05/01/2026
ঋণজালের দিনলিপি-২
জননী: আমার নিঃশব্দ মহাবিশ্ব
ছ’মাস হলো ‘মা’ পরপারে চলে গেছেন। মরণব্যাধি ক্যান্সার কেড়ে নিয়েছে মায়ের মমতা। আজও প্রতিটি ভোরে যখন চোখ মেলি, মনে হয় ঘরময় সেই ঘাম আর বাসি ভাতের চিরচেনা গন্ধটা লেগে আছে। লোকে বলে বাবা নাকি বটগাছ, কিন্তু আমার ধূসর মরুভূমির মতো জীবনে ‘মা’ ছিলেন নীল আকাশ আর শ্রাবণের মেঘ। স্নেহ কিংবা শাসন কেমন-তা বোঝার আগেই পিতৃহীন হয়েছিলাম। দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান হওয়ায় পৈতৃক ভিটায় জায়গা হয়নি; ঠাঁই মিলেছিল নানা বাড়ির অবহেলা আর বঞ্চনার ঘেরাটোপে।
আমার শৈশব ছিল বঞ্চনার এক দীর্ঘ মিছিল। বন্ধুরা যখন নতুন জামা পরে স্কুলে আসত, আমি তখন মায়ের তালি দেওয়া পুরনো শার্টের ভেতরে নিজেকে লুকিয়ে রাখতাম। ছেঁড়া ব্যাগের চেইনটা আটকে রাখতে রাখতে আঙুল ব্যথা হয়ে যেত। মাঝে মাঝে খাতা কেনার পয়সা চাইতাম, কিন্তু মায়ের আঁচলের সেই পরিচিত খুচরো পয়সার ঝনঝনানি যখন স্তব্ধ থাকত, তখন বুঝতাম অভাব আজ ঘরের দরজায় দাঁত বের করে হাসছে।
কিন্তু মা! তিনি ছিলেন এক অনন্য জাদুকর। নিজের পেটে ক্ষুধার হাহাকার পুষে রেখে যখন আমাকে খাইয়ে দিতেন, তখন তাঁর শুকনো ঠোঁটের কোণে যে হাসিটা ফুটে উঠত, আমার মনে হতো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তৃপ্তি বুঝি ওইটুকুতেই।
মা কোনোদিন স্কুলের বারান্দায় পা রাখেননি, কিন্তু জীবনের কঠিন সব সংকটে তিনি যখন বলতেন,“চিন্তা করিস না রে পাগল, সব ঠিক হয়ে যাবে”, তখন মনে হতো মহাবিশ্বের সমস্ত লাইব্রেরির জ্ঞান ওই একটা বাক্যেই লুকানো আছে।
বগুড়া, রাজশাহী কিংবা ঢাকার মেসে যখন অনাহারে রাত কেটেছে, তখন মায়ের সেই নির্ভীক কণ্ঠস্বর আমাকে ধ্রুবতারার মতো পথ দেখাত। আমি রাজনীতি করতাম বলে অনেকে বাঁকা চোখে তাকাত, কিন্তু মা ছিলেন আমার সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস। বুক ফুলিয়ে মানুষের কাছে বলতেন, “আমার ছেলে তো নিজের জন্য না, দশের জন্য লড়ে।” মায়ের এই এক চিলতে বিশ্বাসই ছিল আমার রাজনৈতিক জীবনের শিরদাঁড়া।
আমার মা শিক্ষিত ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তিনি ছিলেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠতম অধ্যাপক। কোনো কিতাব ছাড়াই তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন ‘মানুষ’ হওয়ার পাঠ। আজ জীবনের সফলতার স্বর্ণশিখরে দাঁড়িয়ে কেবল একটি আক্ষেপই বুকের পাঁজরে বিঁধে থাকে-মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কোনোদিন বলতে পারিনি, “মা, তোমাকে বড্ড ভালোবাসি।”
মায়ের গায়ের ঘামের গন্ধ আর চোখের জলের ঋণ শোধ করার মতো কোনো মুদ্রা আজও এই ধরণীতে আবিষ্কৃত হয়নি। মা নেই, কিন্তু আমার প্রতিটি সৎ পদক্ষেপে তিনি বেঁচে আছেন। ‘মা’ তোমায় বিনম্র শ্রদ্ধা।
(চলবে। আগামী পর্বে আমার জীবন লড়াইয়ের পাশে থাকা অন্য কারো কাহিনী নিয়ে হাজির হবো আপনাদের সামনে।)
#ঋণজালের_দিনলিপি #ঋণমুক্তি #সচেতনত #জীবনযুদ্ধ
#বাস্তবতা #আমার_গল্প #ঘুরে_দাঁড়ানোর_লড়াই
#বেঁচে_থাকার_লড়াই #নিঃসঙ্গ_লড়াই
#চলনবিল #মানবিকতা_বেঁচে_থাকুক #মানুষের_গল্প