14/09/2026
আমার একাত্তর (পর্ব-৫৭)
আনিসুজ্জামান
একদিন খবর পেলাম, প্রতিথযশা চিকিৎসক ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এসেছেন আগরতলায়, একটা বাড়ি ভাড়া করে আছেন। খবর পেয়েই দৌড়োলাম তার কাছে, পূর্বপরিচয়ের সূত্রে—দেখলাম সপরিবারে এসেছেন। কুশলবিনিময়ের পর আমি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম শহীদুল্লা কায়সারের কথা (পাঠকেরা অনেকেই নিশ্চয় জানেন শহীদুল্লা তার ভায়রা ছিলেন)। ডা. চৌধুরী বললেন, 'আমি তো রাজনীতি করি না, শহীদুল্লা করে। আমি যখন বুঝলাম, আর থাকা যাবে না, তখন চলে এসেছি। শহীদুল্লা নিশ্চয় বুঝেশুনেই রয়ে গেছে।' ডাক্তার সাহেব তখন খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন তার পিতা আওয়ামী লীগ-দলীয় জাতীয় পরিষদ্ সদস্য কফিলউদ্দীন চৌধুরীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে। কফিলউদ্দীন সাহেব মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকেই ভারতে চলে আসেন, কিন্তু প্রায় প্রথমাবধিই তিনি ছিলেন অসুস্থ। আমরা যখন তার বিষয়ে কথা বলছিলাম, তখন সম্ভবত তিনি হাসপাতালে ছিলেন। ডা. চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলাম তার পরিকল্পনার কথা, বাংলাদেশ সরকারে তিনি যোগ দেবেন কিনা। তিনি বললেন, তখনো কিছু স্থির করেননি, ভাববার সময় চান আরো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তিনি সরকারে যোগ দেন নি, তবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে কয়েকটি কথিকা প্রচার করেছিলেন। আমরা কথা বলছি, এমন সময় কামান গর্জনের আওয়াজ হলো, রাস্তায় লোক ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেলো। তার নিষেধ না মেনে দ্রুত বেড়িয়ে পড়লাম তার বাসা থেকে। পূর্ব-অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ সময়ে রিকশাওয়ালারা নিজের নিজের বাড়ির দিকে ছোটে, তখন একই পথের যাত্রী পেলে তুলে নেয়, পরে রিকশা পেতে বেশ কষ্ট হয়।
আগরতলা থেকে খানিকটা দূরে এক শরণার্থী শিবিরেও গিয়েছিলাম। ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শিক্ষক মুহম্মদ মুহিয়্যুদ্দীন (সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন) সেখানে ছিলেন পরিবার নিয়ে। তিনি কাউকে বলে রেখেছিলেন যে, আমি আগরতলায় এলে যেন তার আশ্রয়ের খবর জানানো হয় আমাকে। খবর পেয়ে দেখা করতে গিয়েছিলাম। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নিচে খোলা মাঠের মতো জায়গায় বাঁশের বেড়ার সার সার ঘর। তারই মধ্যে একটায় তিনি আছেন। তার পুত্রেরা—টেলিভিশনের সংবাদ পাঠক হিসেবে সুপরিচিত—শামীম আহমদ ও ইমতিয়াজ নাসিমউদ্দিন—তখন বেশ ছোট। ঘরের মধ্যে জায়গার অভাব, পুরীষের গন্ধে বসা দুষ্কর। মুহিয়্যুদ্দীন সাহেব খুব খুশি হলেন আমাকে দেখে। বললেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন, পাকিস্তানি বিমানের আক্রমণের পর মূলত পায়ে হেঁটে পালিয়ে এসেছেন। যে-পরিবেশে তিনি থাকতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তাতে তার মন স্বাভাবিকভাবেই খুব খারাপ ছিল। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম রোজার দিনে ইফতারের সময়ের কিছু আগে। মুড়ি আর ছোলা দিয়ে ইফতার করলেন তিনি—আমি রোজা নেই জেনেও জোর করে তার ভাগ দিলেন।
প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য নজরুল ইসলাম ছিল আমার শিক্ষকতা জীবনের একেবারে প্রথম পর্যায়ের ছাত্র। আগরতলার উপকন্ঠে বাসা ভাড়া করে তখন সে সপরিবার থাকতো। এক রাতে তার বাসায় খেতে গেলাম। হারিকেনের মৃদু আলো ঘরটা যতটুকু আলোকিত করেছিল, আমাদের আশার আলো তার চেয়ে খুব বেশি দীপ্ত ছিল না।
আগরতলায় আমার দেখা হয়েছিল ডা. সারোয়ার আলীর সঙ্গে—আলাদা বাসা করে থাকছে। কমরেড অনিল মুখার্জিও কারো বাসায় থাকছিলেন। স্থানীয় শুভার্থীদের মধ্যে দেখা হয়েছিল কে পি দত্ত, অনিল ভট্টাচার্য ও কার্তিক লাহিড়ী প্রমুখ সজ্জনের সঙ্গে। কার্তিক লাহিড়ীর কাছেই জানতে পেরেছিলাম যে, অকস্মাৎ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাদের বন্ধু বদরুল হাসানকে রাখতে হয়েছিল জেলখানার ভিতরে মানসিক ওয়ার্ডে—কেননা, বাইরে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তখন একটু ভালোর দিকে—তাকে কলকাতায় পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
এদিকে যে কাজে এসেছি, সে কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। শরণার্থীদের আধিক্যের ফলে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হবে মনে করে ভারত সরকার ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অধিকাল ভাতা (ওভারটাইম অ্যালাওয়েন্স) মনজুর করেছেন। ফলে, কর্মকর্তা যদি সকালে আসেন তো কর্মচারী আসেন সন্ধ্যায়। তৌফিক ইমামের চিঠিটা প্রাপকের হাতে পৌঁছোতেই সময় লেগে গেলো অনেক। তারপর তিনি 'পরদিন' আসতে বলেন নিয়মিত। ২৮ অক্টোবর অনুমতি পাওয়া গেলো। দুপুরে ভাত খেয়েই রওনা হলাম। আগরতলা থেকে কলকাতা সড়কপথে বারো-তেরো শ মাইল দূরে। পথে সামান্য বিশ্রাম করে রাতে না থেমে করিমগঞ্জ ও শিলং হয়ে গৌহাটি পৌঁছালাম পরদিন রাতে।
৩০ তারিখে সকালে গৌহাটি থেকে বেরিয়ে কুচবিহার হয়ে শিলিগুড়িতে এলাম সন্ধ্যার আগে। সেখানে আরেকটি রাত কাটিয়ে কলকাতা পৌঁছোলাম ৩১ অক্টোবর রাতের বেলায়।
শরণার্থী—জীবনের অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তা আমাদের অনেককে কিভাবে সংকটের আবর্তে ফেলছে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এ রকীব, অধ্যাপক মোসলেম হুদা এবং সম্ভবত আরো কেউ কেউ ভারত থেকে ফিরে গেলেন স্বদেশের বন্দীশালায়। এতে আমরা খুব উদবিগ্ন হয়েছিলাম। কেননা যাদু মিয়ার মতো রাজনীতিবিদ দেশে ফিরে গিয়ে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের পক্ষে কাজ করেছিলেন; রশীদুল হাসানের মতো সরকারি আমলা ফিরে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকার বিব্রত হয়েছিলেন। তবে ফিরে যাওয়া অধ্যাপকদের যদিও অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ, তবু তাদের দিয়ে—আমার জানামতে—বাংলাদেশ-বিরোধী কোনো প্রচারণা করাতে পারেনি।
ওদিকে তাজউদ্দীন খুব উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃত করলেন এক নাটকীয় ঘটনা। সাদেক খান লন্ডনে গেছেন, যাওয়ার পথে হিথরো বিমানবন্দরে ফেলে গেছেন অস্ত্রশস্ত্রের এক তালিকা। কোনো সূত্রে সে তালিকা পৌঁছে যায় লন্ডনের ভারতীয় হাই কমিশনে। তারা লন্ডনের বাংলাদেশ মিশনকে জিজ্ঞাসা করেন সাদেক খানের মিশন সম্পর্কে, কিন্তু বাংলাদেশ মিশন কিছু জানাতে অপারগ হন। ভারতীয় হাই কমিশন তাদের মন্তব্যসুদ্ধ তালিকা পাঠান দিল্লিতে। ভারত সরকার তালিকার একটা প্রতিলিপি পাঠান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এবং বিষয়টা সম্পর্কে তার কাছে জানতে চান। তাজউদ্দীন খোঁজখবর করে যা জানতে পাবেন, তা থেকে দুটি বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হন। তালিকার একজন প্রণেতা ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ; আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামরুজ্জামান লন্ডনে যেতে সাদেক খানকে সাহায্য করেন, তবে সে-বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি কিছু জানান নি। দিল্লি থেকে কাগজপত্র পাওয়ার পরে কামরুজ্জামানকে এ-বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে প্রধানমন্ত্রীকে তিনি জানান যে, বাংলাদেশের পক্ষে প্রচারের কাজে সাদেক খান লন্ডনে যাচ্ছেন বলে তার ধারণা হয়েছিল; তিনি তার যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং বাংলাদেশ মিশনের কাছে একটা পরিচয়পত্রও লিখে দেন। তবে সাদেক যে অস্ত্রশস্ত্র ক্রয়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তা তিনি জানতেন না এবং অস্ত্রের তালিকা কারা তৈরি করেছেন, তাও ছিল তার অজানা। পুরো ব্যাপারটায় তাজউদ্দীন খুব বিব্রত বোধ করেন। তিনি ভারত সরকারকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশ সরকার অস্ত্রশস্ত্র-লাভের কোনো বিকল্প সূত্র সন্ধান করছেন না এবং সাদেক খানের সফর ও শপিং লিস্টের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি লন্ডনের বাংলাদেশ মিশনকেও সাদেক খানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করে দেন। তবে যারা সাদেক খানকে তালিকা তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং 'জেনেশুনে' যারা তাকে বিদেশ যেতে সাহায্য করেছিলেন, তাদেরকে 'কাজটা অনুচিত হয়েছে' বলা ছাড়া আর কী করতে পারেন, তা বুঝতে পারছেন না।
ঘটনার যে-ভাষ্য সাদেক খানের কাছ থেকে পাই, তা এরকম : যুদ্ধসামগ্রীর অপ্রতুলতাহেতু মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং আরো দু-একজন সেক্টর-কম্যান্ডার সরাসরি কিছু সরঞ্জাম-সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে সাদেক খানকে অনুরোধ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টা জানতেন এবং তিনি লন্ডনে আমাদের মিশন প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছেও সাদেক খানের পরিচয় ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সেক্টর কম্যান্ডাররা প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা তৈরি করে দেন এবং নমুনাস্বরূপ কিছু ভাজা কার্তুজও (খোসা নয়) সঙ্গে দিয়ে দেন। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সক্রিয়তার কারণে তখন ব্রিটিশ কাস্টমস অতিরিক্ত সতর্ক ছিল। ফলে বাক্স তল্লাস করে গুলি উদ্ধার করতে তাদের বেগ পেতে হয়নি। সাদেক খান তখন তার সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন এবং যুদ্ধসামগ্রীর তালিকা ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া পত্র দেখান। গুলিগুলো বাজেয়াপ্ত করে কাস্টমস তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বাক্স বন্ধ করার সময়ে তালিকাটা সেখানেই রয়ে যায়। কাস্টমসের মধ্যে হোক, বাইরে হোক, ভারতের কোনো 'চর' সেটা নিয়ে লন্ডনে ভারতীয় হাই কমিশনে পৌঁছে দেয় এবং তার সম্পর্কে খবর দেয়। হাই কমিশন বাংলাদেশ মিশনের কাছে এ-বিষয়ে জানতে চাইলে তারা কিছু জানাতে পারেননি। পরে সাদেক খান যখন বাংলাদেশ মিশনে যান, তখন বিচারপতি চৌধুরী তার সঙ্গে দেখা করেননি, তবে মিশনের কারো কারো সঙ্গে তিনি কথাবার্তা বলেন। তালিকা সঙ্গে না থাকায় এবং মিশনের সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি আর কেনাকাটা করতে সমর্থ হননি। লন্ডন থেকে তিনি তখন চলে যান প্যারিসে এবং সেখানে অঁদ্রে মলরোর সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ করেন। সাদেক খান বলেন যে, বাঙালিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই বিশিষ্ট মনীষীকে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা অবহিত করেন। একথা এখন সকলেরই জানা যে, অঁদ্রে মলরো ওই বয়সেও বাংলাদেশের মুক্তির জন্যে আন্তর্জাতিক স্বেছাসেবী হিসেবে যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
পৃষ্ঠা: ১৬২-১৬৭