09/07/2026
প্রাচীন ভারতের ধর্ম সম্পর্কে এই বইটা মোটামুটি ধারণা দেয়। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও শিখ। এই চার ধর্মের কমন কিছু বিষয় আছে।
প্রধানত এই ধর্মগুলো দুনিয়াবিমুখ। পার্থিব সকল সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে পারাই এখানে সফলতা। এমনকি জৈন ধর্মে মানুষকে পোশাকের শৃঙ্খল থেকেও মুক্তির কথা বলা হয়। হিন্দু ধর্মেও পোশাকের বেড়াজাল থেকে মুক্তির ব্যাপার ঢুকে গেছে। তাই ভারতের অনেক জায়গায় পুরোপুরি উলঙ্গ অবস্থায় ধর্মীয় নানা আয়োজন হয়।
এই প্রবণতার কারণে এখনও হিন্দুস্তানী ধর্মগুলোতে কেউ ধর্মীয়ভাবে এগিয়ে গেলে সে স্বাভাবিকভাবেই সংসার, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও পার্থিব স্বচ্ছলতা থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরতে থাকে। এক ধরণের ভেতরগুটানো একাকী জীবনের দিকে তারা ধাবিত হয়।
এমনকি এই অঞ্চলে মুসলমানদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অথচ ইসলাম তার সূচনাকাল থেকেই সমৃদ্ধ জীবন যাপনের বিরোধী না। ইসলামের প্রাণপুরুষ মহানবী সা. এর একান্ত ঘনিষ্ট সাহাবীদের মধ্যেই তৎকালীন আরবের ধনী মানুষরা ছিলেন। তবে ধন তাদের জীবনধারাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। সম্পদকে তারা কল্যাণের কাজে ব্যবহার করেছেন। সম্পদের দ্বারা ব্যবহৃত হননি। মানুষ সম্পদশালী হয়েও সম্পদের মোহ থেকে মুক্ত থাকতে পারে— এই ধারণা সর্বপ্রথম ইসলাম দিয়েছে। শুধু ধারণা দেয়নি, একেবারে বাস্তব উদাহরণ পেশ করে গেছে। যার কারণে দেখা যায়— জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর দুইজনই ছিলেন তৎকালীন আরবের ধনী ব্যবসায়ী। এই উদাহরণ পৃথিবীর অন্য কোনো ধর্মে কল্পনা করা অসম্ভব।
গৌতম বুদ্ধ ছিলেন রাজ পরিবারের সন্তান। কিন্তু তাকে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য রাজপ্রাসাদ ছাড়তে হয়েছে। ভিক্ষু হওয়ার পর তার বাবা যখন তাকে খুঁজে পান তখন তাকে শত অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি আবার সেই যাযাবর জীবনেই ফিরে যান। তিনি সম্পদ ও আধ্যাত্মিকতার মাঝে সমন্বয় করতে পারেননি। এই ধারণা ভারতীয় উপমহাদেশে এখনও রয়ে গেছে।
যার কারণে মসজিদের ইমামের জন্য ব্যবসা করা দূষণীয়।
ঠিক এই ব্যাপারটা আমরা রাজনীতিতেও দেখি। ধর্ম এবং রাজনীতিকে মানুষ একত্র করতে পারে না। ক্ষমতাকে ধর্মীয় মানুষজন ভালো চোখেই দেখে না। একটা নেতিবাচক দৃষ্টি সবসময় ক্ষমতার দিকে দিয়ে রাখে। রাজনীতিবিদরাও নিজেদেরকে দুনিয়াদার মনে করে। তারা নিজেদেরকে ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে মানবতার সেবক বা বড় পূণ্যকর্মে নিয়োজিত কিছু মনে করতে পারে না।
এমনকি মুসলিমরাও অবচেতনে এই ধারণার দ্বারা প্রাভাবিত। ট্রাডিশনাল ধারাগুলোতে যদি খেয়াল করেন দেখবেন, ঘরোয়া ধর্মীয় আসরগুলোতে যেসব মোটিভেশনাল আলাপ হয় সেখানে রাজনীতির মাধ্যমে পূন্য অর্জনের কোনো আকাঙ্খা থাকে না। ভেতরগুটানো, সামাজিক দায়ভারহীন একটা একান্ত জীবনের ছক সেখানে আঁকা হয়। এটাই কাঙ্খিত ও অর্জনীয় মনে করা হয়। যারাও রাজনীতিকে মেনে নেয় তারাও ধর্মীয়ভাবে একটা সেফ জোনে থেকে রাজনীতি করতে চায়। এবং রাজনীতিকে দুনিয়াবি কাজ হিসেবেই দেখে। রাজনীতিবিদদেরকে পণ্ডিত আলেমরা বড় বড় উপদেশবাণী শোনাতে ইতস্তত করেন না। যেনবা তারা দুনিয়াদারিতে লিপ্ত, তাদেরকে সঠিক পথে চলার উপদেশ দেয়া হচ্ছে। নিজের মধ্যে রাজনীতি নামক নেককাজে যুক্ত হতে না পারার আক্ষেপ তাদের মাঝে দেখা যায় না।
এর বিপরিতে যারা আলেম হয়েও রাজনীতি করেন তাদের ক্ষেত্রে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। তারা দ্বীনি পড়া পড়ানোর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতে না পারার কারণে আক্ষেপে ভোগেন। অন্যন্য আলেমদের কাছে গেলে নিজেদেরকে উপদেশের মুহতাজ মনে করেন। তাদেরকে উপদেশ গ্রহণের উপযুক্ত মনে করতে পারেন না। যেন পড়া পড়ানোই দ্বীনি কাজ, ইলম অর্জন করে রাজনীতি করা বা সামাজিক কোনো কাজে –যা দ্বীনকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত— নিয়োজিত থাকাটা দ্বীনি কাজ না।
একটা ক্লাসরুমে বসে কয়েকজন ছাত্রের সামনে অর্থনীতির কোনো হাদিস পড়ানো আর সেমিনারে দাঁড়িয়ে ব্যাংকারদেরকে ইসলামি অর্থনীতি বুঝানোর মাঝে আসলে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো তফাৎ নেই। কিন্তু এই সামাজে দুইটার মধ্যে তফাৎ আছে। যিনি ব্যাংকারদেরকে ইসলামী অর্থনীতি বুঝানোর জন্য কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করছেন তার চেয়ে যিনি মাদরাসায় বসে পনেরজন ছাত্রের সামনে নুরুল আনওয়ার পড়াচ্ছেন, তিনি বেশি দ্বীনি কাজে লিপ্ত। প্রথম জনের ইলমি দক্ষতার স্বীকৃতির জন্য কোনো মাদরাসায় দরসের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। কিন্তু দ্বিতীয়জনের ইলমি মাহারাতের জন্য বাড়তি কোনো কিছু জরুরি না। এমনকি সারাদিন নির্দিষ্ট একটি কিতাব পড়ানো ছাড়া অন্য কোনো মুতালা না করলেও তাকে আলেম হিসাবে মেনে নেয়া মানুষের জন্য সহজ।
যিনি দরসে বসে মদিনা রাষ্ট্রের কোনো ঘটনা শুনাচ্ছেন, আর যিনি কোনো সমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাধারণ জনতাকে ইসলাম অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার বক্তৃতা দিচ্ছেন; এদের দুইজনের মাঝে সমাজের চোখে বিস্তর ফারাক। প্রথম জনের আলেম স্বীকৃতির জন্য আর কিছুর প্রয়োজন নাই, কিন্তু দ্বিতীয়জনের আলেম স্বীকৃতির জন্য কোনো দরসগাহে হাজিরা দেয়া জরুরি।
এই কারণেই শুধু মসজিদ ও মাদরাসা ছাড়া অন্য কোনো দ্বীনি কাজকে ফুলটাইম পেশা হিসেবে গ্রহণ করা আলেমদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তিনি যা-ই করুন তাকে কোনো না কোনো দরসের সাথে যুক্ত থাকতে হবে। চাই সেখানে পাঁচজন ছাত্র থাকুক, যারা বাবা মার মানত পুরা করার জন্য কিতাব খুলে বসে আছে। আর যারা নানা সেক্টরে দ্বীনের আলো পাওয়ার আশায় হাহাকার করছে, সেখানে ফুলটাইম কাজে যুক্ত থেকে সেই সেক্টরে দ্বীনি মাহাওল গড়ে তোলাকে দুনিয়াবি কাজ অথবা আলেমের শানের খেলাফ বলেই বিবেচিত হচ্ছে।
এই অবস্থার পেছনে উপমহাদেশীয় ধর্মগুলোর বৈরাগ্যবাদের প্রভাব অনেক বেশি, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। হাজার হাজার বছর ধরে এদেশের মানুষের ডিএনএ যে বৈরাগ্যবাদী ধর্মীয় বিশ্বাস ধারণ করে আসছে তার প্রভাব থেকে মুসলমানরা মুক্ত হতে পারেনি।
এই মুক্ত না হতে পারার কারণ হলো, সাধারণ মানুষ জীবনের কখনই একটু সময় নিয়ে ইসলামের ইলমি তুরাস ধারণ করার সুযোগ পায় না। তারা ভাসাভাসা কিছু তথ্য ও কুরআনের যৎসামান্য তিলাওয়াত শিক্ষা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কুরআনের চিন্তাবিপ্লবের হাওয়া তাদের গায়ে লাগার সুযোগ নাই, জীবনবোধের গভীর বোঝাপড়ায় কুরআন ও হাদিসের সঠিক জ্ঞান তাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ফলে বাপ দাদা ও সমাজ-সংস্কৃতি থেকে প্রাপ্ত জিনগত বৈশিষ্ট্যই তাদের ধর্মীয় মূল্যাবোধ নির্ধারণ করে।
আর মসজিদ, মাদরাসাসহ সর্বত্রই আলেমরা এই সাধারণ মানুষে চাহিদার আলোকে জ্ঞান সরবরাহ করেন। যেমন- সাধারণ মানুষের মনের চাহিদা মেটানোর মত করে বয়ান করা, মানুষ যেসব বিষয় বেশি শুনতে চায় সেই ধরণের কিচ্ছা কাহিনী ও টপিক নিয়েই আলোচনা করা ইত্যাদি। সাধারণ মানুষের চিন্তার জগতকে পুনঃবিন্যাস করার জন্য আলোচনা, পাঠদান ও ঘরোয়া আলাপ খুব কম হয়।
বিষয়গুলো নিয়ে আলেমদের সিরিয়াসলি ভাবা দরকার।
বইয়ের রিভিউ লিখতে গিয়ে কথা অন্যদিকে ঘুরে গেলো।