্য কল্যাণকরও হতে পারে।
কিন্তু সবার বাস্তবতা এক নয়। কারও চলাফেরা, কাজ, দায়িত্ব কিংবা আচরণের সঙ্গে অন্য অনেক মানুষের হক জড়িত থাকে। পরিবারের মানুষ তার অবস্থান জানতে চায়, সহকর্মীরা প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে চায়, কখনো শিক্ষার্থী, ব্যবসায়িক অংশীদার কিংবা অন্য কোনো মানুষেরও আপনার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে। তখন চাইলেও পুরোপুরি যোগাযোগের বাইরে থাকা সম্ভব হয় না। নিজের অবস্থান গোপন করে রাখাও সব সময় সম্ভব বা সমীচীন নয়।
আমার অবস্থাটাও অনেকটা তেমনই ছিল।
তাই একটি সিম কার্ডের গল্প মনে হলেও, আমার কাছে এটি আসলে বিদেশের মাটিতে প্রথম শেখা একটি ছোট্ট শিক্ষা—ভ্রমণের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ব্যাগ গোছানো, টিকিট-ভিসা ঠিক করার পাশাপাশি যোগাযোগের ব্যবস্থা কী হবে, কীভাবে পরিবারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকব, জরুরি মুহূর্তে কীভাবে যোগাযোগ করব—এসব বিষয়ও সফরের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আশা করি, আমার এই ছোট্ট অভিজ্ঞতা অন্য কারও সফরের শুরুটা একটু সহজ করে দেবে।