11/10/2022
দীর্ঘ ১৩ বছরের টিউশন জীবনের ইতি টানলাম।সর্বশেষ স্টুডেন্টের এইসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাধ্যমে আমার দীর্ঘ টিউশন জীবনের ইতি ঘটলো। আজকে জীবনের শেষ টিউশনের বেতন হাতে পেলাম, আগামি মাসে চাকরিতে জয়েন করলে আর টিউশন করার ইচ্ছাটা নাই। সাল ২০০৯; এসএসসি পাশ করে ইন্টারে ভর্তি হওয়ার পর থেকে টিউশন পেশা শুরু (অবশ্য বাসায় থাকায় কখনো কখনো পড়ানো হয়নি একটানা বেশ কিছুদিন) সেই থেকে আজ অবধি চলমান ছিল।।।। যারা টিউশনি করাতে চান তাদের উদ্দেশ্যে আজ কিছু বলতে চাই- আমার টিউশন অভিজ্ঞতাটা আগে শেয়ার করি। ২০২০ এর অগাস্ট মাসে ঢাকায় আসি, করোনার মধ্যে, এসে টিউশন নিয়ে হাহাকার করি, অক্টোবর থেকে একটি টিউশন শুরু করি, তখন স্টুডেন্ট নবম শ্রেণির ছাত্র, সপ্তাহে ৪ দিন, ১.৫ ঘণ্টা, ৬ টা সাবজেক্ট পড়ানোর জন্য ২৫০০ টাকায় শুরু করি। ২০২১ এর মাঝামাঝি এসে গার্ডিয়ান বলেন ১ টা সাবজেক্ট কম পড়াতে বিনিময়ে ৫০০ টাকা কম দিবেন, তাদের একটু আর্থিক মন্দা চলতেছে। আমি ঐ এক সাবজেক্ট না কমিয়ে বলেছিলাম আন্টি সমস্যা নাই আমি ওটাও পড়াবো, দৈন্যতা আসতেই পারে, সবসময় তো আর দৈন্যতা থাকবে না, এর জন্য ঐ সাবজেক্ট বাদ দিলে স্টুডেন্টের ক্ষতি হবে। ২০২১ এর শেষের দিকে এসে মিরপুরেই একটা নামকরা কোচিংএ ঢুকলাম, যথেষ্ট ভাল সেলারি পাই সেখান থেকে, (এখনো সেখানে ক্লাস নিচ্ছি), তখন টিউশনিটা না করালেও চলতো। ২০২২ এর জানুয়ারি থেকে ব্যস্ত সূচি, কোচিংএ ক্লাস, টিউশন, নিজের জন্য পড়া, জব এক্সাম দেয়া, টিউশন মিডিয়া সবকিছু মিলিয়ে অনেক ব্যস্ত, ভেবেছিলাম টিউশন টা ছেড়ে দেই কিন্তু কিছুদিন পরেই স্টুডেন্টের এইসএসসি পরীক্ষা ভেবে ছাড়িনি। (তখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও মিডিয়ার কাজ ছেড়ে দিলাম সময়ের অভাবে) ডিসেম্বর থেকে আমাকে শুধু ৩ টা বিষয় পড়াতে হতো তাই আন্টিকে বলে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে ১ দিন কমিয়ে নিলাম। তখনো আমার সেলারি ২০০০ টাকাই আছে, পরে আর সেটা বাড়েনি, জানুয়ারি থেকে অনেক ভাল ভাল টিউশনির অফার এসেছে আমার নিজের জন্যেও কিন্তু আমি রানিং টিউশন বাদ দিয়ে বেশি টাকা সেলারির আশায় নতুন টিউশনিতে যাইনি। ইভেন আমার পাশের বিল্ডিং এ পড়ানোর অফার আসছে তবুও বাদ দিয়ে নতুন টিউশনিতে যাইনি। আমি চাইলেই পারতাম বাদ দিতে, শুধু স্টুডেন্টের ভালোর জন্য বাদ দেইনি। সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে এইসএসসি ২০২২ পরীক্ষা শুরু হবে, অগাস্ট মাসের শুরুতে আন্টি বললেন আমার অপোজিট টিচারকে উনারা বাদ দিয়েছেন, উনারা চাচ্ছেন আমি ঐ টিচারের ২ টা সাবজেক্টও একটু দেখিয়ে দেই এবং সপ্তাহে ৩ দিনের যায়গায় ৪ দিন যাই আর সময়টা একটু বাড়িয়ে দেই, উনারা আমাকে সেলারিও বাড়িয়ে দিবেন, উপায় নাই দেখে রাজি হলাম। অগাস্ট মাসের সেলারি দেয়ার সময় বাড়তি কোনো টাকা দেননি, যথারীতি ২০০০ টাকাই দিয়েছেন, বললেন সামনের মাসে একবারে দিবেন। অগাস্ট মাসের শেষ ২ সপ্তাহ ৫ দিন এবং সেপ্টেম্বর মাসে সপ্তাহে ৭ দিনই পড়াইছি পরীক্ষার জন্য, এমনকি নিজের পরীক্ষার মধ্যেও, পরীক্ষা দিয়ে বাসায় না এসে ডিরেক্ট টিউশনিতে যেতাম, শেষ করে বাসায় আসতাম। আজকে যখন সেলারি দিলেন তখন আমাকে ৫০০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং বললেন আমি মন খারাপ করলাম কি না, সত্যি আমি মন খারাপ করিনি তবে একটু কষ্ট পাইছি। যদি আমাকে ২০০০ টাকাই দিতেন তাহলে আমার কষ্ট লাগতো না, কিন্তু অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দেয়ায় কেনো যানি একটু কষ্ট অনুভব হচ্ছে। ইচ্ছা করছিল অতিরিক্ত ৫০০ টাকা না নিয়ে ফেরত দেই, কিন্তু এতে তারা কষ্ট পাবেন ভেবে ফেরত দেইনি। টিউশনি এবং টাকার ইতিহাস লেখার উদ্দেশ্য নিজেকে মহান দেখানো নয়, এটা লিখলাম কারণ অনেকেই যারা আমাদের মিডিয়াকে নিয়ে বলেন এতো কম টাকায় কেউ পড়ায়??? আজকাল গ্রামেও এর চেয়ে বেশি সেলারি দেয়। তাদের জন্য এটা লিখা, হ্যাঁ কেউ পড়ায় না তবে আমরা পড়াই, মিডিয়ার কাজ শুরু করার আগে নিজের জন্য টিউশনি খুঁজতে অন্য মিডিয়ার কাছে হাজারো বার সিভি দিয়েছি কখনো টিউশনি পাইনি এমনকি রিপ্লাইও পাইনি, আমিতো আপনাদের সবার রিপ্লাই দেয়ার চেষ্টা করি, হাজার হাজার কপি লিফলেট লাগাইছি দেয়ালে দেয়ালে, টিউশনির জন্য আমাদের উপর ভরসা না করে নিজেও দেয়ালে লিফলেট লাগান, চেষ্টা করেন, তখন বুঝবেন একটা টিউশন ম্যানেজ করা কতোটা কষ্টের কাজ। বগুড়া থেকে ঢাকায় আসার পর প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় একটা অলিখিত রুটিন হয়ে গিয়েছিল দেয়ালে লিফলেট লাগানো, সেই তুলনায় আপনারা কিছুই করেননি টিউশনির জন্য। সবাইকে এটাই বলবো- ১. অল্প টাকা হলেও শুরু করেন তারপর দেখবেন আল্লাহ্ ভাল পথ দেখাচ্ছেন, তখন বলতে পারবেন রানিং পড়াচ্ছেন এবং অভিজ্ঞ আপনি, ২. ভাই/বোন প্লিজ টিউশনিকে পেশা হিসেবে নিয়ে নিজের পড়াশুনার ক্ষতি করবেন না, ৩. যে টিউশন পড়াবেন সেটা শুধু টাকার জন্য পড়াবেন না, পুণ্য অর্জন করছেন এটা ভাববেন, শিক্ষা দেয়ার চেয়ে বেশি পুণ্যের কাজ খুব কমই আছে, মনে রাখবেন আপনার কষ্টের তুলনায় টাকা কিছুই না, ৪. যেটা পডাচ্ছেন সেটা নিজের জন্যেও পড়বেন, দেখবেন জবের জন্য এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছেন, ৫. টিউশন শুরু করার পর ভাল অফার পেলে ছেড়ে দিবেন না, এতে স্টুডেন্টের ক্ষতি হয়, নতুন টিচারের কাছে পড়া মানেই হলো আবারও নতুন করে সব পড়া লাগবে, তাছাড়াও মেন্টালিটি ম্যাচিং এরও একটা বিষয় আছে। সবার জন্য শুভকামনা রইলো। আসসালামুয়ালাইকুম.......কপি