02/06/2026
হর্ন অব আফ্রিকা: বিশ্ব ভূ-রাজনীতির এক তপ্ত চুল্লি
মানচিত্রের দিকে তাকালে আফ্রিকার পূর্ব প্রান্তে গণ্ডারের শিংয়ের মতো আকৃতির একটি অঞ্চল দেখা যায়? ভৌগোলিক এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই একে বলা হয় 'হর্ন অব আফ্রিকা' (Horn of Africa) । আপাতদৃষ্টিতে এই অঞ্চলটিকে কেবল খরা আর গৃহযুদ্ধের চারণভূমি মনে হলেও, বর্তমান বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পরাশক্তিদের নজর এখন এই শিংয়ের ওপর!
📍 হর্ন অব আফ্রিকার 'মূল চার' (Core Four) দেশ:
১. সোমালিয়া (Somalia): আফ্রিকার দীর্ঘতম উপকূলরেখা এবং কুখ্যাত জলদস্যুদের জন্য পরিচিত।
২. ইথিওপিয়া (Ethiopia): এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল দেশ, তবে এটি সম্পূর্ণ ল্যান্ডলকড (স্থলবেষ্টিত)।
৩. জিবুতি (Djibouti): আয়তনে ছোট হলেও সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
৪. ইরিত্রিয়া (Eritrea): লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত এক রহস্যময় ও কঠোরভাবে শাসিত রাষ্ট্র।
বিষয় সোমালিয়া ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়া জিবুতি
ধর্ম প্রায় পুরোপুরি মুসলিম খ্রিস্টান+মুসলিম খ্রিস্টান+মুসলিম মুসলিম
জনসংখ্যা ~২ কোটি ~১৩ কোটি ~৪০ লাখ ~১০ লাখ
প্রধান গোষ্ঠী Somali Oromo Tigrinya Issa Somali
অর্থনীতি দুর্বল সবচেয়ে বড় সীমিত বন্দরনির্ভর
শিক্ষা কম তুলনামূলক ভালো মাঝারি মাঝারি
⚓ লোহিত সাগর ও 'বাব-এল-মান্দেব': কেন এই অঞ্চল এত গুরুত্বপূর্ণ?
হর্ন অব আফ্রিকার ঠিক পাশেই রয়েছে বাব-এল-মান্দেব প্রণালী। এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
• অর্থনৈতিক লাইফলাইন: বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১২% থেকে ১৫% এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই সরু প্রণালীটি দিয়ে যাতায়াত করে। সুয়েজ খাল দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার এটাই একমাত্র পথ।
• চোক পয়েন্ট (Choke Point): সামরিক ভাষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ চোক পয়েন্ট। অর্থাৎ, কোনো শক্তি যদি এই প্রণালীটি বন্ধ করে দিতে পারে, তবে পুরো বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়বে (যেমনটা সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণের কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি) ।
⚔️ পরাশক্তিদের দ্বন্দ্ব ও জিবুতির 'সামরিক আড্ডাখানা'
লোহিত সাগরের এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য বিশ্বের পরাশক্তিগুলো হর্ন অব আফ্রিকায়, বিশেষ করে জিবুতিতে তাদের সামরিক ঘাঁটি গেড়েছে। জিবুতিকে বলা যায় বিশ্ব রাজনীতির এক অদ্ভুত মিলনমেলা:
• যুক্তরাষ্ট্র: আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একমাত্র স্থায়ী ঘাঁটি 'ক্যাম্প লেমোনিয়ার' (Camp Lemonnier) এই জিবুতিতেই অবস্থিত।
• চীন: ২০১৭ সালে চীন তাদের ইতিহাসের প্রথম ওভারসিজ (দেশের বাইরে) সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে জিবুতিতে, যা মার্কিন ঘাঁটির খুব কাছেই অবস্থিত।
• অন্যান্য পরাশক্তি: ফ্রান্স, জাপান, ইতালি এবং সৌদি আরবেরও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এখানে। রাশিয়া এবং ইউএই (UAE) এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
⚠️ বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও ফ্ল্যাশপয়েন্ট
১. ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার দ্বন্দ্ব (২০২৪-২০২৬): স্থলবেষ্টিত দেশ ইথিওপিয়া সমুদ্রে পৌঁছানোর জন্য সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল 'সোমালিল্যান্ড'-এর সাথে একটি চুক্তি করেছে। এর বিনিময়ে ইথিওপিয়া সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেবে। সোমালিয়া একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছে, যা পুরো অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
২. রেনেসাঁ ড্যাম (GERD) বিতর্ক: নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার বিশাল বাঁধ নির্মাণ নিয়ে মিসর ও সুদানের সাথে তাদের তীব্র কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চলছে।
৩. ভূ-অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা: চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এবং মার্কিন কাউন্টার-স্ট্র্যাটেজির মূল যুদ্ধক্ষেত্র এখন এই অঞ্চল।
জিবুতি, ইরিত্রিয়া, ইয়েমেনের গুরুত্ব কী?
১. সামরিক গুরুত্ব
যে দেশ বা শক্তি প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তার কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।
উদাহরণ:
• Djibouti-তে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক ঘাঁটি আছে।
• কারণ সবাই এই সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে চায়।
২. বন্দর আয়
জাহাজ ট্যাক্স না দিলেও:
• জ্বালানি নেয়;
• মালামাল খালাস করে,
• মেরামত করে,
• ক্রু পরিবর্তন করে।
এসব থেকে বন্দরগুলো প্রচুর আয় করে।
৩. ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব
ধরুন কোনো যুদ্ধ বা সংকট হলো।
তখন যে দেশ উপকূল নিয়ন্ত্রণ করে, সে:
• নজরদারি করতে পারে,
• সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে পারে,
• বাণিজ্যিক রুটকে প্রভাবিত করতে পারে।
এ কারণেই ছোট দেশ জিবুতির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তার আকারের তুলনায় অনেক বেশি
#ভূরাজনীতি #আন্তর্জাতিকবিষয়াবলি #বিসিএসপ্রস্তুতি #সাধারণজ্ঞান #তথ্যপ্রিজম