14/10/2024
মুশরিকদের উৎসবে হাজির হওয়া ও তাদের শুভেচ্ছা জানানোর শরয়ী বিধান
প্রথমত বলতে হয়, মুশরিকদের উৎসব, পূজাঅর্চনায় শুভেচ্ছা জানানো সবার ঐক্যমতে হারাম অর্থাৎ কবীরা গুনাহ। যদি কেউ মুশরিকদের শিরক কুফরে সন্তুষ্ট থাকে, তবে তা কুফর হবে। এবং তাকে কাফের বলা হবে। তবে এমনিতে স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে শুভেচ্ছা বিনিময় করলে তা হারামের অন্তর্ভুক্ত। তার জন্য অবশ্যই খালেস তওবাহ করতে হবে।
ইবনুল কাইয়্যিম তিনি তার আহকামু আহলিজ্জিম্মাহ নামের কেতাবের ১/৪৪১ নং পৃষ্ঠায় লেখেন—
وَأَمَّا التَّهْنِئَةُ بِشَعَائِرِ الْكُفْرِ الْمُخْتَصَّةِ بِهِ فَحَرَامٌ بِالِاتِّفَاقِ
অর্থ: কুফর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুভেচ্ছা জানানো সর্বসম্মতিক্রমে হারাম।
তিনি একই পৃষ্ঠায় একটু নিচে বলেন—
فَمَنْ هَنَّأَ عَبْدًا بِمَعْصِيَةٍ أَوْ بِدْعَةٍ أَوْ كُفْرٍ فَقَدْ تَعَرَّضَ لِمَقْتِ اللَّهِ وَسَخَطِهِ
অর্থ: যে কোনো গুনাহ,বেদআত,কুফরের জন্য কাউকে অভিনন্দন জানায়, সে নিজেকে আল্লাহ পাক উনার লানত অর্থাৎ অসন্তোষের মুখোমুখি করে।
অর্থাৎ কোনো ভাবেই মুশরিকদের উৎসবে তাদের শুভেচ্ছা জানানো জায়েজ নয়। যেহেতু ইদানীং কওমী জমাতি হেফাজতি চরমোনাইরা মন্দিরে হাজির হচ্ছে, অনেকে মন্ত্রপাঠ করছে, তাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, অতএব তাদের ঘরনার ফতোয়া উল্লেখ করা জরুরি মনে করছি। দারুল ইফতা বানূরী টাউন থেকে ফতোয়া প্রধান করা হয় —
غیر مسلموں کو ان کے تہوار کی مبارکباد دینا کیسا ہے؟
সওয়াল: অমুসলিমদের তাদের উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো কী?
এর জবাবে ফতোয়া দেওয়া হয়, ফতোয়া নম্বর ১৪৪২০৪২০০৪১৩ প্রকাশের তারিং ২৬/১১/২০২০ —
چوں کہ غیر مسلموں کے مذہبی تہوار مشرکانہ اعتقادات پرمبنی ہوتے ہیں اور ہر مسلمان پر اس کے مسلمان ہونے کی حیثیت سے شرک سے براءت، بے زاری آور بے تعلقی کا اظہارضرروی ہے۔ اور غیر مسلموں کے تہواروں پر ان کو مبارکباد دینا گویا ان کے نقطۂ نظر کی تائید ہے اور ان سے اظہارِ یکجہتی ہے، اس لیے غیر مسلموں کو ان کے تہواروں پر مبارکباد دینا جائز نہیں ہے، بلکہ اگر غیر مسلموں کو ان کے تہواروں کی مبارکباد دیتے وقت ان کی تعظیم و تکریم اور ان کے مذہبی تہواروں کی تحسین مقصود ہو تو کفر کا بھی اندیشہ ہے؛ لہٰذا اس سے اجتناب ضروری ہے۔ فقط والله اعلم
অর্থ: অমুসলিমদের উৎসব ইত্যাদি তাদের শিরকি বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। কাজেই আমাদের জন্য মুশরিকদের থেকে দূরত্ব এবং সম্পর্ক ছিন্নতার ঘোষণা দেওয়া আবশ্যক। আর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানোর দ্বারা যেহেতু তাদের চিন্তা-ভাবনা ও আকীদার সমর্থন হয়, তাই এটা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কখনো কখনো এটি ঈমান ভঙ্গের কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ কখনো কখনো এটা ঈমান ভাঙ্গার কারণ হতে পারে। এখানে শুভেচ্ছা জানানোকে মুশরিকদের আকাঈদ সমর্থন হয় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। অতএব তা কখনো জায়েজ হতে পারে না।
অনুরূপ ফতোয়া পাবেন— দারুল ইফতা , দারুল উলূম দেওবন্দ, ফতোয়া নং ১৪৫৬৪৯ প্রকাশিত হয়, ১৭/১১/২০১৬ | এসম্পর্কে দারুল উলূম করাচির ফতোয়া জানতে, তাদের ওয়েবসাইটে দেখুন, ফতোয়া নং ৩৭ প্রকাশের তারিখ :২৫/০৯/২০১৬ |
দ্বিতীয়ত বলতে হয়, তাদের মন্দিরে পূজামণ্ডপে, উৎসবে হাজির হওয়াও হারাম। অর্থাৎ কবীরা গুনাহ। মুশরিকদের উৎসবে হাজির হওয়া ও তাদের উপাসনালয় পাহারা দেওয়া মুমিনদের সিফত না। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ফারুকে আজম আলাইহিস সালাম তিনি বলেন—
وَلَا تَدْخُلُوا عَلَى الْمُشْرِكِينَ فِي كَنَائِسِهِمْ يَوْمَ عِيدِهِمْ، فَإِنَّ السَّخْطَةَ تَنْزِلُ عَلَيْهِمْ
অর্থ: তোমরা মুশরিকদের উৎসবগুলোতে তাদের মন্দিরে প্রবেশ করো না অর্থাৎ তাদের পূজামণ্ডপে হাজির হইও না। কেননা, তাদের উপরে লানত বর্ষিত হয়। —সুনানুল কুবরা, বাইহাকী, ৭/৩৯২পৃ.
এখন, যেখানে লানত বর্ষিত হয়, সেখানে কোনো ঈমানদার মুসলমানের যাওয়া জায়েজ হতে পারে? কোরআন শরীফে ‘যারা মুশরিকদের উৎসবে হাজির হয়না’ তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। এবং তা নেককারদের সিফত হিশেবে ইরশাদ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন—
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ
অর্থ: আর যাঁরা মুশরিকদের উৎসবে উপস্থিত হয় না। — সুরা ফুরকান, আয়াত শরীফ নং ৭২
আয়াতের জূর শব্দের একটা অর্থ হচ্ছে মুশরিকদের উৎসব বা ঈদ সমূহ। তাফসীরে কুরতুবী শরীফের ১৩/৭৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে—
وَبِهِ فَسَّرَ الضَّحَّاكُ وَابْنُ زَيْدٍ وَابْنُ عَبَّاسٍ وَفِي رِوَايَةٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّهُ أَعْيَادُ الْمُشْرِكِينَ
অর্থ: আর এ বিষয়ে দহ্হাক, ইবনে জায়েদ রহ. ও ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু তাফসীর করেছেন, এবং ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু উনার এক রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে যে, জূর হলো, মুশরিকদের উৎসব বা ঈদ সমূহ।
তাফসীরে বাগাবীর ৬/৯৮ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে—
قَالَ الضَّحَّاكُ وَأَكْثَرُ الْمُفَسِّرِينَ: يَعْنِي الشِّرْكَ
অর্থ: হযরত দহ্হাক ও অধিকাংশ মুফাসসির রহ. উনারা বলেন, জূর মানে হলো, শিরক অর্থাৎ শিরকের আস্তানা।
একই পৃষ্ঠায় অন্যত্র বলা হয় —
وَقَالَ مُجَاهِدٌ: يَعْنِي أَعْيَادَ الْمُشْرِكِينَ
অর্থ: হযরত মুজাহিদ রহ. তিনি বলেন — জূর মানে হলো, মুশরিকদের উৎসব বা ঈদ সমূহ।
যারা মুশরিকদের উৎসবে হাজির হয় না তাদের প্রশংসা করা হয়েছে সূরা ফুরকানের ঐ আয়াতে। ইমাম জাহাবী রহ. তিনি তাশাব্বুহুল খাসীস বি-আহলিল খামীস নামের কেতাবে ৩৪ নং পৃষ্ঠায় লেখেন—
وقد مدح الله من لا يشهد أعياد الكافرين ولا يحضرها ، قال تعالى :وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ
অর্থ: মহান আল্লাহ পাক, যাঁরা মুশরিকদের উৎসবে হাজির হয় না ও প্রত্যক্ষ করে না, তাঁদের প্রশংসা করেছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন— যাঁরা মুশরিকদের উৎসবে উপস্থিত হয় না।
উসূল হচ্ছে আর-রিদ্বা বিল-কুফরি কুফরুন। কুফরে সন্তুষ্ট থাকা বা সম্মতি জানানোও কুফর। এখন সাধারণত হাজির হওয়াই হারাম নাজায়েজ। এখন কেউ যদি এতে গিয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে মন্ত্রপাঠ করে, নিজের ভিতরে হিন্দুর বাস বলে মন্তব্য করে, তবে তিনি কাফের। তাকে ঈমান নবায়ন করতে হবে ।
ইমাম কুরতুবী রহ. তিনি তাফসীরে কুরতুবী শরীফের ৫/৪১৮ নং পৃষ্ঠায় লেখেন—
فَدَلَّ بِهَذَا عَلَى وُجُوبِ اجْتِنَابِ أَصْحَابِ الْمَعَاصِي إِذَا ظَهَرَ مِنْهُمْ مُنْكَرٌ، لِأَنَّ مَنْ لَمْ يَجْتَنِبْهُمْ فَقَدْ رَضِيَ فِعْلَهُمْ، وَالرِّضَا بِالْكُفْرِ كُفْرٌ، قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: (إِنَّكُمْ إِذاً مِثْلُهُمْ). فَكُلُّ مَنْ جَلَسَ فِي مَجْلِسِ مَعْصِيَةٍ وَلَمْ يُنْكِرْ عَلَيْهِمْ يَكُونُ مَعَهُمْ فِي الْوِزْرِ سَوَاءً، وَيَنْبَغِي أَنْ يُنْكِرَ عَلَيْهِمْ إِذَا تَكَلَّمُوا بِالْمَعْصِيَةِ وَعَمِلُوا بِهَا، فَإِنْ لَمْ يَقْدِرْ عَلَى النَّكِيرِ عَلَيْهِمْ فَيَنْبَغِي أَنْ يَقُومَ عَنْهُمْ حَتَّى لَا يَكُونَ مِنْ أَهْلِ هَذِهِ الْآيَةِ.
অর্থ: এতে বোঝা যায় যে, গুনাহগারদের সাহচর্য পরিত্যাগ করা ওয়াজিব, যখন তাদের দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হবে। কেননা, যে তাদের পরিত্যাগ করবে না, সে যেনো তাদের কাজে সন্তুষ্ট রয়েছে। আর কুফরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকাও কুফর। আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন— নতুবা তোমরা তাদের মতো হয়ে যাবে।
সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের আসরে বসবে, কিন্তু তাদের উপর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে না, সে গুনাহের ক্ষেত্রে তাদের মতোই সমান গুনাহগার হবে। তাই করণীয় হচ্ছে, তাদের অন্যায় কথা ও কাজের প্রতিবাদ করা; আর যদি এতে সামর্থ্য না থাকে, তবে সেখান থেকে উঠে চলে আসা, যাতে এই আয়াতের (কঠিন বিধানের) অন্তর্ভুক্ত হতে না হয়।
অতএব পূজাঅর্চনায় শুভেচ্ছা জানানো ও পূজামণ্ডপে, মন্দিরে হাজির হওয়া উভয়ই হারাম নাজায়েজ। কেউ যদি এতে সন্তুষ্ট থেকে ও আনন্দের সাথে করে, এতে খুশি প্রকাশ করে, সে নিঃসন্দেহে কাফের।
মহান আল্লাহ পাক আমাদের ওলী-আউলিয়া পীর মাশায়েখদের সহবতে থেকে সকল প্রকাশ কুফর শিরক বেদআত থেকে হেফাজত থাকার তৌফিক দান করুক। আমীন
— আছেমী নামদার
১৩/১০/২০২৪