19/05/2023
বইঃ পদ্মা নদীর মাঝি
লেখকঃ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বাহুল্যবর্জিত। সমকালীন অন্যান্য লেখকের মতো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে কোনো চরিত্রের বর্ণনা দিতেন না। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও অনুভূতি গুলোতে তার এক প্রকার নির্বিকারত্ব লক্ষণীয়।
জনৈক অধ্যাপক বলেছিলেন, 'পদ্মা নদীর মাঝি' শরৎচন্দ্রের হাতে পড়লে চার খন্ডের শ্রীকান্ত হয়ে যেত !'
তাঁর এই পরিমিতিবোধের মূল কারণ ছিল তিনি নিছক লেখার উদ্দেশ্যে লিখতেন না, একটি আদর্শকে সামনে
রেখে লিখতেন।
ব্যক্তি জীবনে মানিক ছিলেন মার্ক্সবাদী আদর্শের অনুসারী, সেইসঙ্গে তাঁর মনন ছিল ফ্রয়েডীয় চেতনায় লালিত।
তাই তাঁর উপন্যাসের সার্থকতা নিরূপণ তাঁর চিন্তা-আদর্শের ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ। এক্ষেত্রে, লেখকের আদর্শের সঙ্গে সহমত হওয়াটা জরুরী নয়।
সেই বিচারে দেখা যায় বিভূতি, শরৎচন্দ্রের মতো মানিকও নিম্নবর্গ, নিম্নশ্রেণীর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ, দুর্দশা চিরায়ত অভাব, অসহায়ত্ব দেখিয়েছেন। তাদের উপন্যাসের দুর্বল দিক হলো তারা এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় দেখান নি।
তবে পদ্মানদীর মাঝি তে মানিক ময়নাদ্বীপের মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একটা উপায় বা স্বপ্ন দেখিয়েছেন বলা যায়।
উপন্যাসে ময়না দ্বীপকে ঘিরে হোসেন মিয়ার স্বপ্ন-
সেখানে সে এমন একটা জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে দলমত ও ধর্মমত নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ এমন একটা সমাজ গড়ে তুলবে, মনুষ্যত্ব ও মানবতাই হবে যার প্রধান ভিত্তি।
তাই বলা যায়, ময়নাদ্বীপ লেখকের স্বপ্নের কম্যুনিস্ট রাষ্ট্রের প্রতীকী রূপ।
সাহিত্যমানে লেখকের বাহুল্যবর্জন আমাকে আইসবার্গ তত্ত্ব এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
এখানে কুবের যেন দ্য "ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী" - এর সেই বৃদ্ধ মাঝির মতো যে শত প্রতিকূলতার মাঝেও নতুন দিনের স্বপ্ন দেখে।
সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ক্ষোভ লুকানোর চেষ্টা করেননি মানিক-‘ ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে । এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না ।
তাঁর লেখায় প্রাধান্য পেয়েছে, মানবপ্রেম।
নীতি নৈতিকতার বিচারে সে কুবেরকে ধনঞ্জয় খুড়ো, শেতলবাবুদের মতো মানুষকে ঘৃণা করতে দেখিয়েছেন। আবার কুবের-কপিলার অবৈধ সম্পর্ক, হোসেন মিয়ার শঠতা, চক্রান্তকে সমর্থন করেছেন।
তিনি মনে করতেন ন্যায়, অন্যায় আপেক্ষিক। মানবতাই আসল ধর্ম।
সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, পদ্মা নদীর মাঝি একটি নিরীক্ষাধর্মী সামাজিক উপন্যাস- যেখানে সমাজ, পরিবার প্রথা এবং পাত্র-পাত্রীদের মনঃস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সমানভাবে উল্লেখ্য। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে বাংলা উপন্যাস নিয়ে এমন দুঃসাহসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার।
'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের আঙ্গিক গঠন, রচনাশৈলী, পাত্র-পাত্রীদের মুখে আরোপিত ভাষা, জীবনাচরণ, জীবনচর্চা এ সবই একটি সার্থক আঞ্চলিক উপন্যাসের পরিচয় বহন করে।
উপন্যাসটির সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ হলো- সম্পূর্ণরূপে নিম্নশ্রেণী অধ্যুষিত গ্রাম্য জীবনের চিত্রাঙ্কনে সূক্ষ্মতা। সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে সনাতন মানব-প্রবৃত্তিগুলির ক্ষুদ্র সংঘাত ও মৃদু উচ্ছ্বাসের যথাযথ সীমা নির্দেশ।
কাহিনী সংক্ষেপঃ
'পদ্মা নদীর মাঝি' একটি আঞ্চলিক উপন্যাস।
জেলে অধ্যুষিত গ্রামের জীবনযাত্রাই পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসটির মূল উপজীব্য।
এ উপন্যাসের পটভূমি বাংলাদেশের বিক্রমপুর, ফরিদপুর অঞ্চল। উপন্যাসে বিক্রমপুর-ফরিদপুর অঞ্চলের পদ্মার তীর সংলগ্ন কেতুপুর ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের পদ্মার মাঝি ও জেলেদের দীন-দরিদ্র জেলে ও মাঝিদের জীবনচিত্র এতে অঙ্কিত হয়েছে। এর কোথাও আধুনিকতা বা সভ্যতার ছোঁয়া নেই। অদৃষ্ট এবং প্রকৃতিও এদের বিরুদ্ধে। এদের স্বরূপ বিশ্লেষণে লেখক বলেছেন,
"এই ধীবর পল্লীর জীবনযাত্রায় শিক্ষিত আভিজাত্যের মার্জিত রুচি ও উচ্চ আদর্শবাদের ছায়াপাত নাই।"
"ঈশ্বর থাকেন ঐ গ্রামে, ভদ্র পল্লীতে- এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া দুস্কর।"
এখানে এইসব এলাকার নিম্নশ্রেণীর অধিবাসীদের মধ্যকার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, অভাব-অভিযোগ, রাগ, হিংসা, স্নেহ-মায়া, চতুরতা, অসহায়ত্ব প্রত্যেকটি দিক খুব স্পষ্টভাবে চিত্রিত।
উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং নায়ক কুবের। পদ্মা নদীর সে এক পাকা মাঝি। মাছ ধরে, প্রধানত ইলিশ মাছ ধরে সে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করে। নিজের নৌকা, জাল নেই কুবেরের। ধনঞ্জয় খুড়ার নৌকায় সে আর গণেশ কাজ করে।
নিম্নবিত্ত সহজ সরল হওয়ায় তাকে সবাই ঠকায়। তার অসহায়ত্বের উপর রাগ হয় তবু নিরব থাকে সে। কেননা,
"গরীবের মধ্যে সে গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও বেশি ছোটলোক"
সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। স্ত্রী মালা, চিরপঙ্গু। পদ্মার ঢেউয়ের মতো চঞ্চল কুবের আর স্ত্রী মালার মধ্যে ছিলো আশ্চর্যরকমের স্থবিরতা।
তা নিয়ে যদিও তেমন কোনো অভিযোগ তার ছিল না। কিন্তু মালার বোন কপিলার চতুরতা, চাঞ্চল্য, বুদ্ধি বিবেচনা তাকে আকর্ষিত করে। অন্যদিকে কুবেরের হৃদয়ে আদিম আবেদন সৃষ্টিকারী কপিলা সচেতনভাবেই কুবেরের অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিতে থাকে।
তাদের এ আচরণের মধ্যে কিছুটা আদিম ও অসংস্কৃত মনের পরিচয় লক্ষণীয়, যা সমাজের চোখে অনেকটাই নিন্দনীয়। তবে কপিলার স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়া, বাপের বাড়ি ফিরে আসা, স্বামীর ২য় বিবাহ, মালার পঙ্গুত্বের কারণে কুবের ও সন্তান-সন্ততির প্রতি তার কর্তব্য করতে না পারা প্রভৃতি এর ইন্ধন যোগায়।
সন্তান-সন্ততি, পরিবার, সমাজের জন্য যদিওবা তারা পরস্পরকে অস্বীকার করে নিজ নিজ সংসারের প্রতি দায়িত্ববান হয়।
কিন্তু উপন্যাসের এক পর্যায়ে, কুবের মিথ্যে ঘটি ও টাকা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত হয় এবং হোসেন মিয়ার কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। বিত্তবান হোসেন মিয়া কুবেরের মতো হতদরিদ্র লোকদের বিভিন্ন কৌশলে তার জনমানবহীন ময়নাদ্বীপে এক নতুন সমাজ গঠনের জন্য নিয়ে যায়। তার চক্রান্তে কুবের একসময় ময়নাদ্বীপে যেতে রাজি হয়।
পুরো উপন্যাসে কপিলা কুবেরের সংশয় নিমেষেই ঘুচে যায়। কপিলা তার সাথে যেতে চায়!
"আমারে নিবা মাঝি লগে?"
কুবের কপিলাকে ময়নাদ্বীপে নিতে সম্মত হলে তারা রওয়ানা দেয় ময়নাদ্বীপের উদ্দেশ্যে ফেলে রেখে তাদের সমস্ত অতীত।
+++----+++----+++----+++----+++----+++---+++---+++
উপন্যাস সম্পর্কিত কিছু সংগৃহীত তথ্যঃ
'পদ্মা নদীর মাঝি' উপন্যাসটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বাধিক পঠিত,আলোচিত এবং একাধিক বিদেশি ভাষায় অনূদিত একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। ১৯৩৬ সালে গ্রন্থাকারে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর ভারতীয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনূদিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে এই উপন্যাসটি।
১৯৪৮ সালে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ইংরেজিতে অনুবাদ করেন (Boatman of the Padma)।
১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে যথাক্রমে সুইডিশ ও চেক ভাষায় উপন্যাসটির অনুবাদ প্রকাশিত হয়। তাছাড়া হাঙ্গেরীয়, জার্মান ও ডাচ ভাষায়ও উপন্যাসটির অনুবাদ হয়।
বাংলাদেশে দুবার পদ্মানদীর মাঝির ওপর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। ঢাকায় নতুন প্রতিষ্ঠিত এফডিসি প্রাথমিক পর্যায়ে উর্দু ভাষায় নির্মিতব্য যে ছবি করার অনুমতি দেয়—সেটি এই উপন্যাসকে অবলম্বন করে নির্মিত হয়। ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রটির নাম ছিল
'জাগো হুয়া সাভেরা (The Day Shall Dawn)'- এর পরিচালক ছিলেন এ জে কারদার। কিন্তু এখানে লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহৃত হয়নি। এর বদলে কাহিনীকার (চিত্রনাট্যকার) হিসেবে উর্দু ভাষার বিশিষ্ট কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের নাম উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীকালে গৌতম ঘোষ ১৯৯২ সালে এই উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন।
Fatema Sharmin Rikta
#চিরায়ত_সাহিত্য_চিরন্তন
#পদ্মা_নদীর_মাঝি