19/06/2026
পার্ট ২
সত্যিটা কখনও কখনও আরও ভয়ংকর, আবার আরও মানবিক
মেহরিন নিখোঁজ হওয়ার পর পুরো বিল্ডিংয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল।
সবার মুখে একই প্রশ্ন।
মেয়েটা গেল কোথায়?
ফ্ল্যাটের সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
চেইন লাগানো।
জোর করে ঢোকার কোনো চিহ্ন নেই।
ঘরের সবকিছু ঠিকঠাক।
শুধু মেহরিন নেই।
যেন রাত ৩:১৭-এর পর সে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ব্যাখ্যা খুঁজতে থাকে।
যেখানে ব্যাখ্যা পায় না, সেখানে গল্প বানায়।
কেউ বলল জিন।
কেউ বলল অশরীরী কিছু।
কেউ বলল ওই ফ্ল্যাটে আগে থেকেই অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
ভয় খুব দ্রুত ছড়ায়।
আর একবার ছড়ালে মানুষ সত্যের চেয়ে গল্প বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে।
কিন্তু সবাই যখন অলৌকিক ব্যাখ্যা খুঁজছিল, তখন একজন মানুষ ঘটনাটাকে অন্য চোখে দেখলেন।
ড. আরিবা রহমান।
তিনি মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করেন।
বিশেষ করে ভয়, আতঙ্ক, ঘুম আর মানসিক বিপর্যয় নিয়ে।
পুলিশ যখন মেহরিনের ফোনের ভিডিওটা তার সামনে চালাল, তিনি অনেকক্ষণ চুপচাপ দেখলেন।
ভিডিওতে মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাত কাঁপছে।
শ্বাস দ্রুত।
চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে আছে।
মনে হচ্ছিল সে এমন কিছু দেখছে, যেটা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব।
ভিডিওর শেষ দিকে তার ঠোঁট কাঁপল।
খুব আস্তে সে বলল—
“আমার পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে…?”
ভিডিও শেষ।
ঘরে নীরবতা।
পুলিশ অফিসার ধীরে বললেন,
“ম্যাডাম… আপনি কী মনে করেন?”
ড. আরিবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“আমি মনে করি মেহরিন কোনো অশরীরীর সাথে না…
নিজের মস্তিষ্কের সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থার সাথে লড়ছিল।”
ঘরে আবার নীরবতা।
তিনি ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা শুরু করলেন।
“মানুষের মস্তিষ্ক খুব শক্তিশালী।”
“কিন্তু ভয়ের সময়…
এই শক্তিশালী জিনিসটাই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে যেতে পারে।”
তিনি বোর্ডে লিখলেন—
ভয় → আতঙ্ক → বিকৃত উপলব্ধি → আরও ভয়
“এটা একটা চক্র।”
“একবার ঢুকে গেলে বের হওয়া কঠিন।”
তিনি বললেন—
রাত ৩টার পর মানুষের শরীর আর মস্তিষ্ক সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় থাকে।
ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে কখনো কখনো মস্তিষ্ক পুরোপুরি জেগে উঠতে পারে না।
শরীরের একটা অংশ জেগে ওঠে।
কিন্তু অনুভূতি, উপলব্ধি—সব এলোমেলো হয়ে যায়।
ফলে—
ছোট শব্দ বড় লাগে।
ছায়া মানুষ লাগে।
নিজের চিন্তার আওয়াজ বাইরের শব্দ মনে হয়।
এমনকি…
নিজের গলাও বাইরের কারও গলা মনে হতে পারে।
একজন অফিসার অবাক হয়ে বললেন,
“মানে… সে নিজের গলা শুনেছে?”
ড. আরিবা মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। সম্ভব।”
“আর যখন panic শুরু হয়…
brain শুধু একটা জিনিস দেখে।”
Threat.
বিপদ।
বাস্তবে থাকুক বা না থাকুক।
তিনি ভিডিও pause করলেন।
স্ক্রিনে সময় দেখা যাচ্ছে—
৩:২০।
তিনি zoom করলেন।
ঘরের এক কোণায় বারান্দার কাঁচে খুব ছোট্ট একটা reflection।
সবাই প্রথমে বুঝল না।
তারপর একজন অফিসার হঠাৎ সামনে ঝুঁকে পড়লেন।
“এক মিনিট…”
Reflection-এ খুব অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে—
মেহরিন ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হচ্ছে।
ভিডিওতে সরাসরি দেখা যায়নি।
কিন্তু reflection-এ ধরা পড়েছে।
ড. আরিবা শান্ত গলায় বললেন,
“ও তখন extreme panic state-এ ছিল।”
“সে বিশ্বাস করে ফেলেছিল—
ঘরের ভেতর কিছু একটা আছে।”
“আর তখন তার brain শুধু একটাই নির্দেশ দেয়।”
পালাও।
যেভাবেই হোক পালাও।
পুরো বিল্ডিং আবার তল্লাশি করা হলো।
পাঁচতলার বারান্দার নিচে একটা সরু কার্নিশ পাওয়া গেল।
খুব সরু।
স্বাভাবিক অবস্থায় কেউ ওখানে নামবে না।
কিন্তু আতঙ্কের মুহূর্তে মানুষ অসম্ভব কাজও করে ফেলে।
সেখানে একটা জিনিস পাওয়া গেল।
মেহরিনের স্যান্ডেলের এক পাটি।
সবাই চুপ হয়ে গেল।
আরও নিচে খুঁজতে গিয়ে তারা পুরোনো maintenance shaft খুঁজে পেল।
বিল্ডিংয়ের অনেকেই জায়গাটার কথা জানত না।
সেখানে…
মেহরিনকে পাওয়া গেল।
জীবিত।
অজ্ঞান।
আহত।
দুর্বল।
কিন্তু জীবিত।
হাসপাতালে চারদিন পর তার পুরো জ্ঞান ফিরল।
ড. আরিবা তার পাশে বসে ছিলেন।
কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর তিনি নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
“সেদিন রাতে তুমি কী দেখেছিলে?”
মেহরিন অনেকক্ষণ চুপ।
তার চোখে পানি জমে উঠল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
“আমি সত্যি ভেবেছিলাম কেউ আমার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।”
তার গলা কাঁপছিল।
“আমি ওর নিঃশ্বাস অনুভব করছিলাম…”
“আমি নিশ্চিত ছিলাম…”
“আমি মরতে যাচ্ছিলাম…”
সে কাঁদতে শুরু করল।
ড. আরিবা তাকে থামালেন না।
কাঁদতে দিলেন।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন—
“আমি বিশ্বাস করি তুমি যা অনুভব করেছিলে, সেটা তোমার কাছে সম্পূর্ণ বাস্তব ছিল।”
মেহরিন তাকাল।
ড. আরিবা বললেন—
“কিন্তু একটা জিনিস মনে রেখো।”
“অনুভব করা আর সত্য হওয়া এক কথা না।”
মেহরিন চুপ।
“তুমি পাগল হয়ে যাওনি।”
“তুমি দুর্বলও না।”
“তুমি মানুষ।”
“আর মানুষ ভয় পেলে কখনো কখনো নিজের বিরুদ্ধেই কাজ করে।”
এই কথাটা শুনে মেহরিনের চোখ বেয়ে পানি পড়ল।পরের কয়েক সপ্তাহে মেহরিন ধীরে ধীরে সুস্থ হলো।
শ্বাস নিয়ন্ত্রণ শিখল।
Grounding শিখল।
Reality check শিখল।
যখন হৃদস্পন্দন বেড়ে যাবে,
প্রথমে শ্বাস ধীর করো।
যখন মনে হবে কেউ আছে,
আলো জ্বালাও।
যখন brain ভয়ের গল্প বানাবে,
নিজেকে জিজ্ঞেস করো—
Evidence কোথায়?
যখন panic বাড়বে,
কাউকে call করো।
কারণ isolation ভয়কে শক্তিশালী করে।
Connection ভয়কে দুর্বল করে।
ছয় মাস পরে মেহরিন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরল।
কিন্তু একটা কথা সে আর কখনো ভুলেনি।
ভয় সবসময় বাইরের কিছু না।
অনেক সময় সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা থাকে আমাদের নিজের মাথার ভেতর।
Unchecked fear.
যদি তাকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে উঠতে দাও,
সে তোমাকে এমন জিনিসও দেখাতে পারে—
যা আসলে কখনো ছিলই না।
আজ রাতেও যদি কখনো
রাত ৩:১৭-এ তোমার ঘুম ভেঙে যায়…
আর মনে হয় ঘরে কেউ আছে…
একটা কথা মনে রেখো।
প্রথমে নিজেকে জিজ্ঞেস করো—
“এটা সত্যি?”
নাকি
“আমার আতঙ্ক আমাকে গল্প শোনাচ্ছে?”
কারণ অনেক সময়…
আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু
অন্ধকার না।
নিঃশব্দ রাতও না।
বরং—
অযাচিত ভয়।
আর সুখবর হলো…
যে ভয় মস্তিষ্ক তৈরি করে,
সেই ভয়কে মস্তিষ্কই জয় করতে পারে।
লেখনি: Mirza Tania Tazneen
18/06/2026
রাত ৩টার পরের সময়টা অদ্ভুত।
যারা মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে একা অন্ধকার ঘরে শুয়ে থেকেছো, তারা জানো—এই সময়ের নীরবতা অন্যরকম।
দিনের নীরবতা আর রাত ৩টার নীরবতা এক না।
এই সময়ে ছোট ছোট শব্দও স্বাভাবিক লাগে না।
ফ্রিজের মৃদু আওয়াজ।
দূরের কুকুরের ডাক।
অথবা পাশের ঘর থেকে আসা হালকা টোকা।
সবকিছু কেমন যেন… অস্বাভাবিক লাগে।
মেহরিন এটা বুঝেছিল।
কিন্তু একটু দেরিতে।
মিরপুরের একটা পুরোনো ফ্ল্যাটে সে একাই থাকত।
পাঁচতলা।
বিল্ডিংটা খুব খারাপ ছিল না, কিন্তু পুরোনো।
করিডোরে সবসময় স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ লেগে থাকত।
রাতে লিফট বন্ধ হয়ে গেলে পুরো বিল্ডিংটা অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে যেত।
সেদিন রাতেও সব স্বাভাবিক ছিল।
ঘুমানোর আগে রান্নাঘর গুছিয়ে রেখেছিল।
মায়ের সাথে কথা বলেছিল।
তারপর শুয়ে পড়ে।
তার একটা অভ্যাস ছিল।
ঘুমানোর আগে সদর দরজা দুবার পরীক্ষা করা।
তালা।
চেইন।
সব ঠিক।
এরপর বাতি নিভিয়ে ঘুম।
রাত ৩টা ১৭।
হঠাৎ তার ঘুম ভাঙল।
প্রথমে বুঝতেই পারল না কেন।
চোখ খুলে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঘর অন্ধকার।
নিঃশব্দ।
তারপর সে শব্দটা শুনল।
টক…
একটু বিরতি।
আবার।
টক…
যেন কেউ কাঠের ওপর নখ দিয়ে আস্তে টোকা দিচ্ছে।
শব্দটা ড্রয়িংরুম থেকে আসছে।
মেহরিন উঠে বসল।
ঘুম জড়ানো চোখে ফোনের দিকে তাকাল।
৩:১৭।
ঠিক তখনই আবার।
টক…
টক…
এইবার পরপর দুইবার।
তার বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জমতে শুরু করল।
নিজেকে বোঝাল—
হয়তো টেবিলের ওপর কিছু পড়ে গেছে।
হয়তো পাশের ফ্ল্যাটের শব্দ।
কিন্তু একটা বিষয় তাকে অস্বস্তিতে ফেলছিল।
শব্দটা থামছিল।
আবার শুরু হচ্ছিল।
যেন কেউ অপেক্ষা করছে।
সে জেগেছে কি না, সেটা বোঝার জন্য।
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল।
পা টিপে দরজার কাছে গেল।
শব্দ নেই।
পুরো বাসা চুপ।
এতটাই চুপ যে নিজের নিঃশ্বাসও ভারী লাগছিল।
দরজার হাতলে হাত রাখল।
আর ঠিক তখনই—
টক।
এইবার শব্দটা ড্রয়িংরুমে না।
তার দরজার ওপাশে।
একদম সামনে।
মেহরিন জমে গেল।
তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
তারপর—
একটা গলা।
খুব আস্তে।
“মেহরিন…”
তার বুকের ভেতর সবকিছু যেন থেমে গেল।
কারণ গলাটা পরিচিত।
অসম্ভব রকম পরিচিত।
ওই গলাটা তার নিজের।
একদম নিজের।
“মেহরিন…”
“দরজা খোল…”
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে নড়ছে না।
শ্বাসও যেন নিতে পারছে না।
দরজার ওপাশে আবার।
এইবার একটু নরম স্বরে।
“ভয় পাস না।”
“আমি তুই।”
মেহরিন ধীরে ধীরে পিছিয়ে এল।
তার মাথা কাজ করছে না।
এটা অসম্ভব।
কেউ এভাবে নিজের গলা নকল করতে পারে না।
ঠিক তখন তার ফোনে আলো জ্বলে উঠল।
অচেনা নম্বর।
একটা বার্তা।
সে কাঁপা হাতে খুলল।
“দরজা খুলো না।”
কয়েক সেকেন্ড পর আরেকটা বার্তা।
“চুপ থাকো।”
আরেকটা।
“ও এখনও বুঝতে পারেনি তুমি জেগে আছ।”
মেহরিনের পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
ও?
কে ও?
তার হাত কাঁপছে।
ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
তারপর আরেকটা বার্তা।
এইবার সে পড়ে নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
“ও এখনও ভাবে তুমি দরজার ওপাশে আছ।”
তার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
দরজার ওপাশে?
তাহলে…
সে কোথায়?
ঠিক তখনই—
তার ঘরের ভেতর থেকে শব্দ।
খুব হালকা।
খস…
যেন কাপড় মেঝেতে ঘষছে।
একদম তার পেছনে।
মেহরিনের শরীর জমে গেল।
তারপর—
কানের একদম কাছে।
ঠান্ডা একটা নিঃশ্বাস।
সে বুঝল…
কেউ একজন তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু সে কোনো পায়ের শব্দ শুনেনি।
কোনো দরজা খোলার শব্দও না।
তাহলে…
এটা ভেতরে এলো কীভাবে?
তারপর খুব নিচু স্বরে একটা ফিসফিস।
একদম কানের পাশে।
“ফোনটা নামাও…”
“ও বুঝে যাবে…”
মেহরিনের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
সে চিৎকার করতে চাইছে।
পারছে না।
দরজার ওপাশে তখন হঠাৎ জোরে ধাক্কা।
ধাম!
ধাম!
ধাম!
আর নিজের গলায় চিৎকার—
“মেহরিন!”
“দরজা খোল!”
“ও তোর পেছনে দাঁড়িয়ে আছে!”
একই সময়ে…
তার কানের পাশে থাকা জিনিসটা ধীরে ধীরে হেসে উঠল।
শুকনো।
ঠান্ডা।
অস্বাভাবিক।
তারপর বলল—
“এখন…”
“ও আমাকে দেখে ফেলেছে।”
পরদিন দুপুরে বাড়িওয়ালা অতিরিক্ত চাবি দিয়ে দরজা খোলে।
সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।
চেইন লাগানো।
সব ঠিকঠাক।
জোর করে ঢোকার কোনো চিহ্ন নেই।
মেহরিন নেই।
শুধু তার ফোনটা বিছানার ওপর পড়ে ছিল।
স্ক্রিনে শেষ খোলা বার্তা।
অচেনা নম্বর থেকে।
“পেছনে তাকিয়ো না।”
পুলিশ ফোনটা পরীক্ষা করে জানতে পারে—
সব বার্তা মেহরিনের নিজের নম্বর থেকেই পাঠানো।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপারটা পরে জানা যায়।
ফোনের সামনে ক্যামেরা রাত ৩:১৭ থেকে ৩:২১ পর্যন্ত চার মিনিট ভিডিও ধারণ করেছিল।
ভিডিওতে মেহরিনকে দেখা যায়।
সে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
একদম স্থির।
তার হাতে ফোন।
সে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
কিন্তু দরজার সামনে কেউ নেই।
কেউ না।
পুরো চার মিনিট ধরে সে ফাঁকা দরজার দিকে তাকিয়ে কাঁপছিল।
ভিডিওর শেষ ৩ সেকেন্ডে…
মেহরিন ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকায়।
তার চোখ দুটো ভয়ে প্রায় বের হয়ে আসছে।
সে কাঁপা ঠোঁটে মাত্র একটা কথা বলে।
“আমার পেছনে কে দাঁড়িয়ে আছে…?”
ভিডিওটা সেখানেই শেষ।
আজও যদি কখনো রাত ৩:১৭-এ তোমার ঘুম ভেঙে যায়…
আর দরজার ওপাশ থেকে
তোমার নিজের গলায় কেউ ডাকে—
দয়া করে একটা কাজ কোরো।
প্রথমে ফোনের সামনে ক্যামেরাটা খুলে দেখো।
কারণ…
কখনও কখনও
আমরা সামনে যা দেখি,
তার চেয়ে অনেক ভয়ংকর কিছু দাঁড়িয়ে থাকে ঠিক আমাদের পেছনে।
(চলো একটু ভয় পাই)
লেখনি: Mirza Tania Tazneen
14/06/2026
মেলাদিন কিছু লেখালেখি করি না।
আজ দুপুরে স্কুল থেইকা পুত্ররে নিয়া আসতেছিলাম। রাস্তার মাঝখানে দেখি কয়ডা পাকা আম পইড়া আছে। ঠিক পাশেই আবার কয়ডা হাগা (গু) পইড়া আছে।
আর দৃশ্যটা দেইখা আমার গবেষণাপ্রবণ মন জাগ্রত হইয়া গেল!
দেইখা কী?
বেয়াক্কল মাছিগুলা আম ছাইড়া সব হাগার উপর গিয়া বসতাছে! 😄
ভাবলাম, মাছি হইল এমন এক প্রাণী, যেটা আমের উপরও বসতে পারে, আবার হাগার উপরও বসতে পারে। কিন্তু সুযোগ পাইলে বেশিরভাগ সময় সে হাগাটাই বেছে নেয়।
তারপর মনে হইল, মাছিরে নিয়া হাসতেছি ক্যান?
আমাগো সমাজেও তো কিছু মানুষ আছে ঠিক এই রকম!
আপনি দশটা ভালো কাজ করেন, মানুষরে উপকার করেন, সুন্দর কিছু লেখেন, ভালো কিছু বলেন—ওইগুলা তাদের চোখেই পড়ে না।
কিন্তু একটা ভুল করেন, একটা টাইপো হয়, একবার হোঁচট খান—ব্যাস!
মাছি যেভাবে দূর থেইকা হাগা খুঁজে বের করে, ওনারাও সেভাবেই সেইটারে খুঁজে বের কইরা সেখানে অবতরণ করে।
আম পইড়া আছে, মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াইতাছে—সেদিকে আগ্রহ নাই।
গবেষণার বিষয় একটাই!
জীবনের বড় শিক্ষা হইল, সবাই আপনার আম খুঁজবে না।
কিছু মানুষ আপনার হাগা খুঁজতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
তাই মাছিরে আমের স্বাদ বুঝাইতে যাইয়েন না।
নিজের কাজ কইরা যান।
যার রুচি আছে, সে আম খুঁজে নিবে।
আর যার স্বভাব মাছির মতো, সে তো খুঁজবেই... অন্য জিনিস!
লেখনি: Mirza Tania Tazneen
02/06/2026
তাই শান্ত হও।
সবকিছু পাওয়ার মধ্যেই সুখ লুকিয়ে থাকে না।
কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রশান্তি এসে বসে সেই হৃদয়ে, যে হৃদয় ধীরে ধীরে শিখে ফেলে—রবের বণ্টনে অভিমান নয়, আস্থা রাখতে হয়।
যে ফুল আজ তোমার বাগানে ফোটেনি, হয়তো তার সুবাস তোমার জন্যই অন্য কোনো ঋতুতে জমা রাখা হয়েছে।
যে স্বপ্নটি হাতছাড়া হয়ে গেছে, হয়তো তার বদলে তোমার জন্য লেখা হয়েছে এমন কিছু, যার সৌন্দর্য এখনো তোমার চোখে ধরা পড়েনি।
আমরা প্রায়ই হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর দিকে তাকিয়ে কাঁদি,
অথচ আকাশের মালিক আমাদের দিকে তাকিয়ে বলেন—
"আমি তোমার জন্য যা রেখেছি, তা তোমার কল্পনার চেয়েও উত্তম।"
তাই প্রতিটি না-পাওয়াকে পরাজয় ভেবো না।
সব বন্ধ দরজাকে প্রত্যাখ্যান মনে করো না।
কিছু দরজা বন্ধ হয় পথ রোধ করার জন্য নয়,
বরং ভুল পথে চলে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য।
জীবন যখন তোমার ইচ্ছামতো চলে না,
তখন মনে রেখো—
তোমার পরিকল্পনা সীমিত,
কিন্তু তোমার রবের পরিকল্পনা সীমাহীন।
কত কিছু চেয়েছিলে, পাওনি—
আজ ফিরে তাকিয়ে দেখো,
সেগুলোর অনেকগুলো না পাওয়াই ছিল তোমার জন্য রহমত।
কত মানুষকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলে,
কিন্তু সময় তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে;
হয়তো কারণ আল্লাহ চেয়েছেন তোমার হৃদয় মানুষের ওপর নয়, তাঁর ওপর নির্ভর করতে শিখুক।
তাই শান্ত হও।
বুকভরা অভিযোগগুলো ধীরে ধীরে আকাশের দিকে ছেড়ে দাও।
অপূর্ণতার ভেতরেও সৌন্দর্য খুঁজে নাও।
কারণ যে হৃদয় আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট হতে শেখে,
তার ভেতরে এমন এক নূর জন্ম নেয়,
যা দুঃখকে ধৈর্যে,
অশ্রুকে দোয়ায়,
আর অপেক্ষাকে ইবাদতে রূপান্তরিত করে।
আর তখন মানুষ বুঝতে পারে—
প্রশান্তি সবকিছু পেয়ে যাওয়ার নাম নয়;
প্রশান্তি হলো এই বিশ্বাসে বেঁচে থাকা যে,
"আমার রব কখনো আমার জন্য ভুল নির্বাচন করেন না।"
লেখনি: Mirza Tania Tazneen
31/05/2026
আমার জীবনাদর্শন
আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো মোড়ে অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করি। কিন্তু পরামর্শের আগে একটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আমি কার কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছি?
একটি ভাঙা কম্পাস কখনো পথ দেখাতে পারে না; কারণ সে নিজেই দিক হারিয়ে বসে আছে। তার নির্দেশনা অনুসরণ করলে পথের চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি পাওয়া যায়।
একটি ফাটা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজতে গেলে ছবিটাও ভাঙা দেখায়। কারণ আয়নাটি নিজেই ভঙ্গুর। তেমনি যার দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষতবিক্ষত, তার পরামর্শেও সেই ভাঙনের ছায়া থেকে যায়।
একটি নিভে যাওয়া বাতি আরেকটি বাতিকে আলো দিতে পারে না। আলো ছড়ানোর আগে নিজেকেই জ্বলে উঠতে হয়। নিজের অন্তর যখন অন্ধকারে ডুবে থাকে, তখন অন্যের পথ আলোকিত করার দাবিটা কেবলই দাবি হয়ে থাকে।
আর একটি ভাঙা সেতুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পথিক যদি সেতু পার হওয়ার উপদেশ দেয়, তবে সেই উপদেশ যাচাই করা জরুরি। কারণ যে নিজেই সম্পর্কের সেতু রক্ষা করতে পারেনি, তার অভিজ্ঞতায় শিক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু সেই শিক্ষাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা প্রজ্ঞার কাজ নয়।
তাই পরামর্শ শুনো, কিন্তু পরামর্শদাতার জীবনটাকেও পড়ো। কারণ মানুষ শুধু কথা দেয় না; তার অভিজ্ঞতা, তার ক্ষত, তার দৃষ্টিভঙ্গি—সবকিছুই অদৃশ্যভাবে তার কথার ভেতর স্থান করে নেয়।
১. যে নিজে নিজের ক্ষত চিনতে শেখেনি, সে প্রায়ই অন্যের ক্ষতে ভুল ওষুধ লাগায়।
কারণ মানুষ সাধারণত যা বুঝে, তার চেয়ে বেশি দেয় নিজের অভিজ্ঞতার ছায়া।
২. প্রতিটি পরামর্শ জ্ঞানের সন্তান নয়; অনেক পরামর্শ অপূর্ণ অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি।
তাই কথা শোনার আগে বক্তার জীবনের দিকেও তাকাও।
৩. যে সব সময় বিশ্বাসঘাতকতার গল্প বলে, সে অজান্তেই তোমাকে মানুষ নয়, সন্দেহ দেখতে শেখাতে পারে।
মন বারবার যা শুনে, পৃথিবীকেও তেমনই দেখতে শুরু করে।
৪. অতিরিক্ত তিক্ত মানুষ থেকে সাবধানে শিক্ষা নাও।
কারণ তিক্ত অভিজ্ঞতা কখনো কখনো সত্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
৫. যে নিজে শান্ত নয়, সে তোমাকে শান্তির পথ দেখাতে পারে; কিন্তু পথের সৌন্দর্য বোঝাতে পারে না।
অস্থির হৃদয় মানচিত্র আঁকে, গন্তব্য নয়।
৬. সবচেয়ে জোরে কথা বলা মানুষটি সবসময় সবচেয়ে বেশি জানে না।
অনেক সময় গভীর নদী শব্দ কম করে।
৭. যে নিজের ভুলের দায় নেয় না, তার ব্যাখ্যা শোনো; কিন্তু বিচারবুদ্ধি তাকে ভাড়া দিও না।
দায় এড়ানো মানুষ প্রায়ই বাস্তবতাকেও এড়িয়ে চলে।
৮. কাউকে তার বক্তব্য দিয়ে নয়, কঠিন সময়ে তার আচরণ দিয়ে চিনো।
চরিত্রের আসল ভাষা মুখে নয়, ব্যবহারে লেখা থাকে।
৯. যে প্রতিটি সম্পর্কেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে, সে হয়তো এখনো নিজের গল্পের পুরোটা পড়েনি।
আত্মসমালোচনা ছাড়া আত্মজ্ঞান জন্মায় না।
১০. রাগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রায়ই আগুন দিয়ে লেখা চিঠির মতো।
উত্তাপ কমে যায়, কিন্তু পোড়ার দাগ থেকে যায়।
১১. যে সবসময় সবাইকে বদলাতে চায়, সে অনেক সময় নিজেকে বোঝার কাজটাই পিছিয়ে দেয়।
অন্যকে ঠিক করার চেয়ে নিজেকে গড়া কঠিন।
১২. প্রতিটি না-বলা কথারও একটি ওজন আছে।
মানুষ শুধু কথায় ক্লান্ত হয় না, নীরবতার ভারেও ক্লান্ত হয়।
১৩. যে তোমার সীমারেখাকে সম্মান করে না, সে তোমার ভালোবাসাকেও দীর্ঘদিন সম্মান করবে না।
সম্মান ছাড়া ভালোবাসা বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
১৪. সব হারানো মানুষ দুর্বল নয়।
অনেকেই হেরে যায় কারণ তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভালো থাকার চেষ্টা করেছিল।
১৫. যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
ভেতরের অস্থিরতা বাইরে ছড়িয়ে পড়তেই চায়।
১৬. কিছু মানুষ তোমার জীবনে আশ্রয় হয়ে আসে, কিছু মানুষ আয়না হয়ে আসে।আশ্রয় তোমাকে শান্তি দেয়, আয়না তোমাকে সত্য দেখায়।
১৭. ক্ষমা করা মানেই আবার বিশ্বাস করা নয়।
ক্ষত সেরে উঠতে পারে, কিন্তু সতর্কতা স্মৃতির মতো থেকে যায়।
১৮. সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যাটা অন্যকে বলা মিথ্যা নয়; নিজেকে বলা মিথ্যা।
কারণ সেটাই ধীরে ধীরে পুরো বাস্তবতাকে বদলে দেয়।
১৯. যে মানুষ শোনার আগে উত্তর তৈরি করে, সে কথোপকথন করে না;
সে শুধু নিজের মতামত প্রচার করে।
২০. মানুষের প্রকৃত পরিপক্বতা বোঝা যায় যখন সে বুঝতে শেখে—
সব যুদ্ধ জেতা জরুরি নয়, কিছু শান্তি বাঁচিয়ে রাখাও প্রয়োজন।
লেখনি: মির্জা তানিয়া তাজনীন
29/05/2026
দ্বীনের খেদমত, প্রায়োরিটি এবং ভারসাম্যের প্রশ্ন
লেখাটা মূলত আমার নিজের জন্যই একটি রিমাইন্ডার।
কোনো স্পেসিফিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়।
বরং আমরা যারা দ্বীনের খেদমতের সাথে জড়িত—আমাদের সবার জন্যই কিছু আত্মসমালোচনার জায়গা থেকে এই কথাগুলো লিখছি।
দ্বীনকে ভালোবেসে দ্বীনের জন্য কাজ করতে পারা নিঃসন্দেহে অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয়।
সবাই এই তাওফীক পায় না।
আল্লাহ তাআলা হয়তো বিশেষ কিছু মানুষকেই নিজের দ্বীনের খেদমতের জন্য বেছে নেন।
তাই যারা সত্যিকার অর্থে দ্বীনের পথে কাজ করছেন, তারা অবশ্যই সম্মানের দাবিদার।
কিন্তু এখানেই একটি গভীর প্রশ্ন আছে—
“দ্বীনের খেদমত করতে গিয়ে আমরা কি কখনো প্রায়োরিটি হারিয়ে ফেলছি?”
কারণ ইসলাম শুধু “কাজ” শেখায় না, ইসলাম “ভারসাম্য” শেখায়।
ইসলাম শুধু লক্ষ্য শেখায় না, লক্ষ্য অর্জনের সঠিক পথও শেখায়।
রাসূল ﷺ–এর জীবন যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখতে পাই—
তিনি দাওয়াহ দিয়েছেন, উম্মাহ গড়েছেন, সমাজ সংস্কার করেছেন, যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন;
কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই ভারসাম্য নষ্ট করেননি।
তিনি আল্লাহর ইবাদতে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন,
আবার পরিবারের হক আদায়েও ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।
তিনি উম্মাহর দুঃখে কেঁদেছেন,
আবার ঘরের মানুষের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।
এমনকি সাহাবিদের মধ্যেও যখন অতিরিক্ততার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, তখন তিনি তাদের থামিয়েছেন।
কেউ বলেছিলেন, তিনি সারারাত ইবাদত করবেন।
কেউ বলেছিলেন, সবসময় রোজা রাখবেন।
কেউ বলেছিলেন, বিয়ে করবেন না।
তখন নবী ﷺ বলেছেন—
“আমি রোজাও রাখি, আবার রোজা ভাঙিও। আমি ইবাদতও করি, আবার বিশ্রামও নিই। আর আমি বিবাহও করি। যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ, সে আমার দলভুক্ত নয়।”
এই হাদিস আমাদের খুব গভীর একটি শিক্ষা দেয়—
অতিরিক্ততা সবসময় তাকওয়ার আলামত নয়;
অনেক সময় তা ভারসাম্য হারানোর লক্ষণও হতে পারে।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে “দ্বীনের কাজ” করতে গিয়ে অনেকেই অজান্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবহেলা করে ফেলছি।
কখনো পরিবার, কখনো সন্তান, কখনো সম্পর্কের হক, কখনো মানসিক সুস্থতা—এসবকে “পরে দেখা যাবে” মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু ইসলাম কি এমন শিক্ষা দেয়?
একটি দাওয়াহি প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ,
কিন্তু একটি মানুষের হৃদয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ইসলামী কাজ মূল্যবান,
কিন্তু জীবনের অন্যান্য আমানতও মূল্যবান।
একটি মিশন দরকার,
কিন্তু সেই মিশনের পথে ন্যায়, হিকমাহ এবং ভারসাম্য আরও বেশি দরকার।
আমরা অনেক সময় মনে করি—
“আমি তো দ্বীনের জন্য করছি, তাই নিশ্চয়ই এটা সঠিক।”
কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো—
শুধু উদ্দেশ্য ভালো হলেই যথেষ্ট নয়;
উপায়টাও সুন্দর, ন্যায়সঙ্গত এবং ফিতনামুক্ত হতে হবে।
কারণ এমনও হতে পারে—
আমরা একটি কাজকে এত বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি যে, অজান্তেই জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে।
দ্বীনের খেদমত কখনো মানুষের হক ভুলে যাওয়ার নাম নয়।
বরং সত্যিকারের খেদমত সেইটাই,
যেখানে আল্লাহর হকও রক্ষা হয়,
আবার বান্দার হকও অক্ষুণ্ণ থাকে।
সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো—
মানুষ যখন নিজের কাজকে এত বড় মনে করতে শুরু করে যে, ধীরে ধীরে আত্মসমালোচনার ক্ষমতাটাই হারিয়ে যায়।
তখন সে ভাবে—
“আমি তো দ্বীনের জন্যই করছি।”
কিন্তু হয়তো সেই মুহূর্তেই সে বুঝতে পারে না,
সে ধীরে ধীরে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে কিনা।
দ্বীন কখনো কঠোর হৃদয়ের শিক্ষা দেয় না।
দ্বীন মানুষকে আল্লাহর কাছেও নিয়ে যায়,
আবার মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
তাই যারা দ্বীনের খেদমতে আছি, আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার—
নিয়মিত আত্মসমালোচনা,
নিয়তের পরিশুদ্ধি,
এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা।
কারণ ইসলাম কোনো চরমপন্থার নাম নয়।
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
আর সত্যিকারের দ্বীনের খেদমত সেইটাই—
যেখানে ইখলাসও থাকে,
হিকমাহও থাকে,
মানুষের হকের প্রতিও সচেতনতা থাকে,
এবং হৃদয়টাও নরম থাকে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে দ্বীনের খেদমত করার তাওফীক দান করুন।
লেখনি: মির্জা তানিয়া তাজনীন
(লেখাটা আমার নিজের জন্য রিমাইন্ডার)
20/05/2026
কেউ যদি তোমার নীরবতাকে
অহংকার ভেবে দূরে সরে যায়,
তবে থামিয়ে রেখো না তাকে—
সব সম্পর্ক জোরে টেকে না,
কিছু সম্পর্ক সময়েই ঝরে যায় সময়েরই বাঁকে।
কেউ যদি তোমার আলোকে
অন্ধকার বলে এড়িয়ে চলে,
তবে ব্যাখ্যার প্রদীপ হাতে
পিছু নিও না কারো ছলে।
মানুষ তার ভাবনার রঙে
তোমায় এঁকে নেবে নিজের মতো,
তুমি শুধু সত্য হয়ে থেকো,
মেঘ সরলে আকাশ চিনবে যত।
সব প্রশ্নের উত্তর দিতে
প্রতিটা দরজায় কড়া নাড়তে নেই,
কিছু সত্য নদীর জলের মতো—
নিজের পথ খুঁজে নেয় সে নিজেই।
সময় বড় অদ্ভুত বিচারক,
নিঃশব্দে সত্য তুলে আনে,
মিথ্যার দেয়াল যত উঁচুই হোক
একদিন ভেঙে পড়ে সময়ের টানে।
তাই ভুল বোঝাবুঝির শহরে
নিজেকে প্রমাণে ক্লান্ত হয়ো না,
যারা হৃদয় দিয়ে দেখবে তোমায়
তারা কোনোদিন ভুল ও বুঝবে না।
শেষে শুধু ধৈর্য রেখো, নীরবতাকেও কথা বলতে দিও,
সত্য যদি তোমার সাথেই থাকে— একদিন পৃথিবীও তা মানতে বাধ্য হবে ঠিকই দেখে নিও।
লেখনী: মির্জা তানিয়া তাজনীন