07/08/2023
বৈচিত্র্যময় প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন
অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্টমার্টিন। বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকাগুলোর মধ্যে সেন্টমার্টিন অন্যতম । চারিদিকে নীল পানি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
ভৌগোলিক অবস্থান
সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত। ৯২°১৮′ থেকে ৯২°২১′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ এবং ২০°৩৪′ থেকে ২০°৩৯′ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে দ্বীপটির অবস্থান । সেন্টমার্টিনের আয়তন ৮ বর্গ কিমি। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ হতে প্রায় ৯ কিমি দক্ষিণে এবং মিয়ানমারের উপকূল হতে ৮ কিমি পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থিত।
নামকরণ
অষ্টম-নবম শতকে চট্টগ্রামে আরব বণিকদের আগমন শুরু হয়। চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যাতায়াতের সময় তারা এ দ্বীপটি বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করত। সেই থেকে এ দ্বীপের উৎপত্তি আরবরা এ দ্বীপের নামকরণ করে জিঞ্জিরা। জিঞ্জিরা আরবি শব্দ, যার অর্থ দ্বীপ। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এ দ্বীপের নাম দেয় সেন্টমার্টিন। খ্রিষ্টান সাধু মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। অন্য তথ্যমতে, দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়। স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় নারিকেল জিঞ্জিরা। সম্ভবত বাঙালি জেলেরা জলকষ্ট এবং ক্লান্তি দূরীকরণের অবলম্বন হিসেবে প্রচুর পরিমাণ নারিকেল গাছ এই দ্বীপে রোপণ করে। এই সূত্রে স্থানীয় অধিবাসীরা এই দ্বীপের উত্তরাংশকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে অভিহিত করা শুরু করে। দ্বীপে রূপান্তর
প্রায় ৫,০০০ বছর আগে সেন্টমার্টিন কক্সবাজার জেলার টেকনাফের মূল ভূমির অংশ ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রের নিচে চলে যায় । এরপর প্রায় ৪৫০ বছর পর বর্তমান সেন্টমার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ পাড়া জেগে উঠে। এর ১০০ বছর পর উত্তর পাড়া এবং পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে বাকি অংশ জেগে উঠে। ১৯০০ সালে ভূমি জরিপের সময় এ দ্বীপটি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন হিসেবে উন্নীত হয় ।
জনবসতি
১৮৯০ সালের দিকে কিছু বাঙালি এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ এ দ্বীপে বসতি স্থাপনের জন্য আসে। এরা ছিল মূলত মৎস্যজীবী। যতটুকু জানা যায়, প্রথম অধিবাসী হিসেবে বসতি স্থাপন করে ১৩টি পরিবার।
ভূপ্রকৃতি
সেন্টমার্টিন দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি প্রধানত সমতল। তবে কিছু কিছু বালিয়াড়ি দেখা যায়। এ দ্বীপটির প্রধান গঠন উপাদান হলো চুনাপাথর। দ্বীপটির উত্তর পাড়া এবং দক্ষিণ পাড়া দু’জায়গারই প্রায় মাঝখানে জলাভূমি আছে । এগুলো মিঠা পানি সমৃদ্ধ এবং ফসল উৎপাদনে সহায়ক। দ্বীপটিতে কিছু কৃষি উৎপাদন হয়ে থাকে। দ্বীপটি ৭.৩১৫ কিমি দীর্ঘ এবং উত্তর-উত্তরপশ্চিম ও দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব দিক জুড়ে বিন্যস্ত। ভৌগোলিকভাবে এটি তিনটি অংশে বিভক্ত। উত্তরাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় নারিকেল জিঞ্জিরা বা উত্তর পাড়া। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশটি দক্ষিণ পাড়া হিসেবে পরিচিত। এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব দিকে বিস্তৃত একটি সংকীর্ণ লেজের মতো এলাকা। একটি সংকীর্ণ কেন্দ্রীয় অঞ্চল বা মধ্য পাড়া দুইটি অংশকে সংযুক্ত করেছে। সংকীর্ণতম অংশটি গলাচিপা নামে পরিচিত। উত্তর পাড়ার পৃষ্ঠমৃত্তিকা গঠিত হয়েছে বালি এবং ঝিনুক শামুকের খোলস সহযোগে। দক্ষিণ পাড়া অঞ্চলে রয়েছে দুটি ক্ষুদ্র মৃত উপহ্রদ এবং একটি বিস্তৃত জলাভূমি। মাছ সংগ্রহস্থল, বাজার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ শুধু উত্তর পাড়াতেই অবস্থিত। সর্বদক্ষিণের স্থান ছেঁড়াদ্বীপ সেন্টমার্টিনের মূল দ্বীপ ছাড়া আর একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে যা ‘ছেঁড়াদিয়া' বা ‘ছেঁড়াদ্বীপ' নামে পরিচিত। এ দ্বীপটি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের স্থান। উল্লেখ্য, ২০০০ সালে ছেঁড়াদ্বীপের সন্ধান পাওয়া যায় ।