16/07/2023
অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন কাঁচা মধু নাকি প্রসেসড মধু নিব? কোনটা ভাল??
এইটা নিয়েই আজকের লেখাটি
মধুতে প্রধানত তিনটি উপাদান থাকে। ১. চিনি(গ্লুকোজ+ফ্রুক্টোজ) ৬৫-৭০%, পানি ২০-৩০% আর বাদ বাকি মিনারেলস। আমরা জানি যে মধুতে পানির পরিমান যত কম হবে সেটা তত ঘন হবে এবং সেটাকেই আমরা ভাল মানের বা গ্রেডের মধু বলে থাকি। যদিও গ্রেডিং পরিমাপ শুধুমাত্র পানি মেপেই করা হয় না আরো মানদণ্ড আছে, সেটা ভিন্ন আলোচনা।
সাধারণত পানির পরিমাণ কম হলেই সেটাকে ভাল মধু বলা হয় এবং সেটা দীর্ঘদিন ভাল থাকে। কারন হলো মধুতে ওয়াটার এক্টিভিটি কম হলে সেই মধুতে ব্যাকটেরিয়া বা ফাংগাস আক্রমণ করতে পারে না। একইভাবে পানির পরিমাণ বেশি হলে ওয়াটার এক্টিভিটি বেড়ে যাওয়াতে ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে ফলে মধু নস্ট হয়ে যায়।তাই যে মধু পাতলা হয় সাধারণত ৫/৬ মাস পরে নস্ট হতে শুরু করে। এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখা দরকার তা হল এটিই কিন্ত একমাত্র কারন নয় মধু নস্ট হবার। আরো কারন আছে যেমন নোংরা পাত্রে মধু সংরক্ষণ, শ্যাতশ্যাতে জায়গায় সংরক্ষণ, পাত্র এয়ারটাইট না রাখা ইত্যাদি।
তাহলে বুঝতে পারলাম মধুতে ময়েশ্চার বা পানি বেশি থাকলে সেটা তাড়াতাড়ি নস্ট হবার সুযোগ থাকে। এর থেকে পরিত্রাণ এর কি উপায়???
১. ভাল মানের সংগ্রহ করা, অথবা
২. মধু প্রসেসড করা
সব সময়ই ভাল মানের মধু পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে যারা বড় ব্যবসায়ী কিংবা যারা দীর্ঘদিন মধু রেখে বিক্রি করেন তাদের আসলে প্রসেসড করা ছাড়া বিকল্প থাকেনা।
এখন প্রশ্ন হল প্রসেসড মধু কি খারাপ? বা প্রসেসড করলেই কি মধু নস্ট হয়ে যায়??
এর উত্তর হল। সাধারণভাবে তাপ দিলে মধু নস্ট হবেই। কিন্ত বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কম তাপমাত্রায় এবং ধীরে ধীরে তাপ দিলে মধুর ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এখন কতটুকু তাপ দিবেন তা নিয়ে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। কেউ কেউ ৬০ ডিগ্রি এর নিচে বলেছেন, কেউবা ৫০ কেউবা ৪০। তবে ৬০ এর নিচেই নিরাপদ তবে ৪০ এর নিচে হলে উত্তম। তাই ৪০/৫০/৬০ যেভাবেই প্রসেসড করা হোক না কেন মধু খারাপ সেটা বলার সুযোগ নেই যদিনা তা সঠিকভাবে প্রসেসড করা হয়। সঠিকভাবে বলতে?? ভাল মেশিন, ভাল অপারেটর এবং সম্যক জ্ঞান থাকা জরুরি।
পরিশেষে এটাই বলব কাঁচা মধুর তুলনা হয় না। সবচেয়ে উত্তম হয় ভাল মানের কাঁচা মধু উৎপাদন করা। সেটা সম্ভব হলে অর্থাৎ ভাল মানের মধু উৎপাদন করা গেলে প্রসেসিং এর প্রয়োজনই পড়বে না। কিন্ত বিভিন্ন কারনে সেটা সম্ভব হয় না বিধায় মধু প্রসেসড করা জরুরি হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ভাল জায়গা থেকে প্রসেসড করা জরুরি।
তাই যারা নতুন ব্যবসায়ী তাদের জন্য পরামর্শ থাকবে প্রথম অবস্থায় কাঁচা ও ভাল মানের মধু নিয়ে কাজ করার৷ আস্তে আস্তে ব্যবসার পরিধি বড় হলে তখন প্রসেসড মধুর কথা ভাববেন।
আরিফুল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, হানি রিসার্চ ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ
কর্নধার, সোপান ফুডস
16/07/2023
মধু জমে যাওয়া প্রাকৃতিক বিষয়। প্রকৃতি যেভাবে আমাদের দেয় ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করা উচিত তাহলেই উক্ত পন্য থেকে সর্বোচ্চ বেনিফিট বা সুবিধা আপনি নিতে পারবেন। মধু কেন জমে যায় সেটা বিজ্ঞানের ছাত্ররা ভালোই জানেন। আন্তঃআণবিক দুরত্ব ও আন্তঃআনবিক শক্তি, দ্রবন ও দ্রাবক পড়ে নাই এমন কেউ আছেন?? তবুও জমা মধু দেখলেই আমরা কুসংস্কারকেই বিশ্বাস করি। এইটা খুবই দুঃক্ষজনক।
মধু কেন জমে যায় সেটা নিয়ে অনেক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে আমাদের দেশের বিভিন্ন মৌ গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যারদের। আমার নিজেরও লেখা আছে চাইলে পুর্বের পোস্ট দেখে নিতে পারেন।
আজ আলোচনা করব আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ও পরিচিত সরিষা ফুলের মধু নিয়ে। এই মধুটি শীতকালেই হয় এবং এই সময়ের যাবতীয় রোগ বালাইয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী অর্থাৎ ঠান্ডা, কাশি, এজমা ইত্যাদি। তবে গ্লুকোজ এর পরিমাণ অন্যান্য মধুর চেয়ে বেশি থাকায় ডায়াবেটিস রোগীদের পরিহার কিংবা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করা যেতে পারে।
এই যে গ্লুকোজ এর কথা বললাম আসলে গ্লুকোজ এর পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকার ফলেই এই মধুটি তাড়াতাড়ি জমে যায়। গলে গিয়ে মধুটি কখনো ঘীয়ের মতো মিহি হয়, কখনো তাল মিছরির মতো হয় আবার কখনো দানা দানা হয় যা অনেকে চিনি মনে করে ভেজাল মধু ভাবেন যা সত্যি তো নয়ই বরং বিজ্ঞান বিরোধী।
আমাদের দেশে মধু নিয়ে ভুল ধারনা থাকলেও উন্নত দেশে এর কদর মারাত্মক। তারা জমে যাওয়া মধুকে ক্রিম হানি বলে এবং অন্যান্য মধু থেকে এর দাম বেশি। হায় আফসোস যত খারাপ দিক আমরা তাদের ফলো করি কিন্ত ভাল জিনিস এর বেলায় উল্টো 😭
যাইহোক আবারও সরিষা সীজন চলে এসেছে। আমি বিনীতভাবে সবাইকে অনুরোধ করব যারা নিয়মিত বা অনিয়মিত সবাইকে এই মধুটি খাবার জন্য। এতে অনেক উপকার হবে তার মোটা দাগে যে তিনটা উপকার হবে তা হল....
১. সীজনাল রোগ বালাই থেকে বেঁচে থাকবেন ইনশাআল্লাহ
২. দেশের মধুর চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সেক্টর টা দাঁড়িয়ে যাবে পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে ইনশাআল্লাহ,
৩. লাখো যুবকের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা হবে যা কিনা আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা
আসুন মধু জমে গেলে ভেজাল এই কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসি, জমা মধু খাই এবং অপরকে খেতে উৎসাহিত করি, দেশিয় মধু শিল্পকে বাচাই...
জমা মধু কিভাবে খাবেনঃ
১. সকালে পাউরুটি বা রুটির সাথে জ্যালির পরিবর্তে খেতে পারেন।
২. চায়ে চিনির পরিবর্তে খেতে পারেন।
৩. বিভিন্ন মিস্টান্ন তৈরিতে ব্যবহার করতে পারেন তবে সঠিক নিয়ম জেনে নিবেন।
৪. শীতে বিভিন্ন পিঠার সাথে খেতে পারেন।
৫. এক কথায় চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
বিঃদ্রঃ ১ বছর নিচের বাবুদের ও ডায়াবেটিস রোগীরা ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিত খাবেন না।
আরিফুল ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, হানি রিসার্চ ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সোপান এন্টারপ্রাইজ
10/05/2023
যারা মধু নিয়ে কাজ করছেন তাদের অনুরোধ করব মধুর পাশাপাশি অন্যান্য মৌ পন্য যেমন পোলেন, রয়েল জেলি, প্রোপোলিস, বীম ভেনম, মধু কসমেটিকস ইত্যাদি নিয়ে কাজ করতে। অন্যান্য পন্য আপাত কঠিন হলেও পোলেন ও মৌ কসমেটিকস নিয়ে কাজ করা যেতেই পারে শুধু দরকার সুন্দর উদ্যোগ ও সাহস। আর যাদের বাইরে বা বিদেশে প্রোডাক্ট পাঠানোর সুযোগ আছে তারাও মধুর সাথে অন্যান্য পন্য পাঠানোর চেস্টা করেন।
এই সেক্টরকে সত্যিকার অর্থে ডেভেলপ করতে হলে শুধু মধু নিয়ে এগোনো কঠিন হবে। আর যারা মৌ খামারী আছেন আপনারা এগিয়ে না আসলে কাজটি আরো কঠিন হয়ে যায়। আপনাদের সর্বাত্মক সহায়তাও প্রয়োজন।
সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইনশাআল্লাহ মৌ সেক্টর একদিন মৌ শিল্পে পরিনত হবে ইনশাআল্লাহ।
পিকঃ ইন্টারনেট
08/04/2023
মধুর প্রাচীন ইতিহাসঃ
ঠিক কতদিন ধরে মধুর অস্তিত্ব রয়েছে তা বলা কঠিন। খ্রীস্টপূর্ব ৭০০০ থেকে স্পেনের গুহাচিত্রগুলি মৌমাছি পালনের প্রাচীনতম রেকর্ড হিসেবে ধরা হয়। তবে মধু মৌমাছির জীবাশ্ম প্রায় 150 মিলিয়ন বছর আগের! এর 'জাদুকর' বৈশিষ্ট্য এবং বহুমুখিতা মধুকে ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দিয়েছে।
মৌচাকে মৌমাছি রাখার প্রথম রেকর্ড পাওয়া গেছে কায়রোর কাছে খ্রীস্টপূর্ব ২৪০০ সালে নির্মিত সূর্য মন্দিরে। মৌমাছি প্রায়শই মিশরীয় হায়ারোগ্লিফগুলিতে দেখা যায় এবং ফারাওদের বেশ পছন্দনীয় ছিল শুধু তাই নয় তারা রাজকীয়তার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করত।
প্রাচীন মিশরীয়রা মধুকে মিষ্টি হিসেবে এবং তাদের দেবতাদের উপহার হিসেবে ব্যবহার করত।মধুর তৈরি কেক মিশরীয়রা দেবতাদের প্রসন্ন করার জন্য ব্যবহার করত। গ্রীকরাও মধুর পিঠা তৈরি করে দেবতাদের কাছে নিবেদন করত।
গ্রীকরা মধুকে শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যই নয়, নিরাময়কারী ওষুধ হিসেবেও দেখত। গ্রীক রেসিপি বইগুলি মধু থেকে তৈরি মিষ্টি এবং কেকগুলিতে পূর্ণ ছিল। পনিরগুলিকে মধুর সঙ্গে মিশিয়ে চিজকেক তৈরি করা হত, যাকে ইউরিপিডস খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে "সোনালী মৌমাছির সমৃদ্ধ মধুতে সবচেয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ভেসে যাওয়া" বলে বর্ণনা করেছিলেন।
রোমানরাও দেবতাদের উপহার হিসাবে মধু ব্যবহার করত এবং তারা রান্নায় এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। মৌমাছি পালন রোমান সাম্রাজ্য জুড়ে বিকাশ লাভ করেছিল।
খ্রিস্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, গির্জার মোমবাতির চাহিদা মেটাতে মধু ও মোমের উৎপাদন অনেক বেড়ে যায়।
রেনেসাঁর আগ পর্যন্ত ইউরোপে মধুর গুরুত্ব অব্যাহত ছিল, যখন আরও দূর থেকে চিনির আগমন মানে মধু কম ব্যবহার করা হত। সপ্তদশ শতকের মধ্যে মিষ্টি হিসেবে চিনি নিয়মিত ব্যবহৃত হতে থাকে এবং মধুর ব্যবহারও কম হয়।
পোপ আরবান অষ্টম মৌমাছিকে তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতেন।
মৌমাছি ছিল প্রথম রাজবংশের (৩,২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) সময় নিম্ন মিশরের রাজার চিহ্ন।
নেপোলিয়নের পতাকা উড়তে মৌমাছির একক লাইন বহন করে এবং তার পোশাক মৌমাছি দিয়ে সূচিকর্ম করা হয়েছিল।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে, মৌমাছি ছিল গ্রীক শহর ইফেসাসে মুদ্রায় ব্যবহৃত প্রতীক।
এছাড়াও মৌমাছি ছিল গ্রীক দেবী আর্টেমিসের প্রতীক।
পিকঃ প্রাচীন গুহায় মধু সংগ্রহর চিত্রকর্ম