10/07/2026
দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার আদিপাঠ: সক্রেটিস-পূর্ব যুগ থেকে শুরু ( পর্ব-৪)
প্রধান শিরোনাম:
পরিবর্তনই চিরন্তন: হেরাক্লিটাসের দর্শন ও আমাদের সময়
আমার জন্ম ২০০১ এ। তখন ছিল ছোট্ট দু'টো হাত, পা, ছোট ছোট চোখ, রোদের তীব্রতা সহ্য করতে না পারা ত্বক, ছিল না দাঁত। তারপর? তারপর ধীরে ধীরে বড় হলাম, ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। সেই ছোট কথা বলতে না পারা ছেলেটা বড় হয়েছি, কথা বলা শিখেছি। তীব্র রোদেও কষ্ট হয় না। দাঁতগুলো শক্ত মাংস চিবিয়ে ফেলে নিমেষেই। জীবন আর জীবিকা সম্পের্ক চিন্তা না করা ছেলেটা অনেকটা বাঁধ্য হয়েই চিন্তা করা শিখতে হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক বা আত্মিক একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছি, অতপর মৃত্যুও আসবে। আমাকে তা গ্রহণ করতেই হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্ম দিয়েছেন, মৃত্যুও দিবেন। মাঝের সমস্ত সময় হলো পরিবর্তন। আর পরিবর্তন-ই জীবন। কথাটা আমি (মাত্রই) লিখতে লিখতে উপলব্ধি করতেছি। আর সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্টটা পড়তে পড়তে আপনিও হয়তো উপলব্ধি করছেন। যাইহোক আজকে একজন দার্শনিকের সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে চলেছি, যাকে বলা হয় পরিবর্তনের দার্শনিক।
আমাদের জীবন, সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা একটা বিষয় খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারি, আর সেটা হলো কোনকিছুই স্থির নয়। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, সমাজ বদলায়, রাষ্ট্র বদলায়, এমনকি আমাদের চিন্তা ও বিশ্বাসও পরিবর্তিত হয়। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই গভীর সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন প্রাক-সক্রেটীয় গ্রিক দার্শনিক হেরাক্লিটাস (খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৫৩৫–৪৭৫)। তাই তাঁকে বলা হয় The Philosopher of Change বা পরিবর্তনের দার্শনিক।
হেরাক্লিটাসের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি ''No man ever steps in the same river twice.” অর্থাৎ, কোনো মানুষ একই নদীতে দু'বার পা রাখতে পারে না। আমার লেখা এই পর্বগুলোর প্রথম পোস্টে বলেছিলাম বিস্তারিত জানাবো। কারণ হেরাক্লিতোস বা হেরাক্লিটাস সম্পর্কে জানতে গিয়ে আমি বুঝতে পেরেছি জীবনের সাথে পরিবর্তনের সম্পর্ক কতটা গভীর।
“কোনো মানুষ একই নদীতে দু'বার পা রাখতে পারে না।” প্রথম দর্শনে কথাটি সহজ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ অত্যন্ত গভীর। বিষয়টা এমন, দ্বিতীয়বার যখন একজন মানুষ নদীতে নামে, তখন নদীর পানি আর আগের মতো থাকে না; প্রবাহ ইতোমধ্যে বদলে গেছে। একই সঙ্গে মানুষটিও আর আগের মানুষ থাকে না। সময়, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সুখ-দুঃখ এবং জীবনের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সেও পরিবর্তিত হয়। ফলে নদীও নতুন, মানুষও নতুন। এই একটি উপমার মধ্যেই হেরাক্লিটাস মানবজীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির চিরন্তন গতিশীলতার দর্শন তুলে ধরেছেন। আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা উপমাটা, আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠাকে মিলিয়ে দেখেন।
হেরাক্লিটাসের মনে করতেন, পরিবর্তনই প্রকৃতির একমাত্র স্থায়ী সত্য। আমরা স্থায়িত্বের যে ধারণা লালন করি, তা অনেকাংশেই আমাদের উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা। প্রকৃতিতে সবকিছুই অবিরাম প্রবাহমান আমাদের জন্ম ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও বিনাশ, উন্নতি ও অবনতি, মিলন ও বিচ্ছেদ। পরিবর্তনকে থামিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই; বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই জীবন ও সভ্যতার অগ্রগতি ঘটে।
তাঁর দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Logos (লোগোস)। হেরাক্লিটাস বিশ্বাস করতেন, বিশ্বজগতের এই আপাত বিশৃঙ্খল পরিবর্তনের পেছনে একটি সার্বজনীন যুক্তি ও শৃঙ্খলা কাজ করে। এই লোগোসই প্রকৃতি, সমাজ এবং মানুষের জীবনকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালিত করে। মানুষ যদি সেই যুক্তিকে উপলব্ধি করতে পারে, তবে সে বিশ্বকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সক্ষম হবে। এটা পিথাগোরাসের শৃঙ্খলা বা Order দর্শনের সাথে মিলে যায়।
হেরাক্লিটাস আরও বলেন, বিপরীত শক্তির সংঘাত থেকেই সামঞ্জস্যের জন্ম হয়। দিন ও রাত, আলো ও অন্ধকার, জীবন ও মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ এসব একে অপরের বিপরীত হলেও তারা পরস্পরকে অর্থপূর্ণ করে তোলে। তাঁর কথায়, সংঘাত ধ্বংসের প্রতীক নয়; বরং পরিবর্তন ও সৃষ্টির চালিকাশক্তি। এই ভাবনা আধুনিক দ্বান্দ্বিক দর্শনের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ প্রভাবশালী রাষ্ট্র, তার কারণ সে প্রভাবশালী না হলে অন্য একটা রাষ্ট্র ঠিকই হতো। এভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসময় পৃথিবীর মোড়ল থাকবে না। আর এটাই নিয়ম।
হেরাক্লিটাস আগুনকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে এটি কেবল ভৌত অর্থে নয়; আগুন তাঁর কাছে ছিল চিরন্তন গতি, শক্তি ও রূপান্তরের প্রতীক। আগুন যেমন এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় পদার্থকে পরিবর্তিত করে, তেমনি বিশ্বজগতও প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রূপ ধারণ করে।
আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে হেরাক্লিটাসের দর্শন যেন আরও বাস্তব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তন আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করছে। যে ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে, তারাই টিকে থাকে এবং নেতৃত্ব দেয়। যারা অতীতকে আঁকড়ে ধরে পরিবর্তনকে অস্বীকার করে, তারা সময়ের স্রোতে পিছিয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে না। শিক্ষা, প্রশাসন, অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। তরুণদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জন, প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এখন সময়ের দাবি। হেরাক্লিটাস আমাদের শেখান, পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে তাকে বোঝা এবং গ্রহণ করাই প্রজ্ঞার পরিচয়।
হেরাক্লিটাসের দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো জীবনকে কখনো স্থির ধরে নেওয়া যাবে না। মানুষ প্রতিদিন বদলায়, সমাজ প্রতিদিন নতুন রূপ পায় এবং ইতিহাস প্রতিনিয়ত নতুন অধ্যায় রচনা করে। তাই পরিবর্তনকে প্রতিপক্ষ নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এফেসাসের এক চিন্তকের উচ্চারিত সেই দর্শন আজও সমান সত্য। আমরা প্রত্যেকে প্রতিদিন এক নতুন নদীতে পা রাখছি, আর প্রতিদিনই নতুন একজন মানুষে পরিণত হচ্ছি। এই উপলব্ধিই হয়তো হেরাক্লিটাসের দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। পরিবর্তনই জীবনের ধর্ম, আর সেই পরিবর্তনকে উপলব্ধি করাই জ্ঞানের সূচনা।
নোট: আমরা আগে থেকেই সবকিছু জানতাম, জন্মের সময় সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম। অতঃপর নতুন করে জানা শুরু করেছি। প্লেটো এটাই তাঁর থিউরি অব রিকালেকশনে বলেছেন। প্লেটো সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। বিস্তারিত লিখব ইনশাআল্লাহ।
📝 Md. Abdul Barik
পর্ব -১: https://www.facebook.com/share/p/18uTE8ASRg/
পর্ব -২: https://www.facebook.com/share/p/1Afi2tW4e2/
পর্ব -৩: https://www.facebook.com/share/p/1Bswunicva/