19/06/2026
জাতীয়তাবাদের আড়ালে আত্মপরিচয়ের সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক সত্য!
লিখেছেন : আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আরহাম
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং পরবর্তী কয়েক দশকের জাতীয় রাজনীতিতে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ একটি অবিসংবাদিত ধ্রুবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা সমাজতত্ত্বের শীতল দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এটি যতটা না একটি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এই প্রকল্পের আড়ালে যে বড় ধরনের আত্মপরিচয়ের সংকট ও ঐতিহাসিক বৈষম্য লুকিয়ে আছে, তা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনার সময় এসেছে।
১. অভিন্ন জাতীয়তাবাদের মিথ বনাম ধর্মীয় বাস্তববাদ:
বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রবক্তারা দাবি করেন, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আমরা একটি অভিন্ন জাতিসত্তায় বিশ্বাসী। কিন্তু আমাদের সমাজবাস্তবতায় ধর্ম সবসময়ই জাতীয় পরিচয়ের সমান্তরালে এক শক্তিশালী নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভারতবিরোধী মানসিকতার শিকড় অত্যন্ত গভীরে।
পক্ষান্তরে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভারত-কেন্দ্রিক বা ‘অখণ্ড ভারত’-এর প্রতি এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ পাওয়া যায়। এই যে দুটি ভিন্ন মেরু, একে অস্বীকার করে ‘বাঙালী’ পরিচয় দিয়ে সবাইকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা এক ধরনের কৃত্রিমতারই নামান্তর।
২.ইতিহাসের দায় ও বিচারের মানদণ্ড:
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেখানে ‘রাজাকার’ তকমাটি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে—পাকিস্তান ভাঙার দায় যদি পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের ওপর বর্তায়, তবে তাদের সেই রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছাড়া অন্য কোনো দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব ছিল না?
এখানেই প্রশ্ন আসে দ্বিচারিতার। যদি হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে অখণ্ড ভারতের আদর্শ লালন করতে পারে, তবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কেন তাদের ধর্মীয় ও আদর্শিক আবাসভূমি ‘পাকিস্তান’-কে অটুট রাখতে চাইল না? যদি একজনের লক্ষ্যকে ‘দেশপ্রেম’ বলা হয়, তবে অন্যজনের লক্ষ্যকে কেন ‘দেশদ্রোহিতা’র মানদণ্ডে বিচার করা হলো? বিচার বা ইতিহাসের সত্য যখন কেবল বিজয়ী শক্তির বয়ান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, তখন তা ন্যায়বিচার নয়, বরং ‘প্রোপাগান্ডা’র রূপ পরিগ্রহ করে।
৩. ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পশ্চিম বাংলার চিত্র:
পশ্চিম বাংলার হিন্দু সমাজ বা রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’-এর চেয়ে ‘হিন্দুত্ববাদী’ বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদ অনেক বেশি প্রকট। তারা কখনোই তাদের জাতীয় পরিচয়ের বিসর্জন দিয়ে একটি স্বাধীন বা আলাদা সত্তার কথা ভাবে না। অথচ বাংলাদেশে এসে সেই একই গোষ্ঠী যখন ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’-এর কথা বলে, তখন তা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ছাড়া আর কী হতে পারে? এটি পরিষ্কার যে, জাতীয়তাবাদ এখানে একটি হাতিয়ার—যা দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করা হয় এবং অন্যকে তার নিজস্ব আদর্শ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা চালানো হয়।
৪. ব্রেইনওয়াশিং ও চিন্তার স্বাধীনতা:
আমাদের শিক্ষা এবং মূলধারার প্রচারমাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে একতরফা বয়ান তৈরির ফলে একটি প্রজন্ম মানসিকভাবে অনেকটা ‘ব্রেইনওয়াশড’। যেকোনো ভিন্নমতের আলোচনাকেই এখানে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ তো সেটিই, যেখানে ইতিহাসের সব পক্ষকে শোনার ধৈর্য থাকবে। কেন দেড় কোটি হিন্দু নাগরিকের একটি বড় অংশের মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের প্রতি টান বেশি—এই সত্যটি নিয়ে যদি আমরা প্রশ্ন না তুলি, তবে আমরা কখনই একটি স্থিতিশীল জাতীয় ঐক্য গড়তে পারব না।
৫.প্রোপাগান্ডার উর্ধ্বে গিয়ে সত্যের অনুসন্ধান:
আমরা যদি সত্যিই একটি পরিপক্ক রাষ্ট্র হতে চাই, তবে আমাদের ইতিহাসের এই ‘অন্ধকার’ দিকগুলোকে সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে হবে। ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ কোনো পবিত্র শাস্ত্র নয় যে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না। এটি একটি রাজনৈতিক ধারণা মাত্র, যা সময় ও পরিস্থিতির বিচারে ব্যর্থ বা বিতর্কিত হতে পারে।
আজ সময় এসেছে প্রোপাগান্ডার মোড়ক খুলে ইতিহাসের অন্দরমহলে প্রবেশের। আমাদের বুঝতে হবে, ধর্ম ও রাজনীতি এখানে পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্র কখনোই প্রকৃত অর্থে সংহতি অর্জন করতে পারে না। আমাদের উচিত আবেগ দিয়ে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের নতুন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা।