এইচ.এস.সি পাশ করে সবে অনার্স ভর্তি হয়েছি। তেঁতুলতল যাত্রাবাড়ি তরুণ সংঘের একদল তরুণ: কাজল, খোকন, তপন, সেলিম ভাইরা তরুণ আইনজীবী রেজাউর রহমান (জনপ্রিয় অনুষ্ঠান "আইন আদালত" খ্যাত) এর নেতৃত্বে একত্রিত হয়। প্রায় প্রতিদিন ধোলাইখাল লেড মেশিনের কাজে যেসব শিশুরা কাজ করে এবং নারায়নগনঞ্জের ফতুল্লায় যে সকল শিশু ইট-পাথর ভাঙার কাজে নিয়োজিত -- তাদের উপর সার্ভে করছিলো।
আলোচনা জমতো দুপুরে আমাদের বাসায়। আমাদের বাড়িতে এমনিতেই অতিরিক্ত কমপক্ষে দশজন লোকের রান্না হতো। সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়ার পর চলতো নতুন নতুন সার্ভের অভিজ্ঞতার বর্ণনা।
ওদের গল্প শুনতে শুনতে এক সময় আমিও এই পথশিশুদের প্রতি আগ্রহী হই। আমার আগ্রহ দেখে সেলিম ভাই ওদের পড়ানোর প্রস্তাব দেন আমাকে।
আমাদের বাড়ি থেকে ধোলাইখাল কাছে। উদ্বোধন হলো স্কুলের। বিশাল আয়োজন! কয়েকদিনের মধ্যে ধোলাইখালের সরু রাস্তা প্রশস্ত হলো। রাস্তার মাঝখানে সারি সারি গাছ। প্রতিটি গলিতে সুরক্ষা বলয়। শুধুমাত্র একটি স্কুলের কল্যাণে ধোলাইখাল এলাকার চেহারা বদলে গেল।
লম্বা আই আকৃতির একতলা বারান্দাসহ স্কুল। চারদিকে ফাঁকা ফাঁকা গ্রিল দিয়ে ঘেরা হলুদ সূর্যমুখী বাগান। গেট দিয়ে ঢুকতে হাতের ডান দিকে হাত ধোয়ার জন্য সারি সারি কল লাগানো। পাশে পানি খাবার গ্লাস। স্কুলের শেষ প্রান্তে বিশাল দোলনা, হাইড এন্ড সিক আরো কত যে আয়োজন! যেন সদ্য ধোয়া চকচকে ঝকঝকে স্কুল।
স্কুল থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সরবরাহ করা হতো:
১. জুতা, ব্যাগ, স্কুল ড্রেস, কলম, পেনসিল, রাবার এবং পেনসিল কাটার জন্য বড় মেশিন যেটা দিয়ে সবাই পেনসিল কাটতো।
২. ভরপেট সকালের খাবার। যা ঢাকার বিখ্যাত মুসলিম সুইট থেকে সরবরাহ করা হতো।
৩. চাল, ডাল, তেল, বিস্কিটসহ আরো অনেক কিছু যা বিদেশ থেকে আমদানিকৃত।
৪. শীতে বহুমূল্যবান কম্বল।
শিক্ষার্থীরা প্রায় সবাই শ্রমজীবী। এদের অর্ধেক কখনোই স্কুলে যায়নি। ওদের মেধাক্রমে ভাগ করা ছিল জরুরি। ছাত্ররা যেহেতু বয়সে বড়, ওদের নিয়মের মধ্যে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে শিক্ষকদের। প্রায়ই অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে করে শিক্ষকদের বিব্রত করে মজা করছিলো। সহসা ওদের পড়াতে আনাটা সহজ ছিলো না। আমি ছিলাম শিক্ষকদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। প্রায় ছাত্রদের বয়সের কাছাকাছি। তাই ওদের সাথে সন্ধি করার জন্য বার বার আমাকেই ক্লাসে পাঠানো হতো।
নাস্তা বিতরণ হতো। একে একে নাস্তা দিয়ে যেতো মনোয়ারা যাকে সবাই চিনতেন ময়নার মা নামে৷ দ্বিতীয় সারিতে আসতেই প্রথম সারির আম্বিয়া চিৎকার দিয়ে, "বইন, তোরটা রাইখা দে। মায়ের লিগা লইয়া যামু। আমারটা দুইজন ভাগ কইরা খামু।" আমার মাথার রন্ধে রন্ধে গেঁথে গেল আম্বিয়ার চিৎকার। এমন পরিবারও আছে যেখানে খাবার গুনে খেতে হয়। আমার কাছে এসব অজানা ছিলো।
আজাদকে সেই সময়ে বড় বেশি বিমর্ষ লাগতো। যে আজাদ আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে রাখতো, সে হঠাৎ এত চুপচাপ! হাবিবকে জিজ্ঞেস করতেই স্পষ্ট হলো কারণ। বাবা আরও একটা বিয়ে করেছে তখন। চোখের সামনে মা'কে নির্যাতিত হতে দেখা। ছোটবোনের অসহায় অবস্থায় দিশেহারা আজাদ। চোখের সামনে আজাদের মা'কে দেখে বুক বিদীর্ণ হলো। বোন আর আজাদের বড়বোনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হলো আমায়।
বিল্লালের পড়াশোনায় আগ্রহ ছিল অনেক। কিন্তু দিন দিন শীর্ন থেকে শীর্নকায় হয়ে গেল। "কী ব্যাপার, বিল্লাল? ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো না?
যাতায়াতের পথে ছিল বিল্লালের কর্মস্থল। "পাঁচভাই ইঞ্জিনিয়ারিং" (লেড-মেশিনের কারখানা) এর মালিককে জিজ্ঞেস করলাম বিল্লালের স্বাস্থ্যের এত অবনতি প্রসঙ্গে। কাজের চাপ কী একটু কমিয়ে দেয়া যায় না, জিজ্ঞেস করলাম। মালিকের কাছেই জানতে পারলাম যে বিল্লালের যক্ষ্মা হয়েছে। আমার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো। আমার জীবনের প্রথম পাওয়া দুইমাসের বেতনের চেক ভাঙ্গিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আমার ভাই, মেডিসিনের অধ্যাপক ডাঃ আজিজুল হক কাহ্হার (মেহেদী) এর পরামর্শে ভর্তি করা হলো বিল্লালকে।
এভাবেই আমি একের পর এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যাচ্ছিলাম, আমার অবচেতন মনে। ওদের ফেলে এগিয়ে চলা সম্ভব ছিলো না আমার পক্ষে। এভাবেই আমার A Bangladeshi Teacher হয়ে ওঠা।