09/10/2025
'মানুষ'
(একটি অনুগল্প)
বেশ ঘটা করেই গরম পড়েছে। সূর্য যেন নিজের সমস্ত শক্তি ঢেলে দিয়েছে তাপে। বিকেলের দিকে সেই তেজে সামান্য ভাঁটা পড়ে—আকাশে মেঘ জমে, বাতাস বইতে শুরু করে, কিন্তু বৃষ্টি আসে না। আসে-আসে করেও কোথাও থেমে থাকে যেন।
তবে আজ আর শেষ রক্ষা হলো না। হঠাৎই আকাশ অন্ধকার হয়ে নামল ঝুম বৃষ্টি। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে গর্জে উঠল মেঘ। দূর মাঠে কৃষাণীরা তাদের কষ্টার্জিত ফসল বুকে চেপে ঘরে ফিরছে। চারণভূমির গরুগুলোও তাড়াহুড়ো করছে আশ্রয়ের খোঁজে।
মাগরিবের আজান পড়তেই তিন্নি উঠে বসল। বৃষ্টিস্নাত বিকেল দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যা নামলেই তাকে বের হতে হবে—খদ্দেরের খোঁজে।
তিন্নি একজন পতিতা।যাদের শরীরে দশ পুরুষের স্পর্শের গন্ধ লেগে থাকে।
এই শহরের অন্ধকার কোণে, আলোহীন রাস্তায়, মানুষের কামনা আর অবহেলার মাঝখানে তার প্রতিদিনের জীবন। কেউ তার নাম জানে না, কেউ তার গল্প শোনে না।শুধু দরজা খোলা আর বন্ধ।
তবুও একসময় তারও স্বপ্ন ছিল—একটা ঘর, একটু ভালোবাসা, আর কারো পাশে নিজের নামের উচ্চারণ। কিন্তু সমাজের কঠিন হাত তাকে ঠেলে দিয়েছে এই জীবনের দিকে, যেখানে দেহই পণ্য, আত্মা কেবল এক জ্বলা প্রদীপের মতো নিভে যেতে থাকে।
আজ বৃষ্টির কারণে হাইওয়ে প্রায় ফাঁকা। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও কোনো খদ্দের এল না। বিরক্ত হয়ে ফিরে যাবার সময় এক বৃদ্ধা হোঁচট খেয়ে পড়ল তার সামনে। তিন্নি ছুটে গেল।
“আহা! কি হয়েছে আপনার? এভাবে দৌড়াচ্ছেন কেন?”
বৃদ্ধা হাঁপাতে হাঁপাতে, ভিজে কাঁপা গলায় বলল, “মাগো, আমাকে একটু সাহায্য করো। স্বামীটা হাসপাতালে ভর্তি… বাঁচার আশা নেই প্রায়! ও-নেগেটিভ রক্ত দরকার, কোথাও... কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এই বৃষ্টিতে সব দোকান, সব জায়গা বন্ধ!” বৃদ্ধা তিন্নির হাত ধরে কেঁদে ফেললেন। “একটা দিনের জন্য যদি তাকে বাঁচাতে পারি...”
তিন্নি থমকে দাঁড়াল। বৃদ্ধার চোখে তার স্বামীর জন্য যে আর্তি, তা তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। এক লহমার জন্য তার মনে হলো—ভালোবাসা, ঘর, নির্ভরতা... এগুলো কি শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে? কারও জন্য এমন আকুল হয়ে কাঁদার সুযোগ সে কোনোদিন পাবে কি? তার শরীর যার কাছে শুধু পণ্য, সেই রক্ত কি পারে অন্য কারও জীবন ফিরিয়ে দিতে?
— “আমি... আপনার জন্য কি করতে পারি?” তিন্নি দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধা হতাশায় মাথা নাড়লেন, “কিছু না মা, শুধু একটা মানুষ যদি ও-নেগেটিভ রক্ত দিত...”
তিন্নি এবার দৃঢ় হলো। তার হারানো স্বপ্নগুলো যেন এই মুহূর্তে বৃদ্ধার স্বামীর জীবনের সঙ্গে একাকার হয়ে গেল।
— “চলুন আমার সাথে।” সে শান্ত গলায় বলল।
বৃদ্ধা অবাক হয়ে তিন্নির ভেজা মুখের দিকে তাকালেন।
— “কোথায় মা? তুমি কি চেনো কাউকে?”
— “হ্যাঁ। আমি চিনি। আমার রক্ত ও-নেগেটিভ। চলুন, সময় নষ্ট করবেন না।”
বৃষ্টির মধ্যে সে বৃদ্ধার সঙ্গে দৌড়ে গেল হাসপাতালে।
রক্ত দিল নিঃশব্দে, কোনো নাম লিখল না, কোনো প্রশ্ন করল না
রক্ত দেয়ার পর যখন বেরিয়ে এল, বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ ধুয়ে গেছে, কিন্তু যেন তিন্নির ভিতরটাও ধুয়ে গেছে—এক নতুন প্রশান্তিতে।
একজন পতিতার রক্তে বাঁচল অন্য এক মানুষের জীবন।
মানুষের পরিচয় তার পেশায় নয়—তার হৃদয়ে।
তিন্নি হয়তো সমাজের চোখে কলঙ্ক, কিন্তু সেদিন সে ছিল এক মানবিক আলো।
পুনশ্চ ১:জীবন সবসময় সমান আলো পায় না। কারও ভাগ্যে সূর্যের রোদ, কারও ভাগ্যে শুধুই অন্ধকার। কিন্তু অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলো জ্বলে উঠতে পারে—যখন মানুষ তার মানবতাকে ভুলে যায় না।
পুনশ্চ ২:আমরা প্রায়ই মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ে বিচার করি, কিন্তু ভুলে যাই—মানবতা পেশার সীমারেখায় বাঁধা নয়।
তিন্নির মতো নামহীন মানুষরাই মাঝে মাঝে শেখায়, "মানুষ" হওয়াটাই আসল পরিচয়।
Sazib.....
31/10/2024
25/08/2024
16/09/2023