11/12/2025
একজন আলেম ও আলোকিত শিক্ষক হিসেবে মাওলানা আবুল কাশেম (রাহ.) (হুজুর স্যার)
জন্ম ও শৈশব
মাওলানা আবুল কাশেম (রাহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১ ডিসেম্বর ১৯৫৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার আকসিনা গ্রামে। তাঁর পিতা মৃত জয়দুল হুসেন এবং মাতা হোসনা আক্তার। ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী শিশু শৈশব থেকেই গভীর ধার্মিকতা, সৌজন্যবোধ ও শান্ত চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন।
শিক্ষাজীবন
ছোটবেলা থেকেই ইসলামি জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। তিনি আড়াইবাড়ি ইসলামিয়া সাঈদিয়া কামিল মাদ্রাসা, সুনাকান্দা আলিয়া মাদ্রাসা এবং ধামতি আলিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘ সময় অধ্যয়ন করেন।
“হাদিস ও ফিকহ” বিভাগে কামিল ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন। তাঁর শিক্ষা ছিল শুধু জানার জন্য নয়—মানুষকে জানাতে, গড়তে, ও নৈতিকতা শেখানোর জন্য।
শিক্ষকতা জীবন
উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি যোগ দেন হীরাপুর শহীদ নোয়াব মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ে, হেড মাওলানা হিসেবে। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার দীর্ঘ পথচলা।
তিনি ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন—তিনি ছিলেন ছাত্রদের আস্থার জায়গা, চরিত্র গঠনের পথপ্রদর্শক, শৈশবের অভিভাবক।
তাঁর মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থী কায়েদা থেকে কোরআন, আকাইদ থেকে আমল—সহীহ দীন শেখার সুযোগ পেয়েছে। তাঁর ক্লাস ছিল আত্মশুদ্ধির পাঠ। তিনি বলতেন—
“কোরআন শুধু পড়ার জিনিস নয়, জীবনে প্রয়োগ করার জিনিস।”
তাঁর কঠোরতা ছিল নিয়মানুবর্তিতা শেখানোর জন্য; আর সেই কঠোরতার আড়ালে ছিল সীমাহীন স্নেহ ও মমতা। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কেউ মিথ্যা বলতে বা অন্যায় লুকাতে সাহস পেত না। তাঁর দৃষ্টি ছিল এমন—যা মানুষের অন্তরের দোষ-কর্ম মনে করিয়ে দিত।
ধর্মীয় ও সামাজিক অবদান
হীরাপুর মধ্যপাড়ার ফোরকানিয়া মাদ্রাসায় তিনিই ছিলেন শিশুদের প্রথম কোরআন শিক্ষক। মসজিদের ইমাম হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর কণ্ঠে তিলাওয়াত, তাঁর ইমামতি, তাঁর দরদ—মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেত।
তিনি বিশ্বাস করতেন—সমাজকে বদলাতে হলে পরিবারকে বদলাতে হবে।
মেয়েদের নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাঁর প্রভাবে পুরো পূর্বাঞ্চলে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি নতুন করে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ
মাওলানা আবুল কাশেম (রাহ.) ছিলেন তাকওয়াবান, নীতিবান, মমতাময় এবং অত্যন্ত সৎ একজন মানুষ।
তিনি কখনও অর্থ, মর্যাদা বা প্রভাবের দিকে ঝুঁকেননি।
সারা জীবন নিজেকে উৎসর্গ করেছেন—
ইলমের জন্য, আমলের জন্য, মানুষের আত্মাকে আলোকিত করার জন্য।
ছোটবেলার শিক্ষার্থীরা আজও বলেন—
“হুজুর স্যারের সামনে সামান্য ভুল করলেও লজ্জায় মাথা তুলে দাঁড়ানো যেত না।”
এই সম্মান জন্মেছিল তাঁর চরিত্র, নৈতিকতা ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব থেকে।
স্যারের পরিবার
জীবনসঙ্গিনী, তিন ছেলে এবং এক মেয়ে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি সুন্দর ও নৈতিক পরিবার।
হুজুর স্যারের সন্তানদের অবস্থান
বড় ছেলে: মাওলানা মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান কাসেমী
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, গুলশান—সহকারী অধ্যাপক
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বর্তমানে সুস্থতার পথে।
মেঝো ছেলে: মোহাম্মদ সাইফুর রহমান কাসেমী
পরিবার নিয়ে ইতালিতে ব্যবসায় নিয়োজিত।
ছোট ছেলে: আব্দুর রহমান আল মাহমুদ
ইতালিতে চাকরিরত।
একমাত্র মেয়ে: হাফসা আক্তার নাবিলা
দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার ও পরিবার পরিচালনা করছেন।
ইন্তেকাল
৩০ জুন ২০২১ সালের রাতে, মিরতলা–আকসিনা গ্রামের নিজ বাড়িতে তিনি ইন্তেকাল করেন। সময় ছিল রাত ২টা ২০ মিনিট।
সেই রাতের পর হীরাপুরের পরিবেশ যেন অন্য রকম হয়ে যায়— হুজুর স্যারের গলা আর শোনা যাবে না, বিদ্যালয়ে তাঁর পদচারণা আর দেখা যাবে না।
আমরা হারিয়েছি শুধু একজন শিক্ষক নয়—আমাদের নৈতিক জীবনের এক আলোর দিশারি।
তাঁর রেখে যাওয়া অনন্য শিক্ষা
তিনি বারবার শিখিয়েছেন—
মানুষের চরিত্রই তার প্রকৃত পরিচয়,।ধর্ম শুধু জ্ঞান নয়, তা চর্চা ও অমল করার বিষয়। শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটি এক আমানত। সততা, সংযম, ভদ্রতা—এসবই মানুষের মূল সম্পদ
আজও ভুল পথে হাঁটতে গেলে মনে পড়ে—
“হুজুর স্যার থাকলে কী বলতেন?”
এই একটি চিন্তা অসংখ্য মানুষকে সোজা পথে ফিরিয়ে আনে
মাগফিরাত কামনা
হে আল্লাহ,
আমাদের প্রিয় শিক্ষক মাওলানা আবুল কাশেম (রাহ.)-কে পরিপূর্ণ ক্ষমা করুন,
কবরকে নূর, রহমত ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিন,
তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় স্থান দিন।
আ-মিন।