Liberation archive Institute

Liberation archive Institute মুক্তিযুদ্ধ-ই বাংলাদেশ।

আমার একাত্তর (পর্ব-৫৭)আনিসুজ্জামানএকদিন খবর পেলাম, প্রতিথযশা চিকিৎসক ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এসেছেন আগরতলায়, একটা...
14/09/2026

আমার একাত্তর (পর্ব-৫৭)
আনিসুজ্জামান

একদিন খবর পেলাম, প্রতিথযশা চিকিৎসক ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এসেছেন আগরতলায়, একটা বাড়ি ভাড়া করে আছেন। খবর পেয়েই দৌড়োলাম তার কাছে, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে—দেখলাম সপরিবারে এসেছেন। কুশলবিনিময়ের পর আমি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম শহীদুল্লা কায়সারের কথা (পাঠকেরা অনেকেই নিশ্চয় জানেন শহীদুল্লা তার ভায়রা ছিলেন)। ডা. চৌধুরী বললেন, 'আমি তো রাজনীতি করি না, শহীদুল্লা করে। আমি যখন বুঝলাম, আর থাকা যাবে না, তখন চলে এসেছি। শহীদুল্লা নিশ্চয় বুঝেশুনেই রয়ে গেছে।' ডাক্তার সাহেব তখন খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন তার পিতা আওয়ামী লীগ-দলীয় জাতীয় পরিষদ্ সদস্য কফিলউদ্দীন চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে। কফিলউদ্দীন সাহেব মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকেই ভারতে চলে আসেন, কিন্তু প্রায় প্রথমাবধিই তিনি ছিলেন অসুস্থ। আমরা যখন তার বিষয়ে কথা বলছিলাম, তখন সম্ভবত তিনি হাসপাতালে ছিলেন। ডা. চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলাম তার পরিকল্পনার কথা, বাংলাদেশ সরকারে তিনি যোগ দেবেন কিনা। তিনি বললেন, তখনো কিছু স্থির করেননি, ভাববার সময় চান আরো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি সরকারে যোগ দেন নি, তবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কয়েকটি কথিকা প্রচার করেছিলেন। আমরা কথা বলছি, এমন সময় কামান গর্জনের আওয়াজ হলো, রাস্তায় লোক ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। তার নিষেধ না মেনে দ্রুত বেড়িয়ে পড়লাম তার বাসা থেকে। পূর্ব-অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ সময়ে রিকশাওয়ালারা নিজের নিজের বাড়ির দিকে ছোটে, তখন একই পথের যাত্রী পেলে তুলে নেয়, পরে রিকশা পেতে বেশ কষ্ট হয়।

আগরতলা থেকে খানিকটা দূরে এক শরণার্থী শিবিরেও গিয়েছিলাম। ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক মুহম্মদ মুহিয়্যুদ্দীন (সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন) সেখানে ছিলেন পরিবার নিয়ে। তিনি কাউকে বলে রেখেছিলেন যে, আমি আগরতলায় এলে যেন তার আশ্রয়ের খবর জানানো হয় আমাকে। খবর পেয়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নিচে খোলা মাঠের মতো জায়গায় বাঁশের বেড়ার সার সার ঘর। তারই মধ্যে একটায় তিনি আছেন। তার পুত্রেরা—টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক হিসেবে সুপরিচিত—শামীম আহমদ ও ইমতিয়াজ নাসিমউদ্দিন—তখন বেশ ছোট। ঘরের মধ্যে জায়গার অভাব, পুরীষের গন্ধে বসা দুষ্কর। মুহিয়্যুদ্দীন সাহেব খুব খুশি হলেন আমাকে দেখে। বললেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন, পাকিস্তানি বিমানের আক্রমণের পর মূলত পায়ে হেঁটে পালিয়ে এসেছেন। যে-পরিবেশে তিনি থাকতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তাতে তার মন স্বাভাবিকভাবেই খুব খারাপ ছিল। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম রোজার দিনে ইফতারের সময়ের কিছু আগে। মুড়ি আর ছোলা দিয়ে ইফতার করলেন তিনি—আমি রোজা নেই জেনেও জোর করে তার ভাগ দিলেন।

প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য নজরুল ইসলাম ছিল আমার শিক্ষকতা জীবনের একেবারে প্রথম পর্যায়ের ছাত্র। আগরতলার উপকন্ঠে বাসা ভাড়া করে তখন সে সপরিবার থাকতো। এক রাতে তার বাসায় খেতে গেলাম। হারিকেনের মৃদু আলো ঘরটা যতটুকু আলোকিত করেছিল, আমাদের আশার আলো তার চেয়ে খুব বেশি দীপ্ত ছিল না।

আগরতলায় আমার দেখা হয়েছিল ডা. সারোয়ার আলীর সঙ্গে—আলাদা বাসা করে থাকছে। কমরেড অনিল মুখার্জিও কারো বাসায় থাকছিলেন। স্থানীয় শুভার্থীদের মধ্যে দেখা হয়েছিল কে পি দত্ত, অনিল ভট্টাচার্য ও কার্তিক লাহিড়ী প্রমুখ সজ্জনের সঙ্গে। কার্তিক লাহিড়ীর কাছেই জানতে পেরেছিলাম যে, অকস্মাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাদের বন্ধু বদরুল হাসানকে রাখতে হয়েছিল জেলখানার ভিতরে মানসিক ওয়ার্ডে—কেননা, বাইরে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন একটু ভালোর দিকে—তাকে কলকাতায় পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

এদিকে যে কাজে এসেছি, সে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। শরণার্থীদের আধিক্যের ফলে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হবে মনে করে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অধিকাল ভাতা (ওভারটাইম অ্যালাওয়েন্স) মনজুর করেছেন। ফলে, কর্মকর্তা যদি সকালে আসেন তো কর্মচারী আসেন সন্ধ্যায়। তৌফিক ইমামের চিঠিটা প্রাপকের হাতে পৌঁছোতেই সময় লেগে গেলো অনেক। তারপর তিনি 'পরদিন' আসতে বলেন নিয়মিত। ২৮ অক্টোবর অনুমতি পাওয়া গেলো। দুপুরে ভাত খেয়েই রওনা হলাম। আগরতলা থেকে কলকাতা সড়কপথে বারো-তেরো শ মাইল দূরে। পথে সামান্য বিশ্রাম করে রাতে না থেমে করিমগঞ্জ ও শিলং হয়ে গৌহাটি পৌঁছালাম পরদিন রাতে।

৩০ তারিখে সকালে গৌহাটি থেকে বেরিয়ে কুচবিহার হয়ে শিলিগুড়িতে এলাম সন্ধ্যার আগে। সেখানে আরেকটি রাত কাটিয়ে কলকাতা পৌঁছোলাম ৩১ অক্টোবর রাতের বেলায়।

শরণার্থী—জীবনের অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা আমাদের অনেককে কিভাবে সংকটের আবর্তে ফেলছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ রকীব, অধ্যাপক মোসলেম হুদা এবং সম্ভবত আরো কেউ কেউ ভারত থেকে ফিরে গেলেন স্বদেশের বন্দীশালায়। এতে আমরা খুব উদবিগ্ন হয়েছিলাম। কেননা যাদু মিয়ার মতো রাজনীতিবিদ দেশে ফিরে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের পক্ষে কাজ করেছিলেন; রশীদুল হাসানের মতো সরকারি আমলা ফিরে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার বিব্রত হয়েছিলেন। তবে ফিরে যাওয়া অধ্যাপকদের যদিও অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ, তবু তাদের দিয়ে—আমার জানামতে—বাংলাদেশ-বিরোধী কোনো প্রচারণা করাতে পারেনি।

ওদিকে তাজউদ্দীন খুব উদ্‌বেগ প্রকাশ করে বিবৃত করলেন এক নাটকীয় ঘটনা। সাদেক খান লন্ডনে গেছেন, যাওয়ার পথে হিথরো বিমানবন্দরে ফেলে গেছেন অস্ত্রশস্ত্রের এক তালিকা। কোনো সূত্রে সে তালিকা পৌঁছে যায় লন্ডনের ভারতীয় হাই কমিশনে। তারা লন্ডনের বাংলাদেশ মিশনকে জিজ্ঞাসা করেন সাদেক খানের মিশন সম্পর্কে, কিন্তু বাংলাদেশ মিশন কিছু জানাতে অপারগ হন। ভারতীয় হাই কমিশন তাদের মন্তব্যসুদ্ধ তালিকা পাঠান দিল্লিতে। ভারত সরকার তালিকার একটা প্রতিলিপি পাঠান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এবং বিষয়টা সম্পর্কে তার কাছে জানতে চান। তাজউদ্দীন খোঁজখবর করে যা জানতে পাবেন, তা থেকে দুটি বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হন। তালিকার একজন প্রণেতা ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ; আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান লন্ডনে যেতে সাদেক খানকে সাহায্য করেন, তবে সে-বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি কিছু জানান নি। দিল্লি থেকে কাগজপত্র পাওয়ার পরে কামরুজ্জামানকে এ-বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জানান যে, বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারের কাজে সাদেক খান লন্ডনে যাচ্ছেন বলে তার ধারণা হয়েছিল; তিনি তার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং বাংলাদেশ মিশনের কাছে একটা পরিচয়পত্রও লিখে দেন। তবে সাদেক যে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তা তিনি জানতেন না এবং অস্ত্রের তালিকা কারা তৈরি করেছেন, তাও ছিল তার অজানা। পুরো ব্যাপারটায় তাজউদ্দীন খুব বিব্রত বোধ করেন। তিনি ভারত সরকারকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার অস্ত্রশস্ত্র-লাভের কোনো বিকল্প সূত্র সন্ধান করছেন না এবং সাদেক খানের সফর ও শপিং লিস্টের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি লন্ডনের বাংলাদেশ মিশনকেও সাদেক খানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করে দেন। তবে যারা সাদেক খানকে তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং 'জেনেশুনে' যারা তাকে বিদেশ যেতে সাহায্য করেছিলেন, তাদেরকে 'কাজটা অনুচিত হয়েছে' বলা ছাড়া আর কী করতে পারেন, তা বুঝতে পারছেন না।

ঘটনার যে-ভাষ্য সাদেক খানের কাছ থেকে পাই, তা এরকম : যুদ্ধসামগ্রীর অপ্রতুলতাহেতু মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং আরো দু-একজন সেক্টর-কম্যান্ডার সরাসরি কিছু সরঞ্জাম-সংগ্রহের উদ্‌যোগ নিতে সাদেক খানকে অনুরোধ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টা জানতেন এবং তিনি লন্ডনে আমাদের মিশন প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছেও সাদেক খানের পরিচয় ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সেক্টর কম্যান্ডাররা প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করে দেন এবং নমুনাস্বরূপ কিছু ভাজা কার্তুজও (খোসা নয়) সঙ্গে দিয়ে দেন। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সক্রিয়তার কারণে তখন ব্রিটিশ কাস্টমস অতিরিক্ত সতর্ক ছিল। ফলে বাক্স তল্লাস করে গুলি উদ্ধার করতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। সাদেক খান তখন তার সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন এবং যুদ্ধসামগ্রীর তালিকা ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া পত্র দেখান। গুলিগুলো বাজেয়াপ্ত করে কাস্টমস তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বাক্স বন্ধ করার সময়ে তালিকাটা সেখানেই রয়ে যায়। কাস্টমসের মধ্যে হোক, বাইরে হোক, ভারতের কোনো 'চর' সেটা নিয়ে লন্ডনে ভারতীয় হাই কমিশনে পৌঁছে দেয় এবং তার সম্পর্কে খবর দেয়। হাই কমিশন বাংলাদেশ মিশনের কাছে এ-বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কিছু জানাতে পারেননি। পরে সাদেক খান যখন বাংলাদেশ মিশনে যান, তখন বিচারপতি চৌধুরী তার সঙ্গে দেখা করেননি, তবে মিশনের কারো কারো সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলেন। তালিকা সঙ্গে না থাকায় এবং মিশনের সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি আর কেনাকাটা করতে সমর্থ হননি। লন্ডন থেকে তিনি তখন চলে যান প্যারিসে এবং সেখানে অঁদ্রে মলরোর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ করেন। সাদেক খান বলেন যে, বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই বিশিষ্ট মনীষীকে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা অবহিত করেন। একথা এখন সকলেরই জানা যে, অঁদ্রে মলরো ওই বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তির জন্যে আন্তর্জাতিক স্বেছাসেবী হিসেবে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।

পৃষ্ঠা: ১৬২-১৬৭

14/09/2026

রক্তে লেখা স্বাধীনতা: একজন মুক্তিযোদ্ধার জবানিতে

স্মৃতিচারণ করছেন- বীরমুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বাবলা
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন—আলমগীর রুমি ও আলমগীর রুমি
কৃতজ্ঞতা: বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।

14/09/2026

মুক্তিযুদ্ধ-ই বাংলাদেশ

14/09/2026

মুক্তিযুদ্ধ-ই বাংলাদেশ❤️

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যত বলা হবে, তত নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার গভীরতা বুঝবে
14/09/2026

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যত বলা হবে, তত নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতার গভীরতা বুঝবে

14/09/2026

১৯৭১-এর মার্চে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির অধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিল। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই বাঙালির দীর্ঘদিনের স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতার যুদ্ধে রূপ নেয়।

মার্চ ১৯৭১—এক নেতা, এক জাতি, এক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। 🇧🇩

১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতি, যুদ্ধের প্রস্তুতি ও মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ম...
14/09/2026

১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতি, যুদ্ধের প্রস্তুতি ও মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ

১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ক্রমেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হচ্ছিল। একদিকে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছিল, অন্যদিকে পাকিস্তানও বিভিন্ন দেশের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। একই সময়ে সীমান্তজুড়ে সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছিল এবং দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছিল।

এই দিনের ঘটনাপ্রবাহে তাই একসঙ্গে দেখা যায় আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন, মুক্তাঞ্চলে চিকিৎসা-সহায়তার উদ্যোগ, ভারতের সামরিক প্রস্তুতি এবং রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ।

বাংলাদেশ সংকটের দ্রুত সমাধানের আহ্বান

মস্কোতে আফগানিস্তানের বাদশাহ মোহাম্মদ জহির শাহের সম্মানে আয়োজিত এক ভোজসভায় সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন।

তিনি বাংলাদেশ সংকটের দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সংকটটির সম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে।

এর মাত্র এক মাসেরও কিছু বেশি আগে, ৯ আগস্ট ১৯৭১ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ফলে মস্কোর অবস্থান বাংলাদেশের সংকট ও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছিল।

শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ব্রিটিশ রাজনৈতিক চাপ

যুক্তরাজ্যেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, ব্রিটেনের বিরোধী দল লেবার পার্টি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়।

লেবার নেতারা মনে করছিলেন, শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সমাধানের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

একই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘে বিষয়টি উত্থাপনের জন্য ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস-হোমের প্রতিও আহ্বান জানানো হয়।

এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে, শেখ মুজিবুর রহমানের আটকাবস্থা শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকছিল না; এটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।

হেলসিংকিতে আবু সাঈদ চৌধুরীর কূটনৈতিক তৎপরতা

বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীও সক্রিয় ছিলেন। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে তিনি দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন।

তিনি বাংলাদেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন, শরণার্থী সংকট এবং স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভিত্তি তুলে ধরেন।

ফিনল্যান্ডের কয়েকজন সংসদ সদস্য বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রশ্ন উঠলে ফিনল্যান্ডের প্রতিনিধির অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়।

দিনের শেষভাগে বিচারপতি চৌধুরী ফিনল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম, বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এই ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক জনমত ও নীতিনির্ধারণী মহলে তুলে ধরার ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ।

মুক্তাঞ্চলে চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্যোগ

মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগ্রামের পাশাপাশি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করাও তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৪ সেপ্টেম্বর মুক্তাঞ্চলে এসে মুক্তিবাহিনীর জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য হাসপাতাল স্থাপন, চিকিৎসক ও ওষুধের ব্যবস্থা এবং যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য সংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের মানবিক অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

এই উদ্যোগে প্রবাসী বাঙালি চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দিল্লিতে তাজউদ্দীন আহমদের প্রতিনিধির বৈঠক

দিল্লিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রতিনিধি মঈদুল হাসান ভারতের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সচিব পি এন ধরসহ বাংলাদেশ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক পরিস্থিতি, পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান, শরণার্থী সংকট এবং মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলের মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগ যুদ্ধের কূটনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।

সীমান্তে পাকিস্তানি আক্রমণের আশঙ্কা

১৪ সেপ্টেম্বর ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে পাকিস্তানের সম্ভাব্য সামরিক আক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল।

পশ্চিমবঙ্গসহ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা ছিল, মুক্তিবাহিনীর ক্রমবর্ধমান তৎপরতা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো, সীমান্ত নজরদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই পরিস্থিতি মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমশ ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করে দিচ্ছিল।

ইয়াহিয়া খানের ইরান সফর

অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সঙ্গে আলোচনার জন্য ইরান সফর করেন।

পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি, ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের অবস্থান—এসব বিষয় তাঁর আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

পাকিস্তান তখন আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছিল। ইরানের মতো আঞ্চলিক ও মুসলিম রাষ্ট্রের সমর্থন পাকিস্তানের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর অভিযান

১৪ সেপ্টেম্বরও বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান অব্যাহত ছিল।

১ নম্বর সেক্টর

ফেনী এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের ওপর মর্টার হামলা চালান। পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা কামান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে গোলাবর্ষণ করে। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চললেও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অবস্থান ধরে রাখেন।

কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাটের কাছেও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের একটি দলকে অ্যামবুশ করেন। এতে একটি সামরিক জিপ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন সদস্য হতাহত হয়। অভিযানে একজন মুক্তিযোদ্ধাও আহত হন।

২ নম্বর সেক্টর

কয়েসপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা রকেট লঞ্চার ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি অবস্থানে আক্রমণ চালান। হামলায় দুটি বাংকার ধ্বংস হয় এবং পাকিস্তানি সেনাদের কয়েকজন হতাহত হয়।

কসবা এলাকাতেও মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিত হামলা চালান। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর দুজন সদস্য হতাহত হয় বলে সমকালীন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এই ধরনের হামলা পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছিল।

৮ নম্বর সেক্টর

আলফাপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন। অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন সদস্য নিহত হয় বলে সমকালীন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের অভিযান মুক্তিবাহিনীর গেরিলা তৎপরতার বিস্তার এবং স্থানীয় ভূগোলকে কাজে লাগানোর সক্ষমতাকে প্রকাশ করে।

১৪ সেপ্টেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর ঘটনাগুলো দেখায়, মুক্তিযুদ্ধ তখন একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে পরিচালিত হচ্ছিল।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অধিকার এবং শরণার্থী সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিচ্ছিল।

আঞ্চলিক ক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়ছিল এবং সীমান্তে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। পাকিস্তানও ইরানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছিল।

মুক্তিযুদ্ধের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনী বিভিন্ন সেক্টরে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যস্ত ও চাপে রাখছিল। একই সঙ্গে মুক্তাঞ্চলে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য সংগঠিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল।

অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর ছিল এমন একটি দিন, যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল রণাঙ্গনের লড়াই ছিল না—এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মানবিক সহায়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক সংগ্রামে রূপ নিয়েছে—১৪ সেপ্টেম্বরের ঘটনাবলি তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

সূত্র
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস — সেক্টর ১, ২ ও ৮
মঈদুল হাসান, মূলধারা ’৭১, ইউপিএল, ঢাকা
আবদুল মতিন, স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, র‍্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস, লন্ডন
আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
যুগান্তর, কলকাতা, ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
সমকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন ও কূটনৈতিক নথি

13/09/2026

রক্তে লেখা স্বাধীনতা: একজন মুক্তিযোদ্ধার জবানিতে

স্মৃতিচারণ করছেন- বীরমুক্তিযোদ্ধা নসরুল কবির চৌধুরী
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন— ডা. মাহফুজুর রহমান
কৃতজ্ঞতা: বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।

আমার একাত্তর (পর্ব-৫৬)পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন অনেকদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায...
13/09/2026

আমার একাত্তর (পর্ব-৫৬)

পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন অনেকদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে, দেশের অভ্যন্তরে সবকিছু স্বাভাবিক অবস্থায় চলছে। এবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধুরাষ্ট্রের পরামর্শে তারা ঘোষণা করলো যে, পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারপরে জনপ্রতিনিধিদের কাছে সারা পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। এর প্রথম ধাপ হলো, সেপ্টেম্বরের গোড়ায় জেনারেল টিক্কা খানকে সরিয়ে ড. এ এম মালিককে পূর্বাঞ্চলের গভর্নর হিসেবে নিযুক্তিদান। দ্বিতীয় ধাপ হলো, জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে দেশদ্রোহী বলে যারা গণ্য, তাদের আসন বাতিল করে, সেখানে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা। এসব উদযোগ-আয়োজনও শুরু হলো সেপ্টেম্বরে, বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকে নির্বাচিত হলেন অক্টোবরে। ভোটগ্রহণের তারিখ স্থির হলো ডিসেম্বরে। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের সময়ও নির্ধারিত হয়ে গেলো ডিসেম্বরে।

উপনির্বাচনের সম্ভাবনায় আমরা যতোটা উদবিগ্ন হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি উৎকণ্ঠিত হয়েছিলাম জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসতে পারে, এই আশঙ্কায়। একবার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসলে ইয়াহিয়া খান নিজের সরকার বা তার পুতুল সরকারের বৈধতা দাবি করতে শুরু করবেন। তখন পাকিস্তানের মুরুব্বিদের চেষ্টায় বিশ্বজনমতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সম্ভবপর হবে।

আমার এই আশঙ্কা ব্যক্ত করলে তাজউদ্দীন বলেছিলেন: 'যত খুশি ইলেকশন করুক, কিন্তু ন্যাশনাল অ্যাসেমরি বসতে দেবো না।' এর থেকে আমার স্পষ্টই ধারণা হয় যে, ডিসেম্বরেই বড়ো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চাওয়া হয়েছিল। তারপরে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্যে সরকার আবার ভারতের কাছে অনুরোধ করলেন অক্টোবরে। আমার কাছে এটাও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল।

এই অক্টোবরেই আমার চাচাশ্বশুর আবদুল আহাদের শহীদ হওয়ার সংবাদ পেলাম।

আবদুল আহাদ ছিলেন বেবীর একমাত্র চাচা, বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সম্ভবত তৃতীয় সলিসিটর। অর ডিগনাম অ্যান্ড কোম্পানি নামে প্রসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন-প্রতিষ্ঠানের শাখা স্থাপন করেছিলেন তিনি—প্রথমে চট্টগ্রামে, পরে ঢাকায়। এখানে কোনো না কোনো সময়ে তার সহকর্মী ছিলেন মরহুম কামরুদ্দীন আহমদ, মরহুম বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন ও ড. কামাল হোসেন। আহাদ সাহেব পরে শিল্প ও বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন এবং পূর্ব পাকিস্তান চেম্বার অফ কমার্সের ও পাকিস্তান ফেডারেল চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি হয়েছিলেন। প্রথম জীবনে তার চালচলন ছিল খুব সাহেবী, পরে বাঙালি সংস্কৃতি ও পাকিস্তানের রাজনীতি সম্পর্কে উৎসাহী হয়ে ওঠেন। সোহরাওয়ার্দীর সূত্রে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, অন্যদিকে এ কে এম আহসান, সানাউল হক, শওকত ওসমান ও সিকান্দার আবু জাফরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়। কাজী আরেফ আহমদ লিখেছেন যে, স্বাধিকার আন্দোলনের জন্যে তিনি অর্থ জোগাতেন। এসব খবর সামরিক শাসকদের অজানা থাকেনি। মে মাসে মতিঝিলের অফিস থেকে তাকে ক্যান্টনমেন্টে ধরে নিয়ে যায় এবং প্রচুর অত্যাচার করে ও অর্থ আদায় করে দুদিন পর তাকে ছেড়ে দেয়। দিনতিনেক পর আবার তাকে অফিস থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। তাকে যারা শেষবারের মতো দেখেছিলেন, তার মধ্যে সহবন্দি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও তখন জাতীয় পরিষদ-সদস্য আবদুল হাদী তালুকদারের জ্যেষ্ঠপুত্র—আবদুল বাকী ছিলেন একজন। অনুমান করা হয় যে, তাকে এবং সিলেটের চা-বাগানের মালিক নির্মল চৌধুরীকে বন্দিশালা থেকে বের করে নিয়ে শহীদ আনোয়ারা স্কুলের পেছনে হত্যা করা হয় ওই মে মাসেই।

ঢাকা থেকে সেপ্টেম্বরে বেবীর ফুপাতো ভাই সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন (তখন অ্যাডভোকেট, পরে বিচারপতি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারে চলে যান সপরিবার এবং দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই থাকেন। অক্টোবরে তিনি চিঠি লিখে কলকাতায় আমাদের জানান যে, চাচা শহীদ হয়েছেন। খবর পেয়ে ছোটফুপু ও বেবীর যে অবস্থা হয়, তা অবর্ণনীয়।

তবে এমন অবর্ণনীয় অবস্থা শুধু দুএকজনের ছিল না। সেজন্যে ভয় ছিল, দেশের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে বসে মানুষের ধৈর্য কতদিন থাকবে!

অক্টোবরে আমি আবার আগরতলায় যাবো বলে মনস্থ করলাম। মূলত আমার গাড়ি আনতে। আমার পরিচয় দিয়ে গাড়িটা কলকাতায় আনার সুযোগ দেওয়ার জন্যে মন্ত্রিসভা সচিব এইচ টি ইমাম একটা আধা-সরকারি চিঠি লিখে দিলেন ত্রিপুরা সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিবকে। সেই চিঠি এবং একজন পেশাদার চালক সংগ্রহ করে এবারে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস-যোগে আগরতলায় পৌঁছোলাম অক্টোবর মাসের ২০ তারিখ নাগাদ।

যাওয়ার আগে কাউকে চিঠি দিয়েছিলাম। সেই সুবাদে জানতে পারলাম, ক্র্যাফটস হস্টেলে আমার জায়গা হয়েছে। ক্র্যাফটস হস্টেলে কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য বা শুভার্থীদের বাস। ওখানে তখন থাকেন কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা জ্ঞান চক্রবর্তী। সকলে ওকে জিজ্ঞেস করেই সব কাজ করতো। জ্ঞানদা বলে দিলেন, উনি যে ঘরে থাকেন, সে ঘরেই যেন আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। ক্র্যাফটস হস্টেলে ঘরে ঘরে ঢালাও বিছানা। যতজন পারছেন, যে যেখানে পারছেন, শুয়ে পড়ছেন। বেশির ভাগেরই বাঁধা কোনো জায়গা নেই থাকার। সুতরাং আমি কাকে স্থানচ্যুত করলাম, তা বুঝতে পারলাম না।

অক্টোবরের ওই সময়ে ক্র্যাফটস হস্টেলে বেশির ভাগেরই মন-মেজাজ ভালো। কমিউনিষ্ট পার্টির দু-দুটি দলের আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে মুক্তিবাহিনীর সাফল্য বেড়েছে, গেরিলা তৎপরতা বেড়েছে। 'মুক্তি' শুনলে পাক-সেনারা ভয় পায়, এমন একটা কথা প্রচলিত হয়ে গেছে। দেশের স্বাভাবিকতা প্রদর্শনে পাকিস্তানিদের প্রচেষ্টার অসারতা নিয়ে নানারকম কৌতুক মুখে মুখে ছড়াচ্ছে।

তবে আমি আগরতলায় থাকতেই খারাপ খবর শুনলাম' মেজর খালেদ মোশাররফ আহত হয়েছেন। শত্রুসেনার আক্রমণে গুরুতররূপে আহত অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্যে পাঠানো হয়েছে। মস্তিষ্কের অপারেশন অনিবার্য। বাঁচবেন কিনা বলা যায় না। বলা বাহুলা, মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলো। আমার মনে হলো, এ-সময়ে নিউরো-সার্জন রশীদউদ্দিন আহমেদ থাকলে কত না ভালো হতো!

আনন্দ ও বিষ্ময়ের সঙ্গে ক্র্যাফটস হস্টেলের বাসিন্দা হিসেবে আবিষ্কার করলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল অফিসার ডা. আবুল বশরকে। ছয় মাসের বেশি সময় পরে দেখা। তিনি পরিবার রেখে এসেছেন সন্দ্বীপে, নিজের বাড়িতে, ঘুরেছেন বিস্তর; আপাতত আগরতলায় আছেন, কিন্তু এখানেই যে থাকবেন তার নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃতিগতভাবে ড. বশর একটু সিনিকাল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তিনি আছেন, কিন্তু তার সাফল্য সম্পর্কে নিশ্চিত নন। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম, চিকিৎসক হিসেবে সরকারি কাজে যোগ দিতে। তিনি যে পরামর্শটা মানবেন না, তা বুঝতেও আমার বেগ পেতে হয়নি। অথচ আমাদের চিকিৎসকের প্রয়োজন ছিল।

প্রয়োজনটা কেমন ছিল, তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হলো এক বিকেলে। আগরতলার কাছেই এক গ্রামে হাবুল ব্যানার্জি নামে এক ভদ্রলোকের বিশাল বাগানে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের ফিড হাসপাতাল। সেখানে সেবিকা হিসেবে কাজ করে বেগম সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে--আমার সহোদরাতুল্য সুলতানা কামাল ওরফে লুলু, আর সাঈদা কামাল ওরফে টুলু। ওদের খোঁজেই গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে পেলাম আরেক ঘনিষ্ঠজন ডালিয়া সালাহউদ্দিনকে—ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ও উদীয়মান নৃত্যশিল্পী। ডালিয়ার পিতামহ ছিলেন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার স্বনামধন্য স্পিকার জালালউদ্দিন হাশমী। ডালিয়া পরে যাকে বিয়ে করে, শামসুদ্দীন তার নাম, সে-ও ওই হাসপাতালেই কর্মরত ছিল, কিন্তু আমি যখন যাই, তখন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। পরে জানতে পারি যে, ডা. সেতারা বেগম বীরপ্রতীকও এই হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন।

হাসপাতাল বলতে যা বোঝায়, তার সঙ্গে এর বিশেষ মিল ছিল না। বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি কটি ঘর, অনেকগুলো বিছানা, রোগীরা বেশির ভাগ গোলাগুলির আঘাতে আহত। হাসপাতালে ডাক্তার কম, উপকরণ সামান্য, চাহিদার তুলনায় সেবিকা অপ্রতুল। এতোকিছুর অভাব সত্ত্বেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ডাক্তার ও সেবিকারা প্রাণপণে খাটছেন, রোগীরা অসম্ভব ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন।

পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬২
আমার একাত্তর
আনিসুজ্জামান

Address

Shahbagh
Dhaka
1000

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Liberation archive Institute posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category