23/08/2026
আঙুল নেই, তবুও পা দিয়ে লিখে HSC পরীক্ষা—কলি রানীর অদম্য গল্প
পরীক্ষার হলে শত শত শিক্ষার্থী যখন হাতে কলম নিয়ে খাতায় লিখছে, তখন সবার মাঝখানে বসে একজন শিক্ষার্থী লিখে চলেছেন অন্যভাবে।
হাতে নয়—ডান পায়ের আঙুল দিয়ে।
প্রথম দেখায় হয়তো অনেকের চোখে বিষয়টি অবাক করার মতো মনে হবে। কিন্তু এই দৃশ্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে চলা সংগ্রাম, কষ্ট, অপমান, পরিশ্রম আর একটি অসম্ভব সুন্দর স্বপ্ন।
এই শিক্ষার্থীর নাম কলি রানী।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের মেয়ে তিনি। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাত স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর হাতে আঙুল নেই এবং হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় তিনি স্বাভাবিকভাবে কলম ধরতে পারেন না।
কিন্তু হাত দিয়ে কলম ধরতে পারেন না—এই বাস্তবতাকে তিনি কখনোই নিজের স্বপ্নের শেষ হিসেবে মেনে নেননি।
ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম এক লড়াই
কলি যখন ছোট, তখন থেকেই তিনি বুঝতে পারেন—অন্য শিশুদের মতো তাঁর পক্ষে হাতে কলম ধরে লেখা সম্ভব নয়।
কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল।
তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন, হাত যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে অন্য কোনো উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
আর সেই পথটি ছিল তাঁর ডান পা।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ডান পায়ের আঙুল দিয়ে কলম ধরে লেখার অনুশীলন শুরু করেন। প্রথম দিকে নিশ্চয়ই কাজটি সহজ ছিল না। একটি অক্ষর লিখতেও যেখানে অন্যদের কয়েক সেকেন্ড লাগে, সেখানে তাঁকে বারবার চেষ্টা করতে হয়েছে।
কলম পড়ে গেছে।
হাতের বদলে পা দিয়ে লিখতে গিয়ে ভুল হয়েছে।
আবার চেষ্টা করেছেন।
আবার লিখেছেন।
এভাবেই দিনের পর দিন অনুশীলন করতে করতে পা দিয়েই লেখার দক্ষতা তৈরি করে ফেলেন তিনি। তাঁর ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ অনুশীলনের পর এখন তিনি বেশ দ্রুতগতিতে পা দিয়ে লিখতে পারেন।
বাবাকে হারানোর পরও থামেনি পথচলা
কলি রানীর জীবনে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি এসেছে পারিবারিক কষ্টও।
তিনি যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর বাবা মনোরঞ্জন রায় মারা যান। পরিবারের ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বাবাকে হারানোর পর তাঁর মা রূপালী রানীকেই সন্তানদের নিয়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
একদিকে অর্থনৈতিক ও পারিবারিক চাপ, অন্যদিকে জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা।
সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সামনে অনেক কারণই ছিল পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার।
কিন্তু তিনি ছাড়েননি।
বরং যত বাধা এসেছে, ততই নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গেছেন।
উপহাসও শুনতে হয়েছে
শুধু শারীরিক কষ্টই নয়, ছোটবেলায় মানুষের কথাও তাঁকে কষ্ট দিয়েছে।
BSS-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলজীবনের শুরুতে সহপাঠীদের কাছ থেকে তাঁকে উপহাসও সহ্য করতে হয়েছে। কখনো তাঁর শারীরিক অবস্থাকে নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজের মেধা, সাহস ও পরিশ্রম দিয়ে তিনি সেই পরিস্থিতি বদলে ফেলেন। পরে সহপাঠীরাও তাঁকে গ্রহণ করে এবং সহযোগিতা করতে শুরু করে।
এটাই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—
মানুষের কথা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যায় না।
পড়াশোনায়ও ছিলেন মেধাবী
কলি শুধু পা দিয়ে লিখতে পারেন—এটাই তাঁর বিশেষত্ব নয়।
তিনি পড়াশোনাতেও ভালো ফল করেছেন।
BSS-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের SSC পরীক্ষায় তিনি GPA-5 (A) অর্জন করেন। সেই পরীক্ষাতেও তিনি পা দিয়ে লিখেছিলেন।
অর্থাৎ HSC পরীক্ষার হলে পা দিয়ে লেখা তাঁর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়।
বরং এটি তাঁর বহু বছরের অনুশীলনের ফল।
এবার HSC-এর পালা
২০২৬ সালের ২ জুলাই শুরু হয় HSC ও সমমানের পরীক্ষা।
রংপুরের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন কলি রানী। তিনি কাউনিয়া কলেজের শিক্ষার্থী।
পরীক্ষার হলে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তিনিও বসেছেন।
সামনে প্রশ্নপত্র।
সামনে উত্তরপত্র।
কিন্তু তাঁর হাতে কলম নেই।
তিনি কলমটি ধরেছেন ডান পায়ের আঙুল দিয়ে।
তারপর ধীরে ধীরে লিখে চলেছেন একের পর এক উত্তর।
কেউ হয়তো তাঁকে দেখে অবাক হয়েছে।
কেউ হয়তো অনুপ্রেরণা পেয়েছে।
কিন্তু কলি রানীর কাছে এটি শুধু পরীক্ষা নয়—এটি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের আরেকটি ধাপ।
সাধারণ পরীক্ষার্থীদের সঙ্গেই পরীক্ষা
শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়ম অনুযায়ী কলি রানীর জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তাঁকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়।
তবে প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি অন্য পরীক্ষার্থীদের সঙ্গেই পরীক্ষার কক্ষে বসে পরীক্ষা দিয়েছেন।
তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরং সুযোগ পেলে তিনিও অন্য সবার মতোই এগিয়ে যেতে পারেন।
শুধু লেখাই নয়, প্রযুক্তিও ব্যবহার করেন পা দিয়ে
কলি রানীর সক্ষমতা এখানেই শেষ নয়।
তিনি শুধু পা দিয়ে খাতায় লিখতে পারেন না; পা দিয়ে কম্পিউটার ও স্মার্টফোনও ব্যবহার করতে পারেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ যে জিনিসগুলো অনেক মানুষ হাত দিয়েও ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, কলি সেগুলো পা দিয়েই করতে শিখেছেন।
এটি কোনো একদিনের অর্জন নয়।
এটি দীর্ঘদিনের অনুশীলনের ফল।
তাঁর স্বপ্ন কী?
কলি রানীর স্বপ্ন শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়।
তিনি পড়াশোনা শেষ করে BCS ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করতে চান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর এই স্বপ্নের কথা উঠে এসেছে।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই তাঁর ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে HSC পরীক্ষা তাঁর জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
প্রশাসনেরও নজরে এসেছে তাঁর সংগ্রাম
কলি রানীর অদম্য মনোবল স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলিকে আটকে রাখতে পারেনি এবং তাঁর উচ্চশিক্ষার পথচলা যেন থেমে না যায়, সেটিই তারা চান।
এই ধরনের সহযোগিতা একজন শিক্ষার্থীর জন্য আরও বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।
কলি রানীর গল্প আসলে কী শেখায়?
কলি রানীর গল্প শুধু একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর গল্প নয়।
এটি এমন একজন মানুষের গল্প, যিনি নিজের জীবনের সীমাবদ্ধতাকে নিজের পরিচয় হতে দেননি।
তাঁর হাতে আঙুল নেই।
কিন্তু তাঁর আছে স্বপ্ন।
হাতে কলম ধরতে পারেন না।
কিন্তু পা দিয়ে লিখে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করছেন।
বাবাকে ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন।
তারপরও পড়াশোনা থামাননি।
মানুষের উপহাস শুনেছেন।
তারপরও পিছিয়ে যাননি।
SSC-তে GPA-5 পেয়েছেন।
এবার HSC পরীক্ষা দিচ্ছেন।
আর সামনে তাঁর লক্ষ্য—BCS ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করা।
কলি রানীর জীবন যেন আমাদের একটি কথাই বলে—
“শরীরের কোনো সীমাবদ্ধতা স্বপ্নের সীমা হতে পারে না।”
যেখানে অনেক মানুষ সামান্য সমস্যায় নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দেয়, সেখানে কলি রানী প্রতিদিন নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর হাতে কলম নেই।
কিন্তু তাঁর পায়ে আছে কলম।
আর সেই কলম দিয়েই তিনি লিখছেন নিজের ভবিষ্যৎ।
হয়তো একদিন এই একই মেয়েকে আমরা একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখব।
সেদিন তাঁর হাতে হয়তো থাকবে সরকারি দায়িত্ব।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে—
তিনি কখনো নিজের স্বপ্নের কাছে হার মানেননি।