01/06/2026
তোফায়েল আহমেদ: রাজপথ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কজন ব্যক্তিত্ব ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখভাগ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তোফায়েল আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বাঁকবদলে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা অনন্য।
১. প্রারম্ভিক জীবন ও ছাত্ররাজনীতিতে উত্থান
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ৪ ডিসেম্বর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের মূল ভিত্তি গড়ে ওঠে ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে।
নেতৃত্বে আরোহণ: ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
'বঙ্গবন্ধু' উপাধি প্রদান: তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্তটি আসে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়ার পর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষ মানুষের বিশাল জনসভায় তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন।
২. ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ঐতিহাসিক ভূমিকা
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ১১ দফা দাবি আদায় এবং বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলনকে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। তার বলিষ্ঠ ও তেজস্বী বক্তৃতা তৎকালীন তরুণ সমাজকে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে আন্দোলিত করেছিল।
৩. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান (১৯৭১)
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তোফায়েল আহমেদ কেবল একজন সংগঠকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারক ও সামরিক অধিনায়ক।
মুজিব বাহিনীর (BLF) অন্যতম প্রধান অধিনায়ক
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে যে চারজন ছাত্রনেতার নেতৃত্বে 'মুজিব বাহিনী' (Bangladesh Liberation Front - BLF) গঠিত হয়, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তাদের অন্যতম প্রধান (অন্য তিনজন ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান এবং আব্দুর রাজ্জাক)।
গেরিলা বাহিনী গঠন ও প্রশিক্ষণ: ভারতের দেরাদুনে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে মুজিব বাহিনীর সদস্যদের উচ্চতর গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তোফায়েল আহমেদ এই বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় জোনের কমান্ডিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
রণাঙ্গনে নেতৃত্ব: তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার তরুণ গেরিলা যোদ্ধা দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা ও আন্তর্জাতিক জনমত
তিনি ১৯৭১ সালে গঠিত মুজিবনগর সরকারের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ, রসদ সরবরাহ এবং ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সাথে সমন্বয় রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
৪. উত্তর-স্বাধীন রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তোফায়েল আহমেদ সংসদীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব: স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) নিযুক্ত হন।
দীর্ঘ সংসদীয় ক্যারিয়ার: তিনি ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
মন্ত্রিত্ব ও নীতি নির্ধারণ: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালেও তিনি বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনীতি সচল রাখতে তার নেওয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়।
তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও দেশ গঠনে ভূমিকা নিয়ে পোস্ট লিখে শেষ করা যাবে না বই লিখতে হবে। এমন একজনের জানাজায় যখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুলিশি হামলা চলে,যে দেশ তৈরিতে নিজের সব উজাড় করে দিয়েছেন বিনিময়ে নেননি কোন প্রতিদান আজকের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গলির পাতি নেতার সম্পদের চেয়েও যার সম্পদ কম তাকে রাষ্ট্র যখন নিজস্ব ব্যবস্থায় অপমান করে মনে রেখো রাষ্ট্র এই ধারা চলমান থাকবে এদেশে। হয়তো এই নামে নয়তো অন্যকোন নামে কিন্তু ধারা চলবেই।