্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৯
ক্লিনিকের করিডোরে হাঁটছি। সকালটা এমন হবে কে জানতো! পাউরুটি আনতে বাসা থেকে বের হতেই মুজরা স্যারের সাথে দেখা। হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে জগিং এ বের হয়েছেন। সারা গায়ে ধুলোবালি। আমি দেখেই বললাম-
: স্যার, কেউ মেরেছে নাকি?
- আরে না না, ওই ইয়ে আরকি... বাচ্চাদের সাথে মাঠে ফুটবল খেলে এলাম।
: ফুটবল খেললেন আর সারা গায়ে ধুলো? দেখে তো মনে হচ্ছে মাঠে গড়াগড়ি করেছেন!
- একটা ছোট্ট ট্রেনিং সেশন নিয়ে এলাম। হাও টু প্রটেক্ট গোলবার। ইউ সি, গোলবার একটা ইম্পরটেন্ট জিনিস। একবার গোল ঢুকে গেলে তোমাকে আগের জায়গায় ফিরে যেতে বিপক্ষের গোলবারে ঢুকে যেতে হবে। নইলে তুমি পিছিয়েই থাকবে।
: স্যার এটাতো খুবই সহজ ব্যপার।
- বাচ্চাগুলোও ধরে ফেলেছে ব্যপারটা। এইটাই সাকসেস। বাচ্চাগুলো খুব ট্যালেন্ট, অসাধারণ ট্যালেন্ট।
: কি যে বলেন স্যার, বাচ্চারা আবার ট্যালেন্ট হয় নাকি? ওরা তো শিশু। যা বোঝাবেন তাই বুঝবে। বড় হলেই না ট্যালেন্ট বের হয়ে আসবে।
- তোমার কি তাই মনে হয়?
মুজরা স্যার জগিং থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি টের পেলাম এতক্ষন আমিও তার সাথে দৌড়াচ্ছিলাম। উনি আবার বললেন-
- ইয়াং ম্যান, বলোতো ট্যালেন্ট একুইজিশন কি? এবার তার কন্ঠস্বর কড়া।
আমি বরাবরের মত রিল্যাক্সড মুডে বললাম-
: স্যার এটা এইচ আর ডিপার্টমেন্টের খুব সহজ একটা কাজ। আরো সহজ করে বললে, যেই প্রসেসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের দরকারের সাথে মিলে এমন স্কিলফুল ট্যালেন্টদের হায়ার করে পরে আবার এদেরকেই কাজ ঠিকমত করে না বলে ব্লেইম দিয়ে একিউজ করা হয়, তাকে ট্যালেন্ট একুইজিশন বলে।
- হোয়াট? আর ইয়ু সিরিয়াস? এই শিখেছো এতদিন? ট্যালেন্ট একুইজিশন মানে ট্যালেন্ট কে একিউজ করা?
: স্যার অনেক সময় এবিউজও করা হয়। আমাদের কালচারে আছে স্যার। ইমপ্লয়ী মানেই তো ফাঁকিবাজ! আর বসেরা সবাই দেবতা!
এরপর আর কিছু বলার সুযোগ হয়নি। মুজরা স্যারের বুকে ব্যাথা শুরু হওয়ায় আমি উনাকে পাশের একটা ক্লিনিকে নিয়ে এসেছি। ডাক্তাররা চেক করছেন আর আমি রুমের বাইরে হাঁটছি। ঘুরে তাকাতেই দেখি ঝুনঝুনি ছলছলে চোখে আমার সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-
: আপনি কি বলেছেন বাবা কে?
- আমি? কিছুই না।
: তাহলে বুকে ব্যাথা শুরু হয়েছে কেন?
- এই বয়সে জগিং এর সময় সকাল সকাল বারান্দায় কাওকে গোসল করা চুল ঝাড়তে দেখলে ব্যাথা হওয়াটা...
: সাট আপ!
- আচ্ছা, ঠিক আছে...
: আর কোনো ক্লিনিক ছিলো না? মেটারনিটি ক্লিনিকে এনেছেন কেন?
- ইয়ে মানে চেস্ট পেইন আর লেবার পেইন তো কাছাকাছি জায়গায় হয় তাই নিয়ে এসেছি...
: প্লিজ আপনি এখান থেকে বিদেয় হন, এক্ষনি! আই রিয়েলি হেইট ইয়ু। গেট আউট! নাও!
আমি উত্তরা হাসিখুশি ক্লিনিক থেকে বের হয়ে এলাম। ঝুনঝুনি আমার পেছন পেছন রাস্তা পর্যন্ত এসেছে। মেয়েটা আমাকে আসলেই হেইট করে! আচ্ছা আমি কেন যেনো বাসা থেকে বের হয়েছিলাম?
ে_লয়_ব
Muzra Sir The HR Expert
Mr. Muzra Unoshottor
Ex-B.logist, Ex-MPO, Negotiator,
Admin Expert, Manobetor HR Consultant
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৮
মুজরা স্যারের সাথে দারুণ একটা মিটিং শেষ হলো। বিনাবাক্য ব্যয় করে তার সাথে নতুন প্রজেক্টে কাজ করতে রাজি হয়েছি। স্যার সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, ইয়াং ম্যান এই প্রথম তোমার সাথে আলাপ করে আমার প্রেসার বাড়েনি, গুড! এইবার বিদায় হও।
আমি তার ঘর থেকে বের হয়েই দেখি ঝুনঝুনি দাঁড়িয়ে আছে। ছুটির দিনে বাসার ভেতর রুপালি পাড়ে সাদা মেঘের ভেতর দিয়ে আকাশি রঙের উঁকি দেয়া শাড়ি আর কাঁধ কাটা ব্লাউজ। আঁচলের টারসেলগুলো ফ্লোরের টাইলসকে কারেন্ট চার্জ করছে। সেই কারেন্টে আমার পায়ে এসে লাগছে! আমাকে দেখেই কোমরে হাত তুলে বললো-
: কি ব্যপার বলেন তো, আজকে বাবা আপনার উপর একটুও রাগ হলো না?
- রাগ হবেন কেন? আমি তো আপনার... ইয়ে মানে নতুন কন্সালটেন্সি প্রজেক্ট এ একসাথে কাজ করতে রাজি হয়েছি।
: এতো সহজেই রাজি হলেন? বাবার এইচ আর থটসের সাথে আপনার থটস্ তো কখনোই মিলে না!
- আরে ধুর, ওসব বাদ দিন। শুনেছি এই প্রজেক্টে আপনি আর আমি একসাথে কাজ করবো? দারুন কাজ হবে আই বিলিভ!
: হ্যা, একটা কোম্পানির এইচ আর পলিসি রেডি করতে হবে। সাথে ওডি আর কালচার ডেভেলপমেন্ট নিয়েও কাজ আছে।
- দারুন। আচ্ছা, পলিসিতে একই প্রতিষ্ঠানের কলিগদের মধ্যে প্রেম ঘটিত কোনো নিষেধাজ্ঞা যেনো না থাকে বুঝলেন, কারন প্রেমে কাজে মোটিভেশান বাড়ে, ওনারশিপ তৈরি হয় আর একটা দুর্দান্ত রোমান্টিক কালচার তৈরি হয়।
: হোয়াট?
- হ্যা, এই ধরুন আমি আর আপনি। একসাথে কাজ করবো। এখন আপনার আর আমার... মানে আমাদের যে কালচার মানে যে পলিসি নিয়ে আমরা.... আন্তরিকতা... বন্ধুত্ব... তৃণমূল... পর্যায়ে একটা বন্ডিং থাকা ভালো না?
: বাবা কি আপনাকে এপয়েন্ট করে দিয়েছেন?
- হ্যা, হ্যা, পেমেন্ট নিয়েও আমার কোনো সমস্যা নেই।
: আপনি কিন্তু আমার আন্ডারে কাজ করবেন। খুব সাবধান।
- আন্ডারেই তো! অবশ্যই আপনার আন্ডারে কাজ করবো, আই সয়ার! আই লাভটু.... মানে আমি উইল প্রিপেয়ার এ প্রেমময় লাভলি এইচ আর পলিসি। বুড়োদের কথা আর কত শুনবো? এদের এক্সপায়ারি ডেট চলে এসেছে। আই উইল ডু হোয়াটেভার ইয়ু সে ঝুনঝুনি!
ভেতর থেকে মুজরা স্যারের চিৎকার শোনা গেল,
- এই এই এই বেয়াদপ, কে বুড়া হ্যা? কে বুড়া? প্রেমময় এইচ আর পলিসি? ফাজলামো আমার সাথে? মা, তুই একে বের করে দে, এক্ষন বের করে দে! কাজ বাদ দিয়ে এম্পলয়ী প্রেম করবে? স্টুপিড ক্লাউন.....
আমি দৌড়ে বের হয়ে এলাম। নিচে নামতে নামতে ঝুনঝুনির এস এম এস-
"উফ, আপনি একটা অসহ্য! ইয়ু আর ফায়ার্ড"
প্লিজ একটা এম্বুলেন্স কল করবেন?
প্লিজ.....
এমন প্লিজের জন্য আমি এম্বুলেন্স কেন প্রেমবুলেন্স ও ডেকে আনতে পারি!
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৭
সুপারশপে একটা খালি ঝুড়ি হাতে বিস্কিটের শেল্ফের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আম্মা কি জানি আনতে বলেছেন তা আসতে আসতেই ভুলে গেছি। শুধু মনে আছে আম্মা বলেছেন, "বিস্কিটের শেল্ফের আশেপাশেই পাবা"। হঠাৎই পেছনে আওয়াজ শুনলাম-
: ইয়াং ম্যান, টোস্ট বিস্কুট কিনতে এসেছো?
মুজরা স্যারের কন্ঠ শুনে পেছনে ঘুরতেই উনার ডান কাঁধের উপর চোখ গেলো। সে কাঁধের পেছনে কালো চুল, পরিচিত কপাল, মোহনীয় চোখ আর লম্বাটে নাকের আধাটা দেখা যাচ্ছে। আরো দেখা যাচ্ছে তার ডান কানে বেতের দুল৷ নিচে একটা কমলা রঙের মুক্তো। কোনো বাতাসের জ্বীন দুলটাকে হালকা দুলাচ্ছে। তার চোখের দুই পাশের চিকন ভাজ দেখে বোঝা যাচ্ছে তার মুখে হাসি। ফান্টা কালারের জামার রঙে পুরো ফ্লোর আলোকিত। আমার প্রিয় ঝুনঝুনি!
মেয়ের দিকে আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুজরা স্যার আবার বললেন,
: কি কিনতে এসেছো?
- ইয়ে স্যার আমি মুরগির জামা কিনতে এসেছি।
: মানে? চিকেন স্কিন?
: না মানে স্যার আমি আসলে যেটা কিনতে এসেছি সেটার নাম মনে পড়ছে না। শুধু এটা মনে জানি যে দেখতে অনেকটা মুরগির জামার মত। মানে মাথায় আছে কি চাই কিন্তু মুখে বলতে পারছি না।
: এই হলো তোমাদের এইচ আর প্রাকটিস! রিকোয়ারমেন্ট মনে মনে জানো কিন্তু কাগজে কলমে জানো না। এই কারনেই তোমাদের সিলেকশন ঠিক হয় না। আবার তার কাছ থেকে সব কাজ এক্সপেক্ট করো!
ঝুনঝুনি এবার আরো ডানে সরে এসেছে। এবার তাকে পুরো দেখা যাচ্ছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে বললাম-
- স্যার, দেখে পছন্দ হওয়াটাও একটা ব্যাপার। রিকোয়ারমেন্ট তো ব্যাকডেটেড ব্যাপার। সামনা-সামনি ইয়ে মানে ইন্টারভিউ বোর্ডে যদি দেখে শুনে কাউকে পছন্দ হয় তখন কিছু রিকোয়ারমেন্ট ইগনোর তো করাই যায়!
: এই জন্যই তোমাদের এই অবস্থা। রিক্রুটমেন্ট- সিলেকশনে তোমাদের কোনো ফোকাস নেই, কোনো এইম নেই। এইচ আর টাকে তোমরা এইচ ফর হিমেশ আর ফর রেশামিয়া বানিয়ে ফেলেছো। যত্তসব।
- স্যার, এইম তো ঠিকই আছে। ইন্টারভিউর জন্য ট্যালেন্টপুলের সাথে সুন্দর দেখে মেয়েদের কল দিতে বলি যাতে মাঝে মাঝে এন্টারটেইনমেন্ট হয় আর প্রশ্ন করতে করতে ব্রেইনে চাপ পড়ে বলে প্রচুর খাওয়াদাওয়া থাকে। ফোকাস হচ্ছে সামনের গিনিপিগকের দিকে, এইম হচ্ছে সে কম জানে আর আমরা বোর্ড মেম্বাররা বেশি জানি এইটা প্রমান করা, ব্যাস। আপনার সময়ের ওল্ড স্কিন এইচ আর গিরি.....
: এই বেয়াদপ, এই.... এই... ফাজিল.... তোমার চামড়া... এই..
এম্বুলেন্স আসতে দেরী হওয়ায় সুপারশপের এক টনের শবজীর কাভার্ড ভ্যানের পেছনে শুইয়ে মুজরা স্যারকে হাস্পাতালে নিয়ে যাচ্ছি। তার পুরোনো বুকের ব্যাথাটা আবার উঠেছে। তিনি ঝুনঝুনির কোলে মাথা রেখে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। ঝুনঝুনি আমার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। আমি এক থোকা বরবটি কোলে নিয়ে বসে আছি। মনে পড়লো, আম্মা আমাকে বরবটি আর পাস্তা নিতে বলেছিলেন.....
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৬
মুজরা স্যার গত তিন দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি। প্রথম দিন মেজাজ ছিলো প্রচন্ড চড়া। ডাক্তাররা ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে রেখেছেন। ঘুম ভাঙ্গেই জিজ্ঞেস করছেন, ছেলেটা কোথায়? কোথায় ছেলেটা! এদিকে ঝুনঝুনি আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়েছে, "আসবেন না প্লিজ!"
আমি ম্যাসেজের মাঝের "না" টা খেয়াল করিনি! আজকে এসে হাজির। বারান্দায় একটা পিলারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝুনঝুনি। আমি বললাম-
: সারারাত ঘুমান নি? গালদুটো ইয়ে মানে চোখ দুটো কেমন ফুলে আছে..
: আচ্ছা? আমার বাবার সাথে আপনার কিসের সমস্যা? প্রতিবার এলেই কেন রাগিয়ে দেন শুনি?
: আসলে আমার মনে হয় স্যার আমার কিউটনেস টা নিতে পারেন না। শুধু আপনি পারেন। এইজন্যই আপনার সাথে আমার কত্তো ইয়ে মানে.. এই আরকি!
: বাবা এইচ আর নিয়ে এলোমেলো কথা সহ্য করতে পারেন না। তারপরও আপনি এমন করেন কেন?
: না না, ছি ছি! মোটেও না। আর সব থেকে বড় ব্যাপার হচ্ছে স্যার রাগ হলেই তো আপনি কাছে আসেন.. মানে সামনে আসেন... আচ্ছা, স্যার কি ঘুমিয়ে আছেন?
: না, চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছেন। ডাক্তার এখন আর ঘুমের ওষুধ দিচ্ছে না।
: আরে কি বলেন! চেষ্টা করতে হবে কেন? আমিতো চলেই এসেছি। আমার গান শুনে ঘুমিয়ে যাবেন স্যার। চাইলে আপনিও একবার ট্রাই করতে পারেন। আন্তরিক ঘুমের গ্যারান্টি দিচ্ছি........
ঝুনঝুনির অমন চাহনি উপেক্ষা করে কেবিনে ঢুকে স্যারের মাথার পাশের চেয়ারে বসলাম। স্যারের চোখ বন্ধ। গলা পর্যন্ত সাদা চাদর টানা। আমি গুনগুন করে গাইতে লাগলাম-
"স্যার গো, এইচ আর মানে চিনি, অনেক মিষ্টি,
ও স্যার, এইচ আর মানে বেনিফিটের বৃষ্টি।
এইচ আর মানে দেমাগ বেড়াইছে উড়িয়া,
বড় স্যারের সকল কথায় হিমেশ রেশামিয়া!
এইচ আর মানে পানিশমেন্ট এর কাব্য
যত যাই বলো আমি এপ্রাইজাল নিয়ে ভাববো!
এইচ আর মানে এটেন্ডডেন্স এ প্রতিদিন খোঁজা লেট,
এইচ আর মানে বোল্ড এন্ড বিউটিফুলে ৭৭৭ ব্লেড।
এইচ আর মানে নেভার দা লেস ছুটি ছাটা হবে কম,
এইচ আর মানে সেইভ করা বুকে দরদের রুমালী পশম।
এইচ আর মানে......"
বাকিটুকু শেষ করতে পারিনি! ভুতের মতো স্যার শোয়া থেকে খটাং করে উঠে বসেছেন। শুধু উঠেই বসেননি, চিৎকার করে হাসপাতাল মাথায় তুলে ডেকেছেন, "সিকিউরিটি.... "!
আপডেট: হাসপাতালের সিকিউরিটি টিম আমাকে একটা স্টোর রুমে নিয়ে আটকে রেখেছে। আমি নাকি পেশেন্টের হার্টে এট্যাক করেছি। আমি যতই বলছি পেশেন্ট না, এটেন্ডেন্ট এর হার্ট চুরি করেছি। এরা শুনবেই না। এদিকে ঝুনঝুনি আমাকে টেক্সট করেছে, "জাস্ট লিভ"! আর এদিকে এরা আমাকে ছাড়ছে না। এখন একসাথে গ্রিভেঞ্জ আর ডিসিপ্লিনারি প্রসেস হবে। চারদিকে শুধুই এইচ আর, অথচ আমরা কেউ বুঝি না!
ে_লয়_ব
#বিশ্ব_এইচ_আর_দিবস
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৫
সকাল সকাল ঘর থেকে বের হয়েই ফুলের দোকানে ছুটে যাচ্ছিলাম। আজকে বিশ্ব এইচ আর দিবস। মুজরা স্যারের জন্য একটা ফুল নেয়ার লোভ সামলাতে পারিনি। পথেই সবজী ভ্যানে পেয়ে গেলাম জাতীয় ফুল। এর থেকে দামী ফুল আর কি হতে পারে! বাসার নিচের কচি ছোট গেট টা পেরুতেই মুজরা স্যারের মুখোমুখি -
: ইয়াং ম্যান! অনেক ব্যাস্ত নাকি! কতদিন পরে এলে!
: আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে এলাম স্যার! আজকে বিশ্ব এইচ আর দিবস!
: শুভেচ্ছায় খুশি হতে পারছি না ইয়াং ম্যান!
: কেনো স্যার?
: যে এইচ আর খরচ কমাতে ফুলের জায়গায় শাপলার ডাটা নিয়ে হাজির হয়, সে যে এইচ আর মানে হিউম্যান রিসোর্স না বুঝে হিমেশ রেশামিয়া বোঝে এটা পরিস্কার।
: স্যার, বিশ্ব জুড়েই তো খরচ কমানোর ব্যাপারটা চলছে। আপনি এটা শুঁকে ফুলের স্মেল নেবার পর ঝুনঝুনি কে দিয়ে বললেন শাপলার চচ্চড়ি খাবেন, সাথে কচি ডজন খানেক চিংড়ি হলে দুর্দান্ত হবে!
: তা তো হবেই!
: দেখেছেন স্যার, আমি কত্ত ম্যাচিউর হয়েছি! এর সাথে এইচ আরও মিলে। ধরুন একটা ইন্টার্ণ নিলাম। তাকে দিয়ে ফটোকপি, প্রিন্ট আউট নিয়ে আসানো শেষে বাকি টাইম বসিয়ে দিলাম সিভি সর্ট করতে। ব্যাস, খরচ কাজ দুটাই চললো। সিভি দেখে কি আর ট্যালেন্ট বোঝা যাবে? ট্যালেন্ট তো ইন্টারভিউ বোর্ডে কে কত ছক্কা হাঁকাতে পারে তার উপর ডিপেন্ড করে।
মুজরা স্যার চিৎকার শুরু করলেন! তিনি ডান হাত বুকে চেপে ধরেছেন। দোতালার ছাদে ঝুনঝুনি চলে এসেছে। তার চেহারা লাল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব এইচ আর দিবসে এমন লাল মুখ দেখতে কার না ইচ্ছে করে!
আপডেট: মুজরা স্যার এম্বুলেন্স এর স্ট্রেচারে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। তার পাশেই ছলছল চোখে বসে আছে ঝুনঝুনি। সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছি আমি। আমার হাতে একজোড়া শাপলা ফুলের ডাটা।
ে_লয়_ব
#রম্য
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৪
গতকাল স্বপ্ন আউটলেট থেকে বের হবার সময়ই মোবাইলে ম্যাসেজ-
❝কাল সকালের নাস্তা আমাদের সাথে, বাবা বলেছেন।
-ঝুনঝুনি!❞
সকাল সকাল হাজির হয়ে দেখি টেবিলে নাস্তা নিয়ে বসে আছেন মুজরা স্যার আর তার বা পাশে ঝুনঝুনি। আমাকে দেখেই-
: ইয়াং ম্যান! গুড মর্নিং!
: মর্নিং স্যার, কেমন আছেন?
: আমি ভালো আছি। কিন্তু তুমি যে ভালো নেই তা তো বুঝতেই পারছি!
: কি যে বলেন স্যার!
: দেখ, মানুষের সামনে নতুন অপরচুনিটি এলে মানুষ অস্থির হবে এটাই স্বাভাবিক। সেই অপরচুনিটি চাকরি হোক, প্রেম ভালোবাসা হোক কিংবা শেখার অপরচুনিটি হোক।
: অপরচুনিটি তো ভালো ব্যাপার, তাই না স্যার?
: তা তো অবশ্যই। তবে ডিসিশন নেবার ক্ষেত্রে ভালোভাবে বুঝে নেয়া দরকার। অনেক সময় আর্টিফিশিয়াল ব্যাপার দেখে আমাদের চোখে ধাঁধা লাগে। দারুন বেতন, দারুন অফিস, মর্ডান গেট আপের ছেলে-মেয়ে এমিন অনেক কিছু দেখে অস্থির লাগে। ডেস্কটপে দেখা দারুন ছবি দেখেই কম্পিউটারটা ভালো এটা ভাবার কারন নেই। ইংরেজি জানা মানুষের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে কে বললো!
গতকাল টুনটুনি আর তার বাবার সাথে পুরো কথোপকথন পিছনে দাঁড়িয়ে ঝুনঝুনি আর মুজরা স্যার শুনেছে বোঝাই যাচ্ছে। আমি ঝুনঝুনির দিকে তাকালাম। সে নাস্তার শুন্য প্লেটের দিকে মাথা নিচু করে তাকিয়ে আছে। মুজরা স্যার আবার বললেন-
: জীবনে কিছু কিছু ব্যাপারের এক্সপেরিয়েন্স নিজেকেই গেদার করতে হয়। সব কিছু কেউ হাত ধরে শেখালে ডিপেনডেন্সি বাড়তে থাকে। বাজারটা তুমি করতে করতেই শিখে যাবে। এর জন্য উচ্চতর ট্রেনিং এর প্রয়োজন আছে? আর ইংলিশ? তা তুমি অনেক ভালো জানো বলেই আমি বিশ্বাস করি।
: না স্যার আসলে ইয়ে মানে....
: নাও, নাস্তা করো, আমি একটু উপর থেকে আসছি।
মুজরা স্যার চলে গেলেন দোতালায়। আমি আর দুজনেই চুপ করে আছি। এভাবে কিছুক্ষন বসে থেকে উঠে চলে এলাম। গলি থেকে বের হয়ে মেইন রোডে আসতেই মোবাইলে ম্যাসেজ-
❝অনেক মানুষ খুঁজে খুঁজে তাদের সারাজীবন পার করে দেয় যা আমি আপনার মধ্যে দেখেছি। শুধু এটুকু বলতে পারি, আপনার আর নতুন করে কিছু শেখার প্রয়োজন নেই।
-ঝুনঝুনি❞
ম্যাসেজটা পড়তেই বুকের ভেতর একটা চিলিক খেলে গেলো মনে হলো। ঠিক তখনি কে যেনো বললো-
: হেই.... য়ু! গুড টু সি ইয়ু এগেইন.... চলুন না কোথাও বসি।
অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে এলো-
: হাই... টুনটুনি!
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২৩
বাজার করাটা আমার জন্য খুবই মুশকিল একটা কাজ। ঠেকায় পড়ে যেদিন বাজার করতে হয় সেদিন যেন আমার সতীনের সংসার! আজকেও বাজার করতে এসেছি। ভদ্রলোকের বাজার স্বপ্ন আউটিলেটে। লিস্ট ধরে ধরে জিনিসপত্র নিয়ে এখন টয়লেট এর জিনিসপত্রের জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছি। আসলে আমি নিজের জন্য গা মাজনি খুঁজছি। বাথরুমে যেহেতু এটা থাকে তাহলে নিশ্চয়ই হারপিক টাইপ জিনিসের কাছাকাছিই থাকবে। কাওকে জিজ্ঞাসা করতেও লজ্জা লাগছে। একটা পুরুষ গা মাজনি খুঁজছে ব্যাপারটি ঠিক যায় না। ইংরেজিতে এর নামটা কি হবে? বডি সোবা?
অনেক খুঁজে না পেয়ে নিচে নেমে এলাম। শুধু মুরগীটা বাকি। বেকারি দোকানে সাজানো কেকের মত এরা উলঙ্গ মুরগী সাজিয়ে রেখেছি। আমি আংগুল দিয়ে ইশারা করে বললাম-
: আমাকে হিজাব ছাড়া একটা দেশী মুরগী দিন তো।
সেলসম্যান টা আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। এমন সময় পাশ থেকে একটা কন্ঠ পেলাম-
: ওটা ড্রেসড চিকেন।
তাকিয়ে দেখি আধুনিকা এক মেয়ে। পরনে জিন্স, গায়ে কালো টি-শার্ট, কানে ছোট ঝুমকা, হাতে কচুরিপানার প্রসেসড চুড়ি পায়ে স্নিকার্স, কাঁধ ছাড়ানো চুল, লম্বা চিবুক, চিমটিকাটা গাল আর ফিগারটা... আচ্ছা, একটু দম নেই! বললাম-
: ওয়াও! ভালো নাম তো! ড্রেসড মানে পাস্ট টেন্স মানে আগে ড্রেস ছিল! আচ্ছা? ইংরেজিতে গা মাজনি কে কি বলে? ইয়ে মানে ব্যাপারটা জানা ছিলো না বলে কাওকে জিজ্ঞাসা করতে পারিনি!
: ওটা বাথ স্পঞ্জ।
আমি আরেকবার ভালো করে তাকালাম তার দিকে। দারুন দেখতে। হঠাৎ পিঠে হাত পরলো। এক ভদ্রলোক। বললেন-
: বাবাজী! সহসা বাজার করো না বলে মনে হচ্ছে?
: জ্বী ইয়ে মানে দরকারে তো করতেই হয়।
: সে তোমার ট্রলি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তেল নিয়েছো পাঁচ লিটার আর বাকি সব নিয়েছো মিনিপ্যাক! প্রতি সপ্তাহে বাজার করবে নাকি?
: আরে তাইতো! আসলে কতটুকু লাগবে তা বুঝতে পারিনি।
: হুম, শুধু বাজারে না তোমার তো দেখি ইংরেজিতেও সমস্যা!
: শেখার তো শেষ নেই আংকেল....
: বাসা কোথায় তোমার বাবাজী?
: এইতো পাশেই।
: আমার চার নাম্বার রোডের আঠারো নাম্বার বাসা। চলে এসো। আমার মেয়ে বাজার আর ইংলিশ দুটোতেই এক্সপার্ট!
: উনি আপনার মেয়ে?
: হ্যা, এ আমার একমাত্র মেয়ে টুনটুনি। বিকেলে চলে এসো!
: জ্বী জ্বী, অবশ্যই। আলতুফালতু জিনিস শেখার থেকে ইংলিশ শেখা অনেক ভালো। অবশ্যই আসবো আংকেল।
: ওকে বেটা, সি ইউ দেন। চল মা টুনটুনি...
উনারা চলে গেলেন। যাবার আগে টুনটুনি ডান হাতের তিন আংগুল নেড়ে বাই দিয়ে গেলো। আমিও হাত তুলে বাই দিলাম। কাউন্টার থেকে প্যাকেট নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝুনঝুনি! তার পেছনে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা মুজরা স্যার! আমার হাতে তখন পিস পিস কাটা একটা দেশী হিজাব ছাড়া মুরগী!
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২২
ঝুনঝুনির সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। ওর লাল জামাটা আমার ভেতরের ষাড়টাকে বার বার নাড়া দিচ্ছিলো। না থাকতে পেরে বলেই ফেললাম-
: ঝুনু! এখন তো চাঁনরাত! চলুন না একটু ঘুরে আসি।
: না না, বাবা গরু আনতে গেছেন। এসে যদি দেখেন আমি নেই, নির্ঘাত আপনাকেই সন্দেহ করবে।
: আরে না, স্যার এত সহজে গরু পাবেন না। উনাকে কেউ গরু দিলে তো...
: কি বললেন?
: না ইয়ে মানে...
এমন সময় এক পাগলাটে গরু নিয়ে গেইটের ভেতরে ঢুকলেন মুজরা স্যার। আমাকে দেখেই মুজরা স্যার বললেন-
: ইয়াং ম্যান! দেখ কেমন তেজি গরু!
: তেজি কোথায় স্যার? ওর তো মেজাজ খারাপ।
: মেজাজ খারাপ মানে? তেজ আর মেজাজ খারাপ কি এক হলো?
: তেজ কথাটা তো অন্য ব্যাপার স্যার। এই গরু তো কাছে যেতেই দিচ্ছে না। কোন না কোন ভাবে তার মেজাজ খারাপ। ওকে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে হবে স্যার।
: গরুকে মোটিভেশনাল স্পিচ! আর ইয়ু ম্যাড?
: স্যার বোঝার চেষ্টা করুন।
: তুমি বলতে চাইছো আমি ভুল বুঝছি!
: না না না স্যার, আপনি যেহেতু বলছেন তেজ তাহলে তো অবশ্যই। গরু মানুষের সাথে তেজ দেখাবে কেনো! গরু তেজ দেখাবে গরুর সাথে। সজাতির সাথেই তো তেজ ব্যাপারটা আসে তাই না।
: হোয়াট! ইয়ু ব্লাডি গোট! আমাকে গরু বলছো? এই শিং দেখেছো? এদিয়ে গুতা দিয়ে তোমার মাথা নামিয়ে দেব। আমাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা! এই ঘরে চাপাতি আছে?
: চা খাবেন স্যার? লিকার চা?
: শাট আপ ইয়ু ইডিয়েট। চাপাতি দিয়ে আজ তোকে....... ষ্টুপিড কোথাকার...... ওরেহ....
মুজরা স্যার বুকে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পরেছেন। ঝুনঝুনি দৌড়ে এসে বললো একটা এম্বুলেন্স ডাকতে। এই চাঁনরাতে আমাদের ডেটটা বুঝি এম্বুলেন্স এর ভেতরেই হবে! আমি ছুট দিলাম এম্বুলেন্স খুঁজতে।
এম্বুলেন্স এর প্যা পু সাউন্ডটাকে সানাইয়ের সাউন্ড ভাবলে কি খুব মন্দ হবে!
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২১
এক সপ্তাহের জীবনে টানা ৯ দিন ঈদের বন্ধের আজ প্রথম দিন। কারাটে ক্লাসও নেই, ভাবলাম আজ সকাল সকাল ঝুনঝুনির সাথে দেখা হলে মন্দ হয় না! যেই ভাবা অম্নি উড়ে চলে এলাম। গেট দিয়ে ঢোকার সময় দেখি একতলার বারান্দায় দোলনায় অন্যমনস্ক। আমি বারান্দার রেলিং এর এপাশে দাঁড়িয়ে বললাম-
: মন খারাপ?
: আরে আপনি! কেমন আছেন? কখন এলেন!
: এইতো মাত্র, আপনার কথা মনে হলো সকাল সকাল। তা আপনার মুড অফ কেনো?
: বই পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু কোনটা পড়বো ডিসাইড করতে পারছি না।
: এতো কনফিউশান যেখানে সেটা না পড়ে অন্য কিছুতে মন ফেললেই হয়...
: মানে?
ঝুনঝুনি দোলনা থেকে উঠে রেলিং এর এপাশে এসে দাঁড়ালো। আমাদের মাঝে শুধুই একটা রেলিং.... আমি বললাম,
: বই পড়তে না চাইলে... প্রেমে পড়তে পারেন!
: শুনুন, পড়ে যাওয়ায় আমার খুব ভয়, পড়ে গেলে সব ভেঙে যায়।
: একবার পড়েই দেখুন না... হতে পারে আমরা নিচে না পড়ে দূরে উড়ে গেলাম!
হঠাৎ মুজরা স্যারের আওয়াজ পেলাম...
: কে উড়তে চাইছে রে!
: স্লামালিকুম স্যার!
: আরে ইয়াং ম্যান! তোমার মুখে সুন্নত রেখেছো দেখছি! নাকি ফ্যাশন?
: ইয়ে মানে স্যার নরসুন্দর এর কাছে যাওয়ার সময় পাচ্ছি না...
: সে সময় পাচ্ছো না কিন্তু সকাল সকাল আমার মেয়ের কাছে ঠিকই চলে এসেছো! এই হচ্ছে তোমাদের এইচআর দের সমস্যা! যেখানে ফোকাস করা দরকার তার উল্টো দিকে বসবাস।
: না মানে স্যার এইদিক দিয়েই....
: খুব বুঝেছি আমি। আচ্ছা বলো তো, নতুন কোন এম্পলয়ী জয়েন করে যদি জানতে চায় সে যদি আরো একটা মাস্টার্স করে তাহলে সে দ্রুত প্রমোশন পাবে কি না, এর জবাব কি হওয়া উচিত?
: জানি না স্যার!
: একজেক্টলি! তোমরা এইচ আর এর কিছুই জানো না। সব কিছু বসদের জিজ্ঞাসা করে নিয়ে বলো। আর জানবে শিখবেই বা কেমন করে? তোমাদের বসগুলোও তো কিচ্ছু জানে না। গত ৫ বছরেও একটা ট্রেনিংও করেনি, একটা আর্টিকেল ও পড়েনি। পড়ালেখার যে ভ্যালু আছে তাও জানে না। ইন্টারভিউ বোর্ডে দুইফোঁটা ইংলিশ ফোটালে যারা মনে করে এরা যোগ্য সেইসব বসের আন্ডারে থেকে কি শিখবে? ইদানিং তোমরা অনার্স পাস করাদের প্রমোশন দিয়ে দিয়ে এত উপরে তুলে ফেলেছো যে আর মাস্টার্স এর ওজন তোমরা জানো না! লজ্জা লাগে না নিজেকে এইচ আর প্রফেশনাল বলতে?
মুজরা স্যার বকবক করেই যাচ্ছেন। আমি ফুটপাত ধরে হাঁটছি। সকাল সকাল কি ভেবেছিলাম আর কি হয়ে গেলো। মুজরা স্যার আর একটু পরে এলে কি ক্ষতি হতো! আমাকে দেখলেই উনার কি হয়! হঠাৎ পকেটে টুং করে শব্দ হলো। ঝুনঝুনির ম্যাসেজ, "উড়ে যাবার ব্যাপারটা নিয়ে আলাপটা কিন্তু শেষ হয়নি আমাদের!"
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_২০
বেশ কয়েকদিন হলো ঝুনঝুনির সাথে দেখা হয় না। মোবাইলে ম্যাসেজ লিখে কি আর সব পোষায়! এই বিকেলের রোদে একটু দেখা হলে মন্দ কি। চলে এলাম মুজরা স্যারের বাড়ির গলিতে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দোতালার ছাদের সামনের দিকটায় লেবু গাছটার পাশ ঘেসে দাড়িয়ে আছে ঝুনঝুনি। আমাকে দেখেই হাত নাড়িয়ে ইশারা করে ছাদে উঠে আসতে বললো। আমি যেন উড়ে এলাম ছাদে! ছাদে উঠেই লেবু গাছটার দিকে যাচ্ছি, তখনি ঝুনঝুনি বললো-
: এই! আমিতো এখানে, ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
: লেবু গাছটা দেখতে যাচ্ছি।
: কেনো বলুনতো?
: যেটুকু সময় গাছটার পাশে দাড়িয়েছেন তাতেই এই গাছের সব পাতা মিষ্টি হয়ে যাবার কথা! এই গাছে লেবু ধরার সম্ভাবনাই নেই। গোলাপি মালটা ধরবে সত্যি!
: একটু বেশি বেশি হয়ে গেলো না!
: এই হালকা গোলাপি জামায় আপনাকে খুব মিষ্টি লাগছে আজ। কালো টিপটা খুলে ফেলেছেন কেনো?
: ইম্প্রেসিভ! আপনার ডেভেলপমেন্ট দেখে ভালো লাগছে। টিপের ব্যাপারটা কিভাবে ধরলেন?
: ছাদের দরোজায় সেঁটে আছে দেখলাম। এই যে, বুক পকেটে নিয়ে রেখেছি!
: আমি অভিভূত! শুনুন, আজ বাবার মুড খুব ভালো। খেয়াল রাখবেন যেন আপনার কথায় রেগে না যায়।
: কেন বলুন তো?
: পাশাপাশি থেকে আপনার ডেভেলপমেন্ট গুলো জানতে ইচ্ছে করছে খুব।
হঠাৎ মনে হলো দু ইঞ্চি উপরে উঠে গেছি! ঝুনঝুনি আমাকে পাশে চায়! আহা! ঠিক তখনি মুজরা স্যারের কন্ঠ পেলাম-
: কার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কথা বলছিস রে মা? এই! ইয়াং ম্যান! আসলেই তো তোমার ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে! সরাসরি ছাদে উঠে এসেছো!
: ইয়ে না মানে স্যার.... ডেভেলপমেন্ট খুব জরুরি। প্রপার ট্রেনিং ছাড়া ডেভেলপমেন্ট কি সম্ভব? আমি অফিসেও এসব নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছি।
: তা ইয়াং ম্যান তুমি রিসেন্টলি কয়টা ট্রেনিং করেছো শুনি? মা, ওই চেয়ারটা দে তো..
: স্যার আমার কি আর ট্রেনিং করার বয়স আছে? ওসব করবে জুনিয়ররা। তাও আবার খরচের ব্যাপার। ট্রেনিং দিলেই তো ভালো চাকরি খুজবে, চলে যাবে। তার চেয়ে বরং বকাঝকা দিয়ে কাজ করালেই ডেভেলপমেন্ট হবে।
: বলে কি! এই ছেলে বলে কি! এ নাকি আবার এইচ আর! দেখেছিস ঝুনঝুনি? এদের জন্য আজকে এইচ আর এর এই অবস্থা।
মুজরা স্যার চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়েছেন। ঝুনঝুনি আমাকে ইশারা করে চুপ থাকতে বললো। ঠিক তখনি মুজরা স্যার বললেন-
: ডেভেলপমেন্ট নিয়ে একটা কথা মনে পরলো, মাস ছয়েক আগে তুমি তোমার ব্যাগ মনে করে আমার এক ব্যাগ আন্ডারওয়্যার নিয়ে দৌড় দিয়েছিলে। সেগুলো লন্ড্রিতে দেয়ার জন্য রাখা ছিল। কি করেছো সেগুলো? ডেভেলপমেন্ট কি?
: ডেভেলপমেন্ট? হ্যা ইয়ে অবশ্যই। সেগুলো দরজির দোকানে দিয়েছি স্যার। দরজি খুব মনোযোগ দিয়ে ডেভেলপমেন্ট করছে। কোনটার সামনে চেইনওলা পকেট, কোনটার পেছনে ব্যাকপকেট আবার কোন আন্ডারওয়্যার এর সামনে বুকপকেট দেয়া হচ্ছে স্যার। রেভ্যুলেশনারী ডেভেলপমেন্ট নিয়া আসা হচ্ছে স্যার৷ আপনি একদম চিন্তা.....
আমি উর্ধশ্বাসে ছুটছি এম্বুলেন্স আনতে। মুজরা স্যার রাগে জ্ঞ্যান হারিয়ে ফেলেছেন। জ্ঞ্যান হারাবার আগে যে শেষ কথাটা বলেছেন তা হলো, এই গর্ধভগুলোই এইচ আর এর মানসন্মানের ব্যাকপকেট-বুকপকেট করে দিচ্ছে!"
ে_লয়_ব
্সপার্ট_মুজরা_স্যার_১৯
ঘটনাটা মাস ছয়েক আগের। সেবার আমার প্রমোশন হলো। ভালো খবর প্রথমেই খুব প্রিয় কাউকে জানাতে হয়। এক্ষেত্রে ঝুনঝুনিকে না জানালে আর কাকে জানাবো! যদিও লেটার পেয়েই ম্যাসেজ লিখে করে জানিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় ওর পছন্দের মিষ্টি আর লাড্ডু নিয়ে হাজির হলাম মুজরা স্যারের বাসায়। বসার ঘরে ঢুকতেই দেখি মুজরা স্যারের সামনে একটা ফিটবাবু বসে আছে। ঝুনঝুনি আমাকে দেখে এগিয়ে এসে কানে কানে বললো, "কংগ্রাচুলেশনস, বাবা কে কিন্তু কিছু বলিনি"! ঠিক তখনি মুজরা স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হাক দিলেন-
: ইয়াং ম্যান! এসো এসো, পরিচয় করিয়ে দেই! এ হলো বাকুড় লস্কর। খুব ব্রিলিয়ান্ট এইচ আর পারসোনালিটি। আর বাকুড়, এ হলো আমার শিষ্য। ওর নামটা গোলমেলে তাই ইয়াং ম্যান বলে ডাকি। আর বাকুড় আজ প্রমোশন পেয়ে এইচ আর ম্যানেজার হয়েছে!
বেকুব ইয়ে মানে বাকুড় সাহেব খুব তাচ্ছিল্যের সাথে আমার দিকে তাকালো। আমিও ঠোঁট উলটে বললাম কংগ্রেস! মুজরা স্যার আমাকে পাশে বসিয়ে বাকুড়ের সাথে আলাপ জুড়ে দিলেন-
: তা বাকুড়, বলো দেখি এই যে প্রমোশন পেলে এতে তোমার ওয়ার্ক লাইফে কি কি চেঞ্জ আসলো?
: অনেক কিছু স্যার! নতুন ভিজিটিং কার্ড হবে, মোবাইল সিলিং বাড়বে, জুনিয়ররা সন্মান করবে, আমি ওদের ভুল ধরে ইচ্ছামত বকা দিতে পারবো। ওদের মোবাইলে কল আসলে আমি ডাক দিলেই লাইন কেটে আমার কাছে আসতে হবে, আমার সামনে দাঁড়ায় দাঁড়ায় কথা শুনবে, আমি না বলা পর্যন্ত বসবে না, আমি যত রাত পর্যন্ত অফিসে বসে থাকবো ওরা আমার জন্য বসে থাকবে!
: বাকুড় বাকুড়... এসব না, আমি জানতে চাচ্ছি এই যে তুমি একটা ডিপার্টমেন্ট এর হেড হলে, এখন তোমার কি কি নতুন অথরিটি আসলো?
: স্যার, আমি এখন থেকে ম্যানেজারদের বাথরুম ইউজ করতে পারবো। আগে তো জুনিয়রদের জন্য বানানো কমন বাথরুম ইউজ করতাম!
: মানে! ম্যানেজার হলে কি টয়লেটে গিয়ে উল্কাপিণ্ড বের হয়? ম্যানেজারদের জন্য আলাদা বাথরুম মানে?
: থাক স্যার, অন্য কিছু বলেন৷ আমি খুব এক্সসাইটেড এই প্রমোশন এ।
: স্বাভাবিক! তা তোমার কাজ কি কি বাড়লো?
: বাড়লো কই স্যার! এখনতো শুধু মেইল ফরোয়ার্ড করে কাজ করাবো৷ নিজে কাজ করলে অন্যদের ভুল ধরবো কখন? এখন তো মিটিং করেই সময় চলে যাবে৷ মিটিং এ অনেক নাকি ডিস্কাসন হয়। আগে দেখেছি, বসগুলো মিটিং করে সারাদিন। একটু পর পর দেয়াল কাঁপানো হাসি, তারা সন্ধ্যা হলেই অফিসের খরচে মিটিং এর নামে মজার মজার খাবার খায় আর অফিসে অন্য যারা বসে থাকে তারা জুনিয়র বলে কিছুই পায় না। এবার আমিও মিটিং করবো।
: এসব কি বলছো বাকুড়! প্রমোশন মানে নতুন কাজ হাতে পাওয়া, নতুন অথরিটি হাতে আসা, জবাবদিহিতা বেড়ে যাওয়া, অন্যদের শেখানোর দ্বায়িত্ব বেড়ে যাওয়া, নেক্সট পারসন কে রেডি করা যাতে সে এক সময় তোমার জায়গায় আসে আর তুমি আরো উপরে ওঠো! এই হলো প্রমোশন এর মানে। আর তুমি এসব কি বলছো?
: কি বলেন স্যার! ছয় ছয়টা প্রমোশন পেয়ে ম্যানেজার হয়েছি। প্রতিটা পজিশনেই একই কাজ করেছি। নতুন কাজ বলে তো কিছুই পাইনি! জুনিয়র থাকার সময় বস ফটোকপি করাতো, এখনো করায়। তখনও তার পারসোনাল কাজ করে দিতে হতো, এখনো করায়, তখনও তাকে জিজ্ঞেস না করে কিছুই করা যেতো না, এখনো তাই। অফিস মানে তো এমনই! আর জুনিয়ররা কিছু শিখে ফেললেই তো মুশকিল! জুনিয়রদের উপরে তুললে আজ যারা সামনে দাঁড়িয়ে কথা শুনতো, কাল তারা সোফার হ্যান্ডেলে বসে কথা বলবে। বেয়াদব হয়ে যাবে।
: তাহলে তুমি প্রমোশন পেলে কিভাবে?
: দুই বছর হলেই তো প্রমোশন। তা না হলে বলতাম অমুক প্রমোশন পেলে আমাকেও দিতে হবে। এইটাই তো সিস্টেম স্যার। কোন জগতে আছেন আপনি? এখন তো হাল্কা ইংরেজি আর কম্পিউটার জানলে আর বসের পারসোনাল কাজ করে দিলেই প্রমোশন। পড়াশোনা বিবিএ বা অনার্স হলেই চলে। ওসবের দাম নেই। খুঁজলেই দেখবেন দুটো মাস্টার্স নিয়ে একজন কম বেতন আর শুধু ডিগ্রিপাস একজনের ডাবল বেতন। আপনি যে কোন দুনিয়ায় আছেন! আজ আসি স্যার, ভালো থাকবেন!
বাকুড় বের হয়ে গেলো। ওর কথাগুলো আমার কেন যেনো খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। মুজরা স্যার চিৎকার করে গালাগাল করছেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
: এই! তুমি কেনো এসেছো? মিষ্টি নিয়ে এসেছো দেখলাম মনে হয়?
আমি ভড়কে গিয়ে বললাম,
: না স্যার, আলু কিনতে মুদি দোকানে গিয়েছিলাম, ওরা ভুলে মিষ্টি দিয়ে দিয়েছে। আমি ফেরত দিয়ে আসি। আজকে আসি স্যার, স্লামালিকুম!
টেবিল থেকে ব্যাগটা টান দিয়ে নিয়ে দৌড় দিলাম। কিছুদূর আসার পর মোবাইলে ঝুনঝুনির ম্যাসেজ- "আপনি ভুল ব্যাগ নিয়ে গেছেন! ওখানে বাবার সব আন্ডারওয়্যার লন্ড্রিতে দেয়ার জন্য রাখা ছিল! যদি লন্ড্রিতে দিয়ে দিতেন প্লিজ!"
আমি সামনে তাকাতেই দেখলাম একটা ময়লার ভ্যান দাড়িয়ে আছে!
ে_লয়_ব
Click here to claim your Sponsored Listing.