13/07/2025
আমি জীবনে নানান ধরণের পাগলামি করেছি। একবার মাথায় ভূত চাপলো -একটা এনজিও দেবো। এক হাতে জীবন, আরেক হাতে যৌবন নিয়ে আমি ঝাপিয়ে পড়লাম। আমার মাথায় যখন ভূত চাপে, সেটার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২ মাস থাকে। এরপর হয় ভূত নিজে থেকে নেমে যায়, নয়তো ঝাকি মেরে আমিই ভূত নামিয়ে ফেলি। কিন্তু এনজিও-র ভূত সর্বকালের রেকর্ড ভেঙ্গে ফেললো। এটির মেয়াদ হলো, ৮ ঘন্টা। ঠিক ৯ ঘন্টার মাথায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই হিন্দি চুলের কারবার আমি করবো না।
কীভাবে এই ঘটনা ঘটলো, এইটা একটু ভেঙ্গে বলি। দুপুর ২ টায় আমি ঠিক করলাম এনজিও দেবো। বিকাল ৪ টায় চলে গেলাম আমার এক আত্মীয়ের কাছে। যিনি গ্রামীন, প্রশিকা, সবশেষ ইউনিসেফ এনজিও করেছেন। চাকরিবাকরি শেষ করে তখন তিনি নিজেই চার চারটি এনজিও'র মালিক।
তিনি আমাকে বললেন, তোমার এনজিও'র উদ্দেশ্য কী? আমি বললাম, তরুণদের কর্মসংস্থান করবো।
কীভাবে করবা? আমি দশ মিনিটে তাকে ব্যাখা করলাম। আমার ব্যাখা শুনে তিনি খুবই হতাশ হলেন। বললেন, তুমি তো সমস্যার গোড়ায় হাত দিয়েছো।
শুনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। বললাম, জ্বী। আমি নিজে একজন বেকার । এজন্য বেকারত্বের সমস্যাটা আমি ভালোভাবে বুঝি। আমার দেশ বিদেশ ঘোরা আছে। ইউরোপের বড় একটা অংশে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। আমার বিশ্বাস, এই প্রজেক্টে তরুণরা উপকৃত হবে।
আমার কথা শুনে সেই আত্মীয় দ্বিতীয়বারের মতো দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তার দীর্ঘশ্বাসের বাতাসে আমার প্রজেক্টের প্রোফাইলের পাতা উড়ে গেলো। উনি হতাশ গলায় বললেন, শোনো। এনজিও'র কাজ সমস্যার সমাধান করা না। সমস্যাকে বাচিয়ে রাখা। যতক্ষণ সমস্যা থাকবে, ততক্ষণ ফান্ড থাকবে। সমস্যা নাই তো, ফান্ডেরও দরকার নাই।
কথাটা শুনে আমি একটু বোকা হয়ে গেলাম। বললাম, একটু বুঝিয়ে বলেন।
আমার আত্মীয় আমাকে বুঝিয়ে বললেন। তার ২ নম্বর এনজিও কাজ করে আর্সেনিক নিয়ে। টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক। এটা বিষ। মানুষের পেটে গেলে দফারফা। এটা একটা বিরাট স্বাস্থ্য সমস্যা। পাবলিক হেলথ। এজন্য উনি একটা প্রজেক্ট নিয়েছেন। কোটি কোটি টাকা। আর্সেনিক আক্রান্ত যেকোনো টিউবয়েলে উনি লাল রঙ দিয়ে ক্রস চিহ্ন আঁকেন। যাতে গ্রামের মানুষ ওই কলের পানি না খায়।
এখানে আর্সেনিক গুরুত্বপূর্ণ না। লাল রঙ লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। ওই লাল রঙের কোয়ালিটি গুরুত্বপূর্ণ। রঙটা এমন হতে হবে, যাতে পরের বছর ওই রঙ মুছে যায়। তাহলে তিনি নতুন করে লাল রঙ লাগানোর কাজ করতে পারবেন। ফান্ডিং-ও বলবৎ থাকবে। আর্সেনিকের জায়গায় আর্সেনিক থাকবে। টিউবওয়েলের বি'ষাক্ত পানি, বি'ষাক্তই থাকবে।
শুধু বছর বছর রঙ লাগাতে হবে।
এজন্য দিস্তার পর দিস্তা গবেষণা হবে। গোল টেবিল মিটিং হবে। ''আর্সেনিকের কবলে গ্রামীণ জনপথ: ঝুঁকিতে জনস্বাস্থ্য '' শীর্ষক সেমিনার হবে। এই সেমিনার আবার পাঁচ তারকা হোটেলে হতে হবে English এ। এখানে বিদেশিদের দাওয়াত দেয়া হবে। সেমিনার হতে হবে কমপক্ষে ৩ দিনের । টাকার ছড়াছড়ি।
কথাটা আমি বানিয়ে বলছি না। আপনি যদি কোনো এনজিও কর্মীকে দেখেন, তাহলে খেয়াল করবেন, সে ধীরে ধীরে হাঁটে, ধীরে ধীরে কথা বলে, এমনকি কাশিও ধীরে ধীরে দ্যায়। এই হচ্ছে এনজিও'র মূল সূত্র।
আমি সেই আত্মীয়ের প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। উনি আমাকে খোলামেলা ভাষায় এনজিও'র উপকারিতা বুঝিয়ে ছিলেন।
জীবনে আর যাই করি, এনজিও করবো না, এই সিদ্ধান্ত নিতে আমার লেগেছে ১ মিনিট। বাকি ৭ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আমি কেন এনজিও করতে চাই না, এটা নিয়ে একটা পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেনটেশন বানিয়েছি। কেন আমি প্রেজেনটেশন বানালাম, এটা আমি নিজেও জানি না। একজন এনজিও কর্মীর সাথে দশ মিনিট সময় কাটালে, আপনিও হুদাই একটা প্রেজেনটেশন বানিয়ে ফেলবেন।
বাংলাদেশ পড়েছে এনজিওবাজদের কবলে। এর আগেও চার চারবার তত্বাবধায়ক/ অন্তবর্তী সরকার এসেছে। পলিটিকাল সরকার এসেছে। নির্বাচিত সরকার এসেছে। স্বৈরাচারি সরকার এসেছে। কিন্তু এমন লুথা সরকার বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। এটাই এনজিও সরকারের বৈশিষ্ট্য। পুরা দেশকে এরা কিস্তি সিস্টেমে নিয়ে গেছে।
ইয়া নফসি পড়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় আমার জানা নাই।