30/08/2022
সালটা ঠিক ১৯৩০ নাগাদ।কাজী নজরুল ইসলাম তখন মসজিদ বাড়ী স্ট্রীটে থাকতেন।পুত্র বুলবুলের বসন্ত রোগ দেখা দেয়।চোখেও বসন্তের গুটি বের হয়।এই বসন্ত রোগে চার বছরের বুলবুলের মৃত্যু হয়।এই শিশুটি ছিল অসাধারণ শ্রুতিধর।মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন, 'একটি ক্ষুদে যাদুকর ছিল সে (বুলবুল)।নজরুলের বন্ধুদের সঙ্গে সে চলে যেত।ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে সে ফিরে আসত।অদ্ভুত ছিল তার স্মৃতি শক্তি।...বুলবুল মা ও দিদিমার চোখের মণি ছিল, চোখের মণি ছিল সে নজরুলের তামাম বন্ধুদের।...কিন্তু কেউ জানত না কত গভীর ছিল নজরুলের স্নেহ তার প্রতি।'
অসুখের সময় বাবাকে কিছুতেই কাছ ছাড়া করত না বুলবুল।মুজফ্ফর সাহেব লিখেছেন, 'নজরুল আমাকে বলেছিল সে ওস্তাদ মহিরুদ্দিন খানের সঙ্গে যখন তার সংগীত নিয়ে চর্চা হত শুনে শুনে বুলবুল তার সবকটি আয়ত্ত করে ফেলত।এমনি ছিল তার স্মৃতি শক্তি।'
বুলবুলের রোগ শয্যায় বসে 'রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ' অনুবাদ করেন নজরুল।গ্রন্থটি বুলবুলের স্মৃতিতে উৎসর্গ করেন।
বুলবুলের মৃত্যুতে নজরুল প্রমীলা ও গিরিবালা দেবী খুব ব্যাথায় ভেঙ্গে পড়েন।প্রথম পুত্র জন্মের কিছুদিন পরে মারা যায়, দ্বিতীয় পুত্র বুলবুল চলে গেল।তৃতীয় পুত্র ১৯২৯শের সেপ্টেম্বরে জন্মগ্রহণ করে।নাম তার কাজী সব্যসাচী।এর দুবছর পরে কবিপুত্র কাজী অনিরূদ্ধের জন্ম হয়।
জীবনে অনেক অনেক ব্যাথ্যা ও দারিদ্রে যে সংগ্রামী ও বিদ্রোহী প্রাণ ভেঙ্গে পড়েনি, সেই প্রাণ ভেঙ্গে পড়ল প্রাণাধিক প্ৰিয় পুত্র বুলবুলের মৃত্যু ব্যাথায়।
বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুল কাব্য সাহিত্যের জগৎ থেকে চলে গেলেন সংগীতের জগতে।একের পর এক গান লিখলেন বুলবুলের স্মৃতিতে―'ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি' ' শুন্য এ বুকে পাখী মোর ফিরে আয়' ইত্যাদি।
দারিদ্র্যের চাপে নজরুল এইচ এম ভি গ্রামফোন কোম্পানিতে সংগীত রচয়িতা ও ট্রেনার হিসাবে যোগ দেন।নজরুল ব্রিটিশ বিরোধী ও জেলখাটায় এইচ এম ভি ব্রিটিশ কোম্পানি তার গান রেকর্ড করার উৎসাহ দেখায় নি।১৯২৮ সালের আগে শিল্পী হরেন্দ্রনাথ দত্ত 'জাতের নামে বজ্জাতি' 'পুঁথির বিধান যাক পুড়ে' রচয়িতা নজরুলের নাম না প্রকাশ করে রেকর্ড করেন।গানগুলির চাহিদা বাড়ায় এবং জনপ্রিয়তা বাড়ায়, গানের রচয়িতার নাম জানতে পেরে নজরুলকে তাদের কোম্পানিতে যুক্ত করেন।দুটি গানের রয়্যালটির টাকাও দেন।নজরুল তার গানের স্বত্ব মেগাফোন কোম্পানিকে বিক্রি করায় তাঁর রচিত গানে অন্য সুরকার সুর দেওয়ার অধিকার পায়।নজরুলের গানে নজরুল ছাড়াও জ্ঞান দত্ত, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, কমল দাশগুপ্ত সুর দেন।
১৯২৯ সাল থেকে কলকাতা রেডিওর সঙ্গে যুক্ত হন কাজী নজরুল। নিয়মিত কয়েকটি গানের আসর― 'হারমনি' 'মেল মিলন' প্রভৃতি নিয়মিত গানের অনুষ্ঠান তিনি পরিচালনা করতেন। একদিন চাকরি করতে যান নি যিনি, দারিদ্র্যের চাপে তিনিই এভাবে ফরমায়েসী সুরসৃষ্টিতে যেতে বাধ্য হলেন।কোনদিন তো কারুর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেন নি।কিন্তু প্রশ্ন জাগে এতবড় শিল্পী, এতবড় কবিকে অমন দারিদ্রের কষাঘাত সইতে হল কেন?
অথচ ১৯৩৬ সালের ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মেলনে নজরুল সভাপতির ভাষণে তাঁর মর্মান্তিক বেদনার কথা প্রকাশ করে বলেন, "সেদিনও আশা ছিল এই ছাত্র সমাজকে অগ্রদূত করে নব বিজয়ের অভিযানে আমি হব তুর্য বাদক..... সে আশা আমার আজও ফলল না।বুঝি মুকুলেই তা পড়ল ধূলার পরে। আমি তাই এতদিন নিজেকে দেশের কাছে জাতির কাছে মনে করেছি মৃত।"
"জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত অবসন্ন, দুঃখ শোকের শত জিঞ্জির বন্দি হয়েও আসতে হলো আমাকে আপনাদের পুরোভাগে এসে দাঁড়াতে।.... এই সংসারের চিড়িয়াখানার বন্দী সিংহের....যে সিংহ আজ হিজ মাস্টার ভয়েসের ট্রেডমার্কের সাথে এক গলাবন্ধে বাঁধা পড়েছে।"
১৯৩৯ সালে প্রমীলা নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। নিম্নাঙ্গ তার চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায়। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থব্যয় করেন। নিজে প্রকাশ করায় ও গ্রামফোন কোম্পানীতে চাকরি করায় অর্থনৈতিক সঙ্গতি অনেকটা সচ্ছল হয়েছিল। বুলবুল গাড়ি চড়তে ভালবাসত বলে একটি মোটর গাড়ি কিনেছিলেন। বালিগঞ্জে কিছুটা জমিও কিনেছিলেন বাড়ি করার জন্য। সবকিছু বিক্রী করে স্ত্রীর চিকিৎসায় খরচ করেন। কিন্তু স্ত্রী আর সুস্থ হননি কোনদিন।পঙ্গু অবস্থায় 25 বছর বেঁচেছিলেন। নজরুল আবার অর্থনৈতিক সংকটে ডুবে যান।
১৯৪১ সালে আগস্টে(২২শে শ্রাবণ) রবীন্দ্রনাথ মারা গেলেন।ব্যথিত নজরুল লিখলেন 'রবিহারা' কবিতা 'ঘুমাইতে দাও শান্ত রবিরে' গান। 'সালাম অস্ত রবি' লিখে শোক সভায় পরিবেশন করেন।
১৯৪২ সালের ৯ই জুলাই কলকাতা বেতারে 'সুন্দরম' প্রবন্ধ পাঠ করতে গিয়ে অসুস্থতা বোধ করেন এবং ছোটদের একটি গল্প বলতে গিয়ে কবি বধির হয়ে যান। আসর পরিচালক নৃপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় নজরুলকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দেন।
কলকাতায় নানা চিকিৎসায় নজরুলের রোগের কোন উপশম হয়নি। নজরুলের বন্ধুরা নিরাময় সমিতি গঠন করে টাকা তুলে ১৯৫৩ সালে ১০ই মে ইংল্যান্ড ও ভিয়েনায় চিকিৎসার জন্য পাঠান। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন চিকিৎসার অনেক দেরি হয়ে গেছে, ভিয়েনার ডাক্তার হানস হফ বলেন 'পিক্স ডিজিজ' নামক মস্তিষ্কের রোগ হয়েছে। ভালো হওয়ার কোনো পথ নেই।
১৯৬২ সালে ৩০শে জুন প্রমীলার মৃত্যু হয়।১৯৭২ সালে ২৪শে মে নজরুলও তাঁর পরিবারকে বাংলাদেশ সরকার নিয়ে যান, জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়ে।১৯৭৬ সালে জানুয়ারী মাসে নাগরিকত্ব দেয়।১৯৭৬ সালে ২৯ শে আগস্ট কবির মৃত্যু হয়।
বাংলা সাহিত্যে নজরুল এক বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন। বাংলা সাহিত্যকে তিনি নিপীড়িত মানুষের সাহিত্যের সিংহদুয়ারে পৌঁছে দিয়ে ছিলেন।
স্বাধীন ভারতবর্ষের নজরুল আজও উপেক্ষিত। নজরুল সাহিত্যের যে বলিষ্ঠতা আজও তা বিবেক ও মনুষ্যত্বে নাড়া দিয়ে যায়। মানুষের প্রতিবাদী মন গড়ে তুলতে প্রেরণা সৃষ্টি করে, এই শক্তিকে আজও শাসকশ্রেণী ভয় পায়, নজরুল চর্চা তাই তারা চায় না। আজকের যারা শোষণ মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রাম করছে, নজরুল সাহিত্যের চর্চা আজ তাঁদেরই যথার্থভাবে করতে হবে। ভারতবর্ষে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারাকে শরৎচন্দ্র নজরুলরা যে স্তরে রেখে গেছেন সেখান থেকে শুরু করতে হবে।
(তথ্যসূত্র: বিপ্লবী জনমত ত্রৈমাসিক; জানুয়ারি,১৯৯৯ সংখ্যা)
30/08/2022